০২ ডিসেম্বর ২০২০

সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামান্য কথা

চোখের আলোয়
-

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আর বাকি দিন দশেক। অনেকে বলছেন, সব রীতি-রেওয়াজ ভঙ্গ করে নির্বাচনের তফসিল পাল্টে দেয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন ৩০ জানুয়ারি থেকে পিছিয়ে পয়লা ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন শুরুতে বলেছিল, তারিখ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ প্রচার-প্রচারণা যখন তুঙ্গে; ভোটকেন্দ্র স্থাপনের স্থান চিহ্নিত এবং প্রার্থীরাও সেই নির্দিষ্ট দিনটি সামনে রেখে সব প্লান-প্রোগ্রাম তৈরি করছেন, সেই মুহূর্তে তারিখ পাল্টে দেয়া মানে একটি চলমান ট্রেনকে ধাক্কা দিয়ে লাইনচ্যুত করে ফেলার সাথে তুলনা করা যায়। আর ‘খেলা যখন চলছে তখন খেলার নিয়ম পাল্টানো রীতিবিরুদ্ধ’।
নির্বাচন কমিশন কাজটা কেন, কার ইঙ্গিতে করল সেই ব্যাখ্যায় না গিয়েও বলা যায়, এর ফলে পরোক্ষভাবে হলেও ক্ষমতাসীন দলের জন্য একটি মহলের ভোট পাওয়া নিশ্চিত হয়েছেÑ এমন ইঙ্গিত কেউ করলে তাকে দোষ দেয়ার সুযোগ থাকবে না। এই বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন একটি ‘বড় অন্যায়’ করেছে এবং বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ রেখেছে। সেই প্রমাণ অবশ্য ইসি আগে থেকেই পদে পদে দিয়ে এসেছে।
দুই সিটি করপোরেশনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারাভিযান সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জাতীয় সংসদের বর্তমান এমপিদের। তবে নির্বাচনীবিধি অনুযায়ী এমপিরা এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। নির্বাচনের আচরণবিধিতে সংসদ সদস্যদের ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সিটি নির্বাচনে ভোটার হলে শুধু ভোট দিতে পারবেন, কিন্তু কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। আওয়ামী লীগের দুই কমিটির দু’জন আহ্বায়ক অতিমর্যাদাসম্পন্ন জাতীয় নেতা এবং সাবেক মন্ত্রী হিসেবে প্রভাবশালী।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা নিজেও বলেছেন, এমপিরা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন করে সেই কাজটিই করে যাচ্ছে। তারা বিধিটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তা তো এখনো সংশোধন করা হয়নি। বিধি বহাল থাকা অবস্থায় খোদ ক্ষমতাসীন দল সেটি লঙ্ঘন করে চলেছে। অথচ এটি হলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। ক্ষমতাসীনরা জানেন, তাদের বাধা দেয়ার মতো শক্তি বা ক্ষমতা এখন এ দেশে কারো নেই। সেই সুযোগটাই তারা অনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাচ্ছেন। গায়ের জোরে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া দখল করতে চান। কিন্তু সিইসি বা পুরো নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। এর চেয়ে বড় পক্ষপাতিত্ব আর কী হতে পারে?
নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য আরো যেসব বিধিবিধান রয়েছে, বিরোধী দলের প্রার্থীদের জন্য সেগুলোও নিশ্চিত করা হয়নি। প্রতীক বরাদ্দের আগেই সরকারি দলের প্রার্থীদের পক্ষে দলের এমপিরা সভাসমাবেশ করে প্রচারণার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এ নিয়ে বহু অভিযোগ ইসির কাছে বা রিটার্নিং অফিসারের কাছে পেশ করা হয়েছে। তবুও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রচারণা শুরুর পরও শত শত অভিযোগ এসেছে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে বিরোধী প্রার্থীর কর্মীদের ওপর হামলা, প্রচারকাজে বাধা দেয়া, হুমকি-ধমকি ও ভীতি-প্রদর্শন থেকে শুরু করে এমন কোনো অভিযোগ নেই যা ইসিতে পেশ করা হয়নি। ইসি বা নির্বাচন কমিশন এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত এখনো দেখা যায়নি।

যে পরিবেশে নির্বাচন করছে বিএনপি
বিরোধীদলীয় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা কেমন পরিবেশে এবার নির্বাচন করছেন সেটি উল্লেখের দাবি রাখে। দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডেই বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা রীতিমতো আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। এই আতঙ্ক কেবল যে, এই নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় বিদ্যমান, এমন নয়। অনেক বছর ধরেই মিথ্যা, বানোয়াট এবং অনেক ক্ষেত্রে গায়েবি আজগুবি মামলায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা পর্যুদস্ত। অনেকে জামিনে আছেন কিন্তু ঘরে থাকতে পারেন না। পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন। এরপর নির্বাচনের প্রাক্কালে মামলা নতুন করে চাঙ্গা করাসহ গ্রেফতার ও হয়রানির হুমকি আসতে থাকে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে অনেক জায়গায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে পিছিয়ে গেছেন। অনেকে প্রার্থী হয়েও প্রকাশ্যে মাঠে নামার সাহস পাননি। যারা নেমেছেন, তারা কোনো রকমে গা বাঁচিয়ে যতটুকু সম্ভব ততটুকুতেই সীমিত রেখেছেন নিজেদের প্রচারণার কাজ।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে আতঙ্কে রয়েছেন মহানগর বিএনপি নেতারা। তাদের অভিযোগÑ বিভিন্ন মামলায় জামিনে থাকলেও নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের বেশির ভাগই নিজেদের বাসাবাড়িতে থাকতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরছি : ‘আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের বাসায় গিয়ে মাঠে যেন না থাকেন সে ব্যাপারে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন; আবার বেশ কিছু এলাকায় দলের নেতাকর্মী যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তাদের তালিকাও করছে পুলিশ। ...৫৭ নং ওয়ার্ডের কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলামকে বিএনপি কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেয়। তিনি মনোনয়ন ফরমও কিনেছিলেন। কিন্তু জমা দেননি। ওই এলাকার বিএনপির এক নেতা জানান, আওয়ামী লীগ নেতাদের ভয়ভীতির কারণে সাইফুল ইসলাম মনোনয়ন ফরম জমা দেননি।’
এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট পত্রিকাকে বলেন, ‘ফরম নিয়েছি, দলীয় সমর্থন পেয়েছিলাম। কিন্তু ফরম জমা দেইনি। কারণ এলাকায় নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই।’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪০ নং ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী গেন্ডারিয়া থানা বিএনপির সভাপতি মকবুল ইসলাম খান টিপু বলেন, ‘আতঙ্কের মধ্যে আছি। লোকজন বলছে ভোট হলে তো আপনি আবারো বিজয়ী হবেন। কিন্তু ভোট তো হবে না।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ কিছু দিন আগে এসে বলেছে, আপনার আর নির্বাচন করার কী দরকার? অন্যদের সুযোগ দিন।’
পুলিশের এই অবাঞ্ছিত ভূমিকা পালনের পেছনে কী কারণ কিংবা কারা পেছন থেকে এর কলকাঠি নাড়ছে, পাঠকের কি সেটা বুঝতে বাকি আছে? কোথাও কোথাও পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘তালিকা তৈরি করছে’ বলেও গুজব ছড়ানো হয়েছে। কেন এসব করা হচ্ছে, বুঝে নেয়া যায় সহজেই। এরই মধ্যে বিএনপি সমর্থিত একজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ। বলা হয়েছে, ‘আগের মামলায় ওয়ারেন্ট ছিল’।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়রপ্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন অভিযোগ করেন, বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেফতার করে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে যেতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। উল্লিখিত কোনো অভিযোগেরই প্রতিবাদ আসেনি ক্ষমতাসীন দলের কোনো স্তর থেকে।
ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল একটি পত্রিকাকে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, এ নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে।’ তিনি বিতর্ক না বাড়িয়ে এ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার আহ্বান জানান।

