০৬ মার্চ ২০২১
`

বক্তব্যের বিষয়বস্তু, নাকি বড় নেতার ভাই হিসেবে আলোচনায় কাদের মির্জা

বক্তব্যের বিষয়বস্তু, নাকি বড় নেতার ভাই হিসেবে আলোচনায় কাদের মির্জা - ছবি : সংগৃহীত

আবদুল কাদের মির্জার যে বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, তিনি তাতে বলেছিলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিন-চারটি আসন বাদে তাদের অন্য এমপিরা পালানোর পথ খুঁজে পাবে না। নোয়াখালী জেলা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করার পর সোমবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দু'টি গোষ্ঠী বা গ্রুপের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কাদের মির্জার সমর্থক এবং সেখানকার একজন এমপির সমর্থকরা আজ একইসময়ে একই জায়গায় কর্মসূচি নিয়েছিল।

আব্দুল কাদের মির্জা নির্বাচনী ব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং নোয়াখালী অঞ্চলের আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-অসংগতি নিয়ে বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রেখেছেন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে।

কাদের মির্জা আওয়ামী লীগের একটি উপজেলার একজন নেতা হলেও তার বক্তব্য নিয়ে কেন এত আলোচনা চলছে- রাজনীতিক এবং বিশ্লেষকদের অনেকে সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন।

আব্দুল কাদের মির্জা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই হিসাবে নাকি তার বক্তব্যের বিষয়বস্তুর কারণে জাতীয় রাজনীতিতেও তোলপাড় ফেলেছেন - এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ আসছে।

কাদের মির্জার অব্যাহত বক্তব্য নিয়ে নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের দু'টি পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তার সমর্থক এবং বিরোধী - দু'টি পক্ষ সোমবার সমাবেশ ডেকেছিল নোয়াখালীর মাইজদীতে। জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করার পর সোমবার সেখানে কোন পক্ষই আর কর্মসূচি পালন করেনি।

কাদের মির্জা কর্মসূচি পালন করতে না পারার জন্য দলের অন্য অংশকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, নোয়াখালী জেলায় আওয়ামী লীগের অনেকের অপরাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি তার বক্তব্য দিয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, ‘এটা অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব, অপরাজনীতির বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব। এখানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে কিছু নেই। অপরাজনীতি করে ত্যাগী সব নেতাকে বাদ দিয়ে দিছে। সেখানে হাইব্রিডদেরকে কমিটিতে স্থান দিছে। এটা হচ্ছে মুল সমস্যা’।

আব্দুল কাদের মির্জা কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে সেখানে পৌর নির্বাচনে এবারো দলের প্রার্থী হিসাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনের আগে প্রচারণায় আবদুল কাদের মির্জার যে বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, তিনি তাতে বলেছিলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিন-চারটি আসন বাদে তাদের অন্য এমপিরা পালানোর পথ খুঁজে পাবে না। নির্বাচনে মেয়র হওয়ার পরও তিনি বক্তব্য দেয়া অব্যাহত রেখেছেন।

স্থানীয় রাজনীতিতে তার বিরোধী অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এবং এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। তার বিরুদ্ধেই মির্জার নানা অভিযোগ।

চৌধুরীও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরতে গিয়ে আব্দুল কাদের মির্জার ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও চৌধুরী ওবায়দুল কাদেরের ব্যাপারে বক্তব্য নিয়ে পরে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু একইসাথে তিনি কাদের মির্জার বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আওয়ামী লীগের এই এমপি একরামুল কাদের চৌধুরীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘একজন লোক আজকে এক মাস সাতদিন ধরে একই কথা বলে যাচ্ছে। এনিয়ে আমি কাদের ভাইকে (ওবায়দুল কাদের) যা জানানোর তা জানিয়েছি। এখন উচ্চপর্যায়ে কি সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা তাদের ব্যাপার।’

কিন্তু একটি জেলার কোন্দলকে কেন্দ্র করে উপজেলার একজন নেতার বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে কেন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে - আওয়ামী লীগের ভেতরেও এই প্রশ্নে নানা আলোচনা রয়েছে। দলটির সিনিয়র নেতাদের অনেকে মনে করেন, আব্দুল কাদের মির্জা তাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই হওয়ার কারণেই তার বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছে।

দলটির তৃণমূলের নেতাদের অনেকে বলেছেন, বক্তব্যের বিষয়বস্তুও বড় কারণ বলে তারা মনে করেন।

বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, কাদের মির্জার বক্তব্যে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দুর্নীতির চিত্র যেমন এসেছে, তেমনি আওয়ামী লীগের এমপিদের অনেকের কর্মকাণ্ড ও দলটির সাংগঠনিক চেহারা ফুটে উঠেছে।

নোয়াখালীর রাজনীতি নিয়ে এসব বক্তব্য এসেছে, কিন্তু দেশের অন্য এলাকার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্য থাকায় তা আওয়ামী লীগকেও নাড়া দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিনাত হুদা বলেছেন, রাজনীতির মাঠে বিরোধীদলে নিস্ক্রিয়তার কারণে মিডিয়াও কাদের মির্জার বক্তব্যকে লুফে নিয়েছে।

‘তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ভাই, সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। এছাড়া তিনি যে বক্তব্যগুলো দিচ্ছেন, সেগুলোর সত্য-মিথ্যা বিচারের ভার হয়তো জনগণ এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ওপর পড়বে।

‘কিন্তু বিষয়বস্তুটাও একটা বিষয়। কারণ তিনি খোলামেলাভাবে নানা কথা বলছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিরোধীদল যারা আছেন, তারা একেবারেই নিস্ক্রিয়। সেখানে আওয়ামী লীগের একটি উপজেলার নেতা হঠাৎ করে আওয়ামী লীগেরই পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়ে যখন বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তা রাজনীতির মাঠকে গরম করছে।’

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। দলটির নেতাদের অনেকে বলেছেন, টানা এক যুগ ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেকে জেলা উপজেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। অন্য এলাকায় সেই দ্বন্দ্ব নোয়াখালীর ধারায় প্রকাশ হতে থাকলে, সেটা দলের জন্য আরো ক্ষতিকর হবে বলে তারা মনে করেন।

দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সিনিয়র মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকও বলেছেন, দেশের অন্য কোন এলাকায় যেন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এভাবে প্রকাশ্যে না আসে, সেজন্য তারা আলোচনার মাধ্যমে নোয়াখালীর পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছেন।

‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কেউ বিভ্রান্ত হয়ে অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু বিষয়টা আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। যে কোন পর্যায়ের দলের শৃঙ্খলাতো একটা বড় বিষয়। কোথাও এই শঙ্খলা ভাঙলে অন্যান্য জায়গাও তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তো আমরা চেষ্টা করছি,’ বলেন ড. রাজ্জাক।

তিনি আরো জানান, ‘আমরা চেষ্টার করছি। তারপরও সে কথা বলেই যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আমরা অভ্যন্তরীণভাবে চেষ্টা করছি, এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য।’

আওয়ামী লীগ নেতারা আব্দুল কাদের মির্জার বক্তব্য থামানো এবং সমাধানের চেষ্টার কথা বলছেন। কিন্তু আব্দুল কাদের মির্জা তার বক্তব্য অব্যাহত রাখবেন বলেই জানিয়ে দিয়েছেন।

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