১৬ অক্টোবর ২০২১
`

বিএনপিবিহীন ইউপি নির্বাচনেও সহিংসতা : মূলে ‘শিওর শট’!

কক্সবাজারে নির্বাচনী সহিংসতায় দুইজন নিহত হয়েছেন। - ছবি : নয়া দিগন্ত

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন বিএনপি বর্জন করার পরও সহিংসতায় দুইজন নিহত হয়েছে। ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভোট কেন্দ্র দখল আর ব্যালট উধাওয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রশ্ন হলো, বিএনপি না থাকার পরও কেন এই অনিয়ম আর সহিংসতা?

গত বছরের এপ্রিলে মোট ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণ বেশি হওয়ায় ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের ভোট হয়। বাকিগুলো স্থগিত করা হয়। তখনো সহিংসতায় তিনজন নিহত হয়।

স্থগিত থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মধ্যে ১৬০টিতে নির্বাচন হয় সোমবার। তবে এরই মধ্যে আবার ৬৯টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হয়েছে দলীয় প্রতীকে। বিএনপির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

কিন্তু এমন নিরুত্তাপ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা সংঘাতে জড়িয়েছেন। কক্সবাজারের মহেশখালীতে আওয়ামী লীগের ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত ও গোলাগুলিতে বিদ্রোহী প্রার্থীর একজন সমর্থক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচজন। কেন্দ্র দখল নিয়ে এই সংঘাতের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় একজন নিহত হয়েছেন ব্যালট বাক্স ছিনতাই করতে গিয়ে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের সময় বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকেরা বাধা দেয়। সেখানে পুলিশও গুলি করে। আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেছেন ওই ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

খুলনার দিঘলিয়ায় আওয়ামী লীগের এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। আরো অনেক এলাকায় একইভাবে আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

শুধু তাই নয়, দুইজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জাল ভোট দিতে গিয়ে হাতেনাতে আটক হয়েছেন নোয়াখালীতে। আর টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্র থেকে ৫০০ ব্যালট পেপার উধাও হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার এই পরিস্থিতিকে ‘শিওর শটের’ দন্দ্ব হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এখন ক্ষমতাসীন দল থেকে মানোনয়ন পাওয়া মানে শিওর শট। তাই প্রার্থীরা প্রথম মরিয়া হয়ে ওঠেন ক্ষমতাসীন দল থেকে মনোনয়ন পেতে। একই দলের যারা মনোনয়ন পান না তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হন। দুই পক্ষই তখন সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করে জেতার জন্য বা প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য। ফলে আগে যে আন্তঃদলীয় সংঘাত হতো সেটা এখন অন্তঃদলীয় সংঘাতে রূপান্তরিত হয়েছে।’

তার মতে, ‘মাঠ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত যে আওয়ামী লীগ তার ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা আছে সেটা এখন প্রশ্ন তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত কী আমার জানা নেই। তবে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এখন অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।’

এই পরিস্থিতি কেন হলো জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ দাবি করেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে এরকম সংঘাত অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। এটা নতুন কিছু নয়। তবুও আমরা চাই যাতে কোনো সংঘাত সংঘর্ষ না হয়। আর যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো রিমোট এলাকায়। ফলে পরিস্থিতি অনেক সময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে এলাকা ও গোষ্ঠীভিত্তিক নানা বিষয় থাকে। ফলে স্থানীয় লোকজনের নানামুখী তৎপরতা থাকে। যার ফলে এসব ঘটনা ঘটে।’

কেন্দ্রের নির্দেশের পরও বিদ্রোহী প্রার্থীর কথা স্বীকার করেন তিনি। বলেন, ‘যারা দলের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখেন তারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। আমরা বিদ্রোহী প্রার্থীদের চিহ্নিত করছি। তাদের আগের ঘোষণা অনুযায়ী দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘বিএনপি দলীয়ভাবে এই নির্বাচনে অংশ না নিলেও তাদের লোকজন অনেক জায়গায়ই স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হয়েছেন।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। আইন, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা সবকিছু। ফলে নির্বাচনে মানুষের আর আস্থা ও আগ্রহ নেই। তাই আমরা নির্বাচনে থাকলেই বা কী আর না থাকলেই বা কী? এর ফল তো এখন দেখা যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন দলীয়ভাবে করে সব শেষ করে দিয়েছে। আমরা এই নির্বাচনে না থাকার পরও তারা বলছে আমাদের লোকজন প্রার্থী হয়েছে। এর মানে হলো তারা এখন চাইছে তাদের অপকর্মের সাথে অন্যরাও শরিক হোক। এই শরিক যখন হচ্ছে না তখন তাদের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’

সূত্র : ডয়চে ভেলে



আরো সংবাদ