০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯, ৫ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

মহাকাশ পর্যালোচনায় জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপ

মহাকাশ পর্যালোচনায় জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপ - ছবি : সংগৃহীত

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের কিছু ছবি বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। যখন এই পৃথিবী কিংবা সৌরমণ্ডলের জন্মই হয়নি, তখনকার ছবি কী করে জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপ পাঠাল, মানুষ কী করেই বা জানল যে পাঠানো ছবিগুলো এত কোটি কোটি আলোকবর্ষ আগের? এতসব আবিষ্কারের মূল সূত্র হলো কোটি কোটি আলোকবর্ষ আগে বিগব্যাং-এর পর সৃষ্ট নক্ষত্র থেকে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি পর্যালোচনা ও তার ব্যাখ্যা বের করা।

‘আলো’ আসলে কী?
আলো একটি তির্যক, তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ যার উপস্থিতিতে কোনো জিনিস মানুষের চোখে দৃশ্যমান হয়। সূর্যের সাদা আলোর বর্ণালিতে আছে দৃশ্যমান বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল রঙের সাতটি আলো। দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে চেয়ে লম্বা আলোকরশ্মি (রেডিও ওয়েভ, মাইক্রো ওয়েভ, ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি) বা তার চেয়ে ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে আলোকরশ্মি (আল্ট্রা ভায়োলেট রে, এক্স-রে এবং গামা রে) খালি চোখে দেখা যায় না।

সব বস্তুই কোনো না কোনো ধরনের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বিচ্ছুরিত করে। সে ওয়েভ ধরতে মাইক্রোস্কোপ বা টেলিস্কোপের সহযোগিতা নিতে হয়। আলোর মহাকাশে চলতে কোনো মাধ্যম লাগে না। তাই শূন্য মাধ্যমে কোথাও বাধাগ্রস্ত না হলে বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষব্যাপী আলো একইভাবে ভ্রমণ করতে পারে। আলো প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার মাইল বেগে চলে। আলো চলতে যে ধারক বল লাগে তাকে ফোটন কণা বলে যার কোনো ভর কিংবা চার্জ নেই তবে এর আছে ভরবেগ, শক্তি এবং চলার শক্তি। আলো চলাচলের পথে কাচ, পানি বা অন্য কোনো পদার্থে বাধাগ্রস্ত হলে তা শোষিত বা প্রতিফলিত হয় কিংবা তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। উদ্ভিদ জগত আলোকে ব্যবহার করে আমাদের জন্য খাদ্য জোগায়। মহাবিশ্বে নক্ষত্রসমূহ আলোর উৎস হলেও সৌরমণ্ডলে মূলত সূর্যই আলোর উৎস। এই আলোই প্রকৃতিতে সর্বোচ্চ গতিতে চলমান এমন একটি শক্তি যা অন্য সব শক্তির উৎস। আলো ব্যবহার করে দূরের জিনিসকে অনেক বড় ও কাছে দৃশ্যমান করার জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে টেলিস্কোপ।

আলোর ব্যবহারে সৃষ্টিকে জানার পদ্ধতি
আমাদের চারপাশে যেসব শব্দ শুনি, না শোনা শব্দ তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। অনেক কাছের জিনিস যেমন দেখি না, তেমনই দেখি না অনেক দূরের জিনিসও। ইলেট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের খুবই ছোট একটি অংশ ০.০০৩৫% আমরা খালি চোখে দেখতে পাই। মহাকাশের অনেক দূরের জিনিস দেখার জন্য অনেক ধরনের টেলিস্কোপ আছে। যেমন রেডিও টেলিস্কোপ, অপটিক্যাল টেলিস্কোপ, গামা-রে টেলিস্কোপ, এক্স-রে টেলিস্কোপ এবং কৃত্রিম উপগ্রহ। আবার টেলিস্কোপ ভূমিতে রেখে যে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাকে গ্রাউন্ড-বেজড্ টেলিস্কোপ এবং মহাশূন্যে প্রদক্ষিণ করিয়ে যে টেলিস্কোপ ব্যবহার হয় তাকে স্পেস টেলিস্কোপ বলে (যেমন কেপলার, হাবল, এবং সর্বশেষ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ)।

স্পেস টেলিস্কোপের ইতিকথা
বায়ুমণ্ডলীয় অসুবিধা দূর করার জন্য বিজ্ঞানীরা ভাবলেন যে এমন টেলিস্কোপ মহাকাশের কোথাও স্থাপন করা যায় কি না যেখান থেকে আরো দূরের জিনিস স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। ১৯৪৬ সালের লিমেন স্পিটজারের পরামর্শে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে ১৯৬৮ সালে স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠায়। স্পেস টেলিস্কোপের সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে মহাকাশের অনেক দূর পর্যন্ত সব দিকেই পর্যবেক্ষণ সুবিধা পাওয়া যায়। এমনকি ১৩৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের জিনিসও অনেক স্পষ্টভাবেই পর্যবেক্ষণ করা যায়। কিন্তু এর দুটি বড় অসুবিধাও আছে। এর খরচ অনেক বেশি, আর স্পেস টেলিস্কোপ সার্ভিস করার জন্য আলাদা স্পেস শাটল লাগে। ১৯৭০ দশকের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯০টিরও বেশি স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে উৎক্ষিপ্ত হয়েছে। ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক শক্তিশালী স্পেস টেলিস্কোপ হাবল মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে যা পৃথিবী থেকে ৩৪০ মাইল দূরত্বে অবস্থান করে প্রতি ৯৫ মিনিটে একবার এবং প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৫ বার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকবে ২০৩০-২০৪০ সাল পর্যন্ত। এই টেলিস্কোপ গত ২৫ বছরে ২৩ হাজারের মতো মহাকাশের বিভিন্ন নক্ষত্র, গ্যালাক্সির স্পষ্ট চিত্র পৃথিবীতে পাঠিয়েছে যা পর্যালোচনা করে মহাবিশ্বের বয়স, কৃষ্ণ গহ্বর ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। মহাবিশ্ব যে সম্প্রসারণশীল তা হাবল টেলিস্কোপ প্রেরিত তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রমাণিত হয়।

জেমস্ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ
১৯৯৬ সালে ১৭টি দেশ মিলে হাবল টেলিস্কোপের চেয়েও উন্নত ধরনের টেলিস্কোপ বানানোর পরিকল্পনা করে। ২০০২ সালে নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ঘোষণা দেন, নাসার এর পরের টেলিস্কোপ হবে জেমস্ ওয়েবের নামে। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত নাসার নেতৃত্বে ছিলেন জেমস্ ই ওয়েব। ওই সময় বিশ্ব অ্যাপোলো মিশনে অংশ নিয়েছিল নিল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স। সেই সময়কার তার অবদানের কথা স্মরণ করেই নতুন এই টেলিস্কোপের নামকরণ হয়েছে জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপ।

জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপটি অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। কোনো বস্তু থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ আলো এতে পড়ে। ফলে অতি উচ্চমাত্রার ছবি ধারণ করা যায়। এটি এমন এক স্থানে রাখা হয়েছে যাতে বায়ুমণ্ডল দ্বারা প্রভাবিত না হয়। টেলিস্কোপটি সুনির্দিষ্ট আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে (ইনফ্রারেড রে) ওপর উচ্চমাত্রার সংবেদনশীল। টেলিস্কোপটি তৈরিই করা হয়েছে উচ্চ বিবর্ধন ক্ষমতা এবং তাপীয় নিঃসরণ ক্ষমতাসম্পন্ন করে। এর আয়নার রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা সবচেয়ে বেশি ইনফ্রারেড রে আকর্ষণ করতে পারে।

কী তথ্য পাঠিয়েছে জেমস্ ওয়েব
নাসা জেমস্ ওয়েবের প্রথম পাঁচটি মহাজাগতিক লক্ষ্য প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কারিনা নেবুলা, ডবিøউএএসপি-৯৬ বি, সাউদার্ন রিং নেবুলা, স্টিফেন কুইন্টেট এবং এসএমএসিএস-০৭২৩। এই লক্ষ্যগুলো তৈরি করেছে একটি আন্তর্জাতিক কমিটি। যার মধ্যে নাসা, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি, কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং বাল্টিমোরের স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করছেন, মহাজগতের সবকিছু সৃষ্টি হওয়ার আগে, যে অসম্ভব রকমের দ্রুতগতিতে মহাকাশ স¤প্রসারিত হয়েছিল, তার কিছু নমুনা চিহ্ন তারা খুঁজে পেয়েছেন। তাদের ধারণা মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর সৃষ্টি এখন থেকে যথাক্রমে ১৩.৮ বিলিয়ন এবং ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে। আর এই সবকিছুই হয়েছিল এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে। আর কোটি কোটি বছর আগের সেই ঘটনায় যে আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল, বিজ্ঞানীরা বলছেন যে তারা সেই আলোর কিছু তরঙ্গ টেলিস্কোপের সাহায্যে ধরতে পেরেছেন। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মহাজগতের সেই সম্প্রসারণের সময়কার অবশিষ্ট কিছু চিহ্ন খুঁজে বের করা। পাঠানো ছবিতে গ্যালাক্সিতে ভরপুর মহাবিশ্বের গভীরতম চেহারা দেখা যায়। এতে প্রচুর নক্ষত্র, সামনের অংশে বিশাল গ্যালাক্সি এবং অস্পষ্ট ও অত্যন্ত দূরবর্তী ছায়াপথগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।

