১৮ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১, ১১ মহররম ১৪৪৬
`

মুক্তচিন্তার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে

মুক্তচিন্তার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে - ছবি : নয়া দিগন্ত

গণমাধ্যম হচ্ছে মানব সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরে সভ্যতার বুকে স্বাক্ষর রেখে চলেছে গণমাধ্যম। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সাথে গণমাধ্যমের নিবিড়তম সম্পর্ক রয়েছে। গণযোগাযোগ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে উপেক্ষা করে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি শুধুই কল্পনাবিলাস বৈ কিছু নয়। এটা আজ প্রমাণিত যে নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলিত গণমাধ্যম কোনো জাতির জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে ।

বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মার্কিন তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন একটা সভ্য সমাজের জন্য গণমাধ্যম কতটা অপরিহার্য, সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন । তা-ই তো তিনি গণমাধ্যম সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে দিয়ে বলেছেন, 'যদি কোনো সমাজে মিডিয়া ও সরকারের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়; মুক্ত মনের মানুষদের সুস্থ পছন্দ হিসেবে বেছে নিতে হবে মিডিয়াকে।

রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সংবাদ মাধ্যম হচ্ছে সমাজের আয়না । যে দেশে গণমাধ্যমের প্রতিবন্ধকতা কম থাকবে; সে দেশ তত বেশি উন্নত হবে । গণমাধ্যমের কণ্ঠ যত রোধ করা হবে; দেশের দুরবস্থা তত বাড়বে । তাই মিডিয়াকে সরকারসহ সব প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বলা আছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো আইন কখনও মার্কিন কংগ্রেস পাস করবে না। সংবিধানে যুক্ত এই আইনটি হলো মার্কিন মিডিয়ার রক্ষাকবচ। প্রায় আড়াইশো বছর ধরে এই প্রথম সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে যে কোনো ব্যক্তি সংবাদ মাধ্যমসহ যে কোনো মাধ্যমে সরকারের যে কোনো নীতির সমালোচনা করতে পারেন। এর সুফলও তারা পাচ্ছেন। গণমাধ্যম ও বাক-স্বাধীনতা অবাধ করার ফলে বিশ্বের সেরা গণতান্ত্রিক দেশের মর্যাদা অর্জন করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকেই অনুসরণ করে। শুধু তা-ই নয়,যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা বিবেকের স্বাধীনতার পাশাপাশি বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে । কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন নানামুখী চাপ এবং বিধিনিষেধের বেড়াজালে সাংবিধানিক এ অধিকার মলাটবদ্ধ নথিতে রূপান্তরিত হয়েছে। উপরন্তু নিবর্তনমূলক ডিজিটাল আইন ও সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে মুক্ত সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরা হয়েছে । এমন পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক চর্চা ও বিকাশের মারাত্মক অন্তরায় ।

সাংবাদিকরা শুরু থেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিরোধী ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ঘোরতর বিরোধিতা করে আসছিল। সাংবাদিকরা বলেছিলেন, এই আইন আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা পত্রের সাথে সাংঘর্ষিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক, মুক্তিযুদ্ধের যে মূল্যবোধ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক এবং সামগ্রিকভাবে বাক-স্বাধীনতার জন্য এটা একটা বিরাট প্রতিবন্ধকতা। গণমাধ্যম ও বাক স্বাধীনতা বিরোধী এই কালো আইন বাতিল চেয়ে শুধু সাংবাদিকরাই নয়,সচেতন মহল, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এমনকি জাতিসঙ্ঘও বিবৃতি দিয়েছে।
একপর্যায়ে এই আইনকে সরকার নাগরিকদের কন্ঠরোধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করলে অনতিবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ স্থগিত করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক।

ভলকার তুর্ক বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে সাংবাদিক এবং মানবাধিকার রক্ষাকারীদের গ্রেফতার, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন এবং অনলাইনে সমালোচনাকে স্তব্ধ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন।’

‘আমি কর্তৃপক্ষকে আবারো অবিলম্বে এর ব্যবহার স্থগিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে এর বিভিন্ন বিধান ব্যাপকভাবে সংস্কার করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমার অফিস থেকে ইতোমধ্যে এর সংশোধনে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় মতামত দেয়া হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান বলেন, ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর কার্যকর হওয়ার এ পর্যন্ত এই আইনের অধীনে ২,০০০টিরও বেশি মামলা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ, ২৯ মার্চ, ২০২৩ দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক প্রথম আলোতে কর্মরত সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে এ আইনে আটক করা হয়েছে। তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তার ল্যাপটপ, ফোন ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। তার জামিনের আবেদনও খারিজ করা হয়েছে।

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও একজন ফটোগ্রাফারের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আরেকটি মামলা করা হয়েছে। বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয়-সঙ্কট নিয়ে তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মামলাটি করা হয়েছে।

তিনি বিবৃতিতে আরো বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ফেসবুকের একটি পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে পরিতোষ সরকার নামে এক তরুণকে এই আইনে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

