২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

বিজ্ঞান চর্চায় মুসলমানরা পিছিয়ে কেন?

বিজ্ঞান চর্চায় মুসলমানরা পিছিয়ে কেন? - ছবি : সংগৃহীত

প্রথম কথা হলো, মুসলিম দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৪৯৮টি। অপরদিকে শুধু আমেরিকাতেই এর সংখ্যা ৫৭৫৪টি, আমাদের প্রধান প্রতিবেশী দেশ ভারতে আমেরিকার চেয়ে বেশি ৮৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ডেইলি টাইমসের এক জরিপ থেকে জানা যায়, পাকিস্তানে বর্তমানে ২৮৫টি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দল নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দলের প্রধান আগ্রহ ‘লড়াইয়ের’ প্রতি!

মুসলিম দেশগুলোর জনগণের শিক্ষার মোট হার শতকরা ২৫ থেকে ২৮ ভাগ। কোনো কোনো মুসলিম দেশের শিক্ষার হার শতকরা মাত্র ১০ ভাগ! এ ধরনের দেশের সংখ্যা ২৫-এর কাছাকাছি। বিশ্বের কোনো মুসলিম দেশের শিক্ষার হার শতভাগে উত্তীর্ণ নয়!

এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমানে ৭৬টি মুসলিম দেশ ওআইসির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আছে। এসব দেশের মাত্র ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে স্থান করে নেয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। অপরদিকে আমেরিকায় ছয় হাজার, জাপানে এক হাজার এবং ভারতে ৮৫০০টি সরকারি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে পুরো পৃথিবীতে ইহুদি জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ। মুসলমানদের সংখ্যা একশত ১৫ কোটি। অর্থাৎ একজন ইহুদি একশত মুসলমানের সমান-সমান। অন্যভাবে বললে, একজন ইহুদি একশত মুসলমানের ওপর চেপে বসেছে! বিগত ১০০ বছরে ৭১ জন ইহুদি গবেষণা-আবিষ্কার, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও সাহিত্য বিভাগে অবদান রাখার কারণে বিশ্বখ্যাত নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে। বিপরীতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মাত্র তিনজন মুসলমান!

আরো আশ্চর্যের বিষয়, সৌদি আরবের বিশ্বখ্যাত সংস্থা ‘কিং ফয়সাল ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে ঘোষিত আন্তর্জাতিক মানের ‘কিং ফয়সাল অ্যাওয়ার্ড’-এর চিকিৎসা, গবেষণা ও সাহিত্য বিভাগের জন্য একজনও এমন আগ্রহী মুসলমানকে পাওয়া যায়নি, যিনি পুরস্কার প্রাপ্তির শর্ত পূরণ করতে পেরেছেন!

উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম, পুরো দুনিয়ার সমস্ত মুসলমানদের জন্য কি একথা লজ্জাজনক নয়? মাত্র দেড় কোটি ইহুদি সবক্ষেত্রে মুসলমানদের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে রয়েছে, মুসলমানদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে! ২২টি আরব দেশের সমস্ত জনগণ একত্রিত হয়েও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, চিকিৎসা-গবেষণা এবং সমরনীতিতে ইসরাইলের সাথে টেক্কা দিতে পারছে না! অথচ এক শ’ ১৫ কোটি মুসলমান ব্যস্ত আছে নিজেদের ভেতরগত মতবিরোধ নিয়ে!

আমার প্রশ্ন হলো, পশ্চিমাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যতীত কি মসজিদে হারামে ৩০ লাখ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে সক্ষম হত! পবিত্র হারাম শরিফে বিদ্যুতের আধুনিক পদ্ধতি, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, এসব কি বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অবদান নয়! পশ্চিমা বিধর্মী বিজ্ঞানীদের অবদানেই এসব পদ্ধতি সহজ হয়েছে। হারাম শরিফের বিশাল লিফট, অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, যার মাধ্যমে হারাম শরিফের বাইরের বড়-বড় টাওয়ারে পবিত্র কাবার ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আওয়াজ পৌঁছে যায়, এসবের কোনোটিই কি ‘মুসলমানদের’ আবিষ্কার?

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা সফলতায় মুসলমানদের সাফল্য মাত্র ৭ ভাগ। ৭ম শতাব্দীতে মুসলমানদের ওপর তাতারিদের নৃশংস ও বর্বর আক্রমণের পর আমাদের পক্ষ থেকে ভয়াবহ ভুল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। আমরা ধর্মীয় শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলাম! সেখান থেকেই আধুনিক শিক্ষা অন্যদের হাতে চলে গেছে। বিশেষত বিজ্ঞান-আবিষ্কারের ময়দানে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় আমরা ৭০০ বছর পেছনে রয়ে গেছি!

স্পেনে মুসলমানরা ৮০০ বছর শাসন করার পরও আজ সেখানে গ্রানাডা-কর্ডোভার ধ্বংস চিহ্ন ও আল-হামরা প্রাসাদের স্মৃতি চিহ্ন ব্যতীত ইসলামের অনুসারী ও ইসলামী সংস্কৃতির কোনো নমুনা খুঁজে পাওয়া যায় না। একই অবস্থা দক্ষিণের ‘সোনার পাখি’ হিন্দুস্তানের। এখানেও তাজমহল, কুতুব মিনার, লাল কেল্লা ও জামে মসজিদ ইত্যাদি ব্যতীত মুসলমানদের হাজার বছরের রাজত্ব ও ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির কোনো নিদর্শন উপস্থিত নেই!

জ্ঞান-বিজ্ঞান জগতে মুসলমানদের দ্রুত অবনতি শুরু হয় ১৩৫০ সালের পর থেকে। মুসলমান শাসকদের একটি চরম ত্রুটি ছিল- তারা শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি কোনো গুরুত্ব প্রদান করেননি। স্কুল-মাদরাসা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তারা অমুসলিম শাসকদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিলেন। মুসলিম জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তুলতে যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক ছিল, তার সামান্যও তারা দেননি।

অপরদিকে ইহুদি, খ্রিস্টান, ইউনানসহ অন্যান্য জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে থেকেছে। পরবর্তীকালে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য ও প্রসিদ্ধ বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। হিন্দুস্তানের মোঘল, ইরানের সুফি বা তুরস্কের ওসমানিয়া- সব শাসকই একইভাবে অসচেতনতার পরিচয় দিয়েছে। মুসলমানরা আজও জ্ঞান-বিজ্ঞান; বিশেষকরে প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।

প্রশ্ন হলো, ইসলামী বিশ্ব থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিক শিক্ষা-গবেষণা কেন হারিয়ে গেল? মুসলমানরা কেন এই আধুনিক প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হচ্ছে না? বিস্তারিত আলাপে না গিয়ে শুধু এতটুকু বলতে চাই, জ্ঞান-গবেষণার দরজায় যিনি ধাক্কা দেবেন, তার জন্যই জ্ঞান-গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণা-প্রযুক্তির দরজা আছে, তবে মুসলমানরা তাতে ধাক্কা দিচ্ছে না!

-ডেইলি জং থেকে আমিরুল ইসলাম লুকমানের অনুবাদ


আরো সংবাদ


premium cement