১৭ মে ২০২২
`

যায় যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান


বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটি দেখেননি বা এ ছবির কথা শোনেননি, বয়সে একটু প্রাচীন বা মধ্যবয়সী এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটি নিছক একটি সিনেমাই নয়; রূপকের আশ্রয়মিশ্রিত এই সিনেমাটিতে কিছু ধ্রæব সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের একজন শাসক যখন অত্যাচারী হয় তখন সেই রাষ্ট্রের প্রজাদের জীবনে কী দুর্বিষহ যাতনা নেমে আসে তারই চিত্র ফুটে উঠেছে এ সিনেমাটির কাহিনীতে। শাসকের অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতনে রাষ্ট্রের নাগরিকরা কতটা অসহায় তারই প্রতিচ্ছবি এই চলচ্চিত্রটি। একটি গণতন্ত্রহীন সরকারের অধীনে রাষ্ট্রের নাগরিকরা যেমন অধিকারবঞ্চিত থাকে, তেমনি অধিকারের কথা বলতে গেলে জেল, জুলুম, নির্যাতন সহ্য করতে হয়। একনায়কতান্ত্রিক সরকারের মূল কথা- যেমন এক ব্যক্তির কথাতেই রাষ্ট্রের সব পরিচালিত হয়, বিচার-আচার হয়, নাগরিকের অধিকার তার ইচ্ছায় পরিচালিত হয় হীরক রাজার দেশে; তেমনি এক শাসকের চরিত্রই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হীরক রাজা যেমন তার মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘হে আমার মন্ত্রীসব, তোমরা যাদের আমি পুষি, তোমাদের কাজে আমি বেজায় খুশি।’ রাজার এমন উক্তিতেই বোঝা যায়, রাজার মন্ত্রীরা রাজার কতটা অনুগত। একান্ত গোলামের মতোই রাজার সব অন্যায়-অত্যাচার মেনে নিয়ে রাজাকে খুশি করার জন্য অবিবেচকের মতোই রাজার প্রশংসা করে চলছে। আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতাও আজ এমন এক অন্ধ অবস্থায় প্রবেশ করেছে। রাজনীতির বাইরের একটি গোষ্ঠীও প্রশংসা করার জন্য সৃষ্টি হয়েছে, তারা আবার ‘বুদ্ধিজীবী’ নামে পরিচিত। তাদের কাজ শাসকের অন্যায়কে ন্যায় বলা, জনগণের অধিকার শাসকের বিশেষ বাহিনীর বুটের নিচে পিষ্ট হলেও ওই শ্রেণীকে বলতে শোনা যায়- সব অধিকার এই শাসকের আমলেই জনগণ ভোগ করতে পারছে। বিশেষ সুবিধাভোগী এই শ্রেণীর কাজ, সরকারের তোষামোদ করে আরো বেশি সুবিধা আদায় করা। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দর্শকদের যারা টকশো দেখতে অভ্যস্ত তারা বোধ করি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন তোষামোদকারী কত প্রকার ও কী কী। অবশ্য আমাদের শাসকশ্রেণী জানে কিভাবে বুদ্ধিজীবীদের ক্রয় করা যায়।

হীরক রাজা তার জনগণ সম্পর্কে যেমন বলেন, ‘এরা যত পড়ে তত বেশি জানে, আর তত কম মানে’। সত্যিই আমাদের শাসকশ্রেণীর মনেও হীরক রাজার মতো ভয় কাজ করে; তাই তারাও চায়, তাদের জনগণকে যত বোকা বানিয়ে রাখা যায়। তাদের ধারণা, জনগণ সচেতন হলেই সমস্যা; তাদের সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে যেতে পারে। এ জন্যই শাসকশ্রেণী জনগণের চিন্তার জগতে আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করে থাকে। আর এ কাজে সাহায্য করে আসছে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর একটি অংশ। তাদের কাজই হলো, জনগণকে ধোঁকা দেয়া এবং সরকারের সব অবৈধকে বৈধ বলে সমাজে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা।

