২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সঙ্ঘাত

রাজধানীতে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষ হয়। - ছবি : নয়া দিগন্ত

২০২৩ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিধাবিভক্ত। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে গোটা জাতি। কিন্তু এর সমাধান কোথায়- কেউ জানে না। বিএনপিসহ সব বিরোধী দলের একই বক্তব্য- এই সরকারের অধীনে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের (ইসির) সদিচ্ছা থাকলেও যে তা সম্ভব নয় তা প্রমাণ হয়েছে গাইবান্ধার উপনির্বাচনে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কারণ এই মেশিন মানুষ নামক যন্ত্র দিয়ে চালিত হয়। ইভিএমের গোপন কক্ষে অবৈধভাবে প্রবেশ করে একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দিতে পারে- এটি গাইবান্ধার উপনির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। সিসি ক্যামেরা লাগিয়েও তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে পুরো নির্বাচনটিই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন।

আগের দুই নির্বাচন কমিশনের মতোই বর্তমান নির্বাচন কমিশনও বিবেকহীনভাবে সরকারের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তবে কোন বিবেকের উদয় হওয়াতে নির্বাচন কমিশন গাইবান্ধার নির্বাচনটি বন্ধ করল তা কোটি টাকার প্রশ্ন হয়ে রইল। নির্বাচন কমিশনের ভাবটা এমন যে, অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি এত বেশি হয়েছে, তারা তাদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু এতে প্রমাণিত হয় না যে, তাদের অধীনে আগামী ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা সম্ভব হবে। নির্বাচন বন্ধ করতে পারলেও জাতির সামনে এটি স্পষ্ট যে, তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ। জনগণের মনে প্রশ্ন জেগেছে, যারা একটি আসনের ভোট সরকারের বলয়ের বাইরে গিয়ে সুষ্ঠুভাবে করতে পারে না, তারা কিভাবে ৩০০ আসনের ভোট সুষ্ঠু করবে? অনেকে আবার এই প্রশ্নও তুলছেন যে, সরকারের ইশারায় এই নির্বাচন বন্ধ করেছিল এটি প্রমাণ করার জন্য যে, এই নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। দেশী-বিদেশী মহলকে এটি বোঝানোর জন্য যে, আগামী নির্বাচন এই সরকারের অধীনে হলেও নির্বাচন কমিশনের ওপর তাদের খবরদারি কাজে আসবে না।

সরকার ও নির্বাচন কমিশন যতই চালাক বনে যাক, এই দেশের জনগণ তাদের কাউকেই বিশ্বাস করে না। সিইসি নিজেই স্বীকার করেছেন, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া, এজেন্টদের বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও ইভিএমে জালিয়াতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করেছেন। একই কারণে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নৌকার প্রার্থী ব্যতীত অপর চার প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এদিকে সিইসি স্বচক্ষে ভোটকক্ষে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কারচুপির দৃশ্য দেখেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা নাকি নির্বাচন বন্ধের কোনো কারণ খুঁজে পাননি। তারা বলছেন, ‘গাইবান্ধায় নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রেই নৈরাজ্য হয়নি।’ ২০১৪ সালের নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে যায়নি। এটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে মানুষ ভোটার ছিল না; কিন্তু কুকুর, গরু, ছাগলের আনাগোনা ছিল। মিডিয়ায় সেই ছবি এসেছে । কেউ ভোটারের সন্ধান না পেলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের দাসত্ব বরণকারী রকিব উদ্দীন নির্বাচন কমিশন কিন্তু ঠিকই ৪০ শতাংশ ভোটারের ভোট খুঁজ পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে হয়েছিল। ভোটের দিন আওয়ামী লীগের ভোটার ব্যতীত অন্য কাউকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়নি। সারা দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহল সেটি দেখলেও আওয়ামী লীগ কিন্তু তা দেখেনি; বরং তারা গর্ব করেই বলে বেড়ায়- ভোটে জনমতের প্রতিফলন হয়েছে।

এই দেশে ১৯৭৩ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সব ক’টি নির্বাচনই অতিমাত্রায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তারা নির্লজ্জের মতো বলে বেড়ায়- তাদের সময়ই নির্বাচন সবচেয়ে বেশি সুষ্ঠু হয়েছে। কলুষিত চোখ দিয়ে কলুষতা ধরা পড়ে না। সুতরাং যারা বিনাভোটে বা ভোটডাকাতি করে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন তাদের পক্ষে কারচুপি, ডাকাতি, জালিয়াতি ইত্যাদি অনৈতিক দৃশ্য ধরা পড়বে কিভাবে? দৃশ্যমান অনৈতিকতা যখন আওয়ামী লীগের কাছে নৈতিকতার সুপারিশ পায় তখন পাগলেও বিশ্বাস করবে না যে, আওয়ামী লীগের অধীনে কস্মিনকালেও একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। গাইবান্ধার উপনির্বাচন প্রমাণ করেছে- এই সরকারের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে। ২০২৩ সালে যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা কোন সরকারের অধীনে হবে এবং তা কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে সেই সংশয় ও সঙ্ঘাত শুরু হয়েছে। নিরপেক্ষ সরকার ব্যতীত এই সংশয় ও সঙ্ঘাত বন্ধ হবে না।

এই সরকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে এতটাই দলীয়করণ ও একটি নিদির্ষ্ট দলের অধীন করে দিয়েছে যে, তারা এখন কেউ কাউকে মানতে চায় না। প্রত্যেকের খুঁটির জোর কোনো না কোনো এমপি বা মন্ত্রী। মাঠ প্রশাসনের ডিসি এসপিরা তো কাউকে পরোয়াই করে না। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে ডিসি-এসপিদের সাথে নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময় সভায়। সেই মতবিনিময় সভায় একজন নির্বাচন কমিশনার বক্তৃতা দিতে ওঠে ডিসি-এসপিদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তোলেন। তখন ডিসি-এসপিরা তার বক্তৃতায় বাধা দেন। এক পর্যায়ে সেই কমিশনার জানতে চান- ডিসি-এসপিরা কি তার কথা শুনতে চান না? তখন তারা সমস্বরে জানিয়ে দেন, তারা চান না। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক পদ। রাষ্ট্রীয় অবস্থানের মর্যাদাক্রমে (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) নির্বাচন কমিশনারদের অবস্থান নবম। আর প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সচিব ক্যাবিনেট ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের অবস্থান তিন ধাপ নিচে, দ্বাদশ। আর ডিসি-এসপিদের অবস্থান ২৫। ডিসি-এসপিদের কাছে অবস্থানগত সম্মানটুকু একজন নির্বাচন কমিশনার পেলেন না। এমন কাণ্ডের পরও নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার এটিকে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বলে এড়িয়ে গেছেন। এর বিরুদ্ধে অফিশিয়ালি সরকারের কাছে কোনো অভিযোগও জানানো হয়নি। ডিসি-এসপিদের কাছে যদি নির্বাচন কমিশন এতটা অসহায় হয় তাহলে সরকারের কাছে তাদের অবস্থান আরো কত নতজানু সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না ।

একজন ডিসির মুখে যখন আমরা শুনতে পাই, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে যদি থাকে, তাহলে আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ বলি, বিএনপি বলি, জামায়াত বলি- সবাই নিরাপদ থাকবে। আমি মনে করি, বিএনপি-জামায়াতেরও এখন দোয়া করা উচিত শেখ হাসিনা যেন আবার ক্ষমতায় আসেন।’ জনগণের সেবক হয়ে তারা ডিসি হয়ে বসে আছেন, করছেন বিশেষ দলের প্রতি আনুগত্য। এরাই যদি আবার রিটার্নিং কর্মকর্তা হন তাহলে ভোট কতভাগ নিরপেক্ষ হবে, তা বোধ হয় অঙ্ক কষে বলার প্রয়োজন নেই। দলীয়করণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন আওয়ামী লীগের সেবায় ব্যস্ত। দেশ ও জনগণের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। পুলিশ প্রশাসনের আচরণ স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশের চেয়েও হিংস্র ও আক্রমণাত্মক। মনে হচ্ছে, তাদের প্রধান অ্যাজেন্ডা হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের রাজপথ থেকে উৎখাত করা। তবে তাদের এই আচরণ রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আবার নির্বাচন কমিশনও যেহেতু সাংবিধানিক স্বাধীনতার বাইরে গিয়ে নিজেদেরকে সরকারের দাস ভাবতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, কাজেই গাইবান্ধার পুরো নির্বাচন সরকারের ইশারার বাইরে গিয়ে বন্ধ করেছে এটি ভাবার কারণ নেই। তবে এটি ঠিক, গাইবান্ধার উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশন যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে খুব প্রশংসা হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক কারণেই সেটি প্রশংসার কারণ না হয়ে সন্দেহের কারণে পরিণত হয়েছে। আমরা গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘকাল হোঁচট খেতে খেতে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তাই আমাদের মনে সংশয় হয় এবং সেটিই যৌক্তিক।

রাষ্ট্র আজকে যে খানাখন্দের মধ্যে পড়েছে তার জন্য মূলত দায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার মানসিকতা। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানই স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করছে না। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সরকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে জনগণের কাছে একটি উন্নাসিকতার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একদিকে সরকারপ্রধান বলছেন, ২০২৩ সালে মহামন্দা আসছে। অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছা পূরণে ১৫০টি আসনে ইভিএমে নির্বাচন করার জন্য ইভিএম প্রকল্পে আট হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যেখানে অভাব সেখানে কেন এত বিলাসিতা? কার স্বার্থেই বা এত বিলাসিতা? আসলে জনগণের সাথে এই তামাশার শেষ কোথায়?

পরিশেষে বলতে চাই, চাপে বা লোভ-লালসার কারণে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এক ব্যক্তির ইশারার দিকে ঝুঁঁকে পড়ে, তখন জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সাময়িকভাবে মুষ্টিমেয় লোক লাভবান হলেও রাষ্ট্র ও তার জনগণ দীর্ঘকালীন সঙ্কটে নিপতিত হয়। কাজেই রাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে না ফেলে সরকার, নির্বাচন কমিশন, ডিসি-এসপি সবারই বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে জনকল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখা উচিত।

harun_980@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement