নদী দখলে প্রযুক্তির অপব্যবহার

বুড়িগঙ্গা-তুরাগকে বাঁচান

এক সময় নদী দখলের চিত্র খালি চোখে দেখা যেত। নদীর তীরে মাটি ফেলা, বাঁশ-খুঁটি পুঁতে সীমানা বাড়ানো, রাতারাতি অস্থায়ী স্থাপনা তোলা হতো। এখন দখলদারির চরিত্র বদলে নতুন হাতিয়ার হয়েছে নথি, ডাটাবেজ, ডিজিটাল জরিপ, অনলাইন খতিয়ান এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। পরিবর্তনটি ভয়ঙ্কর। কারণ, নদীর সীমানা একবার ডিজিটাল রেকর্ডে বিকৃতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে পরবর্তীতে সেই জালিয়াতি হয়ে উঠতে পারে দখলদারের বড় আইনি ঢাল।

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ ঢাকার পরিবেশ, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘদিনের দখল-দূষণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতায় বুড়িগঙ্গা এখন মৃতপ্রায়। তুরাগ বিপন্ন। সর্বশেষ প্রযুক্তির অপব্যবহারে নদী দু’টি নতুন করে হুমকিতে পড়েছে।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ডিজিটাল ব্যবস্থা স্বচ্ছতা-জবাবদিহির জুতসই উপায় হবে; নাকি জালিয়াতিকে নিখুঁত করতে অপব্যবহার হবে? নদী রক্ষার লড়াই তাই এখন আর শুধু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থা, ভূমি জরিপ, পরিবেশ নজরদারি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি রক্ষা হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত ‘মৃত বুড়িগঙ্গা ও বিপন্ন তুরাগ নদী গ্রাসের ডিজিটাল রূপ’ শিরোনামে প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এক সময় নদী দখলের চিত্র খালি চোখে দেখা যেত। নদীর তীরে মাটি ফেলা, বাঁশ-খুঁটি পুঁতে সীমানা বাড়ানো, রাতারাতি অস্থায়ী স্থাপনা তোলা হতো। এখন দখলদারির চরিত্র বদলে নতুন হাতিয়ার হয়েছে নথি, ডাটাবেজ, ডিজিটাল জরিপ, অনলাইন খতিয়ান এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। পরিবর্তনটি ভয়ঙ্কর। কারণ, নদীর সীমানা একবার ডিজিটাল রেকর্ডে বিকৃতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে পরবর্তীতে সেই জালিয়াতি হয়ে উঠতে পারে দখলদারের বড় আইনি ঢাল। যে জমি বাস্তবে নদীর অংশ, সেটি যদি কোনো জরিপে ব্যক্তিমালিকানাধীন বা প্রতিষ্ঠানের নামে উঠে আসে, তাহলে উচ্ছেদ অভিযানে দখলদার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ পায়।

নদীর সীমানা নির্ধারণে কারসাজির অভিযোগ তাই সাধারণ কোনো ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নদী একটি চলমান প্রাকৃতিক সত্তা। এর সীমানা নির্ধারণে ঐতিহাসিক রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট জরিপ, নদীর প্রবাহ, তীরভূমি ও ফোরশোর, সবকিছুর সমন্বিত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, এটি যুগান্তকারী আইনি অবস্থান। কিন্তু জীবন্ত সত্তার আইনগত অভিভাবক যদি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ক্ষমতাহীন হয়; তাহলে সেই স্বীকৃতির বাস্তব মূল্য কতটুকু? নদী রক্ষা কমিশন যদি অবৈধ দখলদার বা দূষণকারীর বিরুদ্ধে সরাসরি কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারে। শুধু বিভিন্ন সংস্থার কাছে সুপারিশ পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়া স্বাভাবিক। সঙ্গত কারণে নদী রক্ষায় এ মুহূর্তে জরুরি কাজ ক্ষমতা-কাঠামোর পুনর্বিন্যাস।

নদীর সীমানা ও জমির ডিজিটাল রেকর্ডে বহুপক্ষীয় যাচাইব্যবস্থা চালু দরকার। এক্ষেত্রে সীমানা পিলারের প্রতিটির অবস্থান জিও-রেফারেন্সড করে জাতীয় পর্যায়ের উন্মুক্ত ডিজিটাল ম্যাপে সংরক্ষণ করতে হবে। অন্যদিকে দূষণ রোধে শিল্পকারখানার ইটিপি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে কারখানার নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভরশীল না রাখা। নৌবাহিনীর জরিপে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের ২২৪টি শনাক্ত নিষ্কাশন মুখকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করে কোনটি পয়ঃবর্জ্য, কোনটি শিল্পবর্জ্য, কোনটি অবৈধ সংযোগ এবং কোনটি বৈধ; কিন্তু অপর্যাপ্তভাবে নিয়ন্ত্রিত তার তালিকা করা। এরপর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রতিটির সমাধান করতে হবে।

আমরা মনে করি, কেবল বুড়িগঙ্গা-তুরাগ নয়, দেশের সব নদ-নদী বাঁচাতে এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কার দরকার; যেখানে নদীর স্বার্থ অন্য সব স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে না যায়। তবে সবার আগে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বুড়িগঙ্গা-তুরাগের অবস্থা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সরকার কি এই বার্তা আমলে নিয়ে তার কর্তব্যকাজ করবে?