২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

প্রিয় নবীর আগমনে খুশির জোয়ার


ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে নবী! আপনি বলুন, মুসলমানরা আল্লাহর ফজল ও রহমত পাওয়ার কারণে যেন নির্মল খুশি ও আনন্দোৎসব করে। এটি তাদের যাবতীয় সঞ্চিত সম্পদ থেকে উত্তম।’ ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুফাসসির হজরত ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ফজল ও রহমত বলতে নবী করিম সা:-কেই বোঝানো হয়েছে। সুতরাং নেয়ামতপ্রাপ্তি উপলক্ষে শুকরিয়া আদায়ের জন্য বিভিন্ন বৈধ অনুষ্ঠান করাই কুরআনের নির্দেশ। (তাফসিরে রুহুল মায়ানি, সূরা ইউনুস, আয়াত-৫৮)। রাসূলুল্লাহ সা: স্বীয় জন্মদিনের ব্যাপারে খুব খুশি ছিলেন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য প্রতি সোমবার রোজা রাখতেন। এ প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘সে দিন আমার জন্ম হয়েছে, আমি নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি এবং আমার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।’ রোজা রাখা একধরনের ইবাদত; সুতরাং যেকোনো ধরনের ইবাদত পালন করে এই দিনকে উদযাপন করা যায়। কেউ রোজা রাখতেও পারেন, আবার মিলাদের মাহফিল (নবীজীর জীবনী আলোচনা) করতেও পারেন; কেননা এগুলোর সবই ইবাদত। সুতরাং আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উদযাপন রাসূলুল্লাহর সুন্নাত।

আনন্দিত হওয়ার সুফল : ইমাম ইবনে হাজর আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইমাম সুহাইলি আলাইহির রাহমাহ থেকে বর্ণনা করেন- হজরত আব্বাস রা: বলেন, আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে দেখেছি যে, সে খুব খারাপ অবস্থায় আছে। অতঃপর সে বলল, তোমাদের ছেড়ে আসার পর আমি কোনো শান্তি পাইনি; তবে প্রতি সোমবার আমার শাস্তি কিছুটা কমানো হয়। (ইমাম সুহাইলি বলেন) কারণ, রাসূলুল্লাহ সা: সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন আর আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবা রাসূলুল্লাহর জন্মগ্রহণের সুসংবাদ আবু লাহাবকে দিলে সে তাকে আনন্দিত হয়ে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেয়।’ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনুজ জাজরি ও শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এ হাদিস ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনকারী ও এর জন্য সম্পদ ব্যয়কারীদের প্রতিদান প্রাপ্তির প্রমাণ। আবু লাহাব, যার নিন্দায় কুরআনের একটি সূরা (লাহাব) অবতীর্ণ হয়েছে, সে যদি রাসূলুল্লাহ সা:-এর জন্মের ওপর খুশি হয়ে তার দাসীকে (সুয়াইবা) স্বাধীন করে দেয়ার কারণে শাস্তি কম ভোগ করে, তাহলে সে মুসলিমের কী অবস্থা হবে, যে রাসূলুল্লাহর ভালোবাসা নিয়ে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন করে এবং ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনে সম্পদ ব্যয় করে? তবে মন্দ বিদয়াত যেমন- নাচ, গান, হারাম বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা উচিত; কেননা এগুলোর কারণে (মিলাদুন্নবী উদযাপনের) বরকত পাওয়া যাবে না।

পানাহারের আয়োজন করা যাবে কি? হজরত আনাস রা: বর্ণনা করেন, নবুয়ত প্রকাশের পর রাসূলুল্লাহ সা: নিজেই নিজের আকিকা করেছেন। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ুতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব নবীজীর জন্মের সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহর আকিকা করেছেন। অথচ আকিকা দু’বার হয় না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সা: দ্বিতীয়বার যে আকিকা করেছেন, তা ছিল আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে। কেননা, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ এবং উম্মতের কাছে সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সা: আল্লাহর শোকরিয়া জ্ঞাপনার্থে নিজের ওপর দরুদ শরিফও পাঠ করতেন। অতএব রাসূলুল্লাহর জন্ম উপলক্ষে মুসলিম ভাইদের একত্রিত করার মাধ্যমে খানা খাওয়ানো, অন্যান্য ইবাদত পালন ও ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া জানানো আমাদের জন্যও মুস্তাহাব।

সাহাবিরা মিলাদুন্নবী পালন করেছেন কী-
১. নবী করিম সা: নবুয়ত পরবর্তীকালে নিজেই সাহাবিদের নিয়ে নিজের মিলাদ সম্পর্কে আলোকপাত (তথা মিলাদুন্নবীর মাহফিল) করেছেন। হজরত ইরবাজ ইবনে ছারিয়া রা: একদিন রাসূল সা:-কে তাঁর মিলাদ তথা আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করার জন্য আরজ করলে রাসূলে করিম সা: ইরশাদ করেন, ‘আমি তখনো নবী ছিলাম- যখন আদম আলাইহিস সালামের দেহের উপাদান- মাটি ও পানি পৃথক অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ আদম নবীর সৃষ্টির আগেই আমি নবী হিসেবে মনোনীত ছিলাম। আমাকে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার বরকতে তাঁর বংশে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং আমি তাঁর দোয়ার ফসল। হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর উম্মতের কাছে আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁরা উভয়েই আমার সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। আমার জননী মা আমেনা আমার প্রসবকালীন সময়ে যে নূর তাঁর গর্ভ থেকে প্রকাশ পেয়ে সুদূর সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করতে দেখেছিলেন, আমিই সেই নূর।