ভলকার তুর্ক বলেন, আমার অফিস ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন অ-সংজ্ঞায়িত বিধান নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ‘সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এ আইনের যথেচ্ছ বা অত্যধিক প্রয়োগের বিরুদ্ধে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু এভাবে গ্রেফতার অব্যাহত থাকলে সেই প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। এই আইনের এখন সঠিকভাবে সংশোধন প্রয়োজন।

জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বিবৃতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিযুক্তদের মুক্তির লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে আনা সব মুলতবি মামলা পর্যালোচনা করার জন্য একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় প্যানেল গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের বিরুদ্ধে দুনিয়া জুড়ে সমালোচনা শুরু হলে এই আইন বাতিল করে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের নামে নিপীড়নমূলক আরেকটি আইন প্রণয়ন করে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মধ্যে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের নির্বতনমূলক ধারাগুলো সন্নিবেশিত করা হয়। সামান্য একটু পরিবর্তন ছাড়া বাকি সব আগের মতো থেকে গেল। তাই শুধু খোলস পরিবর্তন ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনে গুণগত বা উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, গণমাধ্যমে স্বাধীনতা এই বিষয়গুলো খর্ব করার মতো অনেক উপাদান এই আইনে রয়ে গেছে। এর ফলে সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও জনসাধারনের প্রত্যাশাকে একদিকে যেমন পদদলিত করা হলো। অন্যদিকে মুক্ত চিন্তা মত প্কাশের অধিকার ও গণমাধ্যমে স্বাধীনতার মতো মৌলিক মানবাধিকার চর্চাকে অনেক ক্ষেত্রেই আবারো অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হলো, যা চরম হতাশাজনক।

বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে শুভংকরের ফাঁকির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। বিতর্কিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কিছু ধারা জামিনের সুযোগ বাড়াল বটে, কিন্তু অস্বাভাবিক জরিমানারা বিধান করা হলো। যা পরিশোধ করার মতো ক্ষমতা অন্তত বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নেই। ফলে জরিমানার টাকা দিতে না পারলে সাংবাদিকদের সেই জেলই খাটতে হবে। অর্থাৎ 'যে লাউ সে কদু।'

আমরা সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিশ্লেষণে গেলে দেখবো, সাইবার নিরাপত্তা আইনে মোট ৬০টি ধারার মধ্যে ১৮টিতে সরাসরি অপরাধ ও দন্ডের বর্ণনা রয়েছে। এর বাইরে ৪৬(৩) ধারায় ‘তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের গোপনীয়তা’র বিধান লঙ্ঘন করাকে একটি অপরাধ উল্লেখ করে শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। শাস্তির ক্ষেত্রে ১৭, ২১, ২২, ২৫, ২৬, ২৮, ৩১ এবং ৩২ ধারায় কারা্দন্ডের মেয়াদ কমানো হয়েছে, একেবারে বাদ দেয়া হয়নি। দুটি ধারায় কারাদণ্ডের শাস্তি না রেখে কেবল জরিমানার শাস্তি রাখা হয়েছে। এর একটি হলো ধারা ২৯, যেখানে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার ইত্যাদির শাস্তি হিসাবে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। আগের আইনে এ অপরাধের শাস্তি ছিল তিন বছর পর্যস্ত কারাদন্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড। অন্যটি হলো ধারা ৩০, যেখানে আইনানুগ কর্তৃত্ব-বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের শাস্তি হিসেবে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। আগের আইনে এ অপরাধের শাস্তি ছিল পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। এখানে জরিমানার টাকা দিতে না পারলে জেলেই যেতে হচ্ছে। তার মানে শাস্তি থেকেই গেল।

