৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯, ৩ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব চাই

পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব চাই। - ছবি : সংগৃহীত

প্রতি বছর আগস্ট মাস এলেই মনে পড়ে হিরোশিমা-নাগাসাকির কথা। মনে পড়ে বর্বরতা ও নৃশংসতায় অকালে মৃত্যুবরণকারী লাখো মানুষের কথা। হিরোশিমা-নাগাসাকি পৃথিবীর মানুষের কাছে নৃশংসতম বর্বরতার একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে বছরের পর বছর ধরে চিত্রিত হয়ে আসছে। হিরোশিমা-নাগাসাকির নাম শুনলেই ভয়ে আতঙ্কে ওঠে শান্তিপ্রিয় মানুষের মন। মানবজাতির বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট সেই নৃশংসতায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করেছিল জাপানোর হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের লক্ষাধিক মানুষ।

আরো লক্ষাধিক মানুষ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছিল। মারা গিয়েছিল লক্ষাধিক পশুপাখি ও মৎস্যজগৎ। আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল সবুজ বৃক্ষরাজি আর গাছপালা। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল দু’টি জনপদে প্রাণের স্পন্দন। এসব হচ্ছে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমাণবিক বোমা হামলার ভয়াবহ পরিণতি। সেই বোমা হামলার পঁচাত্তর বছর অতিক্রান্ত হলেও বিশ্ববাসী এখনো পারমাণবিক বোমা হামলার হুমকি ও আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এ অবস্থায় মানবজাতিকে যদি পারমাণবিক বোমার নৃশংসতা থেকে বাঁচাতে হয় তাহলে হিরোশিমা ও নাগাসাকির পুনরাবৃত্তি যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। আমরা একটি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব চাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র যে পারমাণবিক বোমা হামলা চালায় তার ধ্বংসলীলা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে সেখানকার মানুষ। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা নগরীতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বোমা হামলা চালায়। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে লিটল বয় নামের এই বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়, যার ধ্বংসক্ষমতা ৬.৫ কিলোটন টিএনটির সমান। এই বোমার আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে হিরোশিমা নগরী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রাণ হারায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ। প্রাণ হারায় লক্ষাধিক পশু। গাছপালা সব পুড়ে যায়। পারমাণবিক বোমা থেকে সৃষ্ট আগুনের লেলিহান শিখা হিরোশিমা নগরীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়।

এর ঠিক তিন দিন পর ৯ আগস্ট জাপানের নাগাসাকি নগরীতে যুক্তরাষ্ট্র আবারো পারমাণবিক বোমা হামলা চালায়। স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ৪৭ মিনিটে ফ্যাটম্যান নামের নিক্ষিপ্ত বোমাটির ধ্বংস ক্ষমতা হচ্ছে ২২ কিলোটন টিএনটির সমান। এখানেও কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করে সত্তর হাজার মানুষ। হিরোশিমার মতো নাগাসাকিও আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যায়। সেই পারমাণবিক বোমা হামলার তেজস্ক্রিয়তায় যুগ যুগ ধরে সেখানকার মানুষ, জীবজন্তু নানা ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং কত মানুষ ও প্রাণী যে বিকলাঙ্গ হিসেবে জন্ম নিয়েছে এবং তার বোঝা বহন করেছে সারা জীবন; তা হিসাবের বাইরে। মানবজাতির ওপর এত বড় ধ্বংসাত্মক ঘটনা ও বর্বরতা পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও ঘটেনি।

সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ শুরু করে। ১৯৪৫ সালের ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দেশ হিসেবে নিউ মেক্সিকো রাজ্যে পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায় এবং এর কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়ে আগস্টে প্রথম সপ্তাহে জাপানের ওপর হামলা চালায়। এর কয়েক দিন পর ১৪ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়। পারমাণবিক বোমার অধিকারী হওয়ার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ক্ষেত্রে একক ও শ্রেষ্ঠতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পারমাণবিক বোমার ধ্বংস ক্ষমতা দেখে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং নিজেরাও সামরিক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হওয়ার লক্ষ্যে পারমাণবিক বোমার অধিকারী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

শুরু হয়ে যায় পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জন এবং পারমাণবিক বোমা তৈরির তীব্র এক প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতায় পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয় রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন), ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া। ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এর মাধ্যমে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে ব্রিটেন, ১৯৬০ সালে ফ্রান্স, ১৯৬৪ সালে চীন, ১৯৭৪ সালে ভারত, ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান এবং ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ছাড়া ইসরাইল অঘোষিতভাবে পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছে এবং পরমাণু বিশ্লেষকদের মতে ইসরাইল ১৯৭৯ সালেই অতি গোপনে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পারমাণবিক বোমার অধিকারী দেশগুলো তাদের পারমাণবিক বোমার শক্তিমত্তা জাহির করতে কিছু দিন পরপর পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এ ধারাবাহিকতায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ১,০৫৪ বার, রাশিয়া ৭১৫ বার, ব্রিটেন ৪৫ বার, ফ্রান্স ২১০ বার, চীন ৪৫ বার, ভারত ছয়বার, পাকিস্তান ছয়বার ও উত্তর কোরিয়া ছয়বার।

এ ছাড়া বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র মজুদের সংখ্যাও অনেক। প্রাপ্ত হিসাব অনুসারে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮০০-৬১৮৫, রাশিয়ার ৬৩৭০-৬৪৯০, যুক্তরাজ্যের ২০০-২১৫, ফ্রান্সের ২৯০, চীনের ৩০০-৩২০, ভারতের ১৪০-১৫০, পাকিস্তানের ১৬০, উত্তর কোরিয়ার ৩০-৪০ ও ইসরাইলের ৯০টি। এক একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে খরচ হয় বিলিয়ন ডলার। সুতরাং শক্তিমত্তা প্রকাশের জন্য বিস্ফোরণ ঘটানো পারমাণবিক বোমা তৈরির পেছনে কত ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। আর মজুদকৃত পারমাণবিক বোমা বা অস্ত্র তৈরি, মজুদ ও রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে কত ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, তার হিসাব তো ধারণক্ষমতার বাইরে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তাতে পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ আতঙ্কিত। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সঙ্ঘাত পৃথিবীকে বেশ কয়েকবার পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এ অবস্থায় পৃথিবীকে পারমাণবিক অস্ত্রের সর্বনাশা ধ্বংস থেকে বাঁচানোর জন্য শান্তিকামী মানুষ আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্বাক্ষরিত হয় পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি এনটিপি ও সিটিবিটি। ১৯৬৮ সালের মার্চে সর্বপ্রথম স্বাক্ষরিত হয় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসংক্রান্ত চুক্তি এনটিপি। প্রাথমিকভাবে ২৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তিতে ৪০টি দেশ স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি ১৯৭০ সালের ৫ মার্চ থেকে কার্যকর হয়। ২৫ বছর শেষে ১৯৯৫ সালে নিউ ইয়র্ক শহরে এ-সংক্রান্ত এক সম্মেলনে চুক্তিটির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য নবায়ন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ বিশ্বের মোট ১৭৪টি দেশ এতে স্বাক্ষর করলেও ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল ও কিউবা এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। অন্য দিকে সর্বাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধকল্পে ১৯৯৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে ১৫৮টি ভোটে সিটিবিটি চুক্তিটি গৃহীত হয়। এ পর্যন্ত ১৬৭টি দেশ এ চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছে এবং মাত্র ৪১টি দেশ এটি অনুমোদন করেছে। এমনকি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে শুধু ফ্রান্স ও ব্রিটেন চুক্তিটি অনুমোদন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। এ চুক্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরকারী কোনো রাষ্ট্রই কোনো ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ চালাতে পারবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। আর যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু অনুমোদন করেনি, সেহেতু রাশিয়া ও চীনও অনুমোদন করেনি। রাশিয়া ও চীনের বক্তব্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদন করলেই তারা সিটিবিটি অনুমোদন করবে। ফলে এনটিপির মতো সিটিবিটিও ব্যর্থ হয়েছে। এসব চুক্তি পৃথিবীকে পারমাণবিক হুমকি থেকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এসব চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার রোধ করার কথা বলা হলেও বর্তমানে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর হাতে মজুদ পারমাণবিক অস্ত্রের কী হবে তার সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই এবং এসব অস্ত্রের ধ্বংসের কোনো বিধান রাখা হয়নি। ফলে এ চুক্তির কারণে নতুন কোনো দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী না হলেও বৃহৎ শক্তিগুলো কিন্তু ঠিকই বিশাল পরিমাণ পারমাণবিক বোমার অধিকারী রয়ে যাবে। ফলে বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত হবে না। এ কারণে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিকে অনেক দেশ, তাদেরকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্রের একক মালিকানা হওয়ার জন্য বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, আইন যেহেতু সবার জন্য সমান, অতএব শান্তির পক্ষে সবাইকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে। তা না হলে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি দেশই পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য মরণপণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে এবং হচ্ছেও। আজকের বিশ্বে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিন্তু এ কারণেই। কারণ সবাই চাচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা সংহত করতে। তাদের মতে, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার।

কেউ পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল মজুদ গড়ে তুলবে, পৃথিবীকে তটস্থ রাখবে আর কেউ এর অধিকারীও হতে পারবে না, এটি তো কোনো আইন হতে পারে না। তাই এ আইনের অবসান হতেই হবে। পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার ও সুবিধা থেকে এসব মানুষ বঞ্চিত। অথচ মানবজাতিকে ধ্বংসের জন্য উন্নত দেশগুলো মারণাস্ত্র তৈরির পেছনে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। এসব না করে উন্নত দেশের নেতারা আজ যদি তাদের সময়, শ্রম ও অর্থ বিশ্বব্যাপী বিরাজমান দারিদ্র্য, অশিক্ষা, মরণব্যাধি এইডস ও করোনা মহামারী নির্মূলের জন্য ব্যয় করত, তাহলেই বরং বিশ্ববাসী উপকৃত হতো।

মারণাস্ত্র তৈরির জন্য যে বাজেট ব্যয় হচ্ছে, সেই বাজেটের সিকি ভাগও যদি আজ মানবজাতির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য ব্যয় হতো তা হলে পৃথিবী আজ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত হতো। অথচ তা না করে ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর নেতারা। আমরা চাই এর চূড়ান্ত অবসান। আমরা চাই পৃথিবীর মানুষ পারমাণবিক অস্ত্রের ভীতি ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচুক।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক।
ই-মেইল : omar_ctg123@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement