০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

বিশ্ব শিশু দিবসে ভাবনা

-

প্রতি বছর বিভিন্ন দিনে বিশ্বব্যাপী জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা ‘দিবস’ পালিত হয়। এসব দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো- সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি বা ক্ষেত্র বিশেষে কোনো অতীত ঘটনার স্মরণ বা উদ্যাপন।

অন্যান্য দিবসের মতো বৈশ্বিক ও জাতীয় শিশু দিবসও বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালিত হয়। বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয়েছে গত ২০ নভেম্বর। বিশ্বজুড়ে শিশুদের অধিকার সুনিশ্চিত করতেই দিবসটি পালন করা হয়। এবারে দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শিশুদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তকরণ নীতি’। যাতে শিশুরা আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে সমানভাবে তাদের অধিকারের চর্চা করতে পারে।
বিশ্ব শিশু দিবসের সূচনা যেভাবে : শিশু অধিকারের গুরুত্ব প্রথমে বুঝেছিলেন ড. চার্লস লিওনার্দো ১৮৫৭ সালে। তখন তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের চেলসিয়ার ইউনিভার্সাল চার্চের যাজক। জুনের দ্বিতীয় রোববার শিশুদের যত্নের জন্য দিনটি বিশেষভাবে নির্ধারণ করেছিলেন তিনি। লিওনার্দো দিনটির নাম দিয়েছিলেন রোজ ডে বা গোলাপের দিন। পরে দিনটি ফ্লাওয়ার সানডে বা ফুলেল রোববার নামে পরিচিতি পায়।

আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম শিশু দিবস পালনের কৃতিত্ব তুরস্কের। তুরস্কের ইসলামী খিলাফতের শেষ দিকে ১৯২০ সাল থেকে রীতিমতো ছুটি দিয়ে তুরস্কে ২৩ এপ্রিল শিশু দিবস পালন করা হতো। আন্তর্জাতিকভাবে শিশু দিবসের ঘোষণা সামনে আসে ১৯২৫ সালে জেনেভায় বিশ্ব সম্মেলনে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। অনেক শিশু অনাথ-এতিম হয়ে পড়ে। এসব অনাথ শিশুদের নিয়ে ভাবনা-চিন্তার উন্মেষ ঘটার পর ১৯২৪ সালে জাতিসংঘ ঘোষণা দেয়, ‘মানবজাতির সর্বোত্তম যা কিছু দেয়ার আছে, শিশুরাই তা পাওয়ার যোগ্য।’

১৯৪৯ সালের ৪ নভেম্বর রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত ওমেন্স ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফেডারেশনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১ জুনকে বিশ্ব শিশু দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৫০ সাল থেকে অনেক কমিউনিস্ট ও সাম্যবাদী দেশে ওই দিন শিশু দিবস পালন শুরু হয়। ১৯৫৪ সালে প্রথম জাতিসঙ্ঘ শিশু দিবস পালন করা শুরু করে। জাতিসঙ্ঘ ঘোষণা অনুযায়ী ২০ নভেম্বর বিশ্ব শিশু দিবস পালন করা হয়। এ ছাড়া ১১ অক্টোবর সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়।

১৯৫৯ সালে এই দিনে জাতিসঙ্ঘ কনভেনশন অন রাইট অব দ্য চাইল্ড প্রতিষ্ঠা করে। শুধু একটি দিন শিশুদের জন্য পালন করা হয় তা নয়। শিশুদের নানা ব্যাপারে বিশ্বকে সচেতন করার জন্য ১৪ থেকে ২০ নভেম্বর শিশু সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে।

শিশু অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনেক উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থাগুলো হলো, ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সেভ দ্য চিলড্রেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশে আছে ঢাকা আহসানিয়া মিশন, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামসহ বিভিন্ন শিশু সংগঠন ও সংস্থা।

প্রতিটি শিশুই অপার সম্ভাবনার অধিকারী। আজ যারা শিশু, কাল তারাই বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। তাই শিশুদের নিয়ে আমাদের ভাবনার অন্ত নেই।

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। জাতীয়ভাবে দিনটি ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

শিশুদের অধিকার সবার আগের বিবেচ্য বিষয় : জাতিসঙ্ঘের ১৯৮৯ সালের গৃহীত শিশু অধিকার সনদে শিশুদের কল্যাণের বিষয়টি সর্বোচ্চ বিবেচনায় এনে আইন প্রণয়ন করার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এমনকি জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৬ দশমিক ২ ধারায় স্পষ্টভাবে শিশুদের শোষণ, নির্যাতন, পাচার ও শিশুদের বিরুদ্ধে সব নিপীড়ন বন্ধকরণ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া আছে।

সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা হলো একজন শিশুর মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এ জন্য বাবা-মার অন্যতম দায়িত্ব হলো শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা। পৃথিবীর প্রত্যেক শিশু যেন ন্যূনতম স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবারই। এজন্য শিশুদের সুযোগ দিতে হবে নানা ক্ষেত্রে। এমনকি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজেও। তাতে শিশু যেমন নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে বুঝতে পারবে, তেমনি সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধের জায়গাও তৈরি হবে।

মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে অসহায় হচ্ছে শিশুরা। বড় হয়ে ওঠার জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় বড়দের ওপর। যেকোনো দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। তার ওপর রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি বড়দের দায়িত্বশীলতার ঘাটতি, যথাযথ মনোযোগ ও পরিচর্যার অভাব।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুদের প্রতি অবহেলা একটু বেশিই। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত কিংবা যুদ্ধকালে শিশুদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যে ভুল পথে পরিচালিত হয়, সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন এবং সোমালিয়ার দুর্দশাগ্রস্ত শিশুদের কান্না বিশ্বের মানবতাকামী মানুষকে কাঁদাচ্ছে।

মহামারীর ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার শিশুরা। এতে বেড়ে গেছে শিশু নির্যাতন, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, অপুষ্টি। এজন্য শিশু অধিকার ও সুরক্ষায় প্রত্যেকের অবস্থান থেকে নজর দেয়া জরুরি। এর পাশাপাশি সাংবিধানিক অঙ্গীকার অনুযায়ী সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ এবং আনন্দময় পরিবেশে শিশুকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী শিক্ষায় গড়ে তোলাও জরুরি।

ভূমিষ্ঠ হবার আগেই শিশুর যত্ন নিশ্চিত শুরু করা : আক্ষরিক অর্থে শিশুর জন্ম ভূমিষ্ঠ হওয়াকে বোঝালেও প্রকৃতপক্ষে শিশুর জন্ম শুরু হয় ভূমিষ্ঠ হওয়ার ২৮০ দিন আগে মাতৃগর্ভে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে ভ্রুণসঞ্চারের মাধ্যমে। সুস্থ-স্বাভাবিক শিশুর জন্ম হতে মাতৃগর্ভে থাকার সময় থেকেই শিশু ও মায়ের যত্ন নিতে হবে। যেহেতু গর্ভস্থ শিশুর পুরো পুষ্টিই মায়ের কাছ থেকে পেয়ে থাকে, সেহেতু গর্ভাবস্থায় শিশুর যত্ন মানে গর্ভবতী মায়ের যত্ন।

গর্ভাবস্থায় মায়ের যত্ন না হলে ‘কম ওজনের শিশু’ বা ‘অপরিণত শিশুর’ জন্ম হয়, যারা পরবর্তীকালে সহজেই নানারকম অসুখে আক্রান্ত হয় এবং কখনোই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় না। ফলে এসব বিকলাঙ্গ ও মানসিকভাবে পঙ্গু শিশু পরিবার, সমাজ ও জাতির কাছে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তাই গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসের মধ্যে মাকে বিশেষ বিশেষ ওষুধ দেয়া, তার খাবার ও অন্যান্য যত্নের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর স্তন্য পান করাবে। পিতার দায়িত্ব যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই সব মা-বাবাকে সতর্ক করেছেন, যারা সন্তানের যত্ন নেয় না। তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার পোষ্যদের ক্ষতি সাধন করে।’ (রিয়াজুস সালিহিন)।