আইনে ১৮, ১৯, ২০, ২৩, ২৪, ২৭, ৩৩ এবং ৩৪ ধারায় কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দুই-ই পূর্বের মতোই রাখা হয়েছে। অপরাধ ও দণ্ড-সম্পর্কিত মোট ১৮টি ধারার মধ্যে ছয়টিকে আমলযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য এবং ১২টিকে অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য করা হয়েছে। পূর্বের আইনে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৪টি এবং পাঁচটি। অর্থাৎ অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হয়েছে। ১৬টি ধারায় শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড উভয়ই রয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে আটটিতে শাস্তি পূর্বের মতোই রাখা হয়েছে। বাকি আটটিতে শাস্তির মেয়াদ কমানো হয়েছে। অন্য দুটিতে কারাদণ্ডের বিধান বাদ দিয়ে শুধু অর্থদন্ড করা হয়েছে; কিন্তু জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। এ দুটি ধারার মধ্যে ২৯ ধারাটি নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়,নতুন বা পুরোনো কোনো আইনেই ‘মানহানি’র সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। ধারা ২(ধ)-তে বলা হয়েছে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার ‘মানহানি’ই এ আইনের ‘মানহানি’ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় প্রদত্ত ‘মানহানি’র সংজ্ঞাই এ আইনের ২৯ ধারার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ী, মানহানির শাস্তি হলো দু'বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। অপরাধের সংজ্ঞা একই, একটি ডিজিটাল মাধ্যমে অন্যটি প্রিন্টসহ অন্যান্য মাধ্যমে। জরিমানা ছাড়া দু'বছর কারাদণ্ড বা কেবল জরিমানা বা উভয় দণ্ড যা-ই হোক না কেন ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিনতর। প্লাটফরম ভিন্ন হওয়ার কারণে একই অপরাধের ভিন্ন বা উচ্চতর শাস্তি হতে পারে না। সংবিধানের ২৭, ৩১ এবং ৩৫ অনুচ্ছেদ বিবেচনায় ২৯ ধারাটি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। নিয়ম অনুযায়ী মানহানির মামলা করতে হয় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নিজেকে। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ২৯ ধারাটি খড়্গসম। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করলেই এ ধারায় অভিযুক্ত হতে হয়। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন অনেক সংবাদই সাংবাদিকরা প্রকাশ করে থাকেন, যার মাধ্যমে কারো না কারো বিরুদ্ধে যায়। মানহানিও অভিযোগ এনে মামলা করা শুরু করলে আর সাংবাদিকতাই করা যাবে না।
এটা তো সত্য যে পত্রিকার সংবাদের ভিত্তিতে এ দেশে অনেক অপরাধ এবং অপরাধী সামনে এসেছে। বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থাও হয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থ ও মানব পাচারসহ বড় বড় অপরাধ রোধ এবং সুশাসন নিশ্চিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সম্প্রতি সাবেক পুলিশ বাহিনী প্রধান বেনজীর আহমদ ও রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা মতিউর রহমানের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এসব প্রতিবেদন দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৯ ধারায় এদেরও মানহানির মামলা করার সুযোগ রয়েছে। এরা এতো অর্থবিত্তের মালিক ও প্রভাবশালী যে, এদের সাথে একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের পেরে উঠা সম্ভব হবে না। বাস্তবতা হচ্ছে, ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের শাস্তির আশঙ্কা থাকার কারণে কোনো সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবে না। কারণ কেউ চাইবে না রিপোর্টের কারণে কারাগারে যেতে বা ২৫ টাকা জরিমানা দিতে। এতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কমে যাবে, দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম বেড়ে যাবে।

স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য আরেকটি বড় বাধা হলো আইনটির ১৭ ধারা। এ ধারার দফা ২(ক) অনুযায়ী, ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’তে বেআইনি প্রবেশ করলে অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং দফা ২(খ) অনুযায়ী বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে ক্ষতিসাধন বা বিনষ্ট বা অকার্যকর করলে বা করার চেষ্টা করলে অনধিক ছয় বছর কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। ইতোমধ্যে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ২৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ হিসাবে ঘোষণাও করা হয়েছে। এর ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে সাংবাদিকদের সাথে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের একটা দুরত্ব তৈরি হয়েছে।এক্ষেত্রে কোন সাংবাদিক যদি গোপন সোর্সের মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতির কোনো খবর ছাপে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’তে বেআইনি প্রবেশ করার অভিযোগ এনে মামলা দেয়, তাহলে রিপোর্ট সত্য হলেও ওই রিপোর্টারকে অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। দুর্নীতির রিপোর্ট গোপন সূত্রের মাধ্যমেই নিতে হয়।প্রকাশ্যে কেউ দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত দেবে না। এই আইনের কারণে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। বড় অসুবিধা হলো, ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’র তালিকা ঘোষণা করা হলেও কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা দেওয়া হয়নি। মুক্ত গণমাধ্যমের বিকাশের জন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। শুধু সংবাদকর্মী নয়, এর মাধ্যমে জনগণের অবাধ ও নিরপেক্ষ তথ্য লাভের অধিকারও খর্ব করা হয়েছে।

এপ্রসঙ্গে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। সম্প্রতি আমি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচারের যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে যাই। প্রথমে কেউ কোনো তথ্য দিতে রাজি হলেন না। পরে নাম প্রকাশ, ছবি তোলা এবং কথা রেকর্ড করা যাবে না- এ শর্তে কয়েকজন তথ্য দিতে রাজি হলেন।

সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করাকে অপরাধ বলা হয়েছে। ২৮ ধারায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে কোনো কিছু প্রকাশ, প্রচার করাকে অপরাধ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। ৩১ ধারায় বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটার উপক্রম হয় এমন কোনো কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করা অথবা করানোকে অপরাধ বলা হয়েছে। এ তিনটি ধারায় সংশ্লিষ্ট অপরাধের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনেক জটিল ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যথাযথ স্পষ্টীকরণ বা সংজ্ঞায়ন না থাকায় এগুলো সাধারণ নাগরিকদের কাছে সহজে বোধগম্য হবে না। অন্যদিকে ৩৪ ধারায় বর্ণিত ‘অপরাধ সংঘটনে সহায়তা’র জন্য শাস্তির উল্লেখ করা হলেও এর সংজ্ঞায়ন করা হয়নি। এমনকি দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় বর্ণিত ‘মানহানি’র সংজ্ঞাই এখানে প্রযোজ্য হবে কি না, তাও উল্লেখ করা হয়নি। এসব অস্পষ্টতা, ত্রুটি ও অসংলগ্নতা দূরীকরণে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞার দরকার ছিল। তাতে অন্তত নাগরিকদের জন্য আইনটি সহজবোধ্য হতে পারত। অতএব এক্ষেত্রেও আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ বিদ্যমান। ইচ্ছামতো সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নাগরিকদের হেনস্তা করার আশঙ্কা সুস্পষ্ট।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তার বিষয় হলো আইনটির ৪২ ধারা। এ ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ ধারাবলে পুলিশ চাইলে সন্দেহের তালিকায় ফেলে যে কোনো ব্যক্তির ঘরবাড়ি বা অফিস, দেহ বা ব্যক্তিগত ডিভাইস ইত্যাদি তল্লাশি করতে এবং তাকে গ্রেফতার করতে পারবে। সন্দিগ্ধ অপরাধ আমলযোগ্য নাকি অ-আমলযোগ্য বা আদৌ অপরাধ হয়েছে কি হয়নি, তা দেখার কিছু নেই। আর এজন্য পুলিশের কোনো ওয়ারেন্ট বা আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হবে না। আইনই তাকে বাধাহীন সুযোগ দিয়েছে। এখানেই ভয় এবং শঙ্কার প্রশ্ন। এই ৪২ ধারাটি দমন-পীড়নের হাতিয়ার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। আরেকটি বিশেষ দিক হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হলেও ৫৯ ধারার বিধানবলে ওই আইনের আওতায় গৃহীত সব কার্যধারা বা মামলা বা আপিল এমনভাবে চলমান থাকবে, যেন তা সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনেই সূচিত। অতএব যারা আগের আইনের প্রয়োগে হয়রানি, নিপীড়ন, গ্রেফতার বা মামলার শিকার হয়েছেন,আইন বাতিল হলেও তাদের মামলা চলমান থাকলো।

