২৩ অক্টোবর ২০২০

পুলিশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে নাটক বানাচ্ছে : এমপি হারুন

পুলিশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে নাটক বানাচ্ছে : এমপি হারুন - ছবি : সংগৃহীত

দেশে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড অনেক বেড়ে গেছে উল্লেখ করে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ হারুন বলেছেন, আজকে এইভাবে পুলিশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয় দিয়ে মানুষকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা করছে এবং নাটক বানাচ্ছে। মাননীয় স্পিকার আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি এখানে যা বলছি একেবারেই ১০০ ভাগ সত্য। আরেকজন ১৮ বছরের যুবক আমার নির্বাচনী এলাকায়, আমি বাহিরের কোনো কথা বলছি না। আমার বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে নির্মমভাবে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

সোমবার সংসদে পয়েন্ট অফ অর্ডারে এসব কথা বলেন হারুন।

তিনি বলেন, ঢাকার সেওড়াপাড়া এলাকা থেকে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যায়। ২৯ তারিখ তার দাদি পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করে তার সন্ধান চান। তার চারদিন পর আমার গ্রামের বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই ধরণের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ঘটেই চলছে।

হারুন অর রশিদ হারুন বলেছেন, সারা বিশ্বে তথা বাংলাদেশ একটি মহাসংকটময় পরিস্থিতি চলছে। এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক অংশ বন্যায় বিপর্যস্ত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিয়ে আসছে। বেকারত্বের মধ্যে তাদের সময় অতিবাহিত করছে।

তিনি বলেন, সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের যে কথা বলা হয়েছে, কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে বসবাসরত সকল নাগরিকের এবং সমাগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বিশেষত আইন ব্যতিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, সুনাম বা সম্পত্তির হানী ঘটে।

মাননীয় স্পিকার এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে বাংলাদেশে এই মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য ১/১১ এর সময় যারা সরকার ছিলেন তারা ২০০৮ সালে একটি অডিনেন্স জারি করেছিলো মানবাধিকার কমিশন। সেটাকে বর্তমান সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-২০০৯ নামে একটি আইন প্রণয়ন করে। সেখানে মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ এর তৃতীয় অধ্যায় দেখা যাচ্ছে কমিশনের কার্যবলি ও ক্ষমতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বা সরকারী প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সংগঠন কতৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের প্ররোচনার কোনো অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত করা হবে।

সোমবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

হারুন বলেন, আজকে বাংলাদেশে বিভিন্ন মানবাধিকার যেসকল সংস্থাগুলো আছে এবং তারা যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, গত ১০-১২ বছরে তিন হাজারেরও বেশী মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাই আমি একটি বিবৃতি দাবি করব। সংবিধানে আমাদের যে অধিকার গুলো দেয়া হয়েছে সেই অধিকারের ক্ষেত্রে আজকে যারা তাদের স্বজনকে হারিয়েছে, গুম হয়েছে বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে তারা কি আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার পাবে না? সংবিধানের এই বিষয়গুলো কি আমরা স্থগিত করে দিয়েছি?

মাননীয় স্পিকার আমি এই সংসদের সদস্য হিসেবে আমার প্রত্যক্ষ যে ঘটনা তার দুই একটি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি। আমার নির্বাচনী এলাকা, ৫ জুলাই একজন রিক্সা চালককে মাদক বহনের অপরাধে র‌্যাব কতৃক গ্রেফতার করা হয়। আমার উপজেলার সদর থানায় তাকে সোপর্দ করা হয়। থানা পুলিশ তাকে একদিনের রিমান্ডে নেয়। মাননীয় স্পিকার সেইদিনই তাকে পুলিশ হেফাজতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ৬ তারিখে পুলিশ সুপার বরারব একটি দরখাস্ত করে বলেন, আমার স্বামীকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ কর্তৃপক্ষ আপোষ করে এটা একটা সমাধানের চেষ্টা করে।

আমি হৃদয়বিদারক আরেকটি ঘটনা আপনার সামনে বলতে চাই। আমি যেদিন এই মহান জাতীয় সংসদের শপথ গ্রহণ করেছি তার মাত্র দুই দিন পরে আমার নির্বাচনী এলাকায় একদম প্রকাশ্য দিবালোকে আরেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

কতটা অমানবিক মাননীয় স্পিকার একজন পেশাদারি পুলিশের প্রতিষ্টান বিকেল তিনটা বাজে একজন সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে এসে গুলি করে হত্যা করে এবং পুলিশ যে এজহার দাখিল করে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বিকেল চারটায় মাননীয় স্পিকার। সেখানে বলছে পুলিশের উপর বেপরোয়া গুলি বিনিময় করা হয়েছে। এটা সম্ভব মাননীয় স্পিকার? তাকে হত্যার পর যে উদ্ধার দেখানো হয়েছে তাতে হাতে তৈরী বাটুল পিস্তল দেখানো হয়েছে এবং সবচেয়ে মাননীয় স্পিকার আমি আপনার কাছে অনুরোধ করবো আপনি এই বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় পাঠাবেন। আমি আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি যাদের এ মামলায় আসামি করা হয়েছে তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুইজন ব্যক্তি আমার নির্বাচনী এলাকায় ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলো গতবার এবং তার বড় ভাই সেদিন এই মহান সংসদে উপস্থিত। সংসদ থেকে পাশ না নিয়ে নিশ্চই কোনো ব্যক্তি সংসদে প্রবেশ করতে পারবে না। তাদের নামে আমি পাশ ইস্যু করিয়েছিলাম।

৩০ তারিখ এই মহান সংসদের দর্শক সারিতে তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদেরকে পুলিশ এই মামলার আসা করে। মাননীয় স্পীকার আমার ব্যক্তিগত একটা ঘটনা আপনাকে বলতে চাই। ১/১১ তে আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম তখন জুন মাসের ২০ তারিখে আমার নির্বাচনী এলাকায় একটা চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করা হয়েছিলো। যে আমি চাঁপাইনাবাবগঞ্জের বাসস্থানে তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছি। কেন্দ্রীয় কারাগারে পত্রিকায় দেখলাম আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমার স্ত্রী পাপিয়াকে বললাম তুমি পার্লামেন্টে খোঁজ নাও আমি বাজেট অধিবেশনের সময় নিশ্চই সেদিন পার্লামেন্টে উপস্থিত ছিলাম। আল্লাহর কি অশেষ রহমত ঠিকই সেদিন আমি এই মহান সংসদে উপস্থিত ছিলাম এবং বাজেট বক্তিতায় অংশ নিয়েছিলাম। স্পিকার আমাকে প্রত্যয়ন দেয়ার কারণে আদালতে মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে গিয়েছিল।

আল্লাহর অশেষ রহমত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। এজন্যই মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন মিথ্যার পাহাড়কে আল্লাহ সত্য দিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন। আজকে মেজর সিনা হত্যায় আদালতে মামলা হয়েছে বিচার হচ্ছে তার পরিবার স্বস্তি পাচ্ছে তাহলে এই যে গত ১২ বছরের ৩ হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তাদের পরিবার কি বিচার লাভের অধিকার পাবে না? আজকে যারা এ নির্মমভাবে খুন-গুম হয়েছে তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র কি তাদের দিবে না?


আরো সংবাদ