১৩ বিলিয়ন বছর আগে গঠিত মহাবিশ্বের প্রথম ছবি
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ছবি পাঠিয়েছে এখন থেকে ১৩৫০ কোটি আলোকবর্ষ আগে সঙ্ঘটিত মহাবিশ্বের ঘটনার। এরকম ছবি আগে কখনো হাতে পায়নি নাসা। গত ১১ জুলাই পাঠানো অবাক করা ছবিগুলো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। প্রথম ছবিটি ৪৬০ কোটি আলোকবর্ষ আগের সময়ের। এতে এসএমএসইএস ০৭২২৩ নামের একটি ক্লাস্টার গ্যালাক্সি দেখানো হয়েছে যা ইতোপূর্বে কখনো দেখা যায়নি।

দ্বিতীয়টি ছিল সাউদার্ন রিং নীহারিকার। তৃতীয় ছবিটি ছিল স্টিফেন্স কুইন্সটেটের যেখানে চারটি গ্যালাক্সি একসাথে দেখা গেছে। এখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে একটি গ্যালাক্সি অপর একটি গ্যালাক্সির সাথে মিশে যায় কিংবা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, একদিন আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে এর পার্শ্ববর্তী গ্যালাক্সি এন্ড্রোমিডার সাথে এভাবে মিশে যাবে কিংবা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। দুটো গ্যালাক্সি মিশে যাওয়া বা সংঘর্ষ হওয়ার ধারণা একসময় থিউরি আকারেই ছিল। বর্তমানে জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে তা অনেকটাই প্রমাণ হয়ে গেছে।

চতুর্থ ছবিটি ছিল দি কারিনা নেবুলার। এতে দেখা গেছে কিভাবে একটি তারার জন্ম হয়। নক্ষত্র সৃষ্টির আগে নক্ষত্র তৈরির উপাদানগুলো যে গ্যাসীয় আকারে আস্তে আস্তে ঘনীভূত হতে থাকে এবং পরে কুয়াশার মেঘের মতো ঘনীভূত হয়ে নক্ষত্র তৈরি হয় এটাও ধারণা ছিল মাত্র। জেমস্ ওয়েব টেলিস্কোপে পর্যবেক্ষণ করে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পঞ্চম ছবিতে ধরা পড়েছে ডাব্লিওএএসপি ৯৬বি নামক একটি এক্সো গ্রহ। আমাদের সৌরজগতের বাইরে কোটি কোটি নক্ষত্রের চারদিকে যে কোটি কোটি গ্রহ প্রদক্ষিণ করে তাদের এক্সো প্লানেট বলে। এটি আমাদের পৃথিবী থেকে এক হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, এই গ্রহে পানি আছে। কোনো প্রাণী বা এলিয়েন আছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জেমস্ ওয়েব কি বিগ ব্যাং-এর সময়ের ছবি পাঠাতে পারবে?
উত্তর হলো, না। বিগ ব্যাং সময়কার বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি ছিল আলোর গতির চেয়েও বেশি এবং বর্তমানেও বিগ ব্যাং সময়কার বিস্ফোরিত রশ্মি আলোর গতির চেয়েও বেশি গতিতে ধাবমান। ফলে সে সময়কার আলোক রশ্মি ক্যামেরায় ধারণ করা সম্ভব নয়।

বর্তমান জেমস্ ওয়েব স্পেস টেলস্কোপের মাধ্যমে ১৩৫০ কোটি আলোকবর্ষের পূর্বেকার ছবি ধারণ করতে পেরেছে। এই টেলিস্কোপ দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে বিচ্ছুরিত ইনফ্রারেড আলোকরশ্মি বেছে নিতে পারে। কিন্তু কসমোলজিকাল পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিং ব্যাং-এর সময়কার বিচ্ছুরিত মাইক্রোওয়েভ আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ, ইনফ্রারেড আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে চেয়ে বড়। বর্তমান টেলিস্কোপ ইনফ্রারেডের চেয়ে বড় আলোর তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে না। ভবিষ্যতে যদি ইনফ্রারেড আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে চেয়ে বড় আলোর তরঙ্গ শনাক্ত করার মতো টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হয় তখনই কেবল বিগ ব্যাংয়ের আরো কাছাকাছি সময়কার ছবি ধারণ করতে পারবে। কিন্তু কখনোই বিগ ব্যাং-এর সময়কার ছবি ধারণ করতে পারবে না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হিস্টোপ্যাথলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি


আরো সংবাদ


premium cement