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় ঘুম অত্যাবশ্যক। যথেষ্ট পরিমাণ ঘুম না হলে মানুষ কাজ করার শক্তি পায় না। শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম ও বিশ্রাম বড়দের চেয়েও বেশি প্রয়োজন। শিশুদের ঘুমের সময় বেশি হতে হবে। দিনে ১০-১২ ঘণ্টার মতো ঘুম না হলে শিশুদের জন্য খুব ক্ষতিকর। অনেক শিশু মা-বাবার সাথে রাত ১টা-২টা পর্যন্ত জেগে থাকে। এটা খুবই অস্বাস্থ্যকর। তাই শিশুকে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস করানো শিশু স্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যক। এটা শুধু বললেই হবে না, আগে আপনার নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। শিশুকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বিছানায় যান। বিছানায় যাওয়ার আগে ল্যাপটপ, ট্যাবে গান বা সিনেমা দেখানো ঠিক নয়। এতে শিশুর ঘুমের সমস্যা হয়।

আজকাল অধিকাংশ মায়ের অভিযোগ, তার সন্তান খায় না। মায়েরা এই একটা বিষয়ে খুব সচেতন। কিন্তু চাপাচাপি করে খেতে বাধ্য করা হলে খাবারের প্রতি শিশুর অনীহা জন্মে। তাকে তার পছন্দ ও সময়মতো খেতে দিন। ক্ষুধা লাগলে সে এমনিতেই খাবে, চেয়ে নিয়ে খাবে।

ফাস্টফুড নয় : আমরা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ফাস্টফুডের সঙ্গে পরিচিত করি। কারণ, আমরা তা না হলে তো চলতে পারি না। ফাস্টফুড শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। বর্তমানে মুটিয়ে যাওয়া বিশ্বব্যাপী বড় সমস্যা। স্থূলো শিশুরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। অল্প বয়সেই নানা রোগে ভোগে। ফাস্টফুড খেতে দেবেন না। শিশুদের আদর্শ খাবার হলো ঘরে তৈরি রান্না করা নিজ হাতের খাবার।
খেলাধুলা শিশুর বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক : বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা খেলতে দিতে হবে। তবে সে খেলা কম্পিউটার বা মোবাইলে নয়, সেটা হতে হবে খোলা মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড়ঝাঁপ করা, পানিতে সাঁতরানো। এটা শিশুর শরীর গঠনে খুব দরকারি। একজন তিন চার বছর বয়সী শিশু যখন অনেক বেশি লাফালাফি করে তখন অনেক অভিভাবক থামিয়ে দেয় এই ভেবে যে শিশু ক্লান্ত হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে প্রকৃতিগত বৈজ্ঞানিক বিষয় হলো এই যে, শিশুরা যখন দৌড়াদৌড়ি করে তখন রক্তের ক্যালসিয়াম ঢুকে পড়ে হাড়ের ভিতর যা হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতএব শিশুদের তাদের মতো খেলতে দেয়া উচিত। তবে তা হতে হবে বড়দের উপস্থিতিতে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য : ম্যারি এমিং ইয়াং তার জনপ্রিয় বই- ‘ফ্রম আরলি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট টু হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’-এ খুব জোর দিয়ে বলেছেন যে, তিন থেকে আট বছর বয়সী শিশুদের মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতার বিকাশ তার পরবর্তী জীবনের ব্যক্তিত্বের বিকাশ, কোনো বিষয়ের সম্যক জ্ঞান লাভ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের সক্ষমতা অর্জন, সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। তাই শিশুদের এ স্টেজটা খুবই চ্যালেঞ্জিং।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৫ ভাগই শিশু। বিশ্বে অধিকারবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা একশত কোটিরও বেশি। আর প্রতি বছর অপুষ্টিতে ভুগে অকালে মারা যায় প্রায় তিন লাখ শিশু।

বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি শিশু-কিশোর রয়েছে (৪০ শতাংশ)। এদের সবার জন্য মৌলিক অধিকারগুলোও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত।
আজকাল পত্রিকা পড়লে মনে হয়, শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ সহিংসতা। আমরা এমনই দানবে পরিণত হয়েছি যে, প্রায়ই তুচ্ছ কারণে শিশুদের হত্যা করছি। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা সহিংসতার শিকার হয় বেশি। এ থেকে তাদের রক্ষা করতে হবে। শিশুদের সহিংসতার বিচারের জন্য দ্রুত ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করতে হবে। মা-বাবাকে সচেতন থাকতে হবে।

লেখক : স্বাস্থ্যবিষয়ক নিবন্ধকার ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ


premium cement