০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

বস সবসময় সঠিক বনাম ভাইয়া-আপু সংস্কৃতি

বস সব সময় সঠিক বনাম ভাইয়া-আপু সংস্কৃতি - ছবি : সংগ্রহ

সরকারি অফিসে কিছু সিনিয়র অফিসারদের বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের বিশাল কাচের নিচে এক সময় একটা লেখা দেখা যেত, 'Boss is always right.' এটি উপনিবেশিক শব্দ। উপনিবেশিক সময় থেকে এই বস শব্দটা প্রচলিত হয়ে এসেছে এবং একজন বস যে বড়সড় কিছু একটা সেটা ওই সময় থেকেই অধঃস্তনদের মাথায় গেঁথে দেয়া হয়েছে। শব্দটার অর্থ শুধু সেখানে থেমে থাকে নেই, বস যে কখনো ভুল করতে পারে না, বস যে ভগবান তুল‍্য এবং তার কোনো আদেশ-নিষেধ-উপদেশ অমান্য করা যায় না- ইত্যাদির ইঙ্গিতও দিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কারণে ইংরেজ চলে গেলেও, ইংরেজি লেখাটা সযত্নে রেখে দেয়া হয়েছে, তাও সরকারি দফতরে।

এতে করে যে ভীষণ ক্ষতিটা হয়েছে, সেটা হলো সিনিয়রদের সাথে জুনিয়রদের শুধু মানসিক দূরত্বই বাড়েনি, অনেক সময় রেষারেষির পর্যায়ে যাবার উপক্রম হয়। কারণ কোনো মানুষই নিখুঁত নয়। ভুল অবশ্যই সবার করে এবং করবেই। কিন্তু সেই ভুল দেখিয়ে দেয়ার রাস্তায় সব থেকে বড় বাধা এই boss is always right-এর মাধ্যমে সিল করে দেয়া হয়েছে। পরিণামে অনেক সময় সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক রেষারেষি সম্পর্কের দিকে চলে যায়।

কোনো সম্পর্ক যখন রেষারেষির পর্যায়ে চলে যায় তখন খুব স্বাভাবিকভাবে শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতার সৃষ্টি হয়। সরকারি কাজ সমষ্টিক কাজ। সেখানে একা কেউ কোনো কাজ সম্পন্ন করতে পারেনা, করা সম্ভবও না। এখন কথা হলো এভাবে শত্রুভাব সৃষ্ট কোন কাজ সম্পন্ন করতে গেলে অনেক বাধা এসে হাজির হয়। কোনো নির্দিষ্ট কাজ করার সময় হয়তো দেখা গেল, কাজটা করলে, জনগণের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি হবে, কিন্তু বস যেহেতু সবসময় ঠিক, কাজেই জেনে বুঝে ওই বেঠিক কাজ অনিচ্ছা সত্তেও করতে হয়। ফলে জুনিয়র তখন গড়িমসি করে বা ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে কাজটা করতে থাকে। কাজের গতি কমে যায়, নানা বাধার সৃষ্টি হতে থাকে। কোনো কাজে বাধা পড়ার অর্থ কাজটা পিছিয়ে যাওয়া। এভাবে কর্মক্ষেত্রে জটিল জটিল সমস্যা এসে হাজির হতে থাকে । এতে করে শুধু জুনিয়র অফিসার নয়, দু'পক্ষেরই মানসিক যন্ত্রণা, টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। আর রাষ্ট্রের ক্ষতিকর দিকটা তো থেকেই যায়।

এই যে দিনের পর দিন ভুল একটা ইংরেজি শিক্ষা ( আররোপ্রচুর ভুল শিক্ষা দেয়া হয়, সবটা অবস্থা বোঝাবার জন‍্যে এখানে একটা উদাহরণ দেয়া হলো) সরকারি অফিসগুলোতে দেয়া হয়, সেই ভুলগুলো সংশোধন করার মানসিকতাও কারোর ভেতরে জেগে ওঠে না। অবশ‍্য আজকাল এই তোষামোদের সময়কালে, ইংরেজি বাক‍্যটা লেখা না থাকলেও, অন্ধের মতো সবাই বসকে অনুসরণ করে। অর্থাৎ boss is always right. এখন আর স্বচ্ছ কাচের নিচে লিখে রাখতে হয় না, জুনিয়ররা নিজ দায়িত্বে এই কর্তব্য পালন করে। এই যে নিজ দায়িত্বে ( তোষামোদের কারণে ) বসদের ভুল কাজগুলো বিনা প্রতিবাদ বা দ্বিধায় মেনে নেয়ার মন-মানসিকতা, এটা হলো উত্তর-উপনিবেশিক প্রক্রিয়াজাত মন অর্থাৎ উপনিবেশিক যুগের পরবর্তী যুগের পরিমার্জিত মন। উপনিবেশিক মনের চেয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক মন আরো ভয়ঙ্কর। আরো বিধ্বংসী। কারণ, এই উত্তর-উপনিবেশিক মন কেউ কাউকে বাধ‍্য করেনা, বাধিত মনে মানুষ নিজেই বদ্ধ হয়ে যায়। যে বন্দিত্ব সে নিজেও বুঝতে পারে না। বন্দিত্বকেই মনে করে মুক্তি।

