০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

শিক্ষক দিবস ও শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা

শিক্ষক দিবস ও শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা - ছবি : সংগৃহীত

শিক্ষক দিবস হলো শিক্ষকদের সম্মানে পালিত একটি বিশেষ দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন দিনে এ দিবস পালন করে। ভারত ১৯৬২ সাল থেকে দেশের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর, আর্জেন্টিনা ১১ সেপ্টেম্বর, ব্রুনাই ২৩ সেপ্টেম্বর ও ভুটান ২ মে, শিক্ষক দিবস পালন করে। ভিন্ন ভিন্ন দিনে শিক্ষক দিবস পালনের বিভিন্ন কারণ আছে।

ব্রুনাইয়ের ২৮তম শাসক ওমর আলী সাইফ উদ্দীন নামমাত্র বেতনে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেন বলে তার জন্মদিন সে দেশে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। ভুটানে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার জন্য তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াংচুকের জন্ম দিন ২ মে দেশটি শিক্ষক দিবস পালন করে থাকে। স্বাধীনতার পর বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলভুক্ত করায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মদিন ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশে কোনো কোনো শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক দিবস পালন করে থাকে। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় শতাধিক রাষ্ট্র ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করে আসছে।

বিশ্ব শিক্ষক সংঘ তথা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের ক্রমাগত প্রচেষ্টায় ও ইউনেস্কো-আইএলওর সদিচ্ছায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সরকার সম্মেলনে শিক্ষকের অধিকার, কর্তব্য ও মর্যাদা-বিষয়ক সনদ ইউনেস্কো-আইএলও সুপারিশ ১৯৬৬ প্রণীত হয়। সে জন্য ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে সংস্থার তৎকালীন মহাপরিচালক ফ্রেডারিক এম মেয়র এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের অনুরোধে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল গঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। এটি বেলজিয়ামভিত্তিক একটি শিক্ষাসংক্রান্ত সংস্থা।

এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে থাকে। এ বছর এই দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- The Transformation of education begins with teachers. এর বাংলা অর্থ হলো, শিক্ষার রূপান্তর শুরু হয় শিক্ষকদের দিয়ে। অন্য কথায়, শিক্ষকদের দিয়ে শিক্ষার পরিবর্তন শুরু হয়। এই প্রতিপাদ্যটি শতভাগ যথার্থ। কিন্তু শিক্ষার পরিবর্তন শিক্ষকদের দিয়ে শুরু করতে হলে শিক্ষকের মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষকের মানের উন্নতির জন্য প্রয়োজন উন্নত নিয়োগ প্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদান, পদোন্নতি প্রভৃতি। ২০০৫ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৮ সাল থেকে এর আরো উন্নত সংশোধনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ চলছে। ফলে বেসরকারি সেক্টর মানসম্মত শিক্ষক পেতে শুরু করছে। তাছাড়া আগে থেকে শিক্ষকের মান উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে বেসরকারি শিক্ষা সেক্টর পর্যায়ক্রমে মানসম্মত হচ্ছে। কিন্তু এখন প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষাক্রম, শিক্ষকদের অর্থনৈতিক সুবিধা ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।

আগামী বছর থেকে শুরু হচ্ছে নতুন শিক্ষাক্রম। এটি ‘শিক্ষাক্রম-২০২২’ নামে পরিচিত। কোভিড-১৯-এর কারণে যথাসময়ে শিক্ষাক্রম চালু করা যায়নি। নতুন শিক্ষাক্রমে গাঠনিক মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গাঠনিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের ২০ শতাংশ জ্ঞান দান করতে পারে।

শিক্ষক্রম-২০২২ এ বিভিন্ন শ্রেণীতে গাঠনিক মূল্যায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ধারাবাহিক (গাঠনিক) মূল্যায়নের নির্দেশনা রয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীতে ৭০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষভিত্তিক (গাঠনিক) মূল্যায়ন ও ৩০ শতাংশ বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে (সামষ্টিক মূল্যায়ন) মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে যথাক্রমে ৬০ ও ৪০ শতাংশ গাঠনিক মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। দশম শ্রেণীতে উভয় ধরনের মূল্যায়ন সমান অর্থাৎ ৫০ শতাংশ করে রাখা হয়েছে। অন্য দিকে, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে গাঠনিক মূল্যায়ন ৩০ শতাংশ আর সামষ্টিক মূল্যায়ন ৭০ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে গাঠনিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিলেও উপরের শ্রেণীগুলোতে পর্যায়ক্রমে সামষ্টিক মূল্যায়নের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীর জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য মূলত সামষ্টিক মূল্যায়ন উত্তম ব্যবস্থা। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষক সমাজ মনে করে, নতুন শিক্ষাক্রমে সংশোধন আনা প্রয়োজন।

বর্তমানে বেসরকারি কলেজগুলোতে সরকার থেকে ‘সহকারী অধ্যাপক’ পর্যন্ত পদোন্নতির ব্যবস্থা রয়েছে এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ‘অধ্যাপক’ পদ পর্যন্ত পদোন্নতির ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ সরকার সহকারী অধ্যাপকের বেতন বহন করে আর সে সব কলেজ শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বেতন বহন করতে সক্ষম তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন স্বপদে দিতে পারে। অন্যরা যথাযথ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত হয়। শিক্ষক সমাজ আজকের এই দিনটিতে প্রত্যাশা করে, সরকার থেকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে পদোন্নতির সুযোগ সষ্টির ঘোষণা আসবে।

প্রতি বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষক সমাজ কিছু প্রত্যাশা করে ক্ষমতাসীনদের কাছে। বাংলাদেশে এই দিবসে শিক্ষকদের প্রত্যাশা হলো চাকরি জাতীয়করণ। চাকরি জাতীয়করণ করলে শিক্ষকদের অধিকার আদায় হবে, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা পাবে, শিক্ষকরা কর্তব্যপরায়ণ হবেন। তাতে করে ইউনেস্কো-আইএলও সুপারিশ ১৯৬৬ বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ বেশ বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মোকাবেলা করে যাচ্ছে। তাই জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য নিম্নের কিছু প্রস্তাব বিবেচনার দাবি রাখে। প্রস্তাবগুলো হলো-

১. স্নাতক (পাস-অনার্স) থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষের বেতন কোড ০৪ ও উপাধ্যক্ষের বেতন কোড-০৫, সে সব প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষের বেতন কোড-০৩ ও উপাধ্যক্ষের বেতন কোড-০৪ এ উন্নীত করতে হবে।

২. থানাভিত্তিক এ ধরনের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষকের একটি নির্দিষ্ট হারে একই পর্যায়ের
শিক্ষকতায় মোট ২২ বছর ও ২০ বছরের প্রকৃত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষকদের অধ্যাপক বেতন কোড-০৪ এবং সহযোগী অধ্যাপক বেতন কোড-০৫ দিতে হবে। যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন শ্রেণী কার্যক্রম চলছে সেখানে শিক্ষকদের শ্রেণী বক্তৃতা পর্যবেক্ষণ করে (কতক্ষণ বক্তৃতা দিতে সক্ষম, বক্তৃতার মান, বক্তৃতা দেয়ার কৃত্রিমতা পরিহার করা, স্বাভাবিক থাকা প্রভৃতি যাচাই করে) প্রকৃত অভিজ্ঞ শিক্ষক বাছাই করা যাবে। আর যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা নেই সেখানে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে তা করতে হবে। এই প্রবন্ধে থানাভিত্তিক ১০ শতাংশ শিক্ষককে অধ্যাপক ও ১০ শতাংশ শিক্ষককে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রস্তাব করা হলো; যা এমপিওভুক্ত স্নাতক (পাস), স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর কলেজে সীমাবদ্ধ থাকবে।

৩. প্রতিষ্ঠানপ্রধান হওয়ার জন্য ২০ বছরের সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও ৫০ বছর বয়স হওয়ার বিধান চালু করতে হবে।
৪. বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. সর্বশেষ বেতন স্কেলের ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া দিতে হবে।
৬. সর্বশেষ বেতন স্কেলের ২০ শতাংশ চিকিৎসাভাতা দিতে হবে।
৭. মহানগরের জীবনযাপন ব্যয় অধিক বলে মহানগর শিক্ষকদের সর্বশেষ বেতন স্কেলের একটি নির্দিষ্ট হারে মহানগর ভাতা দিতে হবে।

৮. বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরির নির্ধারিত প্রবেশ বয়স বাতিল করে অবসর বয়স গড় আয়ুর সমান অর্থাৎ ৭২ বছর করতে হবে। সব স্তরের শিক্ষক তথা শিক্ষাশ্রমিক ও সব প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার (যারা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন) ক্ষেত্রে গড় আয়ুর সমান অবসর বয়স নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে।

৯. কলেজ তথা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষকদের চাকরিতে প্রবেশ বেতন কোড-০৮ নির্ধারণ করতে হবে।
১০. মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নির্ধারিত অভিজ্ঞতা থাকা সাপেক্ষে ব্যাচেলর অব এডুকেশন সার্টিফিকেট জমা দিলে তাকে উচ্চতর স্কেল দিতে হবে।

আমরা আশা করি, ইউনেস্কো-আইএলওর সুপারিশ ১৯৬৬ আমাদের দেশে বাস্তবায়িত হবে। সে হিসাবে সরকার উল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে শিক্ষকদের ও শিক্ষার অগ্রগতিতে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

লেখক : প্রবন্ধকার ও শিক্ষা বিশ্লেষক
ইমেইল : kazimain@gamil.com


আরো সংবাদ


premium cement