৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

গণপরিবহন হিসেবে রেলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে

গণপরিবহন হিসেবে রেলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে - ছবি : সংগৃহীত

রেলের ব্যাপক উন্নয়ন চলছে। কেননা আধুনিক উন্নয়ন চিন্তার মূল বিষয়ই হচ্ছে শক্তিশালী ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে গণপরিবহন তো দূরে থাক, ন্যূনতম পরিবহন সুবিধাও মানুষ পাচ্ছে না। মানুষের পরিবহন দুর্ভোগের কথা লিখে শেষ করা যাবে না, নজিরবিহীন কষ্ট মানুষ ভোগ করে পরিবহনের জন্য। কাজেই মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে গণপরিবহনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সেটি সম্ভব রেল যোগাযোগ নিয়ে ব্যাপক পরিসরে চিন্তা করা ও রেলব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে।

কার্যত রেল যোগাযোগ ছাড়া দেশে পরিবহন সঙ্কট দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে আধুনিক যাতায়াতব্যবস্থা, যা সম্ভব রেলের মাধ্যমেই। কাজেই রেল নিয়ে ভাবতে হবে ব্যাপক পরিসরে, রেলের জন্য নিতে হবে মহাপরিকল্পনা।

উন্নত দেশগুলো রেল যোগাযোগ গড়ে তুলেছে যুগোপযোগী করে। রেলের উন্নয়নে তারা নিচ্ছে মহাপরিকল্পনা। আমাদের পাশের দেশ ভারতের রেল এক অভ‚তপূর্ব যাতায়াতমাধ্যম। সেখানে প্রতি বছর প্রায় ১৫ কোটি মানুষ রেলে ভ্রমণ করে। ভারতে রেল ভ্রমণ অত্যন্ত নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। সে তুলনায় বাংলাদেশের রেল কিছুই করতে পারেনি; বরং রেলের আরো অধঃপতন হয়েছে। সেই ব্রিটিশ আমলের অবকাঠামোও রেল ধরে রাখতে পারছে না। তা ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান ক্রমেই নিম্নমুখী।

যাত্রীরা পদে পদে এখানে বিড়ম্বনা ও হয়রানির শিকার হন। অনেকসময় যাত্রীদের হাতে সিট ও কোচ নম্বরসহ টিকিট থাকে; কিন্তু গাড়িতে সেই কোচ থাকে না। তা ছাড়া সময় মতো ট্রেন না ছাড়া, আসন বিড়ম্বনা, টয়লেটে পানি না থাকা, যাত্রায় সময় বেশি লাগা, জানালার সাটার না লাগা, বাথরুম অপরিষ্কার, ময়লা সিট, নোংরা পরিবেশ এ সব তো আছেই। এসব হয়েছে দীর্ঘ দিনের অবহেলার কারণে। লুটপাটের কারণে রেলের সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা, গাফিলতিও প্রকট আকারে বিদ্যমান। ফলে জনগণের এই বাহনটি ক্রমেই অজনপ্রিয় একটি বাহনে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে বছরের পর বছর রেল লোকসান দিচ্ছে, যা এক নজিরবিহীন ইতিহাস।

রেলকে অবহেলার চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতব্যবস্থা কেবল রেলের মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। তা ছাড়া এ দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ এখনো বাস করে দারিদ্র্যের মধ্যে। এই দরিদ্র মানুষগুলোর যোগাযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করাও অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী পরিবহনের চিত্রটি লক্ষ করলে দেখা যাবে, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ রেলে বেশি যাতায়াত করে থাকে। রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, ৯৮.৬ শতাংশ যাত্রী দ্বিতীয় শ্রেণীতে, ১.৩৬ শতাংশ প্রথম শ্রেণীতে এবং ০.০৫ শতাংশ যাত্রী শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় যাতায়াত করেন।

কার্যত পরিবহনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে কিছু সামাজিক দায়দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা রেলওয়ে ছাড়া আর কোনো মাধ্যমে এত সহজে করা সম্ভব নয়। যেমন রেলওয়েকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য এবং যাত্রীদের অতি স্বল্প মূল্যে পরিবহনে সাহায্য করতে হয়। অনেকসময় লাভজনক নয় এমন লাইন চালু রাখতে হয় দেশের জনগণের যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোনসহ যেকোনো দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষদের সাহায্যার্থে ত্রাণ ও পুনর্বাসন সামগ্রী নামমাত্র মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয়।

শিল্পায়ন, নগরায়ন, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দেশের আর্থসামাজিক অচলায়তনের ধারা ভেঙে পুঁজি ও শিল্পনির্ভর সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে রেলওয়ে পালন করেছে অভ‚তপূর্ব ভ‚মিকা। অর্থাৎ পুরো সমাজ জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে রেলপথের সুবাদেই।

আমাদের সীমিত সম্পদ, জনসংখ্যার আধিক্য, নিম্ন আয় ও কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় রেলের গুরুত্ব ব্যাপক। যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে, বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহনে, অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের ব্যাপক প্রসার এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে রেলের আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি এবং তা সময়ের দাবিও।

খাদ্যঘাটতি মোকাবেলায় ভ‚মির পরিকল্পিত ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। দেশে প্রতি বছর কৃষিজমি কমছে। পরিকল্পনাহীন সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ এর অন্যতম কারণ। অতিমাত্রায় সড়ক পথের উপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটছে অগণিত প্রাণহানি, যা এক দিকে মানবসম্পদের অপচয় এবং হৃদয় বিদারকও বটে। অন্য দিকে রেলে তুলনামূলক হারে দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম এবং মালামাল পরিবহনের মাধ্যমে দেশের শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে অন্যতম প্রধান পরিবহন রেল। রেলের সাহায্যে ধান, গম, চাল, পাট, তামাক, আখ, শাক-সবজি ইত্যাদি কৃষিজাত পণ্য এবং সার-কীটনাশক, কৃষি সরঞ্জাম এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেয়া করা হয়। তা ছাড়া পরিবহন করা হয় শিল্পজাত পণ্য এবং নদীবন্দরের সাহায্যে যেসব পণ্য আমদানি ও রফতানি করা হয় তারও একটা অংশ রেলওয়ের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। এতে পরিবহন খরচ কম থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সম্ভব।

আমরা যদি প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, পরিবহন ব্যয় কমাতে তাদের কলকারখানা থেকে শুরু করে সমস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে রেল স্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে। আজকে আমাদের দেশেও যে সমস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্প গড়ে উঠেছে তার বিকাশ ঘটাতে হলে রেলওয়েকে আরো বেশি শক্তিশালী ও আধুনিক করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের জনগণের পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে এই খাতটিকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল তা দেয়া হয়নি।

রেলওয়ে দেশের সেবা খাতগুলোতে যে সুবিধা প্রদান করছে তার যদি একটি আর্থিক মূল্যায়ন আমরা দাঁড় করাই তাহলে দেখা যাবে, রেল কোনো দিনই অলাভজনক কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। রেলের একটি কামরায় অনেক মানুষ যাতায়াত করতে পারে। এখানে পরিবারের সবাই মিলে একসাথে একটি আন্তরিক পরিবেশে যাতায়াত করা যায়। আবার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষও একই কামরায় থাকে। তাদের মধ্যে ভাববিনিময় হয়, আদান-প্রদান হয় সংস্কৃতির। গড়ে ওঠে পারস্পরিক সখ্য এবং পারস্পরিক সহমর্মিতাবোধ, যা একটি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সুতরাং দেশের জনগণের স্বার্থে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই রেলওয়ের আধুনিকায়ন করতে হবে এবং এর সেবার মান বাড়াতে হবে।

দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। একে লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

রেলের স্টোরকৃত মালের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। তেল-ডিজেল যা দরকার তার থেকে দু-তিন গুণ বেশি কেনাবেচা হয়। প্রতিদিন বিভিন্ন রেলস্টেশনে চলাচলকারী রেলের ইঞ্জিন থেকে শ’ শ’ লিটার ডিজেল চুরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। চুরি হচ্ছে বিদ্যুৎ। রেলস্টেশন চত্বরে দোকানগুলোতে ও রেলের পরিত্যক্ত বাসায় অবৈধ বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ দেয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ, যা রেলওয়ের শক্তিকে সঙ্কুচিত করে ফেলছে।

রেলের যে সম্পদ ও সম্পত্তি আছে তা রক্ষণাবেক্ষণে নেই কোনো সুচারু ব্যবস্থা। প্রতিনিয়ত দখল হয়ে যাচ্ছে রেলওয়ের জমি ও সম্পদ। এগুলো দিনের পর দিন স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। রেলের স্ক্র্যাপ, রেলপাত, ভাঙা লোহা অবাধে পাচার হচ্ছে। একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র কাজগুলো করছে প্রকাশ্যে; কিন্তু দেখার কেউ নেই। অথচ এই সম্পদের চুরি ঠেকিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে এবং এসব অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে রেলের কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব। সম্ভব রেলকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

রেল পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ব্যয় হচ্ছে তা পূরণ করে এটিকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে দেশের মানুষের যাতায়াত ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি, যা একটি রাষ্ট্রের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। সুতরাং রেল যোগাযোগ নিয়ে মহপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে, বিশেষ করে ঢাকার উপর যে অব্যাহত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার লক্ষ্যে ঢাকার আশপাশের শহরগুলোর সাথে রেল নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করা এবং তার সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশপাশের জেলাগুলোকে ঢাকার সাথে সুষ্ঠু ও সার্বক্ষণিক রেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে এলে ঢাকা থেকে মানুষজন ধীরে ধীরে আশপাশের জেলাগুলোতে বসতি স্থাপন করবে। রাজধানীর ওপর বাড়তি মানুষের চাপ কমে যাবে।

লেখক : কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
belayet_1@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement