০৯ মার্চ ২০২১
`

ভ্যাকসিন পলিটিক্স আলোচনায় প্রভাব পড়ছে আস্থায়

ভ্যাকসিন পলিটিক্স আলোচনায় প্রভাব পড়ছে আস্থায় - ছবি : সংগৃহীত

ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সমর্থকরা প্রতিবেশী দেশ ভারতের ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন উপহারকে উল্লেখ করেছেন ‘বন্ধুত্বের স্মারক’ হিসেবে। এই উপহারকে ভারতের সাথে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে ঐতিহাসিক হৃদ্যতা কিংবা সুসম্পর্ক সেটির সর্বশেষ ‘সফল কূটনীতি’ হিসেবেও কেউ কেউ উচ্চারণ করছেন। মহামারী করোনাভাইরাস নাশে বিশ্বজুড়ে এই ভ্যাকসিনের অর্থনৈতিক মুনাফার পরিপ্রেক্ষিতের সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনীতিও। ভারত থেকে বর্তমান সরকারের ভ্যাকসিন আমদানি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নানামুখী আলোচনা বেশ কিছু দিন ধরেই চলে আসছিল। ‘উপহার’ হিসেবে দুই কোটি ডোজ আসার পরে ভ্যাকসিন পলিটিক্সে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। এর ফলে জনগণের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা নিয়ে একধরনের ‘আস্থা-অনাস্থার’ চিত্র ফুটে উঠছে।

সরকারিভাবে কেনা টিকা সময়মতো আসা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার ২০ লাখ চার হাজার ডোজ টিকা ভারত থেকে দেশে এসে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী এই টিকার চালান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মার সবুজ লনে উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ ভারত সরকার বাংলাদেশের মানুষের জন্য ২০ লাখ চার হাজার ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে।’
অন্য দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আজ আমাদের এক ঐতিহাসিক দিন। ভারত যে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু আবারো তার প্রমাণ দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে আমাদের সহায়তা দিয়েছে এবারো আমরা তাদের কাছ থেকে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সহযোগিতা পেলাম।’

‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’র অংশ হিসেবে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিনা পয়সায় করোনাভাইরাসের টিকা পাঠানোর যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার আওতায় গত বুধবার ভুটান ও মালদ্বীপে কয়েক লাখ ডোজ ‘কোভিশিল্ড’ পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার এসেছে বাংলাদেশে। পাকিস্তান বাদে ভারত প্রতিবেশী আরো কয়েকটি দেশকে এই ভ্যাকসিন উপহার দিচ্ছে। আর পাকিস্তানকে ভ্যাকসিন উপহার দিচ্ছে চীন।

ভারত সরকার এই উদ্যোগের নাম দিয়েছে ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’, মেইড-ইন-ইন্ডিয়া কোভিড ভ্যাকসিন। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে অন্তত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীনের তৈরি টিকা সিনোভ্যাক বা সিনোফার্মকে টেক্কা দেয়াও ভারতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

মাস কয়েক আগে বাংলাদেশ সরকার যখন ভ্যাকসিন আমদানির চিন্তাভাবনা শুরু করে তখনো একধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। চীন, না ভারত; কোন দেশ থেকে ভ্যাকসিন আনা হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও সরকার কিছুটা সময় নিয়েছে। ওই সময়টাতে ঢাকা সফরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। তার সেই সফরের পরই ভারত থেকে ভ্যাকসিন আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ভ্যাকসিনের পেটেন্ট নিয়ে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে বাংলাদেশ সরকার ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। সেরামের কাছ থেকে টিকা এনে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেবে বেক্সিমকো।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকোর মাধ্যমে দেশে ভ্যাকসিন আমদানি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপির অভিযোগ, উপহারের বাইরে যে টিকা কেনা হচ্ছে তার জন্য অনেক বেশি দাম দিচ্ছে সককার। নিজেদের লোককে চুরির সুযোগ করে দিতেই এমন উদ্যোগ আওয়ামী লীগ সরকারের।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে সরকারের টিকা সংগ্রহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হিসোবে কষে বলেছেন, ‘দুই ডলার ৭০ সেন্টে অক্সফোর্ড টিকা বেচে। দুই ডলারের টিকা বেক্সিমকো বেচবে ১৩ ডলারে। একটা টিকাতে লাভ হবে ১১ ডলার। আর বেক্সিমকোর সাথে ব্যবসা হবে সরকারের।

কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ধরনের আলোচনার মধ্যেই চুক্তিকৃত ভ্যাকসিনের চালান আসার আগেই ভারতের উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ এসেছে। এই ভ্যাকসিন প্রাথমিকভাবে কাদের দেয়া হবে, তা নিয়ে সরকারের একধরনের পরকিল্পনা রয়েছে। সরকারি তরফ থেকে বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যকর্মী, জরুরি সেবাপ্রদানকারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক ও শিক্ষকরা ভ্যাকসিনে অগ্রাধিকার পাবেন।

কিন্তু ভ্যাকসিন গ্রহণের পর যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরির আশঙ্কা থাকে, সেটি নিয়ে জনমনে একধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে আস্থাহীনতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। ভারতে ভ্যাকসিন গ্রহণের পর অনেকের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর মিডিয়াতে আসায় সেটি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ভারতের বায়োটেকের উদ্ভাবিত আরেকটি ভ্যাকসিন ‘কোভ্যাকসিন’ নিতে সেখানকার চিকিৎসকদের একটি অংশ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশে যে ভ্যাকসিন উপহার দেয়া হয়েছে, সেটিকে সরকার অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জনগণের মধ্যে সৃষ্ট সন্দেহ-সংশয়ের কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাব, পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যেভাবে টিকার প্রথম ডোজ নিয়ে মানুষকে আস্থা ও ভরসা দিচ্ছেন, আশ্বস্ত করছেন, আপনারাও সেই পথ অনুসরণ করুন। এর ফলে টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা কাটাতে সহায়ক হবে।’

রিজভী বলেন, ‘ভিআইপিরা আগে নেবে না, সাধারণ মানুষরা আগে নেবে। সরকারের এ ধরনের বক্তব্যে মানুষের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। টিকা আগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যারা আছেন সেখান থেকে শুরু করলে মানুষের মধ্যে আস্থা আসবে।’ তিনি বলেন, ভারত সরকার কোভিশিল্ড না কোভ্যাকসিন উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে, সেটিও একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, আমরা আশা করি, সবাই ভ্যাকসিন পাবেন। তবে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রথমে টেলিভিশনে সরাসরি ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী সবার আগে ভ্যাকসিন নিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করবেন।
করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেছেন, সাধারণত ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিন নেয়া হয় না। এখন আমাদের হাতে সময় কম থাকায় ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিন নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, রূপান্তরিত করোনাভাইরাসেও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা থাকবে। তবে এই কার্যকারিতা ছয় মাসের বেশি থাকবে না।
বিএনপির তরফ থেকে দেয়া বক্তব্যকে অবশ্য নিছক গুজব হিসেবে উল্লেখ করেছেন সরকারের মন্ত্রীরা। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, টিকা নিয়ে বিএনপি উদ্ভ্রান্তের মতো প্রলাপ বকছে।



আরো সংবাদ