৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯, ৩ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স বাড়াতে না পারলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে


বিশ্বজুড়ে বিরাজমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের পুরোটাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই অর্থবছরের মধ্যেই কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতিসহ কোভিড চলাকালীন স্থগিত থাকা আমদানির বিল পরিশোধ করতে হবে এবং এর পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের চলমান কিস্তিসহ স্থগিত থাকা কিস্তির অর্থও পরিশোধ করতে হবে। ফলে এত দেনা পরিশোধজনিত চাপ সইতে হবে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদকে। বিদেশ থেকে দেশে প্রেরিত ‘রেমিট্যান্স’ যদি আশানুরূপভাবে না বাড়ে তাহলে সেই চাপ প্রবল হারে দেখা দেবে। মোট কথা, বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের স্বস্তিদায়ক প্রত্যাশা অতি ক্ষীণ।

২০২১ সালে এই মজুদ বেড়ে ৪৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। ওই বছর আমদানি বিল ছিল ৫৫০ কোটি ডলার। সেই হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছিল ৯ মাসের আমদানি বিল বহনের জন্য যথেষ্ট। গত ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২০০ কোটি ডলার। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং মজুদ কমে গিয়ে ২২০০ কোটি ডলারে এসে ঠেকেছিল। বর্তমানে গড়ে প্রতি মাসে আমদানি বিল দিতে হচ্ছে ৭৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। ফলে হাতে থাকা মজুদ দিয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ মাসের আমদানি বিল মেটানো যেতে পারে। অবস্থা উত্তরণের প্রত্যাশায় মজুদ ৪৩০০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ হলো কতকটা Hope against hope বা আশার বিপরীতে প্রত্যাশার মতো অনিশ্চিত কামনা। দায়দেনা পরিশোধের পর এখন মজুদের আশা আর কিছুতেই ৪০০০ কোটি ডলারের ওপরে তোলা যাচ্ছে না। প্রতিদিনকার আমদানি বিল শোধ দিতে ব্যাংকগুলোর কাছে মজুদ থেকে ডলার বিক্রি করতে করতে মজুদ দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগেই বলেছি, রেমিট্যান্স বাড়লে মজুদ বাড়বে, এই ধরনের Hope against hope কামনা করতে দোষ নেই। তবে বাস্তবতা যে অতি কঠিন। বাস্তবতার পাষাণে প্রত্যাশার কোমল পরশ নিতান্তই অর্থহীন হয়ে দেখা দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিধান মোতাবেক কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি বিল দেবার মতো বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়। ইতোমধ্যে জ্বালানিসহ স্বাভাবিক শিল্প কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, যানবাহন ও নিত্য ভোগ্যপণ্য আমদানির ওপর চাল আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতিটি আমদানি পণ্যের দামদর বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ বা ওজনের পণ্যে আমদানির বিল বাড়তির দিকে। পণ্যবাজার স্থিতিশীল হতে দেয়নি কোভিড, আর এখন ইউক্রেন যুদ্ধ। এরকম অস্থিরতা বহাল থাকলে অন্তত সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো মজুদ থাকার কথা। কারণ গোটা পৃথিবীর জন্যই এ সময়টা একটা ঘোরতর অসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অথচ রফতানি পণ্যের খরচ বাড়লেও দাম বাড়াতে গেলেই প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়তে, এমনকি ছিটকে পড়তেও হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় ব্যয় তারতম্য বাড়ছে।

আমদানিকৃত দ্রব্যসামগ্রীর দাম হঠাৎ করে প্রচুর মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার ফলে ২০২০ সালে ৩৫০ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় ২০২১ সালে বেড়ে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার হয়েছিল। ২০২২ মালে তা আরো বেড়ে গিয়ে ৭৫০ থেকে ৭৯০ কোটি ডলারে উঠেছে। সেই হিসাবে বর্তমান সময়ের সাত মাসের আমদানি বিল মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় মজুদ পাঁচ হাজার কোটি ডলার হলে স্বস্তি পাওয়া যেত। বিরাট একটা গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেছে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। আমদানির পরিমাণ ও দর বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। বাড়তি বিল মেটাতে গিয়ে মজুদ কমছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে এলসি খোলার জন্য ক্যাশ ডলার বেচতে হচ্ছে। তাও চাহিদার তুলনায় কম। চাহিদা জোগানোর চেয়ে কম বলে ডলারের দাম হু হু করে বাড়ছে। যার যেমন ইচ্ছা মুনাফা করে চলেছে। এটাও কিন্তু একধরনের জালিয়াতি। ব্যাংকগুলোও নিয়মিত এলসি খুলতে পারছে না। ভরসা এখন বাংলাদেশের বীর শ্রমযোদ্ধাদের দেশে পাঠানো টাকা বা ‘রেমিট্যান্স’। শ্রমের বিশ্বে নতুন হয়তো কিছু খবর আছে; কিন্তু সেগুলো মোটেও সুখবর নয়। মালয়েশিয়া বন্ধ শ্রমবাজার এখনো খোলেনি। কর্মসংস্থানের নতুন গন্তব্যও তৈরি হয়নি যতটা আশা করা হয়েছিল। খোদ ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা মন্দাক্রান্ত। অথচ আমদানি দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। আমদানি কঠোর হাতে দমন করলেও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