কেনিয়ার লেখক গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো তার 'ডিকলোনাইজেশন অফ দ‍্যা মাইন্ড' বইটিতে শেখ হামিদু কেনের উপন‍্যাস 'অ‍্যাম্বিগিউস অ‍্যাডভেঞ্চার'-এর বরাত দিয়ে উত্তর-উপনিবেশিক সাম্রাজ‍্যবাদ কিভাবে প্রথম বন্দুকের শাসনের পর চক আর ব্ল‍্যাকবোর্ডের মাধ‍্যমে নম্র-ভদ্রভাবে, মোলায়েম দক্ষতার সাথে উত্তর বা পরবর্তী উপনিবেশিত মন সৃষ্টি করে তার একটা চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন- 'কৃষ্ণাঙ্গদের মহাদেশে যে কেউ বুঝতে শুরু করে, আসল ক্ষমতা প্রথম প্রত‍্যুষের গোলার মধ‍্যে থাকে না, বরং গোলার পরে যা আসে তার মধ‍্যে থাকে। সেই গোলার পেছনেই ছিল নতুন স্কুল। আর নতুন স্কুলের ছিল গোলা আর চুম্বক দুটিরই স্বভাব। গোলার কাছ থেকে নিয়েছে যুদ্ধবাজি অস্ত্রের দক্ষতা। কিন্তু গোলার চেয়েও বেশি স্থায়ী বিজয় অর্জন করেছে নতুন স্কুল। গোলা শক্তি প্রয়োগ করে শরীরের ওপর। আর স্কুল দুর্বার আকর্ষণে টানে আত্মাকে। আমার দৃষ্টিতে ভাষাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন, যেটা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আত্মাকে আকর্ষণ করেছে এবং বন্দি করে ফেলেছে।' এভাবেই আমরা 'Boss is always right'-এর মতো ব্রিটিশদের ইংরেজি প্রবাদ বাক‍্যের ক্ষমতা জালে শুধু আটকা পড়ি নাই, সেইসাথে তোষামোদের মাধ‍্যমে বস অর্থাৎ ক্ষমতার প্রতি নতজানু চিত্তে নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিতেও শিখেছি। উপরে উল্লেখিত উত্তর-উপনিবেশিক প্রক্রিয়াজাতকরণ বলতে এই আত্মবিসর্জনকে বুঝিয়েছি। এখন আর টেবিলের কাচের নিচে Boss is always right লেখা না থাকলেও, আমরা ধরেই নেই বস যা বলেন, সেটাই ঠিক।

কিন্তু বেসরকারি অফিস, ব‍্যাংক ইত্যাদির চিত্রটা একেবারেই আলাদা। উপনিবেশিক বা উত্তর-উপনিবেশিক প্রভাব তাদের মধ‍্যে সেভাবে এখন আর কাজ করতে পারে না। তাদের কাছে বস বা স‍্যার শব্দটা একেবারেই অর্বাচীন। তারা তাদের বসকে স‍্যারের বদলে 'ভাইয়া বা আপু' ডাকতে শিখে গেছে। তোষামোদের ধার করা ধারণা। কারণ তাদের কাছে কাজটাই মুখ‍্য আর সবকিছু গৌণ। কাজ মানে দক্ষতা, যে যত দক্ষ তার উন্নতিও তত। যদিও তাদের বিশাল মাল্টিন‍্যাশনাল কোম্পানির আড়ালে অন‍্য ধরনের exploitation আছে। সেটা একেবারেই ভিন্ন বিতর্ক। বৈশ্বিক সমস্যার বৈশ্বিক সমাধানের বিষয়। কিন্তু এই ভাইয়া বা আপু ডাকের সংস্কৃতি সম্পর্কের দূরত্ব কমিয়ে এনেছে। শ্রদ্ধা আছে, কিছুটা প্রশ্রয়ও আছে। কিন্তু বেয়াদবি নেই। বসের কোথাও ভুল হলে বা তার সঙ্গে দ্বিমত করলে নির্দ্বিধায় তারা বলতে পারে। নতজানু হয়ে নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিতে হয়না। এই ভাইয়া বা আপুর দল, ইংরেজি জানে, কিন্তু ইংরেজ হবার বাসনা করে না। এরা দেশীয় কায়দায় নিজেদের আপডেটেড রাখে, বিদেশী আপডেটের অনুকরণ করে না। এরা নিজগুণে বড় হতে চায়, পরের মুখের ঝাল খেয়ে বড় হয় না। আর এরাই আমাদের ভবিষ্যতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব


আরো সংবাদ


premium cement