হীরক রাজার দেশের চিত্রই যেন আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন সেই সরকারের ধারক বাহককে খুশি করার জন্য একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্ম হয়েছে । মন্ত্রী থেকে আমলা, সাংবাদিক থেকে বুদ্ধিজীবী সবাই ব্যস্ত সরকারপ্রধানকে খুশি করে কিছু বলার জন্য। আমাদের সরকার বাহাদুররাও চায়, সবাই তাদের প্রশংসায় ব্যস্ত থাকুক। প্রশংসা ছাড়া মন্দ কাজের জন্য সমালোচনা কোনো সরকারকেই বরদাস্ত করতে দেখি না। তারা সব কাজের জন্যই প্রশংসা চায়। সমালোচনাকারীদের পরিণতি কী হয়, তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে কম নেই। রেডিও, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা, বইপুস্তক সর্বত্রই ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার না করে শুধুই প্রশংসার ডালা মেলে বসেছে। এর নেতিবাচক দিকটি আমরা একবারো চিন্তা করছি না। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সমাজ সভ্যতায় এর কী প্রভাব পড়বে তাও ভেবে দেখি না। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে আজ ব্যক্তিস্বার্থে নিমজ্জিত হয়ে আমরা যে তুষ্টিযুদ্ধে নেমেছি এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব আমাদেরকে বহন করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে প্রথমেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রাখতে হবে। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর এই ক্ষুদ্র দেশে শাসকের ন্যায়পরায়ণতা, গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সভ্যতা বজায় রাখা সম্ভব। প্রতিহিংসা ও নাগরিক অধিকারকে বঞ্চিত করে কোনো সমাজ সভ্যতায় শান্তি আসতে পারে না। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সব কাজেরই প্রশংসা করে রাজাকে তুষ্ট করার চেয়ে জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বললে জনগণ যেমন তার অধিকার ফিরে পাবে; সরকার বাহাদুরও জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে সাহস পাবে না। শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবীদের সাহসী ভ‚মিকা সব দেশের জন্যই আবশ্যক। সাহসী ভ‚মিকা না রেখে আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও যদি সরকারের অন্যায়কে মেনে নিয়ে একান্ত বাধ্যগতদের মতো বলে বসেন, ‘যায় যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান’, তা হলে তো আর কোনো কথা নেই।

আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার ইতিহাস কারো বশ্যতা করার জন্য সৃষ্টি হয়নি। কেউ রাষ্ট্রের ‘ভগবান’ হয়ে রাষ্ট্রের জনগণের অধিকার নিয়ে খেলা করবে সেই জন্যও সৃষ্টি হয়নি। কৃষক, কামার, কুমার, জেলে, নাপিত, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক সবারই দায়িত্ব হলো যে, সমাজ গঠনে ভ‚মিকা রাখা এবং রাষ্ট্রের দায় রয়েছে সব জনগণের অধিকার ভোগ নিশ্চিত করা। ভুলে গেলে চলবে না, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সমুন্নত এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনা সমুজ্জ্বল রাখতে, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করতে এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। কারো তাঁবেদারির কাছে মাথা নত করার জন্য এই জাতির সৃষ্টি হয়নি। ভাত-কাপড়ের অধিকার, শিক্ষা লাভের অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, ভোটের অধিকার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্মগত অধিকার। এ অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে কোনো শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে, ‘হীরক রাজার’ ভ‚মিকা পালন করবে তা হলে তা হবে মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের রক্তের সাথে বেঈমানি।

