০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯, ৫ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

হামিদ আনসারীর নামে কুৎসা

হামিদ আনসারীর নামে কুৎসা - প্রতীকী ছবি

রাজনীতিতে মতাদর্শগত বিরোধিতা আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু নিজের মতাদর্শগত বিরোধীদের হীন করে দেখানোর জন্য কোনো দল এতটাই নিচে নামতে পারে, এটি কেউ ভাবেনি। গত জুলাই মাসে বিজেপি যে অনাকাক্সিক্ষত ভঙ্গিতে সাবেক উপরাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ হামিদ আনসারীর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, তার উদাহরণ তারা নিজেরাই। সবাই জানেন, হামিদ আনসারী তার পুরো জীবন ক‚টনীতিতে অতিবাহিত করেছেন। রাজনীতির সাথে তার সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তিনি একজন ভদ্র ও সভ্য মানুষ। তিনি সদা সত্যকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে যেহেতু সত্য বলাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধে পরিণত হয়েছে, তাই যারাই সত্য বলতে বা সত্যকে উন্মোচন করার চেষ্টা করছেন, এর জন্য তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে যার সবচেয়ে তাজা প্রমাণ অল্টার নিউজের সাংবাদিক মুহাম্মদ জুবায়ের যাকে সত্য বলার কারণে বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে তার জামিন না পাওয়ায় তিনি এখনো কারাগারেই রয়েছেন। সত্য বলার কারণেই উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারীকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অথচ তিনি জীবনের যে ধাপে অবস্থান করছেন, সেখানে তার বিশ্রাম ও শান্তির প্রয়োজন। কিন্তু সঙ্ঘ পরিবারের লোকেরা এই বয়সেও তার দেশপ্রেমের পরীক্ষা নিচ্ছে।

সবাই জানেন, মুসলমানদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা সঙ্ঘ পরিবারের পুরনো অভ্যাস। এ কর্ম ওই সময় থেকে চলছে, যখন ভারত স্বাধীন হয়েছে এবং তার উদর থেকে পাকিস্তান নামে এক নতুন রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে। পাকিস্তানের নাম নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের গালি দেয়া ও তাদের পাকিস্তানি বলে তাদের দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সঙ্ঘ পরিবারের লোকদের এক স্বতন্ত্র নীতি। কিন্তু এ বিষয়ে এ লোকেরা এতটাই নিচে নামতে পারে তা কারো ধারণাতেই ছিল না।

সাম্প্রতিক কালে এই অধঃপতনের ধারণা তখনই পাওয়া গেল, যখন বিজেপির বাচাল মুখপাত্র গুরু ভাটিয়া হামিদ আনসারীর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং এক অখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তার ওপর দুর্বল ও অনর্থক আঘাত হানা হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র বলেন, হামিদ আনসারী ২০১০ সালে যখন উপরাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন নুসরাত মির্জা নামে এক পাকিস্তানি সাংবাদিককে চাপ দিয়ে পাঁচবার ভারতে ডেকে আনেন। ভারতে এসে ওই সাংবাদিক ভারতের গোপন তথ্য জোগাড় করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসকে সরবরাহ করেছে। মুখপাত্র এ কথাও বলেন যে, হামিদ আনসারী ওই সাংবাদিককে সাথে নিয়ে নয়াদিল্লিতে সন্ত্রাসবিরোধী এক কনফারেন্সে স্টেজেও হাজির হন। হামিদ আনসারী দৃঢ়ভাবে এ অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তিনি ওই সাংবাদিককে চেনেনও না এবং তার সাথে কখনো সাক্ষাৎও করেননি। গুরু ভাটিয়া তৎকালীন শাসকদল কংগ্রেস ও তার সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকেও লক্ষ্যবস্তু বানান।

মুহাম্মদ আনসারীর প্রতি বিজেপির এই আচরণ নতুন কোনো বিষয় নয়। তারা থেমে থেমে তার বিরুদ্ধে নিজেদের আক্রোশ প্রকাশ করে। এ ধারা ওই সময় শুরু হয়, ২০১৭ সালে হামিদ আনসারী যখন উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তার অবসর গ্রহণের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উচ্চকক্ষে বিদায়ী ভাষণে যে শ্লেষাত্মক বাক্য বলেন, তা অবশ্যই তার পদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। এরপর বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের লোকেরা হামিদ আনসারীর বিরুদ্ধে অনর্থক কথা বলার উৎসাহ পেয়ে গেছে এবং তারা এমন সুযোগের সন্ধানে তৎপর রয়েছে, যাকে ঢাল বানিয়ে তারা তার বিরুদ্ধে নিজেদের কুৎসিত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। হামিদ আনসারী ২০১৭ সালে উপরাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান পদে ১০ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে অবসর গ্রহণ করেন। এই ১০ বছর সময়কালে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসেবে তার কর্মকাণ্ডকে আমি রাজ্যসভার প্রেস গ্যালারির মাধ্যমে কাছ থেকে দেখেছি। আমার এটিই মনে হয়েছে যে, তিনি পূর্ণ সততার সাথে তার কাজ করেছেন এবং কোনো দলের প্রতিই তার পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়নি।

সবাই জানেন, হামিদ আনসারী এক সম্ভ্রান্ত স্বাধীনতার মুজাহিদ পরিবারের সন্তান। তিনি স্বাধীনতার বিখ্যাত মুজাহিদ ডা: মুখতার আহমদ আনসারীর নিকটাত্মীয় যিনি খেলাফত বিলুপ্তির পর মেডিক্যাল মিশন নিয়ে তুরস্ক গিয়েছিলেন। জাতীয় আন্দোলনের সময় ডা: মুখতার আহমদ আনসারীর অবদান ও আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয়। হামিদ আনসারীর পরিবারেরই এক বীরপুরুষ ছিলেন ব্রিগেডিয়ার উসমান, যিনি ভারতীয় বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নওশেরায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ১৯৪৮ সালের ৩ জুলাই শাহাদতের অমিয় সুধা পান করেন। এমনই এক পরিবারের প্রিয় মানুষ এবং দেশের ক‚টনৈতিক ইতিহাসে সফলতার পতাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিজেপি ও তার মুখপাত্রের পক্ষ থেকে পরিচালিত চরিত্রহনন এবং কুৎসা রটনার কার্যক্রম অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়।

হামিদ আনসারী একজন শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ হিসেবে নিজের যোগ্যতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। তিনি কয়েকটি দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসঙ্ঘে ভারতের বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণেই কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন শেষে তাকে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান ও শেষের দিকে দু’বার উপরাষ্ট্রপতি বানানো হয়।

এখন আসুন, ওই কারণগুলোর ওপরও একটু নজর বুলাই, যা বিজেপিকে হামিদ আনসারীর বিরোধী বানিয়েছে। ২০১৪ সালে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন হামিদ আনসারী উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। সেখানে বিজেপির সদস্য সংখ্যা বেশ কম ছিল। রাজ্যসভায় যেকোনো বিল পাস করানোর জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া আবশ্যক। এটি বিজেপির ছিল না। এতদসত্ত্বেও শাসকদল বিজেপি হামিদ আনসারীর কাছে এটি আশা করত যে, তিনি নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে বিজেপির রাস্তা সুগম করে দেবেন। কিন্তু হামিদ আনসারী যেহেতু নিয়মনিষ্ঠ ও গণতন্ত্রমনা মানুষ ছিলেন, তাই তিনি কখনোই শাসকদলের সুরে সুর মেলাননি। এ কারণেই রাজ্যসভায় বিজেপি মনমতো চলার সুযোগ পায়নি। এটিই সেই ক্ষত, যা থেমে থেমে বিজেপির লোকদের অন্তরে বেদনা সৃষ্টি করে। তাই সুযোগ পেলেই তারা তার ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করার আগে হামিদ আনসারী এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন, সংখ্যালঘুদের মাঝে নিরাপত্তাহীনতার যে অনুভব উপলব্ধি করা যায়, বর্তমান সরকারের তা দূর করা উচিত। হামিদ আনসারীর এ সত্য কথা শাসকদলের এতটাই অপছন্দ হয় যে, তারা কোমর বেঁধে তার পেছনে লেগে যায়। অথচ তার বক্তব্য ছিল সত্যনির্ভর ও বাস্তবতার সঠিক প্রতিচ্ছবি। এরপর হামিদ আনসারীর আত্মজীবনী প্রকাশ হলো। সেখানেও তিনি কিছু কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর ফলে তাকে আরেকবার লক্ষ্যস্থল বানানো হয়।

এর আগে ২০১৫ সালে তিনি যখন অল ইন্ডিয়া মুসলিম মজলিসে মোশাওয়ারাতের গোল্ডেন জুবিলি সভায় এ কথাগুলোই বললেন, তখন সঙ্ঘ পরিবার তৎক্ষণাৎ তার বিরুদ্ধে বিদ্রূপ মন্তব্য ও গালাগাল শুরু করে। মোট কথা, যখনই হাতে সুযোগ আসে, তখনই এ লোকেরা তাকে ভালো-মন্দ বলা শুরু করে দেয়। কিন্তু এবার বিজেপির মুখপাত্র তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্লজ্জতার সব সীমা অতিক্রম করেছেন। আর সেটিও এমন এক নামসর্বস্ব সাংবাদিকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে, যিনি ২০০৫ সালে পাকিস্তানে ভ‚মিকম্প ও ২০১১ সালে জাপানে হওয়া সুনামিকে মার্কিন ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছিলেন। এমন এক অখ্যাত সাংবাদিক, খোদ পাকিস্তানে যাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না, তিনি বিজেপির কাছে এতটাই মূল্যবান ও গ্রহণযোগ্য কিভাবে হলেন? এটিই এখন তদন্তের বিষয়।

মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ২৪ জুলাই,
২০২২ হতে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ


premium cement