০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`

সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে সমাবেশকে শান্তিপূর্ণভাবে করতে সহায়তা করা : ফখরুল

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। - ছবি : নয়া দিগন্ত

নয়াপল্টনেই ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশ হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটি আবারো এই অবস্থানের কথা জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (৮ ডিসেম্বর) বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন।

তিনি বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, আমরা সমাবেশ করবই। এজন্য নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জায়গা চেয়েছিলাম। এখন সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এই সমাবেশটাকে শান্তিপূর্ণভাবে করতে সহায়তা করা। আমরা অবশ্যই আমাদের সমাবেশস্থলে যাব। আর জনগণ কী করবে সেটা জনগণই ডিসাইড করবে।

নয়াপল্টন সড়ক পুলিশ অবরোধ করে রেখেছে, সেখানে কিভাবে সমাবেশ করবেন জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা ২২ আগস্টের আগে অনেকেই বলেছেন বিএনপি পারে না। কিন্তু ২২ তারিখের পর ৯টি সমাবেশ হয়েছে না? আপনারা নিজেরাই দেখেছেন জনগণ কিভাবে উঠে দাঁড়াচ্ছে। আমরা সবাই বিশ্বাস করি, যে গণতন্ত্রের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সেই গণতন্ত্র আজকে পুরোপুরিভাবে এরা লুট করে নিয়ে চলে গেছে। সেটাকে ফিরে পাওয়ার জন্য জনগণ উঠে দাঁড়াচ্ছে, নদী সাঁতরিয়ে পার হচ্ছে, ভেলা দিয়ে নদী পার হচ্ছে, ১০০ মাইল সাইকেলে, হেঁটে, চিঁড়া-মুড়ি-গুড় নিয়ে সমাবেশগুলোতে উপস্থিত হচ্ছে। অপেক্ষা করুন ঢাকায় তা আপনারা নিজেরা স্বচক্ষে দেখবেন।

তিনি বলেন, ১০ তারিখ আমাদের বিভাগীয় সমাবেশের শেষ কর্মসূচি। এই সমাবেশ থেকে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবো। আমাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এসব। আমরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবো। সেখান থেকে আমাদের আন্দোলন শুরু করা হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যুগপৎভাবে এই আন্দোলনে থাকবে। নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশি অভিযান এবং নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের বিষয় নিয়ে বিএনপি মহাসচিব স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ এই সংবাদ সম্মেলনে আসেন।

পুলিশি অভিযান কর্তৃত্ববাদের বহিঃপ্রকাশ : মির্জা ফখরুল বলেন, নয়াপল্টনে পুলিশের হামলা প্রমাণ করে বর্তমান সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তারা বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার সাংবিধানিক অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। যা গণতন্ত্র, রাজনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত। পুলিশের নির্মম হামলার প্রতিবাদ ও নিন্দার ভাষা আমাদের নেই। এটা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার শামিল। আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে গণ-আন্দোলনে পতনের ভয়ে ভীত হয়ে দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সরকারকে অগণতান্ত্রিক পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব। একইসাথে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পুলিশ প্রত্যাহার এবং ১০ ডিসেম্বর গণসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের প্রতিবন্ধকতা দূর করার দাবিও জানান তিনি। অন্যথায় সব দায় সরকারকে বহন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন ফখরুল।

বোমা বিস্ফোরণ-উদ্ধার পুলিশের নাটক : মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আমাদের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে পুলিশ সেখান থেকে গ্রেফতার করেছে। অফিসের কর্মচারীদেরও তারা গ্রেফতার করেছে। এরপর পুলিশ নিজেদের রেখে আসা বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের নাটক সাজায় এবং মিথ্যাচার করে। আমাকে তারা বিএনপি অফিসে ঢুকতে দেয়নি। আমার সামনেই পুলিশ সেখানে অসংখ্য বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। শুধু পুলিশ নয়, তাদের সাথে সোয়াত বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা এই সন্ত্রাসে নিয়োজিত ছিল। যে গুলি করেছে তার আলোকচিত্র এসেছে গণমাধ্যমে, আর্জেন্টিনার ড্রেস পরে সে গুলি করেছে।

কার্যালয়ে অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন : বিএনপি মহাসচিব বলেন, পুলিশ দাবি করছে যে বিএনপি কার্যালয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া গেছে, কয়েক বস্তা নাকি পাওয়া গেছে। তারা উদ্ধারের তল্লাশি চালানোর জন্য ক্রাইম সিন ঘোষণা করেছে আমাদের অফিসসহ এলাকাটিকে। অথচ আইন হচ্ছে কোনো বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালাতে যদি হয় সেই বাড়ির মালিককে সাথে রাখতে হবে। নিরপেক্ষ সাক্ষী থাকতে হবে। সাধারণত এই ধরনের তল্লাশি চালাতে হলে সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে হয়। এই ক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি। উপরন্তু আমাদের কার্যালয়ে না ঢুকতে দিয়ে পুলিশ চার ঘণ্টা ভেতরে ভাঙচুর করেছে, বোমা রেখেছে, এই সব বিস্ফোরক উদ্ধার নাটক তারা তৈরি করেছে। পুলিশ বিএনপি অফিসে অযাচিতভাবে প্রবেশ করে নিচতলা থেকে ৬ তলা পর্যন্ত বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করেছে। এমনকি দলের চেয়ারপারসনের কক্ষ, মহাসচিবের কক্ষ, অফিস কক্ষের দরজা তারা অন্যায়ভাবে ভেঙে প্রবেশ করে এবং সব আসবাবপত্র, ফাইল, গুরুত্বপূর্ণ নথি তছনছ করে। তারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক এমনকি দলীয় সদস্যদের প্রদেয় মাসিক চাঁদার টাকা, ব্যাংকের চেক বই, নির্বাচন কমিশন সংক্রান্তসহ সব গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে গেছে।