এই আইনটি সম্পর্কে সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, 'সাইবার নিরাপত্তা আইন: রূপে নতুন, নাচটা আগের মতোই।'
তাই এই আইনকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিরোধী উল্লেখ করে সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন,টিআইবি বাতিল ও সংশোধন চেয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বাতিল করে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামে আরেকটি কালা কানুন করায় হতাশা ব্যক্ত করেছে জাতিসঙ্ঘ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইনের সাথে ডিএসএর ‘গুরুতর ঘাটতি’র বেশ কিছু বিধান প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে থাকায় হতাশাও প্রকাশ করেছেন। র‍্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান গতবছরের ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারকে এক চিঠিতে বিষয়টি জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে গঠণমূলকভাবে সম্পৃক্ত থাকতে আইরিন খান চিঠিতে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, এর আগে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার, ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউয়ের (ইউপিআর) বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্র, জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ প্রক্রিয়া এবং স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার হিসেবে তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে অনেক উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

গত বছর জুনে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বাংলাদেশ সরকারকে একটি কারিগরি নোট পাঠিয়েছিল। ওই নোটের অনেক বিষয়ই সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় স্থান পায়নি বলে তিনি জানান।

এতে জাতিসঙ্ঘ স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া নিয়ে তিনটি মন্তব্য করেছেন। প্রথমত, খসড়া আইনে অস্পষ্ট ও অধিক বিস্তৃত বিধান থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে বৈধভাবে মত প্রকাশকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়।

এই বিধানগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নতুন রূপ হিসেবে এসেছে। এগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর এগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আক্রান্ত হয়েছে।
দীর্ঘ মেয়াদে কারাবন্দিত্ব ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

দ্বিতীয় মন্তব্যে জাতিসঙ্ঘ স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার বলেছেন, খসড়া আইনে শাস্তিগুলো অসামাঞ্জস্যপূর্ণভাবে কঠোর করা হয়েছে। সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজার মাত্রা কমাতে বা বাদ দিতে চেয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জামিনের সুযোগ বাড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কারাদণ্ড বাদ দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো অর্থবহ হওয়ার মতো খুব তাৎপর্যপূর্ণ হবে না।

সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া নিয়ে তৃতীয় মন্তব্যে স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার বলেছেন, প্রস্তাবিত এই আইনে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনটি যাতে সত্যিকার অর্থেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়, সে জন্য একে আইনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান। তিনি আশা করেন, প্রস্তাবিত আইনটি সংসদে উত্থাপনের আগে সরকার আরো সংশোধন করবে। কিন্তু সরকার এ আহবানে সাড়া না দিয়ে গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর সংসদে এটি পাশ করিয়ে নেয়।

জাতিসঙ্ঘ স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৯ ধারা অনুযায়ী বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ওই চুক্তি করেছিল।

প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রপাগান্ডা চালানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘ কমিটির মতে, রাষ্ট্রপ্রধানসহ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা এবং রাষ্ট্রের পতাকা, জাতীয় প্রতীক বা ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে মতামত আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত বৈধ অভিব্যক্তি।

জাতিসঙ্ঘ স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ারের আশঙ্কা, এই ধারার অপরাধের পরিধির বিস্তৃতি ও অস্পষ্টতা রাজনৈতিক মত প্রকাশের ওপর বেআইনি বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে।

প্রস্তাবিত আইনের ২৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত এবং ৩১ ধারায় বিভিন্ন সম্প্রদায় বা শ্রেণির মধ্যে বিদ্বেষ, ঘৃণা বা বৈরিতা সৃষ্টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার বলেছেন, ২৮ ধারা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ওই ধারা বাদ দেওয়া উচিত। আর ৩১ ধারাকে আইসিসিপিআরের ২০(২) ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা উচিত।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা (আপত্তিকর, মিথ্যা ও হুমকি সৃষ্টিকারী ডাটা তথ্যবিষয়ক) এবং ফৌজদারি মানহানিবিষয়ক ২৯ ধারা বাংলাদেশ সরকারের সমালোচকদের আটক করতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি আইনেও এগুলো থাকাকে বিরক্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার।

সাইবার সন্ত্রাস সম্পর্কে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৭ ধারায় সাইবার সন্ত্রাস খসড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনেও স্থান পেয়েছে। স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার বলেছেন, সাইবার সন্ত্রাসের সংজ্ঞা অনেক বিশদ ও অস্পষ্ট। সন্ত্রাসের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার কোনো উপাদান সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের সুপারিশ অনুযায়ী সন্ত্রাসের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুমোদন করতে চিঠিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘ স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ারের মতে, প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্ত আইনে কেবল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে থাকা অপরাধের দীর্ঘ তালিকাই সংযোজন করা হয়নি, শাস্তির বিধানও যোগ করা হয়েছে। অপরাধের সংখ্যা ও শাস্তির মাত্রা কমাতে স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন।

নিয়ন্ত্রক ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা প্রসঙ্গে বলা হয়,খসড়া আইনের ৮ ধারায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে (বিটিআরসি) ডিজিটাল নিরাপত্তা হুমকিতে ফেলা ওয়েবসাইটগুলোতে প্রবেশাধিকার সীমিত করার বা তথ্য-উপাত্ত মুছে ফেলার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়া উচিত।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতার আলোকে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোর বিষয়ে স্বাধীন বিচারিক নজরদারি রাখতে সুপারিশ করেছেন স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার। প্রস্তাবিত আইন নিয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসারও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সরকার এতে কোনো সাড়া দেয় নি। জাতিসংঘের এ প্রস্তাবনাগুলো আমার কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক মনে হয়েছে।

‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’র ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনোরূপ হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রত্যেকের মতামত প্রকাশের অধিকার, তথ্য ও ভাব ধারণা অন্বেষণ করা, গ্রহণ করা ও প্রদান করার অধিকার রয়েছে। ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি’র ১৯ অনুচ্ছেদের এসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে এগুলোর পূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছে। সেখানে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে আইনের বেড়াজালে আটকে যেতে হয় এবং পীড়াদায়ক শাস্তির খড়্গ মাথার ওপর ঝুলতে থাকে। সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সরকার মূলত সে কাজটিই করেছে।

শুধু তাই নয়, ফৌজদারি আইন ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এখন সরকারবিরোধী এবং সরকারের সমালোচকদের শাস্তি প্রদান করার জন্য একটা মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকরাও এ হাতিয়ারের শিকার হচ্ছেন। এ হাতিয়ারের ন্যক্কারজনক শিকার হন প্রথম আলোর জোষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম। সরকারপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট নামের একটা নতুন হাতিয়ারও খুঁজে পেয়েছেন। এক শ' বছরের পুরনো এই আইনে রোজিনা ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। শত বছরের পুরনো অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট উপনিবেশ যুগে ভারতের স্বদেশী আন্দোলন দমনে তখনকার শাসকরা করেছিল। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দাবি বাংলাদেশ সরকার জনগণকে সত্য জানা থেকে বঞ্চিত করতে শত বছরের পুরনো এই আইন খুঁজে বের করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে।

সাংবাদিকদের শায়েস্তা করা যায় এমন অন্তত ১৪টি আইন র‍য়েছে দেশে। পুরনো আইনের মধ্যে রয়েছে ডিফেমেশন, অফিশিয়াল সিক্রেসি, কনটেম্পট অব কোর্ট আইন। নতুন আইন আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি, গণমাধ্যমকর্মী আইন, ডাটা প্রটেক্ট ল, ওটিটি। এসব আইনের নাম ভিন্ন হলেও এগুলো প্রয়োগের যে পরিধি, সেখানে ঘুরেফিরে মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এগুলো সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিবন্ধক। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো আড়িপাতা প্রযুক্তি এবং ট্র্যাকিং ডিভাইস দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি করছে এবং সেটি অসহনীয় ও বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেছে। প্রশ্ন হলো, স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে এত আইন কেন?

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এ প্রসঙ্গে এক প্রবন্ধে লিখেন "গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, বা বলা যায় তাকে দমন করে রাখার জন্য দেশে অনেক আইন আগে থেকেই আছে; এরপরও নতুন নতুন আইন কানুন পাস করার যে তোড়জোড় চলছে, তাতে কারো মনে হতে পারে সরকার যে খাতগুলোকে আটকে দেয়া দরকার বলে ভাবছে, তার মধ্যে সবার আগে সাংবাদিকদের 'স্থবির' করা দরকার।"

