০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`

ইউক্রেনে, তুরস্কের চোখ দু’দিকেই

ইউক্রেনে, তুরস্কের চোখ দু’দিকেই - ছবি : সংগৃহীত

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ নবম মাসে প্রবেশ করেছে। তুরস্ক সঙ্ঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেশির ভাগ বৈশ্বিক শক্তি পক্ষ বেছে নিয়েছে। আঙ্কারা মস্কো ও কিয়েভ উভয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে, সাথে সাথে বিরোধের অবস্থানে নিজেকে একটি প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু শান্তি কি সত্যিই তুরস্কের মোটিভেশন? নাকি প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান রাশিয়া থেকে যত বেশি সম্ভব সুবিধা পেতে বেশি আগ্রহী?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার এরদোগানের প্রশংসা করেছেন, যাকে তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে তুরস্কের নিরপেক্ষতা বলে আখ্যায়িত করেছেন। অবশ্যই পরিহাস যে, আঙ্কারা যখন উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগের লাইন খোলা রেখেছে, এটি নিরপেক্ষতা থেকে অনেক দূরে। তুরস্ক ইউক্রেনকে শুধু বায়রাক্তার ড্রোনই সরবরাহ করছে না, টিআরএলজি-২৩০ প্রিসিশন গাইডেড মিসাইলও দিচ্ছে। অক্টোবরে, তুর্কিয়ে শিপইয়ার্ডে আরএমকে মেরিন এমনকি ইউক্রেনের প্রথম অ্যান্টি সাবমেরিন নেভালশিপও চালু করেছিল। আরো কী, তুর্কিয়ে ড্রোন নির্মাতা বেকার আগামী দুই বছরের মধ্যে ইউক্রেনে একটি ড্রোন তৈরির কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মানে কি পুতিনের ‘প্রিয় বন্ধু’ এরদোগান ক্রেমলিন থেকে গ্যারান্টি পেয়েছেন যে, রুশ বাহিনী তুরস্কের বিনিয়োগে আক্রমণ করবে না? রাশিয়ার জন্য যতটা আত্মপরাজিত বলে মনে হচ্ছে, এটি প্রথমবার নয় যে, দুই নেতা এমন একটি ব্যবস্থা করেছেন। সিরিয়া ও লিবিয়া থেকে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান পর্যন্ত তাদের লাভজনক চুক্তির ইতিহাস রয়েছে।

সম্প্রতি এরদোগান নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে রাশিয়ার শস্যের চালান পাঠানোর বিষয়টি সমর্থন করেছেন। কাকতালীয়ভাবে না, রাশিয়া যে দেশগুলোতে বিনামূল্যে তার শস্য পাঠায়- মালি, জিবুতি, সুদান ও সোমালিয়া- সেসব জায়গা, যেখানে তুরস্ক তার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

এভাবে এরদোগানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুতিনের ‘শুভেচ্ছা অঙ্গভঙ্গি’ আঙ্কারাকে তার নিজস্ব বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। অক্টোবরে কের্চ ব্রিজের বিস্ফোরণের পর ক্রেমলিন কৃষ্ণসাগরের শস্যচুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। উল্লেখ্য, বিস্ফোরণের ফলে ক্রাইমিয়াতে রাশিয়ার বাহিনীকে পুনরায় সরবরাহ ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। ইউক্রেনকে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরের নৌবহরে আক্রমণ করার জন্য ‘নিরাপত্তা করিডোর’ ব্যবহার করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। যাই হোক, এরদোগানের থেকে একটি ফোন কলই পুতিনের পক্ষে তার মন পরিবর্তন করতে এবং ইউক্রেনকে কৃষ্ণসাগরের মাধ্যমে তার শস্য রফতানির অনুমতি দিতে সম্মত হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

ফলে তুরস্ক এখন ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়ের কাছ থেকে কম দামে শস্য কিনতে পারবে- যা তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে উপকৃত করবে। প্রকৃতপক্ষে, শস্যচুক্তির সম্প্রসারণ তুরস্ককে আবারো সঙ্ঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে অবস্থান নিতে এবং পুতিনের কাছ থেকে এরদোগানের যে উল্লেখযোগ্য সুবিধা নেয়ার সুযোগ রয়েছে, সেটি স্পষ্ট করেছে। কিন্তু কেন?

মস্কোর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার ফলে, তুরস্ক হয়ে গেছে রাশিয়ার জন্য বিশ্বের প্রধান প্রবেশদ্বার। তুরস্ক হচ্ছে আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটোর একমাত্র সদস্য রাষ্ট্র, যে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। অর্থাৎ পুতিনকে অর্থনৈতিক লাইফলাইন দিচ্ছেন এরদোগান। তাই এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, ক্রেমলিন ইউক্রেনের ব্যাপারে তুরস্ক যে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সে ব্যাপারে তার দৃষ্টিকে অন্ধ রেখেছে- অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় থেকেছে এবং সাম্প্রতিককালে, সিরিয়ার ব্যাপারেও এটা ঘটেছে।

তুরস্ক গত সপ্তাহে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে বিমান হামলা শুরু করার পর এরদোগান জোর দিয়েছিলেন যে, তিনি এ ব্যাপারে পুতিনকে আগে থেকে অবহিত করবেন না। তিনি সেটিই করেছিলেন। সিরিয়ায় রাশিয়ার নিজস্ব সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এরদোগান এটা করেছিলেন। এরদোগান ভালো করেই জানেন যে, মস্কো সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে কুর্দি প্রভাবিত পিপলস ডিফেন্স ইউনিটে অথবা প্রেসিডেন্ট আসাদের সিরিয়ান আরব আর্মিকে সহায়তা করতে অক্ষম।

একইভাবে, সম্প্রতি তুরস্ক তেল ট্যাংকারগুলোরে ব্যাপারে নিয়মনীতি কঠোর করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর (যেগুলো বসফোরাস এবং দারদানেলেস স্ট্রেইটগুলোতে ট্রানজিট করে,) মস্কোকে আবার বালিতে মাথাগুঁজতে তথা মাথা পুঁতে রাখতে হয়েছিল। কারণ এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার তেলের প্রবাহকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।

মোট কথা, তুরস্ক রাশিয়ার নীরবতা কিনছে। ২০২১ সালে রাশিয়ান সূত্র অনুসারে, রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে এবং চলতি বছর ৬০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অধিকন্তু ক্রেমলিনের লক্ষ্য হলো আঙ্কারার সাথে জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং তুরস্ককে একটি আঞ্চলিক গ্যাস কেন্দ্রে পরিণত করা, যদিও এরদোগান গ্যাসের ধারণাকে সমর্থন করেন- তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন একটি প্রকল্পের জন্য সবুজ সঙ্কেত দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটি করার জন্য ২০১৯ সালে গ্যাজপ্রমে (এধংঢ়ৎড়স) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেক্সি মিলার প্রথম তুর্কস্ট্রিম-২ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেন; তবে এটা ছাড়াও একটি নতুন পাইপলাইন যেটা ইইউ সদস্য বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির মধ্য দিয়ে যাবে। রাশিয়া যদি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকে, তাহলে এমন ফলাফল অবান্তর।

পুতিনের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা নেয়া সত্ত্বে¡ও এরদোগান ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য প্রভাব খাটাতে পারবেন বলে মনে হয় না। তিনি যা করতে পারেন তা হলো রাশিয়াকে জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য মধ্যস্থতা চালিয়ে যাওয়া এবং মস্কো ও কিয়েভকে শস্য ও অ্যামোনিয়া শিপমেন্ট বা চালানের চুক্তিতে পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারে। এমনকি বন্দী বিনিময় এবং যুদ্ধ বিরতির ব্যাপারেও কাজ করতে পারে।

তারপরও সব থেকে বড় প্রশ্ন হলো- এরদোগানর জন্য এতে কী আছে? একটি সম্ভাব্য উত্তর হলো অভ্যন্তরীণ সহায়তা। ২০২৩ সালের জুনে তুরস্কের সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এরদোগান বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে তার রেকর্ড শক্তিশালী করার দিকে তাকাতে পারেন- যাতে তুরস্কের জনগণকে এটা বোঝাতে সক্ষম হন যে, তার নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক।

কারণ যা-ই হোক না কেন, বাস্তবতা হলো তুরস্ক-রাশিয়া সম্পর্কের এই পর্যায়ে শুধু একজন নেতাই গুলি চালাচ্ছেন, যা এরদোগানকে একটি ঈর্ষণীয় অবস্থানে নিয়ে গেছে। কিভাবে তিনি এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান, যাতে আগামী বছরগুলোতে এই অঞ্চলটিকে নতুন আকার দিতে তথা পুনর্গঠিত করতে পারে?
লেখক : সার্বিয়ার একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
এশিয়া টাইমসের সৌজন্যে, ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ


premium cement