হীরক রাজা তার মন্ত্রীদের কর্মে খুশি হয়ে তাদের হীরার মালা উপহার দেন। রাজা মন্ত্রীদের ওপর খুশি কারণ মন্ত্রীরা রাজার হুকুম পালনে গড়িমসি করে না, বরং রাজার প্রতিটি অন্যায় কাজকে তারা প্রশংসার বাণী ছড়িয়ে রাজাকে খুশি করার চেষ্টা করেন। আমরাও বর্তমান সরকারকে এমন উপহার দিতে দেখেছি। একান্ত বশ্যতার উপহার হিসেবে হীরার মালা না দিলেও মন্ত্রী কিংবা বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের দামি ব্রান্ডের গাড়ি উপহার দেয়ার নজিরও বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে। উপহার পেয়ে আমাদের বড় বড় ব্যক্তিরাও ন্যায়-অন্যায় ভুলে গিয়ে হীরক রাজার মন্ত্রীদের চেয়ে কম প্রশংসার বাণী ছড়ান না। এটি রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করার একটি কৌশলও বটে। রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি পাচার হয়ে যায়, ব্যাংক ভোল্ট শূন্য হয়ে যায়, বড় বড় প্রজেক্টের নামে দুর্নীতি এত বেশি হয় যে, স্বয়ং মন্ত্রীকেই বলতে হয়েছিল, আগে হতো পুকুর চুরি, এখন হয় সাগর চুরি’। অথচ আমাদের নেতা, আমলা ও বুদ্ধিজীবীরা এগুলোকে মানুষের দৃষ্টিগোচর রাখার জন্য সারাক্ষণ সরকারের প্রশংসায় ব্যস্ত। এতে রাষ্ট্র যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; মানুষের মধ্যেও অন্যায়কে মেনে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। মানুষ যখন বেশি মাত্রায় অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে শিখবে তখন সামাজিক সঙ্কট তীব্রতর হতে থাকবে। এর ফলে সমাজে একটি শ্রেণী চরম বৈষম্যের শিকার হবে; যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ধারীদের এ সত্যকে অনুধাবন করা উচিত।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, রাজা আমাদের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘মিষ্টিকুমড়া দিয়েও তো বেগুনি হয়’। আর আমাদের মন্ত্রী, আমলা, বুদ্ধিজীবীরা সায় দিয়ে বলেন, স্বাদে-গুণে সে এক চমৎকার! সে চমৎকার! চমৎকার সে হতেই হবে যে, হুজুরের মতে অমত এমন সাহস কার? শাসক যদি সত্যিকার অর্থে জনভোটে নির্বাচিত হতেন, তিনিও মোসাহেবদের এই মোসাহেবির উত্তর এভাবেই দিতেন, ‘জাগিয়া দেখিনু, ‘জুটিয়াছে যত হনুমান আর অপদেব।’

আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে। একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এবং দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতিকে একই প্লাটফর্মে আনার জন্য আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া সম্ভব নয়। মোসাহেবির বিনিময়ে ব্যক্তি বিশেষ সুবিধা লাভ করলেও গোটা জাতির জন্য তা সর্বনাশা।
harun_980@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement
সিআরপিএফের দখলে বারানসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ চত্বর আগামী জুলাই থেকে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করতে দেয়া হবে না : ডিএসসিসি মেয়র ত্রিপুরায় রাতারাতি মুখ্যমন্ত্রী বদল! শেষ রক্ষা হবে কি বিজেপির? সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে ন্যাটোতে দেখতে চায় না তুরস্ক সম্রাটের জামিন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে দুদকের আবেদন কদমতলীতে গৃহবধূকে গলা টিপে হত্যার অভিযোগ : স্বামীসহ আটক ৪ হজযাত্রীদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা প্রেমের বিয়ের ৮ বছর পর স্ত্রীকে হত্যা, স্বামী গ্রেফতার রূপায়ণ সিটি উত্তরার প্রবেশ সড়ক উদ্বোধন চট্টগ্রাম বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে জাপানি ‘সনি’ ব্র্যান্ড এখন পাওয়া যাবে সব ট্রান্সকম ডিজিটাল আউটলেটেও

সকল