০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯, ১০ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ইউক্রেন রাশিয়ার ‘ফুড করিডোর চুক্তি’ টেকসই হবে কি?

ইউক্রেন রাশিয়ার ‘ফুড করিডোর চুক্তি’ টেকসই হবে কি? - প্রতীকী ছবি

রাশিয়া-ইউক্রেন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তুরস্কে একটি চুক্তি হয়েছে, যেটিকে সবাই ফুড করিডোর চুক্তি হিসেবে অভিহিত করছে। ওই চুক্তির অধীনে খাদ্যশস্য চলাচল ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনটি চালান ইউক্রেনের ওডেসা বন্দর ছেড়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ান সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব মোটাদাগেই দৃশ্যমান। খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে মিসরসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে। এর পাশাপাশি, বিশ্ব শান্তির প্রতিও এই খাদ্যাভাব হুমকি হয়ে দেখা দেবে, তা স্পষ্ট করেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন। জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহেও বিশ্ব অর্থনীতি কঠিন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন। অবশ্য কোভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর থেকেই খাদ্যাভাব ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখতে শুরু করেছে বিশ্ব সম্প্রদায়।

যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় বিশ্বব্যাপী বিষণ্ণ সম্ভাবনার নানাদিক ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনকে রাশিয়া অবরুদ্ধ করে ফেলেছে বলে ইউক্রেনের খাদ্য রফতানি বন্ধ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী কোটি মানুষের খাদ্যাভাব দেখা দেবে’-এই বার্তাটি জাতিসঙ্ঘ খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বেসলি রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে পৌঁছে দিয়েছেন। অন্য দিকে, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসও অনুরূপ বার্তা রাশিয়ান প্রেসিডেন্টকে পৌঁছে দিয়েছেন যে, ‘বর্ধিত খাদ্যমূল্য বিশ্বের দরিদ্র ও সবচেয়ে ঝুঁকিপুর্ণ দেশগুলোকে বিপর্যস্ত করে ফেলবে।’

ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম। ইউক্রেনের লাখ লাখ টন শস্য উৎপাদন ও রফতানি ব্যাহত করার মাধ্যমে প্রকৃত খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গম উৎপাদনকারী দেশ। ২০২১ সালে ইউক্রেন ৩৩ মিলিয়ন (তিন কোটি ৩০ লাখ) টন গম উৎপাদন করে এবং ২০ মিলিয়ন টন রফতানি করে দেশটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ গম রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। চলতি বছর যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে গম উৎপাদন ২৩ শতাংশ কমে ২৩ মিলিয়ন টনে নেমে আসবে (গার্ডিয়ানের পূর্বাভাস ৬ মে, ২০২১)। ইউক্রেনের এই গম রফতানির ৯৫ শতাংশই হয়ে থাকে কৃষ্ণসাগর দিয়ে। রাশিয়া-ইউক্রেনের চলতি যুদ্ধের কারণে বিশেষ করে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো খাদ্য ঘাটতিতে পড়েছে। বলা হচ্ছে, ইউরোপের খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে।

ইউক্রেনের কৃষকরা প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন, তাদের শস্যক্ষেতে ও ফার্মে এবং ব্যবহৃত মেশিনে রাশিয়ানরা হামলা করেছে। মিকোলাইভের সূর্যমুখী তেল সংরক্ষণাগার, দ্বিতীয় বৃহত্তম শস্য পরিবহন টার্মিনাল এবং একটি শস্য ও অন্যান্য কিছু মজুদ রাখার ভবনটি স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, রাশিয়ান সেনাদের হামলায় এটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। রাশিয়ান হামলার কারণে ওই টার্মিনালের রফতানি সক্ষমতা কমপক্ষে তিনগুণ হ্রাস পেয়েছে। অন্য দিকে, যুদ্ধ ইউক্রেনের খাদ্য উৎপাদনের খরচও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব ক্রেতা দেশগুলোতে পড়তে বাধ্য। রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনিয়ান শস্যের দখলের কারণেও ইউক্রেনের রফতানি ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাজভ সাগরের রাশিয়ান বন্দর দিয়ে রাশিয়ানরা প্রচুর ইউক্রেনিয়ান শস্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের বন্দর অবরোধ করে রাখায় দেশটির খাদ্যশস্য রফতানিতে এটি আরেকটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওডেসা বন্দর রাশিয়া দখল করতে না পারলেও বন্দরটি রাশিয়ান সেনারা অবরোধ করে রাখে দীর্ঘদিন। ফলে ইউক্রেনের গম, সূর্যমুখী তেল, বার্লি ও ওট রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও ইতোমধ্যে শস্যভর্তি জাহাজ ইউক্রেনের বন্দর ছেড়ে গেছে, তবু ভবিষ্যতে রাশিয়ান আচরণ কী হয়, তা কেউ বলতে পারে না। কারণ রাশিয়া ইউক্রেনের পতন চায়। সে কারণেই কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের বন্দর থেকে খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার প্রথম দিনই রাশিয়া বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ফলে চুক্তি অনুযায়ী শস্য রফতানির প্রথম দিনই চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে। ভবিষ্যতে রাশিয়া এমন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে না, এর গ্যারান্টি কোথায়? কারণ, ‘যে করেই হোক, রাশিয়া এই যুদ্ধে জিততে চায়। জিততে না পারলে পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বে তার ইমেজ ভয়ঙ্করভাবে নষ্ট হবে।’

খাদ্যশস্য রফতানির উদ্দেশ্যে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যেন একটি চুক্তি হয় সে জন্য তুরস্ক গত চার মাস ধরে অব্যাহত চেষ্টা করে গেছে। কৃষ্ণসাগরের মাধ্যমে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য যেন যেতে পারে সে কারণে তুরস্ক যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু’মাস পর থেকেই লেগেছিল। তুর্কি সরকারের এ প্রচেষ্টায় তারা জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবকে জড়িত করে; জাতিসঙ্ঘ ও তুরস্ক ছিল সে চুক্তির সহযোগী স্বাক্ষরদাতা। শেষ পর্যন্ত ফল দিয়েছে, ‘এটি তুরস্কের সফল কূটনীতি’। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার তো বলেই দিয়েছেন, এ চুক্তি ধরেই ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হবে।

উল্লেখ্য, গেরহার্ড শ্রোয়েডারকে রাশিয়ানদের প্রতি কিছুটা ‘নরমপন্থী’ জার্মান নেতা হিসেবে দেখা হয়। এ চুক্তি ধরেই ইতোমধ্যে তিনটি সফল চালান ইউক্রেন থেকে বের হয়ে গেছে, তুরস্কে যাওয়ার পর কৃষিপণ্য ও খাদ্যশস্য ভর্তি জাহাজের চালান চেক করে ইউক্রেন ও রাশিয়ানরা যৌথভাবে সার্টিফিকেটও দিয়েছে। তবে এ চুক্তির একটি হতাশাপূর্ণ দিক হলো, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পন্ন এ চুক্তির বৈধতা থাকবে পরবর্তী চার মাস মাত্র। তবে নবায়ন করার একটি সুযোগও রাখা হয়েছে। এই চুক্তিতে রাশিয়ান কৃষিপণ্য রফতানির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে, যদিও প্রথমে ইউক্রেনিয়ান পক্ষ আপত্তি জানিয়েছিল। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই চুক্তি হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার সাথে খাদ্য বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, গম ও সারের বিষয়টিও তোলে। শেষত রাশিয়া এবং জাতিসঙ্ঘ ও তুরস্কের সাথে আরেকটি পৃথক সমঝোতা (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয় যেন, ‘রাশিয়ার খাদ্যপণ্য ও সার রফতানি করা যায় কোনো বাধা ছাড়াই’।

বৈশ্বিক খাদ্যাভাব মেটাতে চতুর্পক্ষীয় চুক্তিটি বিরাট একটি অর্জন হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। কৃষ্ণসাগরের এই নিরাপদ করিডোরটি বিবেচিত হচ্ছে বাধা অপসারণে বিরাট পদক্ষেপ। ইউক্রেন ও রাশিয়ার উভয় পক্ষই যতক্ষণ পর্যন্ত চুক্তিটি রক্ষায় সম্মান দেখিয়ে যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত খাদ্য প্রয়োজন, এমন দেশগুলোকে সরবরাহ করা যাবে। তবে কিছু ঝুঁকি এখনো রয়েই গেছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের ফার্ম হাউজে এবং শস্যক্ষেতে হামলার ঝুঁকি রয়েই গেছে। রাশিয়া হয়তো যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ইউক্রেনিয়ান কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এমন হলে, সামনের দিনগুলোতে ইউক্রেনিয়ান পণ্য সরবরাহ কমে যাবে, এটি নিশ্চিত। কারণ দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধটা এখনো চলমান। যুদ্ধ চলে নিজ নিজ পক্ষের একান্ত পরিকল্পনায়; যদিও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন মনে করছেন, এই চুক্তির আওতায় ইউক্রেন মোট ২৫ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য রফতানির পরিকল্পনা করেছে। অপর পক্ষে, রাশিয়া এ বছরের শেষ নাগাদ কৃষ্ণসাগরের নতুন এই নিরাপদ করিডোর দিয়ে ৫০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য ও কৃষিপণ্য রফতানি করতে পারবে।

যুদ্ধকালে অবরোধ করা, বন্দরে মাইন পুঁতে রাখা, সবই বৈধ হয়ে যায়। তা সত্তে¡ও যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে কিছু শর্তও পালন করতে হয়। এটি করতে হয় বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করার জন্য, বেসামরিক নয় আবার যুদ্ধবাজ নয়, ‘এমন মানুষও যুদ্ধের আওতামুক্ত থাকে’। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা করা যায় না। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সব ধরনের যুদ্ধপক্ষকেই জেনেভা কনভেনশন (জেনেভা কনভেনশন ১ আর্টিকেল ৬৩; জেনেভা কনভেনশন ২ আর্টিকেল ৬২; জেনেভা কনভেনশন ৩, আর্টিকেল ১৪২; জেনেভা কনভেনশন ৪, আর্টিকেল ১৫৮ ) মেনে চলতে হয়। এই কনভেনশন অনুসারে, ‘সব পক্ষই বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষা দিতে বাধ্য’।

আবার ১৯০৭ সালে দ্য হেগ কনভেনশনেও (নং ৮) সব পক্ষকেই শান্তিপূর্ণ জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তায় সম্ভাব্য সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। দ্য হেগ কনভেনশন মানাও বাধ্যতামূলক। কিছু দিন আগে ইউক্রেন, রাশিয়া, তুরস্ক ও জাতিসঙ্ঘের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তা সব পক্ষকেই যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। কারণ সব পক্ষের জন্য এই দলিল আইনগতভাবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইউক্রেনিয়ান ও রাশিয়ান বন্দর ছেড়ে যাওয়া পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব চারপক্ষেরই। সব পক্ষকেই এই বোঝাপড়ার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, ‘তা থেকে বিরত থাকতে হবে’।


আরো সংবাদ


premium cement