০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪
ads
`

ফিলিপাইনের বাংসামোরো-মিন্দানাও

ফিলিপাইনের বাংসামোরো-মিন্দানাও - প্রতীকী ছবি

ফিলিপাইনের আদি অধিবাসী নেগ্রিতো জাতির মানুষজন প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপ থেকে এখানে আসে। একটা সময় দক্ষিণের মালয় জাতির লোকেরা আসে- যারা বারাংগে নামে সুপরিচিত। নবম শতকে চীনা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এসে বসতি স্থাপন করে। তারও বহু আগে আরব বণিকদের জাহাজ এখানে আসত- তাদেরই একটি অংশ ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চল মিন্দানাওতে ইসলামের প্রচলন শুরু করেন। পৃথিবীর স্বায়ত্তশাসিত উপদ্বীপগুলোর মধ্যে মিন্দানাও অন্যতম। এর দুই কোটি জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ মুসলমান।

ফিলিপাইন দীর্ঘ সময় মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। ‘মিরিকাই’, ‘সুলু’, ‘মাগিনদানিউ’ নামে তিনটি মুসলিম সালতানাতের স্বাধীন ছিল বর্তমানের ফিলিপাইন দেশটি। স্বাধীন মিরিকাই সালতানাতের সর্বশেষ মুসলিম শাসক ছিলেন ধর্মপ্রাণ গোলায়মান। ১৫২১ সালে স্পেনীয় নাবিক ম্যাগিলান ভারত মহাসাগর হয়ে মিরিকাই পাড়ি জমান। তাকে অনুসরণ করে বহু ইউরোপীয় সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে আসতে থাকে। বছরের শেষ দিকে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফার্দিনান্দ ম্যাগিলান স্পেনের পক্ষে মিরিকাই দ্বীপের সালতানাত দাবি করে। অবৈধ এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৫৬৫ সালে স্পেনীয়দের সাথে যুদ্ধে সুলতান গোলায়মান পরাজিত হন এবং তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী স্পেনের রাজা ফিলিপ মিরিকাই দখল করে নেয়। দ্রুত সময়ে স্পেন পার্শ্ববর্তী স্বাধীন সালতানাত সুলু ও মাগিনদানিউ কুক্ষিগত করে। স্পেনীয় বণিকরা মিরিকাইকে কেন্দ্র ধরে তিনটি সালতানাতকে একত্রিত করে। স্পেনীয় বণিকরা রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের নামে দেশটির নামকরণ করে ফিলিপাইন ও মিরিকাইয়ের নাম পরিবর্তন করে ম্যানিলা রাখে- যা বর্তমানে ফিলিপাইনের রাজধানী।

১৮৯৮ সালে স্পেন-মার্কিন যুদ্ধে মার্কিনিরা ম্যানিলা উপসাগরে স্পেনীয় নৌবহরকে পরাজিত করে। এমন সময়ে চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপিনো নেতা এমিলিও আগিনালদো ১৮৯৮ সালের ১২ জুন ফিলিপাইনকে স্পেন থেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। সাত হাজার ১০০ দ্বীপের সমন্বিত দ্বীপদেশ ফিলিপাইন ১৮৯৯ সালে স্পেনের অধিকার থেকে কথিত প্যারিস শান্তিচুক্তির ক্ষমতা বলে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে যায়। ওই বছরই মার্কিন শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপিনোরা বিদ্রোহ শুরু করে। ১৮৯৯-১৯০২ পর্যন্ত তিন বছরে মার্কিন-ফিলিপিনো যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিপিনো ও অসংখ্য মার্কিন সেনা নিহত হয়। ১৯০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ফিলিপাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত দেশটি আমেরিকার অধীনেই ছিল।