২. একদিন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: নিজ গৃহে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন। উপস্থিত সাহাবিদের কাছে নবী করিম সা:-এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত ঘটনাবলি বর্ণনা করছিলেন। শ্রোতামণ্ডলী শুনতে শুনতে মিলাদুন্নবীর আনন্দ উপভোগ করছিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজীর দরুদ পড়ছিলেন। এমন সময় রাসূলে করিম সা: সেখানে উপস্থিত হয়ে ইরশাদ করলেন, ‘তোমাদের সবার প্রতি আমার সুপারিশ ও শাফায়াত অবধারিত হয়ে গেল।’ সুবহান আল্লাহ!

৩. সাহাবি কবি হজরত হাসসান বিন সাবিত রা: দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নবী করিম সা:-এর উপস্থিতিতে তাঁর গৌরবগাথা পেশ করতেন এবং অন্যান্য সাহাবি সমবেত হয়ে তা শ্রবণ করতেন, যা শুনে মুগ্ধ হয়ে নবীজী তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন।

মিলাদুন্নবী ও সিরাতুন্নবী : মিলাদুন্নবী ও সিরাতুন্নবী হলো ব্যাপক আলোচিত শব্দ। শাব্দিক অর্থে মিলাদুন্নবী দ্বারা নবী করিম সা:-এর শুভাগমন ও সিরাতুন্নবী দ্বারা রাসূলে আরবির চরিত্র বোঝালেও ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় উভয় শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত। ইমাম নাসাফি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জিহাদ তথা যুদ্ধের কর্মপদ্ধতির নাম হলো সিরাত। তাই সিরাতুন্নবী নবী করিম সা:-এর আট বছরে যুদ্ধ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত; নবীজীর জিহাদি জিন্দেগির অংশের নাম। (হিদায়া, কাওয়াঈদুল ফিকহ) পক্ষান্তরে মিলাদুন্নবী হলো রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদি বৃত্তান্তের নাম। নবী করিম সা:-এর নূর জগতের সৃষ্টি থেকে শুরু করে নূরানি জগতে লাখ লাখ বছর বিচরণ, তারপর দুনিয়ার বুকে শুভাগমন ও দুধপান করার অবস্থা থেকে ৬৩ বছর নূরানি জাহেরি হায়াতে তৈয়বার প্রতিটি বিষয় আলোচনায় স্থান পায় মিলাদুন্নবীর মাহফিলে বা অনুষ্ঠানে। কোনো কোনো কুচক্রী মহল মিলাদুন্নবীর বিশাল আয়োজন সহ্য করতে না পেরে ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বরকতময় ঈদে মিলাদুন্নবী সা:-এর নূরানি মাহফিল থেকে মুসলমানদের দূরে সরানোর অপচেষ্টা হিসেবে সিরাতুন্নবী মাহফিলের অবতারণা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো- নবীপ্রেমিক মুমিনদের সাথে ঈদে মিলাদুন্নবীর সাথে সংঘর্ষ ও বিরোধিতা করা এবং মিলাদুন্নবী সা:-এর প্রতি আঘাত ও কটূক্তি করা। এ প্রসঙ্গে মুফতি আমিমুল ইহসান বরকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, শাব্দিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিরাত বলতে ভালো-মন্দ উভয় চরিত্র বোঝায়। বস্তুত নবী করিম সা: অনুপম চরিত্রে মন্দের লেশমাত্রও নেই। তাই সিরাতুন্নবী শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। তদুপরি সিরাতুন্নবী মাহফিল নামে কোনো অনুষ্ঠান অতীত যুগে ছিল না। তাই নব্য বিদয়াত। যুগ যুগ ধরে বিশ্বের মুসলমানরা রবিউল আওয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী সা: নামে নবীজীর শুভাগমনকে অতি ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে পালন করে আসছেন। ইসলামী শরিয়তের মুফতিরা বিশেষত মক্কা-মদিনার ৯০ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম ১২৮৬ হিজরিতে এটিকে বরকতময় ও মুস্তাহাব হিসেবে চূড়ান্ত ফায়সালা দিয়ে নিম্নোক্ত ফতোয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করেছেন। ‘হে মুসলমানগণ! আপনারা জেনে রাখুন যে, মিলাদুন্নবী সা:-এর আলোচনা ও তাঁর সমস্ত শান-মান বর্ণনা করা ও ওই মাহফিলে উপস্থিত হওয়া সবই সুন্নাত।’

বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশে এ দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করা হচ্ছে। আর এর বিপরীত কিছু করা আসলে মিলাদুন্নবীকে অস্বীকার করার নামান্তর।

লেখক : শিক্ষক


আরো সংবাদ


premium cement