গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে ল্যাটিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও চিলিতে নির্মম গুমপ্রথা চালু হয়। ক্ষমতা স্থায়ী করতে শাসকরা এই নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেন। ল্যাটিন আমেরিকার ওই সময়ের শাসকদেরও এ কারণে করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়। সারা বিশ্বে তারা ঘৃণিত ও নিন্দিত হন। এ ঘৃণিত পরিত্যক্ত প্রথা আঁকড়ে ধরে হাসিনা তার শাসনামল চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালানোর পর সারা দেশে গুপ্ত কারাগারের সন্ধান মেলে। সেখানে নিরপরাধ ব্যক্তিদের বন্দী করে লোমহর্ষক নির্যাতনের বহু খবর বেরিয়ে আসে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুম প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচারের স্বচ্ছতা বিধানে সুপারিশ করা হয়; যাতে দেশ থেকে গুম প্রথা বিলুপ্ত হয়। নতুন সরকার সেই বিধানে পরিবর্তন এনে শিথিল করায় গুমের শিকার ও সংশ্লিষ্টরা ঘৃণিত এ প্রথার ফের ফিরে আসে কি না তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করছেন।
৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে ঢাকায় গুমের ভুক্তভোগী পরিবার, রাজনৈতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাতে গুম প্রতিরোধে সংসদে সরকারের প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ আইনের সমালোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আনা গুম অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী, অভিযোগ তদন্তের নিয়ন্ত্রণ ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের। সন্দেহ হলে গোপন কারাগারে বা বন্দিশালায় যাওয়ার অনুমোদন ছিল কমিশনের। গুম হওয়া ব্যক্তির পরিণতি কিংবা খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত কমিশনের অনুসন্ধান চালানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। উত্থাপিত বিলে তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বদলে সরকারি বাহিনীর কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। সামান্য ব্যতিক্রম হলো- যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ; শুধু ওই বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না। তদন্তের দায়িত্ব কাকে দেবে, তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের।
অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার নেশায় হাসিনা গুমের কৌশলটি নিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি ও কাশ্মিরিদের দমন-পীড়নকারী ইসরাইল ও ভারতের কাছে থেকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের অভিযোগ, র্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের এ জন্য ভারত থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হাসিনা, তার গুটিকয় সাঙ্গপাঙ্গ গুমের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করত। প্রকাশ্যে কাউকে ধরে নেয়ার পরও বাহিনীগুলোর কেউ তা স্বীকার করত না। শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল ভীতি ছড়ানো, যাতে কেউ সরকারের কোনো কাজের সমালোচনা এবং প্রতিবাদ করতে না পারেন।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা যখন এই, তখন গুমের তদন্তে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকলে নাগরিকরা কীভাবে প্রতিকার পাবেন? ফ্যাসিবাদী জমানায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীরা গুমের প্রধান শিকারে পরিণত হন। এমনকি বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার মতো গুমের সংস্কৃতি চালু করবে না, এমনটি বিশ্বাস করতে চায় মানুষ। তবে কেন গুমের অভিযোগ তদন্ত সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, প্রশ্নটি বড় করে দেখা দিয়েছে।
হাসিনার আমলে গুমের শিকার ২৮৭ জন এখনো ফিরে আসেননি। এ হিসেবের বাইরেও অনেকে নিখোঁজ আছেন, গুম কমিশন প্রতিবেদনে তাই জানিয়েছে। এদিকে গুমের বিচারের অগ্রগতিও সামান্য। ভুক্তভোগী পরিবার এখনো প্রতিকার পাওয়া নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত। এই অবস্থায় গুমের প্রস্তাবিত আইন দ্বিধা তৈরি করছে। ভুক্তভোগীরা এ নিয়ে সরকারের আন্তরিকতা দেখতে চান। নাগরিক-সমাজ নিশ্চিত হতে চায় ভবিষ্যতে কখনো আর এ দেশে গুমের মতো নিষ্ঠুর সংস্কৃতি চালু হবে না।