স্পেনীয়-আমেরিকা ও ফিলিপিনোদের গত কয়েক শ’ বছরের শাসনামলে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে মুসলিম আদিবাসীদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়েছে। যে মুসলিম জাতি কয়েক শ’ বছর আগেও শাসক ছিল, সাম্রাজ্যবাদী ইহুদি-খ্রিষ্টানদের চক্রান্তে তারা হয়ে যায় সংখ্যালঘু। ইউরোপে মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে ‘মুর’ বলা হতো। সেই ইউরোপীয়রা ফিলিপাইনে এসে একইভাবে মুসলমানদের মুর বলা শুরু করে। সেই মুর থেকে মোরো নামের উৎপত্তি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ফিলিপাইনের মুসলমানরা মোরো নামে সুপরিচিত। মোরো জাতির বসবাসের জায়গাটির নাম বাংসামোরো। দক্ষিণ ফিলিপাইনের মুসলিম অধ্যুষিত মিন্দানাও নিয়ে বাংসামোরো একটি স্বশাসিত অঞ্চল।

বর্তমানে ফিলিপাইন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান অধ্যুষিত স্বাধীন দেশ। দেশটির আদিবাসী মোরো মুসলিমরা ১৯৭০-এর দশকে মুক্তির সংগ্রাম শুরু করে। সরকার ক্ষমতা জিইয়ে রাখতে মুসলিম প্রধান মিন্দানাও, জুলু ও পাহলোয়ান দ্বীপপুঞ্জের ১৪টি প্রদেশে ইহুদি-ইসরাইলের মতো খ্রিষ্টান বসতি গড়ে তোলে। ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কিছু স্বাধীনতাকামী মুসলিম আদিবাসী গোষ্ঠী গত কয়েক দশক ধরে স্বাধীনতার প্রশ্নে লড়াই চালিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (MILF) ও মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (MILF) ও আবু সায়াফ অন্যতম।

জেবিদাহ গণহত্যা : জেবিদাহ গণহত্যার পর ১৯৬০-এর দশকে মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের জন্ম হয়। কিন্তু নীতির প্রশ্নে দ্বন্দ্বে গিয়ে ১৯৭৭ সালে মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ভেঙে যায়। এতে করে নুর মিসৌরির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট। প্রতিষ্ঠার পর এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ম্যানিলা সরকার বিদ্রোহ দমনে বেশ কয়েকবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সেনাবাহিনী পাঠিয়েও সুবিধা করতে পারেনি। মিন্দানাওয়ে তারা প্রত্যেকবার এমআইএলএফ যোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে।

লিবিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির মধ্যস্থতায় ১৯৭৬ সালে ফিলিপাইন সরকার ও MILF-এর মধ্যে আধা স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ত্রিপোলিতে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অবশ্য চুক্তিটি বেশি দিন টেকেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এমআইএলএফ গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতার চেষ্টা করে আসছে ফিলিপাইন সরকার। এই স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী দলটির সাথে বেশ কিছু ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের বেঁধে দেয়া বিভিন্ন শর্ত সরকারপক্ষ পালনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সমঝোতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই বিদ্রোহে ২০১৬ সাল নাগাদ প্রায় দুই লাখ নিরীহ ফিলিপাইনবাসীর মৃত্যু হয়েছে। ঘর ছাড়া হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ এবং চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়ে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। ১৯৯৭ সালে ম্যানিলা সরকার ও এমআইএলএফের মধ্যে সর্বপ্রথম স্বাক্ষরিত হয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি। কিন্তু ২০০০ সালে ম্যানিলার প্রেসিডেন্ট জোসেফ এসত্রাদা চুক্তি বাতিল করে সেনাবাহিনীকে দমন-পীড়ন চালানোর নির্দেশ দেন। ফলে, মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে চ‚ড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে।

মিন্দানাওয়ের মুসলমানদের ব্যাপারে মালয়েশিয়া সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। সত্তরের দশকে আসিয়ানের সভায় অঞ্চলটির মুসলমানদের অধিকার নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তুলেছিলেন মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী তুন রাজাক হুসেন। অশান্ত পরিস্থিতিতে ২০১১ সালে সেই মালয়েশিয়া দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপের আয়োজন করে। সেই থেকে ম্যানিলার যাবতীয় শান্তি প্রক্রিয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ মালয়েশিয়াকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে।

২০১২ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ফিলিপাইন সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী গওখঋ-এর মধ্যে অকল্পনীয় এক শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনা শুরু হয়। ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি কুয়ালালামপুরে ফিলিপাইন সরকার ও এমআইএলএফের মধ্যে সমঝোতাপত্র সই হয়। ওই সমঝোতা ছিল তখনকার ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইনের বড় অর্জন।

সমঝোতা চুক্তিতে সরকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের আশ্বাস দেয় যে, সরকার মিন্দানাওসহ দক্ষিণের বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বায়ত্তশাসন দেবে। বিনিময়ে এমআইএলএফের ১১ হাজার যোদ্ধার একটি বড় অংশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেবে এবং অন্যরা পর্যায়ক্রমে অস্ত্র সমর্পণ করবে। এই সমর্পণের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে তৃতীয় কোনো পক্ষ। তা ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন খনি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ৭৫ শতাংশ মিন্দানাওতে থাকবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পাওয়া করের অর্ধেক সেখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। স্বায়ত্তশাসিত এলাকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব গওখঋ-এর হাতে থাকবে। তাই অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দমন করার কী পরিমাণ ক্ষমতা তাদের আছে, তার ওপর শান্তিচুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে।

১৯৯৬ সালে আরেকটি বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠী মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সাথে ফিলিপাইন সরকারের শান্তি চুক্তি হয়। কিন্তু ওই চুক্তিতে বিদ্রোহীদের হাতে অস্ত্র রাখার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল বলে শেষ পর্যন্ত শান্তি আসেনি। মুখ দেখাদেখি বন্ধ না করে আন্তরিকতা নিয়ে আলোচনা করলে শান্তির জন্য সমাধানের পথ বের হবেই। তার প্রমাণ সরকার ও এমআইএলএফের মধ্যে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সই করা চুক্তি।

অবশেষে মালয়েশিয়া সরকারের উদ্যোগের চ‚ড়ান্ত সাফল্যে ১৭ বছর ধরে চলা আলোচনায় ফলাফল আসে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার সরকারি হাউজে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের উপস্থিতিতে সরকারের পক্ষে শান্তিচুক্তিতে সই করেন প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইন ও বিদ্রোহীদের পক্ষে এমআইএলএফের চেয়ারম্যান মুরাদ ইবরাহিম। এই সময় সরকারি উচ্চপদস্থ জনবলসহ এমআইএলএফের পাঁচ শতাধিক সদস্য উপস্থিতি ছিলেন ।

চুক্তিতে মুসলিম অধ্যুষিত বাংসামোরোকে সরকারের পক্ষ থেকে স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বাংসামোরোকে বাজেট ও পুলিশ গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়। এমআইএলএফের সিনিয়র ফিল্ড কমান্ডার ও গোষ্ঠীর মুখপাত্র ভন আল-হক, যিনি ১৯৭২ সাল থেকে সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রশ্নে লড়ছেন- আল-জাজিরাকে বলেন, তাদের তরুণ যোদ্ধারা পুরো জীবনই যুদ্ধ দেখেছেন। তারা এখন নিজ পরিবারের কোলে ফিরে যেতে চান। স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চান। আধুনিক বিশ্বও তাই আশা করে।

১৯৭০ দশকের দিকে মিন্দানাও অঞ্চলকে একটি মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র বানানোর দাবি নিয়ে যে আন্দোলন, তা ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি ও ৬ ফেব্রুয়ারির দ্বি-পর্যায়ের নির্বাচনে চ‚ড়ান্ত আলোর মুখ দেখে। অবশ্য তার আগের বছর ফিলিপাইনের কংগ্রেস গণভোটের বিষয়ে অনুমোদন দেয়।
পরে এক গণভোটের মধ্য দিয়ে ফিলিপাইনের পাঁচটি প্রদেশ, তিনটি মহানগর, ১১৬টি পৌরসভা ও দুই হাজার ৫৯০টি গ্রাম বাংসামোরোর অংশে পরিণত হয়। আয়তনের ভিত্তিতে ফিলিপাইনের কংগ্রেসে আটজন মুসলিম প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পান।

লেখক : কলামিস্ট


আরো সংবাদ


premium cement