১৬০ বস্তা চাল উদ্ধার প্রসঙ্গ : মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ, এতে বিভিন্ন এলাকার নেতা-কর্মীরা আসবেন। আমি জানি না, আমার নলেজেই নেই। এমনও তো হতে পারে সেটা দেয়া হয়েছিল ওই সমাবেশে যারা আসবেন তাদের জন্য খিচুড়ি রান্নার জন্য, এটা হতে পারে। তবে ওই খানে ১৬০ বস্তা চাল রাখার কোনো জায়গাই নেই। এটা পুরোপুরি মিথ্যা। আর দুই লাখ বোতল রাখারো জায়গা সেখানে নেই।

সমাবেশে বসে যাওয়ার অপপ্রচার : সমাবেশ শেষে অবস্থানের অপপ্রচার প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা ওদের এই প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব দেই না। কারণ জনগণ ওদের এই প্রচারণায় বিশ্বাস করে না। জনগণ খুব ভালো করে বুঝে গেছে যে, আওয়ামী লীগ একটা মিথ্যাচার করা দল। তারা এই মিথ্যাচার করে প্রতারণা করে, মানুষকে ভুল বুঝিয়ে যেমন উন্নয়ন বিভ্রম সৃষ্টি করেছে, তেমনি একইভাবে ভুল প্রচার করে গণতন্ত্র ও রাজনীতির বিভ্রম শুরু করেছে। এটা ছাড়া তারা টিকতে পারে না। অন্য দলগুলোর সাথে মিলে আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যুগপৎ আন্দোলন করবো।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এনামুল হক চৌধুরী, আবদুল কাইয়ুম, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, নাজিম উদ্দিন আলম, জহির উদ্দিন স্বপন, ফাহিমা মুন্নী, জি এম সিরাজ, আলী নেওয়াজ খৈয়াম, সুলতান মো: বাবু, আবুল হোসেন, তাইফুল ইসলাম টিপু, বেলাল আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ফখরুলকে কার্যালয়ে যেতে বাধা : সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে বিএনপি মহাসচিবের গাড়ি নাইটিঙ্গেল মোড়ে এলে পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে আটকিয়ে দেয়। এ সময় মহাসচিবের সাথে দলের ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ও মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান ছিলেন।

ডিএমপির যুগ্ম-কমিশনার বিপ্লব সরকার এ সময় জানান, ক্রাইম সিনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি অফিসে কারো প্রবেশাধিকার নেই।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরে উপস্থিত গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে বলেন, আমি বিএনপির মহাসচিব। আমাকে আমার পার্টি অফিসে যেতে দেয়া হলো না এবং তারা যে কথাগুলো বলছে এটা সর্বৈব মিথ্যা। আমাদের ওখানে কোনো বিস্ফোরক ছিল না। নাথিং ওয়াজ দেয়ার। তারা (পুলিশ) নিজেরা এসব করেছে, আপনারা (গণমাধ্যম) তা দেখেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এটা সম্পূর্ণভাবে চক্রান্ত ও পরিকল্পনার প্লট। আমাদের ১০ তারিখের সমাবেশকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য এটা সরকারের হীন পরিকল্পনা-চক্রান্ত। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য, মানুষের অধিকারকে ধ্বংস করার জন্য আমার রাজনৈতিক অধিকারকে হরণ করার জন্য, আমার রাজনৈতিক দল হিসেবে আমার নিজের অফিসে যেতে না পারি তাহলে কী করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কাজ করবে। আমি অবিলম্বে বিএনপি অফিস খুলে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

মির্জা ফখরুল গাড়ি থেকে নেমে যুগ্ম কমিশনারকে বলেন, আমি আমার পার্টি অফিসে যেতে চাই। এই সময়ে স্যার সম্বোধন করে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গতকাল (বুধবার) বিকেলে বেলা ও রাতে আমাদের পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেছি, ককটেল বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি এই মুহূর্তে আমাদের কাছে ঘটনাস্থল যেটিকে আমরা আইনের ভাষায় বলি প্লেইস অব ওকারেন্স। সো এটা আমরা ক্রাইম সিন হিসেবে বিবেচনা করছি। ক্রাইম সিন হিসেবে আমাদের সিআইডি, বোম ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা সেখানে কাজ করছে। সো এই মুহূর্তে কেউ সেখানে যেতে পারবে না।

মহাসচিব আবারো প্রশ্ন করে জানতে চান যে, আমি আবার অফিসে যেতে পারবো কি না। যুগ্ম-কমিশনার বলেন, ক্রাইম সিনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে কেউ এলাউড না। নো বডি এলাউড টু গো।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমি বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে আমার পার্টি অফিসে যেতে পারবো কি না এটা আপনি বলুন? এ রকম প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ক্রাইম সিনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নো বডি ইজ এলাউড টু এন্টার ইন টু দি পার্টি অফিস।

পরে বিএনপি মহাসচিব গাড়িতে উঠে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পুলিশের গুলিতে নিহত পল্লবীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মকবুল হোসেনের লাশ দেখতে যান এবং তার পরিবারকে সান্ত্বনা দেন। এ সময় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা: রফিকুল ইসলাম ছিলেন।


আরো সংবাদ


premium cement