এসব কালাকানুন ব্যবহার করে সব্যসাচী সাংবাদিক শফিক রেহমান, শহিদুল ইসলাম, ফটো সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম কাজল, বিএফইউজের সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক বীরমুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন গাজী, দ্য নিউ নেশনের উপদেষ্টা সম্পাদক ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ঢাকা টাইমস এডিটর আরিফুর রহমান দোলন, শীর্ষ নিউজের এডিটর একরামুল হক, সিনিয়র সাংবাদিক সায়াদাত হোসেনসহ অনেক সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। দৈনিক সংগ্রামের বয়োবৃদ্ধ সম্পাদক আবুল আসাদকে সরকারি দলের ক্যাডাররা কর্তব্যরত অবস্থায় টেনে হিচড়ে অফিস থেকে বের করে শুধু অমানবিক নির্যাতনই করেনি, পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। পুলিশ সন্ত্রাসীদের না ধরে আবুল আসাদকে উল্টো জেলে ঢুকিয়ে রিমান্ডের পর রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। লেখক।মুশতাক আহমদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতে কাশিমপুর কারাগারে তার মৃত্যু হয়।

বর্তমান সরকারের আমলে ৬০ জনের বেশি সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন । দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক দিনকাল, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, সিএসবিসহ অসংখ্য গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এসব মিডিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক সাংবাদিক বেকার হয়েছেন। আবার বিভিন্ন মিডিয়া থেকে ভিন্নমতের চিহ্নিত করে অনেক সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে ।

সরকারের রোষানলে পড়ে যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান,ওলি উল্লাহ নোমান, কাজী জেসিন, সালেহ শিবলী, শামসুল আলম লিটন, কনক সারোয়ার, ফরিদ আলম, মাহবুবুর রহমান, কাফি কামাল, মাহমুদুল ইসলাম লিটন, মঞ্জুরুল ইসলাম, দীন ইসলাম, আজহার মাহমুদ, ইলিয়াস হোসেনসহ অনেক সম্পাদক ও সাংবাদিককে দেশান্তরি হতে হয়েছে ।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর হিসাবে দেখা যায়,গত বছর বাংলাদেশে ৩৬৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। হত্যার শিকার হয়েছেন দুইজন। এ ছাড়া ৫৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন ১১ জন। দেশের ১২টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের তথ্য অনুসন্ধানী ইউনিটের তথ্যের ভিত্তিতে তারা ওই তথ্য প্রকাশ করে।

আর আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০২৩ সালে ২৯০ সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। নির্যাতনের শিকার এ সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৮ সংবাদকর্মী। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির মাধ্যমে লাঞ্ছিত ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় বাধা প্রদানের শিকার হয়েছেন ২২ সাংবাদিক।

আরএসএফ বলছে, 'বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা ডিএসএ সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বে সবচেয়ে কঠোর আইনের মধ্যে অন্যতম। এই আইন কোনো পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার বা তল্লাশি এবং যেকোনো কারণে সাংবাদিকের সূত্রের গোপনীয়তা লঙ্ঘন অনুমোদন করে'

'এই ধরনের আইনগত পরিবেশে, সম্পাদকরা নিয়মিত নিজেদের সেন্সর করেন,' বলছে আরএসএফ।

আর গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৪৫১ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)-তে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৭ জনকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক ড.আলী রীয়াজ ‘দ্য অর্ডিল: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পাঁচ বছর' শীর্ষক গবেষণাপত্রে গত মঙ্গলবার এমন তথ্য তুলে ধরেন। তিনি ওয়েবিনারের মাধ্যমে তুলে ধরা এই গবেষণা পত্রে বলেন, 'তাদের মধ্যে ২৫৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের লেখা রিপোর্টের জন্য। আর গ্রেপ্তার হওয়া ৯৭ জন সাংবাদিকের মধ্যে ৫০ জন স্থানীয় সাংবাদিক (জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের)।'

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উদঘাটিত হয়নি ১২ বছরেও। ১২ বছরে আদালত থেকে ১১১ বার সময় নির্ধারণ করে দেযার পরও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি বা দেয়নি সংশ্লিষ্টরা। অথচ সাগর-রুনির খুনিদের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হবে বলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস সরকার আন্তরিক হলে অবশ্যই চাঞ্চল্যকর এ হত্যার বিচার পাওয়া যেতো।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম বর্তমানে সত্যিকার অর্থেই চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। এমন ভয়ানক অন্ধকার সময় আরেকবার এসেছিল স্বাধীনতা উত্তর সরকারের সময়। ওই সময় মাত্র চারটি সংবাদপত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে সকল খবরের কাগজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। অনেক সাংবাদিককে তখন বেকার হতে হয় । ঠুনকো কারণে অনেক সম্পাদক ও সাংবাদিককে জেল খাটতে হয় । এখন প্রচুর মিডিয়া আছে, কিন্তু মিডিয়ার স্বাধীনতা নেই ।

আমরা সবচেয়ে চরম সংকটে আছি বাক-স্বাধীনতা নিয়ে। বাক-স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ায় মানুষকে এখন খুবই ভেবেচিন্তে কথা বলতে হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে মানুষ নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। কিছু লিখলে বা কোনো কথা বললে সরকারের বিরুদ্ধে যায় কিনা, বক্তব্য কোনোভাবে মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যায় কিনা, সরকার দলীয় এমপিদের বিরুদ্ধে যায় কিনা, শেখ মুজিব পরিবারের বিরুদ্ধে যায় কিনা, সরকারি দলের নেতার বিরুদ্ধে যায় কিনা, সেই ভাবনা এখন বড় শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে বাক-স্বাধীনতা। তাইতো নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন : 'বাক-স্বাধীনতা প্রকৃত পক্ষে মানব স্বাধীনতারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যের সঙ্গে কথা বলতে পারা, অন্যের কথা (মতামত) শুনতে পারার সক্ষমতা; এটি হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের মূল্যবান হওয়ার কেন্দ্রীয় কারণ ।'

আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই উপলব্ধি আমাদের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চারিত হয়নি। বাংলাদেশে সমালোচনার এতই সীমা রেখা টেনে দেয়া হয়েছে যে সমালোচনার সময় কয়েকজন ব্যক্তির নাম ভুলেও মুখে কিংবা কলমে আনা যাবে না। তাদের সমালোচনা মানেই সাথে সাথে চৌদ্দ শিকের ভাত খেতে হবে।

ভিন্নমতের বিরুদ্ধে সরকারের অসহিষ্ণু অবস্থান বাক-স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। সরকারের নানান পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে এমন এক ভয়ের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যেখানে অনেকেই মুক্তভাবে তাদের মনের কথা বলতে পারছেন না। এ এক শ্বাসরোধী পরিস্থিতি।

মানব জমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সম্প্রতি 'অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসেছে' শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ওই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন : 'আমি নিজেই অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে আছি। লিখলে ভয়, না লিখলে বাহবা। শেষের পথটা কখন যে আমি বেছে নিয়েছি। আমার হাত কি কেউ বেঁধে দিয়েছে? না এটা সত্য নয়। আমি অগোচরে নিজের হাত নিজেই বেঁধে নিয়েছি। খুলতে গিয়ে দেখছি, কোথায় যেন গোলমাল হয়ে গেছে ।'

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ডয়েচে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন : 'লিখছি না এমন অনেক ইস্যু রয়েছে । অনেক ইস্যুতে লেখা উচিত । যেমন ধরেন গত নির্বাচন । এছাড়াও আরও ছোট নির্বাচনগুলো নিয়ে লেখা উচিত। যা লিখছি না। বলা উচিত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লিখতে পারছি না।'

লিখবেনই বা কি করে! বর্তমান সরকারের সময় মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে ৮০টির বেশি মামলা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ২১টি। মানহানির মামলাগুলোর মধ্যে ৫১টিতে এক লাখ ২২ হাজার ৪৭০ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মানহানি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

একইভাবে বেশ কিছু মামলা ঝুলছে মতিউর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে । প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরের পর তো বলা ও লেখা তিনি অনেকটা বন্ধই করে দিয়েছেন ।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকার নজিরবিহীনভাবে বাক-স্বাধীনতার উপর আঘাত হেনেছে। আগের সরকারগুলো ‘সমালোচক' পত্রিকার সরকারি বিজ্ঞাপন কমিয়ে দিত কিংবা বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিত । এ সরকারের সময় দেখা গেল, দেশের প্রধান দু'টি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি টেলিফোন কোম্পানি, ব্যাংক এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিজ্ঞাপনও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটি করা হয়েছে সরকারি গোপন নির্দেশে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কাজটি হচ্ছে ভিন্নমতের পত্রিকা বন্ধ কর দিচ্ছে নানা অজুহাতে । দৈনিক আমার দেশ পত্রিকাটি ছিল বেশ জনপ্রিয়। সার্কুলেশন ছিল অনেক। সরকারের সমালোচনা করতো বলেই পত্রিকাটি বন্ধই করে দেয়া হলো। সম্পাদককে জেলে ঢোকানো রিমান্ডের পর রিমান্ডে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হলো। আদালতে হাজিরা দিতে গেলে সেখানে সরকারের লেলিয়ে দেয়া ক্যাডাররা আদালত প্রাঙ্গণে তার রক্ত ঝরালো । জীবন বাঁচতে নিরুপায় হয়ে তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হলো!

টিভি টকশোতে কেউ মন খুলে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। যারা সাহস করে সত্য কথা বলেন তাদের পরে আর টকশোতে ডাকা হয় না । এক সময় টকশো ঝড় তুলতেন নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুলরা। এখন তাদের আর টকশোতে দেখা যায় না । মানে তাদের ডাকা হয় না। সরকারের বাক-স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে শুধু বাংলাদেশের সাংবাদিকরাই নয় বিশ্ব বিবেকও ধিক্কার দিচ্ছে। কিন্তু সরকার এতে কোনো কর্ণপাত করছে না ।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর ২০ জুলাই ২০২১ বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগসহ গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন, 'বাংলাদেশ সরকার আগ্রাসীভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করছে। আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন সাংবাদিকসহ সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে । যাদেরকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় আটক করা হয়েছে, তাদের ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া যেন নিশ্চিত করা হয়।'

যুক্তরাজ্য সরকারের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিবেদন-২০২০-এ বলা হয়েছে : বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। করোনা মহামারীতে বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা ঠেকাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহারসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।'

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পেছাতে পেছাতে এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও স্থান ঠেকেছে তলানিতে।

