২১ মে ২০২২
`
বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দ

সুরক্ষার মোড়কে অধিকার হরণের কালাকানুন মেনে নেব না সাংবাদিক সমাজ

-

‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের’ মোড়কে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অধিকার হরণে নতুন আইন প্রণয়নের কঠোর সমালোচনা করেছেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।

তারা বলেছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি সরকারের এক দুরভিসন্ধি। এ আইনে কিছু ভালো দিক থাকলেও অনেক বিতর্কিত ধারায় গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নতুন অপচেষ্টা চলছে।

সোমবার রাজধানীতে এক বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।

তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, অধিকার হরণের কোনো কালো আইন সাংবাদিক সমাজ মেনে নেবে না। বক্তারা অনতিবিলম্বে সাংবাদিকদের শীর্ষ নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ কারাবন্দি সকল সাংবাদিকের মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল এবং বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাষ্ট্রপতির সংলাপকে ‘তামাশা’ অভিহিত করে বলেন, ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতেই সরকার এমন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কারাবন্দি বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) সোমবার (১০ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ সমাবেশ আয়োজন করে।

বিএফইউজের সভাপতি এম আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং ডিইউজে’র সাংগঠনিক সম্পাদক দিদারুল আলম দিদারের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন বিএফইউজে ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিএফইউজের মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন, ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক মো: শহিদুল ইসলাম, ডিইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাকের হোসাইন, বিএফইউজের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোদাব্বের হোসেন, কোষাধ্যক্ষ খায়রুল বাশার, কারাবন্দি রুহুল আমিন গাজীর ছেলে আফনান গাজী, বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মাজহারুল আলম, ডিইউজের সহ-সভাপতি শাহীন হাসনাত, বাছির জামাল ও রাশেদুল হক, বিএফইউজের সাবেক দফতর সম্পাদক আবু ইউসুফ, ডিইউজের দফতর সম্পাদক ডি এম আমিরুল ইসলাম অমর প্রমুখ।

বিএফইউজে ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিশ্বাস করে না। তারা একদলীয় শাসনে বিশ্বাসী। এ কারণেই সাংবাদিকদের শীর্ষ নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ মুক্ত গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের পক্ষের লোকজনকে মামলা-হামলা দিয়ে নিপীড়ন করা হচ্ছে।

‘দেশ গণতন্ত্রের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, এখন চূড়ান্ত আঘাত করার সময়’ উল্লেখ করে এ সাংবাদিক নেতা আরো বলেন, সাংবাদিক সুরক্ষার নামে আরেকটি কালো আইন করতে যাচ্ছে সরকার।

তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে এ সরকারের অনেকের নাম কালো তালিকায় উঠেছে। একইভাবে সরকারের তল্পিবাহক ও দালাল সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের মালিকদের তালিকাও করতে হবে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল রিজভী রাষ্ট্রপতির সংলাপকে ‘তামাশা’ অভিহিত করে বলেন, জনগণের চোখকে ধুলা দেয়ার জন্য, জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঠেলে দেয়ার জন্য তিনি (প্রধানমন্ত্রী) তামাশা করছেন। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে তিনি আবার সংলাপ দেখাচ্ছেন। আরে কিসের সংলাপ? আমরা আগে দেখতাম ট্রেনে-বাসে বড়ি বিক্রি করতে হকার অত্যন্ত মজার মজার চমকপ্রদ অনেক কাহিনী বলতো, গল্প বলতো, মানুষ আকর্ষণ করতো। তারপরে সে বড়িটা বিক্রি করতো। এই রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সে ধরনের হকার - সংলাপের নামে রাষ্ট্রপতি হকারগিরি করছেন। কারণ আল্টিমেটলি যে নির্বাচন কমিশন বানানো হবে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটবে।

রিজভী বর্তমান সরকারকে মহামারী করোনার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, করোনার যেমন ক্রমে রূপান্তর ঘটছে। তেমনি একদলীয় শাসনের বিভিন্ন রূপ দেখাচ্ছে নব্য বাকশালী সরকার। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে যা দরকার সেই চেষ্টাই করছে তারা।

বিএনপির এ নেতা বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠতা লংঘনের সমালোচনা করে বলেন, ১৯ জনকে টপকিয়ে অ্যাপিলেট ডিভিশনে বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কারণ অ্যাপিলেট ডিভিশনে তাদের (সরকার) বিশ্বস্ত লোক দরকার।

সভাপতির বক্তব্যে এম আবদুল্লাহ প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কর্মী আইনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, একদিকে ফটো সাংবাদিকদের সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে বিভাজনের অপচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে মালিকদের তল্পিবাহকদের সাংবাদিক কাতারে আনার চেষ্টা চলছে।

সাংবাদিক সুরক্ষা আইনকে কালো আইন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এ আইনে কারো অভিযোগের ভিত্তিতে একজন যুগ্ম সচিবকে গণমাধ্যম বন্ধ করার ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি একটি দুরভিসন্ধি। তিনি অনতিবিলম্বে রুহুল আমিন গাজীসহ কারাবন্দি সকলের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেয়ার দাবি জানান।

বিএফইউজে মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন বলেন, রাতের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী সরকার দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নের পরিবর্তে গণতন্ত্র হরণ করে বহির্বিশ্বে বদনাম কুড়িয়েছে। এ সরকার গুম-খুন-নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চায়। এর বিরোধিতা করলেই সরকারের রোষানলের শিকার হতে হয়। এ নব্য স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়ে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সাংবাদিকদের অবিসংবাদিত নেতা রুহুল আমিন গাজীসহ কারাবন্দি সকলকে মুক্ত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ডিইউজে সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মিডিয়ার শত্রু অভিহিত করে বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে বর্তমানে সাংবাদিকরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তিনি বলেন, বারবার প্রমাণ হয়েছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ হবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার তারিখ ৮৪ বার পেছানোকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে আরো বলেন, স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে এ সরকারকে বিদায়ে রাজপথে কঠিন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে কারাবন্দি রুহুল আমিন গাজীর ছেলে আফনান গাজী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তার বাবার মুক্তি চেয়ে বলেন, আমার বাবা অত্যন্ত অসুস্থ। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে বহু আবেদনের পরও তার চিকিৎসার ব্যবস্থা হচ্ছে না।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কামালউদ্দিন সবুজ বর্তমান সময়কে অন্ধকার যুগ উল্লেখ করে বলেন, সুস্থ রাজনীতি নির্বাসনে পাঠিয়ে এবং সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে এ সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চায়। গণতান্ত্রিকভাবে এ সরকারের পতন সম্ভব নয়।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের পতন ঘণ্টা বেজে উঠেছে। ১৪৪ ধারা জারি করেও গণমানুষের স্রোত রুখতে পারছে না।

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক মো: শহিদুল ইসলাম অনতিবিলম্বে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীর মুক্তি দাবি করে বলেন, রুহুল আমিন গাজী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। নব্বইয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্র এবং মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে কথা বলতেন বলেই সরকার তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মিথ্যে মামলায় কারাবন্দি করে রেখেছে।

ডিইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাকের হোসাইন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে চার দশক ধরে নেতৃত্বদানকারী রুহুল আমিন গাজীকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে। গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার থাকায় সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে। এর অবসান হতে হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি


আরো সংবাদ


premium cement