১২ আগস্ট ২০২০

এবার বাজেট নিয়ে যত আলোচনা সংসদের বাইরে

এবার বাজেট নিয়ে যত আলোচনা সংসদের বাইরে - প্রতীকী
24tkt

২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় সংসদে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হওয়ার পর নতুন অর্থবছরও শুরু হয়ে গেছে। তবে এখন সেই বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সংসদেই বাজেট পেশ এবং পাস করা হলেও এবছর সংসদে বাজেট আলোচনা হয়নি বললেই চলে। মাত্র দুই কর্মদিবসে তিন ঘণ্টার মতো বাজেটের ওপর আলোচনা হয়েছে।

এ বছর বাজেট নিয়ে সকল আলোচনা-সমালোচনা সংসদের বাইরে। বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন, রাজনৈতিক দলের বাজেট প্রতিক্রিয়া বাইরেই চলছে। এমনকি সরকারি দলের সদস্যরাও এবার বাজেটকে সমর্থন করে সংসদের বক্তব্য রাখা কিংবা বিভিন্ন সংশোধনীর ব্যাপারে কোনভাবেই পরামর্শ দেয়ার সুযোগ পাননি।

গত ১১ জুন সংসদে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয় এবং গত ৩০ জুন ছোটখাট কিছু সংশোধনী এনে সেই বাজেট পেশ করা হয়। গত ২৩ ও ২৯ জুন দুই কার্যদিবসে মোট তিনঘণ্টার মতো বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। অথচ অন্যান্য বছর এই আলোচনা ৪০ থেকে ৬০ ঘন্টা পর্যন্ত হয়ে আসছিল।

সংসদে বাজেট আলোচনা দীর্ঘায়িত না করার কারণ করোনা পরিস্থিতি। কড়া স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করে অধিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়। সংসদ সদস্যদের মাস্ক গ্লাভস বাধ্যতামুলক করা ছাড়াও আসন বিন্যাসে দূরত্ব বজায় রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারি এমনকি শেষের দিকে সংসদ সদস্যদেরও করোনা টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়। সাড়ে তিনশ’জন সদস্যের মধ্যে রোস্টার তৈরী করে দিনে ৮০ থেকে ৯০ জনের উপস্থিতি নিশ্চিত করে অধিবেশন চালানো হচ্ছে। অধিবেশনকে কেন্দ্র করে করোনা টেস্টে শতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারির করোনা পজেটিভ আসে। এছাড়া এ পর্যন্ত ১৭ জন সংসদ সদস্য করোনা আক্রান্ত হন। মারা যান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ ও নাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ফলে করোনা আতংকের মধ্যেই অধিবেশনটি চলে।

গত ১০ জুন সংসদে অধিবেশন শুরু হওয়ার পর বাজেট পাসের দিনসহ কার্যদিবস ছিল ৬টি। এর মধ্যে প্রথম দিন এবং বাজেট পেশের পরের কার্যদিবসটি চলতি সংসদের দুইজন সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাবের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে শেষ হয়। এরপর এক কার্যদিবসে সমাপ্য বছরের সম্পূরক বাজেট নিয়ে আলোচনা ও পাস হয়। বাকী তিন কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র গত ২৩ জুন একদিন বাজেটের ওপর আলোচনা হয় তাতে বিএনপির একজনসহ সরকারি ও বিরোধী দলের ১২জন সদস্য আলোচনার সুযোগ পান। তারা ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, সরকারি দলের আমিরুল হক মিলন, উম্মে কুলসুম স্মৃতি ও মোহাম্মদ শফিউল ইসলাম, বিএনপি’র মো. হারুনুর রশীদ এবং বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা ও জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

এরপর ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও জাতীয় পার্টিও চেয়ারম্যান জিএম কাদের বাজেটের ওপর আলোচনা করেন এবং ওইদিনই অর্থবিল পাস হয়। ৩০ জন নির্দিষ্টকরণ বিল বিল পাসের মধ্য দিয়ে বাজেট পাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

এ বছর বাজেট পেশের আগে করোনা পরিস্থিতিমোকাবেলায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা প্যাকেজ প্রণোদনাসহ বাজেট ভাবনা প্রকাশ করেছিল। বাজেট আলোচনায় বিএনপির হারুনুর রশীদকে ১২ মিনিট সময় দেয়া হয়েছি। তবে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমানের নাম নেয়ায় সরকারি দল ও বৈঠকে সভাপতিত্বকারি ডেপুটি স্পিকারের আপত্তির মুখে প্রতিবাদে বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। তারআগে বক্তব্যে তিনি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থতার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকের অপসারণ দাবি করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযুক্ত ব্যক্তিদের বসানোর দাবি জানান।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ সংসদে বিরোধী দলের আসনে যারা বাজেট আলোচনায় অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা করোরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের সমালোচনা করে বিভিন্ন বিষয়ে পরার্শ দিয়ে বক্তব্য রাখেন এবং বাজেটকে সমর্থন করেন।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, করোনা সঙ্কটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়ে জাতিকে গৌরবাম্বিত করেছেন। একটা অস্বাভাবিক অবস্থা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেট গতানুগতিক। বরাদ্দ বৃদ্ধি না করে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট কমানো হয়েছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বিশ্বের অর্থনীতি যখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি, উন্নয়নখাত বিপর্যস্ত তখন আমাদের প্রবৃদ্ধি নির্ভর বাজেট করা উচিত হয়নি। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ অপ্রতুল।

ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলে, দেশের অর্থনীতিতে শক্তি আছে, এখনও মজবুত রয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হতে আরো ছয় মাস সময় লাগবে। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হবে।

এরআগে বাজেট পেশের পর সিপিডিসহ বিভিন্ন সংগঠন সংস্থা বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা প্রবৃদ্ধির লক্ষমাত্রা নির্ধারণ, রাজস্ব আয়ের ট্রার্গেট ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনা করে পরামর্শমুলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। পত্রপত্রিকায় বিশেষজ্ঞরা বাজেটে কোথায় কোথায় পরিবর্তন আনা দরকার তার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাজেট পাশের দিন অর্থমন্ত্রী কালো টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিন বছর লক ইন এ থাকার শর্ত তুলে দিয়ে এক বছরে শিথিল করে আনা ছাড়া আর কোন পরিবর্তন ছাড়ই ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটটি পাস করে নেন।

পরদিন ১ জুলাই বিএনপির সংসদ সদস্যরা মানিক মিয়া এভিনিউস্থ সংসদের গেইটে বাজেট প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বাজেটের মুদ্রিত কপি ছিড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানায়। সেখানে বলা হয়, বাজেটে লুটেরাদেও স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। বাজেট পাশের পর জামায়াতে ইসলামীসহ আরো দুয়েকটি সংগঠন এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং বাজেটে কারো সমালোচনা ও পরামর্শ আমলে না আনার সমালেচনা করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বজেট প্রত্যাখানের ঘোষণা দিলে বলেন, এই বাজেট কোনো মতেই বাস্তবায়নযোগ্য নয় অর্থাৎ এত আয় তারা কোত্থেকে করবে সেটা তারা সুনির্দিষ্টভাবে বলেনি। রাজস্ব আয় যেটা বলেছে, এটা একেবারেই সম্ভব নয়। কারণ গত বছরের সমস্ত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ৫০ ভাগও তারা আদায় করতে পারেনি। এই বাজেট করোনাকালীন সময়ের বাজেট নয়। এটি হচ্ছে একটি ব্যুরোক্র্যাটিভ বাজেট। এই বাজেট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এই বাজেট ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।


আরো সংবাদ