বাংলাদেশের মিডিয়ার এমন খারাপ সময় দেখে মেধাবীরা আর সাংবাদিকতায় আসতে চাইছে না। বরং অনেকেই সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। অথচ একটা সময় তরুণ-তরুণীদের স্বপ্নের পেশা ছিল সাংবাদিকতা। সাহসী ও চ্যালেঞ্জিং পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নিতেন তারা । এখন বোধহয় সময় এসেছে কথাটি বদলানোর । দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনার হার বাড়ছে। কিন্তু পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতায় আসার হার বাড়ছে না । আবার যারা এসেছেন, তাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়েছেন । যারা আছেন, তাদের কেউ কেউ ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন। সুযোগ পেলেই অন্য কোনো চাকরিতে চলে যাচ্ছেন তারা। গত ক'বছরে অনেকেই সাংবাদিক পেশা ছেড়েছেন।

মাত্র এক বছরে পেশা ছেড়ে দেয়ার কারণে ১১০ জনের সদস্যপদ স্থগিত করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি। এর মধ্যে প্রবাসে চলে গেছেন ৬০ জন । আর ৫০ জন পেশা বদল করেছেন । ডিআরইউ সদস্য নন, এমন অনেকেই সাংবাদিকতা ছেড়েছেন ।

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্র ও সরকারের পাহারাদার। কোথায় কি ভুল হচ্ছে, গণমাধ্যম তা সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় । রাষ্ট্রের সেই চতুর্থ অঙ্গকেই আজ বিকলাঙ্গ করে দেয়া হচ্ছে কোন স্বার্থে? মুক্তচিন্তা এবং বাক-স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বা আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের লক্ষণ। আমরা মনে করি খোলা মনে কথা বলার বা মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরি করা না হলে সেটা সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে ।

এটা আজ প্রমাণিত সত্য যে, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক।গণতন্ত্র না থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকে না।আবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া, গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। তাই গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমরা একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলি, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একের পর এক কালাকানুন করছি। আমরা তথ্য অধিকারের কথা বলি আবার সাংবাদিকদের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গেইট বন্ধ করে দেই। আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলি, আবার ভিন্নমত পোষণের জন্য গণমাধ্যম বন্ধ করে দেই। আমরা সাংবাদিকদের নিরাপত্তার কথা বলি আবার কথায় কথায় সাংবাদিক হত্যা করি, সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন চালাই। সাংবাদিকদের গুম করি, সাংবাদিকদের পিঠমোড়া বেঁধে কিংবা কোমড়ে রশি বেঁধে জেলে নেই। এমন দ্বিচারিতার কারণে বাংলাদেশে গণমাধ্যনের স্বাধীনতা একেবারে তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সে ভয়াবহতার কথাই স্মরণ করে দেয়।

২০২৪ সালের সবশেষ মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের ১৬৫তম, যা এ যাবত কালের মধ্যে সর্বনিম্ন। মূলত ২০০২ সাল থেকে মুক্ত গণমাধ্যম সূচক প্রকাশ করা হচ্ছে। ওই বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৮তম।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায়। এই ১৫ বছরে মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ৪৪ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ!

মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২১তম এবং ১০০ এর মধ্যে স্কোর ছিল ৪২ দশমিক ২; ২০২২ সালে ১৬২তম এবং স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩; ২০২৩ সালে ১৬৩তম এবং স্কোর ৩৫ দশমিক ৩১। চলতি বছর এই সূচক গতবছরের চেয়ে আরও দুই ধাপ কমেছে। এ বছর বাংলাদেশের স্কোর ২৭ দশমিক ৬৪।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক তৈরিতে আরএসএফ মূলত পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় নেয়। সেগুলো হলো- রাজনৈতিক সূচক, অর্থনৈতিক সূচক, আইনি সূচক, সামাজিক সূচক ও নিরাপত্তা সূচক। গত বছরের তুলনায় পাঁচটি সূচকেই বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে।

২০২৩ সালে রাজনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩৯.০৬, এ বছর তা কমে হয়েছে ১৯.৩৬। অর্থনৈতিক সূচকে গতবছর স্কোর ছিল ৩৬.১১, এ বছর ২৭.৮৩। আইনি সূচকে গতবছর বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩৫.২২, এ বছর ৩১.৩২। সামাজিক সূচকে গতবছর স্কোর ছিল ৩৬.৫৫, এ বছর ৩২.৬৫। নিরাপত্তা সূচকে গত বছরের চেয়ে ২.৫৭ পয়েন্ট পিছিয়ে এ বছর বাংলাদেশের স্কোর ২৭.০৩।

এই পাঁচটি সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করা দেখা যায়, গতবছরের তুলনায় রাজনৈতিক সূচকের স্কোরে বাংলাদেশের দ্বিগুণ অবনতি হয়েছে।

আমরা যদি ২০২৪ সালের মুক্ত গণমাধ্যম সূচকের দিকে তাকাই, সেখানে দেখা যায় যে,বাংলাদেশের নিচে রয়েছে সৌদি আরব, কিউবা, ইরাক, মিসর, মিয়ানমার, চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান। এসব দেশে গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। সুতরাং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে আগে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিরোধী সকল কালাকানুন বাতিল করতে হবে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে, তা দূর করতে হবে। তবে সবার আগে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।

লেখক

মহাসচিব
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন

এবং

সদস্য সচিব
বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ


আরো সংবাদ



premium cement