২৫ মে ২০২২
`

নাসিকে কৌতূহলের ভোট আজ


অপেক্ষার পালা শেষ। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন আজ রোববার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ হচ্ছে, কে হবেন নগর পিতা। নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষের দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জের দিকে।

রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রয়েছে নানা রকম কৌতূহলী প্রশ্ন। প্রার্থীদের অনেকের অভিযোগের শেষ নেই। তবে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে জানিয়েছেন আর পুলিশ সুপার বলেছেন, নির্বাচনী উৎসব নষ্ট করতে চাইলে কঠোর ব্যবস্থা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এত আয়োজনের পরও স্বস্তিতে নেই ভোটররা। সবার মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কী হবে, কী হচ্ছে?

নির্বাচনে মূলত প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তৈমূর আলম খন্দকারকে নিয়েই সরব আলোচনা। বিজয়ের ব্যাপারে দুইজনই আত্মবিশ্বাসী। তৈমূর বলেছেন, সুষ্ঠু হলে তিনি লক্ষাধিক ভোটে বিজয়ী হবেন। মরে গেলেও মাঠ ছাড়বেন না। অপর দিকে আইভী বলছেন, তার বিজয় সুনিশ্চিত । তবে কে বসবেন নগর পিতার আসনে। কে হাসবেন শেষ হাসি। কার গলায় যাবে বিজয়ের মালা এমন জিজ্ঞাসা জনে জনে।

জানা গেছে, নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা সোয়া পাঁচ লাখ। ভোট শুরু হবে সকাল ৮টায়, চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ২০১১ সালে পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সিটির নির্বাচন। এই নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে পাঁচজন দলীয় ও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ সাতজন প্রার্থী। সংরক্ষিত ৯টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ৩২ জন এবং ২৭টি সাধারণ আসনে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ১৪৮ জন প্রার্থী। তবে মেয়র পদে সাত প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই হবে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভী আর হাতি প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের মধ্যে। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে তৈমূর সকাল সাড়ে ৮টায় নারায়ণগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে এবং আইভী নারায়ণগঞ্জ শিশুবাগ স্কুল কেন্দ্রে নিজের ভোট প্রদান করবেন।

নির্বাচন ঘিরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। আজ ও কাল প্রতি সাধারণ ওয়ার্ডে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং তিনজন পুলিশ ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৫-২০ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবে। পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স ২৭টি, মোবাইল টিম ৬৪টি, প্রতিটি টিমে পুলিশ সদস্য পাঁচজন, প্রতি কেন্দ্রে পুলিশ পাঁচজনের মধ্যে একজন এসআই। আনসার আট, মহিলা আনসার চারজন। বিজিবি থাকছে ১৪ প্লাটুন, আরো ছয় প্লাটুনের জন্য ডিসির চাহিদাপত্র দেয়া রয়েছে। র‌্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স তিনটি, চেকপোস্ট ছয়টি, টহল টিম সাতটি স্ট্র্যাটিক থাকছে দু’টি।

নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল শনিবার রিটার্নিং অফিসার মাহফুজা আক্তার বলেন, আমরা ভোটের সব সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়েছি। ১৯২টি কেন্দ্রকেই আমরা গুরুত্ব ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আমলে নিয়েছি। ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। প্রতি কেন্দ্রে থাকবেন ২৬ জন সদস্য। ভোটে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। ভোটাররা যেন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য যা যা করার নির্বাচন কমিশন সব ব্যবস্থা নিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। ভোটের দিন আমাদের ৩০ জন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবেন। পুলিশের ৭৫টি ও র‌্যাবের ৬৫টি টিম মাঠে থাকবে। বিজিবিও আমাদের সাথে কাজ করবে। নির্বাচনের জন্য যারা থ্রেট হতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আশা করি সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছ থেকে লিখিত, ফোনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনো অভিযোগ পাইনি। ইলেকশনের রুটিন ওয়ার্ক করছি। দাগি আসামির বিরুদ্ধেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

বহিরাগতদের প্রশ্নে ডিসি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের কথা জানি না, সেটা সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। এ ছাড়া কোনো সরকারি বাসস্থানে প্রশাসনের লোক ছাড়া কাউকে স্থান দেয়া হয়নি। সব সেন্টারকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। সবাই নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন।’

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, কোনো বহিরাগতকে শহরে প্রবেশ করতে দেবো না। নারায়ণগঞ্জ মহানগরে আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে সবাইকে চলাচল করতে দেবো। যারা শহরে বের হবেন, পরিচয়পত্র নিয়ে বের হবেন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় আমরা ছাড় দেবো না।

নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এসপি বলেন, কেউ যদি নির্বাচনের উৎসব ও আমেজের পরিবেশ নষ্ট অথবা বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে তাহলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। আমরা কঠোর অবস্থানে আছি, কঠোর অবস্থানেই থাকব। মা- বোনেরাসহ যারা আছেন, আপনারা সবাই ভোটকেন্দ্রে আসবেন। কেউ বাধা দিলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো।