মুদ্রাপাচার ও চোরা পথে মুদ্রার বিকিকিনি বা হুন্ডি মোটেও বন্ধ কারা যায়নি। করোনাকালে ‘হুন্ডি’র প্রতাব কিছুটা হলেও কমেছিল। করোনার বিপদ কেটে যাওয়ার পরে ‘হুন্ডির’ ছোবল আবার দংশন শুরু করেছে। এই বিষ তোলার ‘ওঝা’ নেই। থাকলেও তন্ত্রমন্ত্রের সুবচন বা সুবোধ বুলিতে কাজ হচ্ছে না। সরকারকে যদি ধারকর্জ অগত্যা করতেই হয় তাহলে স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি কর্জ সন্ধান করতে হরে। বেশি সুদের কম মেয়াদের ঋণে দায় পরিশোধের চাপ এই দুর্বল অর্থনীতি নিতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় বহু ‘কর্জে হাসানার’ উৎস আছে। এগুলো তো খোঁজ তালাশ করতে হবে। বাড়ি বয়ে কি কেউ কল্যাণী দাদন বা ‘কর্জে হাসানা’ মুখে তুলে দিতে আসবে? সবসময়ই এগুলো বেসরকারি পর্যায়ে এবং বিশিষ্টজনদের মারফত হয়ে থাকে। জিন্নাহ সাহেব একেবারে শূন্য হাতে শুরু করেছিলেন ‘স্টেট-ক্রাফ্ট।’ ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের শঠতায় নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভাণ্ডারে ছিল গড়ের মাঠ। হায়দ্রাবাদের নিজামের বিপুল অর্থ এনে সেদিন পাকিস্তানের ‘স্টেট ব্যাংক’ খুলতে হয়েছিল। আমাদের দেশে ইসলামী ব্যাংকের মতো এত বড় বহুজাতিক ব্যাংক ও বহুপক্ষীয় শরিকানা কি এমনি এমনি হয়েছে? এ ব্যাপারে তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আল খতিব সর্বতোভাবে আবদুর রাজ্জাক লস্করকে সেদিন সহায়তা করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে শেয়ার এনে এত বড় একটা ব্যাংক গড়তে। সেই বিশাল ও বহুজাতিক সূচনা থেকেই তো আজকের ইসলামী ব্যাংক এত বড় এক মহীরুহ, বিশ্বের হাজার ব্যাংকের একমাত্র বাংলাদেশী ব্যাংক এবং দেশের শীর্ষ ব্যাংক তো বটেই। ইসলামী ব্যাংকের পল্লী অর্থায়ন ইসলামী মাইক্রো-ফিন্যান্সের এক বিরল বিশ্ব দৃষ্টান্ত। এটি মোটেই সামান্য অর্জন নয়। কাজেই সেই রকম ব্যক্তিগত মাধ্যম ও যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে এডিবি, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বাইরে গিয়ে। পৃথিবীতে এখনো অনেক স্থানে অনেক অলস অর্থ স্তূপাকারে পড়ে আছে। আজ পর্যন্ত আমরা বিল গেটসকে এ দেশে বড় কোনো কাজে নিয়ে আসতে পারলাম না। নোবেল জয়ী ড. ইউনূসের ভুবনজয়ী সুনামকে কাজে না লাগিয়ে তাকে কোণঠাসা করে একঘরে করে রেখে দিলাম। বিদেশী দাতা বা বিনিয়োগকারীরা কি যাকে তাকে দেখে এ দেশে বিনিয়োগের সওগাত নিয়ে আসবে? বিনিয়োগ আনতে প্রয়োজনে মহামান্য পোপকে ডেকে, দাওয়াত করে আনা যেতে পারে। মনে নেই, উইনস্টেন চার্চিল কী বলেছিলেন? চার্চিল বলেছিলেন, ‘If Hitler invaded Hell, I will make at least a favorable reference to the devil in the House of Commons.’

২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক জরিপে উঠে এসেছিল যে, বিশ্বের মোট বিনিয়োগের অর্ধেকটাই ঘটেছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা পারিবারিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। জরিপটি চালায় ‘Bank of America.’ এই জরিপের শিরোনাম ছিল Small Business Owner Report. ওরা অবশ্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের কারবারকেও বিনয়ের সাথে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ বলে। জরিপে দেখা গিয়েছিল, এরকম ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত বিনিয়োগের ৩৮% ভাগ উদোক্তা বিনিয়োগ পেয়েছেন বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে। ৩৫% উদ্যোক্তা বলেছেন তারা মূল কর্জ যেখান থেকে যে শর্তেই নিয়ে আসুন না কেন, চলতি মূলধন (রানিং ক্যাপিটাল) তারা পেয়েছেন বন্ধুদেরই মধ্যস্থতায় কিংবা ‘পারসুয়েশনে’। ফোর্বস ম্যাগাজিন ও গবেষণাপত্র মোতাবেক বিশ্বে এখন বিলিয়নিয়ার রয়েছেন ২,৬৬৮ জন। তারা অনেকসময় উচ্চ করভার এবং মজুরির উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়া/প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার অনেক দেশে বিনিয়োগ করেন। এগুলো তো খুঁজে বের করতে হবে, সম্পর্ক গড়তে হবে। সম্পর্ক লালন করতে হবে। আমরা কি কখনো অ্যালন মাস্ক, ল্যারি পেন, গৌতম আদানি বা মুকেশ আম্বানি, জেফ বেজোস, জ্যাক মা, বার্নাড আরনল্ড, বিল ও মেলিন্ডা গেটস, ওয়ারেন বাফেট, সার্গে ব্রিন, স্টিভ বলমার- এদের কাছে পৌঁছতে পেরেছি? বলতে পেরেছি কি বাংলাদেশে বিনিয়োাগ মানেই মানবতায় বিনিয়োগ? বাংলাদেশ যদি Tesla, Meta, Amazon, Christian Dior, Microsoft, Bershire Hathaway, AlPhabet, Adani, Reliance Group, Wallmart, Sinotec, Mc Kesson, China State Construction Group, Saudi Aramco, Samsung, British Petroleum, Shell Oil, Mercedez-Banz, China Life, Exxon-Mobil, Huawei, Honda, General Motor প্রভৃতি মাল্টি বিলিয়ন ডলার ব্র্যান্ডগুলোর/কোম্পানিগুলোর ছিটেফোঁটা বিনিয়োগও পায় তাতেই ভেসে যাবে বাংলাদেশ। আর বিনিয়োগের ধর্মও এটাই। যখন অপেক্ষমাণ বিনিয়োগকারীরা দেখে বড় বড় প্রতিষ্ঠান অমুক দেশে গেছে, অমনি তারাও এগিয়ে আসবে এবং বিনিয়োগ তখন প্রতিযোগিতার পর্যায়ে চলে যাবে। বেশি দূরে যাবেন কেন, ভিয়েতনামের কথাই ধরুন না কেন? ভিয়েতনাম আজ বিশ্বপুঁজির নিশ্চিত গন্তব্য। কারণ সেখানে ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে Proctor & Gamble (P&G), 3M, Microsoft, Pepsico Food, Abott, Honda কিংবা Nestle. তাই অন্যরাও বসে থাকেনি।

ভিয়েতনাম এখন ১.২৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, যা বিশ্বের ২৩ তম শীর্ষ ধনী দেশ। সে দিনের সেই নিঃস্ব রিক্ত রক্তাক্ত ভিয়েতনাম! Price WaterhouseCoopers এর মতে, ভিয়েতনামের অর্থনীতি এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকা একটি অর্থনীতি। ভিয়েতনামের এই উত্থান কার্যত ১৯৯৭ থেকে শুরু। অথচ এর ৩০ বছর আগে আমরা স্বাধীন হয়েছি এবং একটি আধা শিল্পায়িত অর্থনীতিকে তৈরি অবস্থায় পেয়েছি। আমাদের অনেক পরে উত্থান ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের। ভিয়েতনামের জিডিপি ১.২৪ ট্রিলিয়ন ডলার আর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৭.১৭ শতাংশ। আমাদের আসলেই শরম পাওয়া উচিত। ব্যর্থতার গ্লানি থেকে যদি একটি নব প্রজন্মের দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তাহলেই বলব ‘শোক্র আল্ হামদুলিল্লাহ।’ সব প্রশংসা মহা-মহিম স্রষ্টা প্রতিপালকের।


আরো সংবাদ


premium cement