০৭ জুলাই ২০২০

জিয়াউর রহমানের ৩৯তম শাহাদৎবার্ষিকী আজ

জিয়াউর রহমান - সংগৃহীত

আজ ৩০ মে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩৯তম শাহাদৎবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্যের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই স্বপ্নদ্রষ্টা। শোকাবহ এই দিনটি স্মরণে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিএনপি।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বলা হয় আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। তিনিই জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে বারবার দাঁড়িয়েছেন নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে। বিপর্যস্ত জাতিকে রক্ষা করেছেন সর্বোচ্চ ঝুঁঁকি নিয়ে। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিশেহারা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস জুগিয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য হানাদারদের বিরুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার এ অতুলনীয় ভূমিকা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত এক পরিস্থিতি থেকে দেশ মুক্তি পায় ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে। আর এই বিপ্লবের প্রাণপুরুষ ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি একদলীয় বাকশালের রাহুমুক্ত করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। নিশ্চিত করেন বাক-ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কালজয়ী দর্শনের বক্তা জিয়াউর রহমান জাতির নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরেন। তার অন্যতম উপহার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পতাকাবাহী রাজনৈতিক দল ‘বিএনপি’। তার শাহাদাতের পর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। তার প্রতিষ্ঠিত দল তিনবার জনগণের ভোটে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পান।

জিয়াউর রহমান আমৃত্যু যুদ্ধ করেছেন ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য ও নিরক্ষতার বিরুদ্ধে। জাতিকে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশকে তিনি গণতন্ত্রের আস্বাদ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পরবর্তীতে তাকে বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তার ডাক নাম ছিল ‘কমল’। বাবা মনসুর রহমান ও মা জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় ছেলে কমল ছোটবেলা থেকেই লাজুক ও গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতায় তার বাল্যপাঠ শুরু হয় সেখানকার হেয়ার স্কুলে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাবার সাথে করাচি চলে যান তিনি। জিয়াউর রহমান ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং কমিশন পান ১৯৫৫ সালে। ১৯৬৬ সালে তিনি কাবুলে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে ইন্সপেক্টর হন এবং একই বছর শেষদিকে কোয়েটা স্টাফ কলেজে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের অক্টোবরে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্ব দিয়ে তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে।

বিএনপির ভিন্নধর্মী কর্মসূচি : শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। তবে করোনাভাইরাসের কারণে অন্যান্য বছরের মতো এবার জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান থাকছে না। এবার ভিন্নধর্মী কর্মসূচি পালন করবে দলটি। গত ১৮ মে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক সভায় নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে শহীদ জিয়াউর রহমানের ৩৯তম শাহাদাতবার্ষিকীর কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সভায় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। এরমধ্যে থাকবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, বস্ত্রবিতরণ ও আর্থিক সহযোগিতা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

কর্মসূচির মধ্যে আরো রয়েছে- আজ ভোর ৬টায় দলের নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। বেলা ১১টায় দলের মহাসচিবসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও মাজার জিয়ারত। বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা। এরপর ১০ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন গণমাধ্যম ও সামাজিক গণমাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচ্য বিষয়গুলো হচ্ছে- ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ ও শহীদ জিয়া’, ‘গণতন্ত্র, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বিএনপি’, ‘শহীদ জিয়া, উৎপাদন ও উন্নয়নের রাজনীতি,’ ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও অর্থনৈতিক সংস্কার,’ ‘শহীদ জিয়া ও কৃষি বিপ্লব’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশু কল্যাণ,’ ‘কর্মসংস্থান ও শ্রমিক কল্যাণ’, ‘শিক্ষা ও গণশিক্ষা’, “পল্লী বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ উন্নয়ন’, ‘শহীদ জিয়ার বিদেশ নীতি’ এবং ‘শহীদ জিয়ার যুব উন্নয়ন’। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কর্মসূচির আলোকে সারা দেশে সব ইউনিট কার্যালয়ে বিএনপির উদ্যোগে ভোর ৬টায় দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে।

এ দিকে আজ শনিবার দুপুর ১টায় জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে রাজধানীর আসাদগেট এলাকায় ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

জিয়াউর রহমানের ৩৯তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা মহানগরসহ দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। এতে থাকবে ভোরে নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী জেলা ও মহানগর কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। জিয়াউর রহমানের রূহের মাগফিরাত কামনায় যথাসম্ভব শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দোয়া মাহফিল, গরিব ও দুস্থদের মঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ। বিএনপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ। কালো ব্যাজ ধারণ।

মির্জা ফখরুলের বাণী : জিয়াউর রহমানের ৩৯তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও মাগফিরাত কামনা করে এক বাণীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান সরকার দেশে একদলীয় সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের নির্মমতা চারদিকে বিদ্যমান। জাতির ক্রান্তিকালে সব সঙ্কটে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। জাতীয় জীবনের চলমান সঙ্কটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত পথ ও আদর্শ বুকে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। জাতীয় স্বার্থ, বহুমাত্রিক গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষায় ইস্পাতকঠিন গণঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের অধিকার, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে বর্তমান সরকার। সেজন্য গণতন্ত্রের আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এখন তাকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তার মিথ্যা মামলা ও সাজা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রারম্ভে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতায় দেশের মানুষ যখন দিশেহারা ঠিক সেই মুহূর্তে ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা সারা জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উজ্জীবিত করেছে।

এই ঘোষণায় দেশের তরুণ, যুবকসহ নানা স্তরের মানুষ মরণপণ যুদ্ধে সামিল হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষে জাতি বিদেশী শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে বিজয় অর্জনের অব্যবহিত পরে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর দুর্বিনীত দুঃশাসনে মানুষের নাগরিক স্বাধীনতা ও কাক্সিক্ষ গণতন্ত্র মাটিচাপা পড়ে। একের পর এক দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়, দেশ একদলীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসনের নিষ্ঠুর কবলে পড়ে পিষ্ট হতে থাকে। এ অবস্থা থেকে জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করেন। উৎপাদনের রাজনীতির মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশালী করেন। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির আখ্যা থেকে খাদ্য রফতানিকারক দেশে পরিণত করেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, চক্রান্তকারীরা যতই চেষ্টা করুক কোনো রাষ্ট্রনায়ককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলেই তিনি বিস্মৃত হন না বরং নিজ দেশের জনগণের হৃদয়ে চিরজাগরুক হয়ে অবস্থান করেন।


আরো সংবাদ

সকল