স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার বলেছেন, মানুষের ওপর যত অত্যাচার হয় ভোটাররা তত ঐক্যবদ্ধ হয়। লক্ষাধিক ভোটে পাস করব। মরে গেলেও মাঠ ছাড়ব না। প্রশাসনকে বলব জনগণের সেবা করা আপনাদের দায়িত্ব। বহুবার রিকোয়েস্ট করেছি, এখন বিবেকের কাছে ছেড়ে দিলাম। ভোট যাই হোক আমরা মাঠে থাকব। গ্রেফতার হলে হবো; কিন্তু নির্বাচন চালিয়ে যাবো। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন হাতি প্রতীকের তৈমূর।

তিনি বলেন, আমি প্রচার না; সংবাদ সম্মেলন করছি। আমি ভোট চাইনি। আমার ঘরে আগুন লাগিয়ে দিলে আমি কি বলব না? আমার লোকজন গ্রেফতার হচ্ছে, আমার গলায় আপনি ফাঁসি লাগিয়ে দেবেন আমি কথা বলতে পারব না, সেটা তো হবে না। এটা নৈতিক দায়িত্ব।

তৈমূর বলেন, এখানে অনেক লোক যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। এদের মধ্যে এমন কোনো লোক নেই, যাদের বাড়িতে দুই-তিনবার পুলিশের লোক যায়নি। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আপনি আমাদের ওপর এত অত্যাচার করছেন কেন? প্রশাসনের এহেন কাজে আপনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পাপনও এখানে ছিল। তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। এভাবে আমার লোকদের গ্রেফতার করা হলে নির্বাচন কমিশন যে বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এটাই কী সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন তাদের জিজ্ঞেস করে দেখেন পুলিশ কিভাবে অত্যাচার করছে। একটি অডিও ভাইরাল হয়েছে। ভোটারদের নৌকায় ভোট দেয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। নয়তো তাদের ভোট দিয়ে দেয়া হবে।

এসপির বক্তব্যের প্রতিবাদে তিনি বলেন, আপনাদের মাধ্যমে যে কথা বলি এটা কি তার কর্ণগোচর হয় না? এসব সাফাইয়ের কোনো ভিত্তি নাই। রবি কি মাদক ব্যবসায়ী, জামাল হোসেন কি হেফাজত? ১৯৫২ সালে যারা এ দেশের আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল তারা বাঙালি পুলিশই ছিল।

তৈমূর আলম বলেন, সরকারি দলের প্রার্থীর ডিজিটাল আইনের মামলা থেকে সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। এখনো সেই মামলায় তারা জেল খাটছেন। ছাত্রলীগের ছেলে সুজন তার মামলা মাথায় নিয়ে মারা গেছে।

মেয়র প্রার্থী আইভী বলেন, আমি মনে করি, নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বাভাবিক হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। স্বাভাবিক পরিবেশ যেন বজায় থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বলতে চাই সকাল থেকেই যেন উৎসবমুখর একটা পরিবেশ থাকে।

তিনি বলেন, অনেকগুলো কাজই চলমান রেখে আসছিলাম। বিজয়ী হলে একসাথে অনেক কাজই করতে হবে। তার মধ্যে প্রাধান্য দেবো সবচেয়ে বেশি কদম রসূল ব্রিজে। আর ছয়টি মেগা প্রজেক্ট চলমান ছিল। সেসব প্রজেক্ট সম্পূর্ণভাবে শেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করার পরিকল্পনা আছে।

ভোটারদের উদ্দেশে আইভী বলেন, ভোটারদের আহ্বান জানাব আপনারা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে আসবেন। আমাকে আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন। আমি আপনাদের কাজগুলো চলমান রাখতে চাই। একটা কথা বলতে চাই- আমি ঈমানের সাথে কাজগুলো করেছি, সেবা করেছি। কখনো কোনো অন্যায় কাজের সাথে জড়িত ছিলাম না। দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করেছি। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কাজ করেছি। কখনো দলবাজি করিনি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। নারায়ণগঞ্জের মানুষের জন্য আমার জীবন বিপন্ন করে কাজ করেছি। সুতরাং আমাকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি এবং আগামী পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ দিন।

রিটার্নিং অফিসার মাহফুজা আক্তার বলেন, আমরা আপনাদের নিশ্চিত করতে চাই, প্রত্যেকে প্রচারণা চালিয়েছে। তবে কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। ফলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে হয়নি। আমরা আশা করি এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশই থাকবে। সবাই আমাদের সহযোগিতা করবেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের মালামাল বিতরণ হয়েছে। আজ সকাল থেকে ভোট হবে। আমরা নির্বাচনে সুন্দর পরিবেশ রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের সব ভোটার ও প্রার্থীর সহযোগিতা কামনা করছি।


আরো সংবাদ


premium cement