ইভিএম নিয়ে ইসির একগুঁয়েমি
ইভিএম নিয়ে পানি অনেক ঘোলা করা হয়েছে। সব বিরোধী দলই এই আধাদক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে। শুধু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একা এই প্রযুক্তি ব্যবহারে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে মনে করা যেতে পারে যে, নির্বাচন কমিশন না চাইলে আওয়ামী লীগ এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য চাপ দিত না। কিন্তু কমিশন এটি জোর করেই চাপিয়ে দিচ্ছে। এর পেছনে অন্য কোনো ‘খেলা’ আছে কি না, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। শুধু বলা যেতে পারে, ইভিএম যন্ত্র ব্যবহারে ইসির একগুঁয়েমি যথেষ্ট রহস্যজনক।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বিবিসিকে বলেছেন, সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম চাপা দিতে এখন ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট পুনঃগণনার কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো বিতর্ক হলে মামলা করার সুযোগ নেই। এখন গুণ্ডামির দরকার হবে না। পুলিশকে রাতে বিরিয়ানি খাওয়ার টাকাও দিতে হবে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হবে না। শুধু সুইচ টিপলেই সব ভোট চলে আসবে। কিন্তু প্রার্থী বা ভোটার হিসেবে আপনি কোনো প্রমাণপত্র হাতে পাবেন না। ফলে মামলাও করতে পারবেন না।’
সম্প্রতি ঢাকায় ইভিএম নিয়ে যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল বিএনপি সমর্থিত একটি সংগঠন। এতে একটি বিশেষজ্ঞ দল ইভিএমের টেকনিক্যাল সমস্যাগুলো তুলে ধরেছে। সেই দলের প্রধান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, একজন ভোটার ভোট দেয়ার পর জানতে পারবেন না, তিনি কোথায় ভোট দিলেনÑ এটিই ইভিএমের বড় ত্রুটি।’
স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জনগণের মধ্যে ইভিএম নিয়ে অনাস্থা আছে, অবিশ্বাস আছে। সেটি দূর করতে ইসি কী করেছে, সেটি আমাদের জানাতে হবে। একটি জাতীয় দৈনিকের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘অনেক দেশ ইভিএম বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতেও ইভিএম নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, সেটি সেখানকার নির্বাচন কমিশন সমাধান করেছে। তারা ইলেকটোরাল পেপার চালু করেছে। প্রমাণ হিসেবে ভোটারদের হাতে সেটি দেয়া হচ্ছে। আমাদের এখানে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এখানে পুনর্গণনার ব্যবস্থা কি হবে, তা-ও জানা নেই। আমি কাকে ভোট দিলাম, সেটি জানতে হবে। এগুলো ঠিক করেই নির্বাচন করা উচিত।’
আমাদের নির্বাচন কমিশন এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেয়ারই দরকার মনে করছে না। কারণ তাদের কাছে হয়তো এগুলো কোনো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ই নয়। তারা কেবলই প্রচার করে চলেছে যে, ‘ইভিএমে ভোট জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই।’ যদিও কথাটা সত্য নয়। ইভিএম নিয়ে ইসির এই একগুঁয়েমিতাই রহস্যজনক। কেউ যদি এর পেছনে ‘বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য’ আছে বলে ধরে নেয়, তাহলে তাকে দোষ দেয়া যাবে কি?
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া এরই মধ্যে পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। বর্তমান ইসির হাত ধরে সেটি বর্তমানে বিলীন হওয়ার পর্যায়ে। সুতরাং এবারের সিটি নির্বাচন কেমন হবে, সেই চিন্তায় মাথা গরম করার কোনো মানে হয় না। হ


আরো সংবাদ