১৯ মে ২০২২, ০৫ জৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

সড়ক ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা কই

অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম -

প্রয়োজনের তাগিদে আমাদের রাস্তায় চলাচল করতে হয়। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছার জন্য যানবাহনে উঠতে হয়; কিন্তু যন্ত্রদানব নানা বয়স ও শ্রেণীর মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। একই পরিবারের পাঁচ-ছয়জন একই সাথে নিহত হওয়ার খবর যখন পত্রিকার পাতা ও টিভির পর্দায় দেখি তখন হৃদয় কেঁপে ওঠে।

২০২১ সালে দেশে সর্বমোট ৫৩৭১টির মতো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬২৮৪ জন নিহত এবং ৭৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। এটা সঠিক পরিসংখ্যান সম্ভবত নয়! কারণ গ্রামগঞ্জের সব দুর্ঘটনার খবর সংবাদপত্র কিংবা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না। এগুলোর মধ্যে ৬২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। ২০২১ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২২১৪ জনের মৃত্যু হয় যা ২০২০ সালের তুলনায় ৫০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। আর্থিক ক্ষতি ৯৬৩১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৩ শতাংশ। এ দুর্ঘটনার নিহতদের ১৩ শতাংশ হচ্ছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ সময় দৈনিক গড় মৃত্যুর হার ছিল ১৭ জন। এই চিত্রটা দিন দিন বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১৩.৫ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ১৭ শতাংশ। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সঠিক কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় দিন দিন দুর্ঘটনা বাড়ছে। মৃত্যুযন্ত্রণা ও আহতদের আর্তনাদ বাড়ছে।

বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোতে বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে চালকদের অদক্ষতায়। এর অন্যতম কারণ, চালক নিজে গাড়ি না চালিয়ে সহকারী অথবা এমন কেউ গাড়িটি চালান যার কোনো লাইসেন্সই নেই। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হিসাবে সারা দেশে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজি, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ মোট গাড়ি ৪৪ লাখের বেশি রয়েছে। এর বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়েছেন ২২ লাখ চালক। অর্থাৎ সাড়ে ২১ লাখ চালক কোনো লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। তাদের গাড়ি চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। ফলে সড়কে ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ। এ ক্ষতি পূরণ হবার নয়। শুধু চালকদের জেল জরিমানা কিংবা শাস্তি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ হয় না। নব্বইয়ে দশকে গাড়িচালকদের ওপর একটি জরিপ করা হয়। ওই জরিপে দেখা গেছে, ২৭ শতাংশ গাড়ির চালক সিগন্যালের রং বুঝতে পারেন না। তারা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসেন।

দেশের বিভিন্ন সড়কে প্রায়ই বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। বিশেষ করে ময়মনসিংহ সড়কের কথা বলা যায়। বিশাল সড়ক করা হয়েছে। যাতে যানবাহনের চাপ কমে। কিন্তু এই সড়কের বিভিন্ন জায়গায় দুই-তৃতীয়াংশ কোথাও অর্ধেক অংশ বাজার দখল করে বসে আছে। সড়কের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে লাভ হয়নি। বেশির ভাগ সড়ক দখলদারের হাতে চলে গেছে। যারা সড়কে চলাচল করেন তাদেরও সচেতনতার অভাব রয়েছে। পথচারীরা মোবাইলে কথা বলতে বলতে কিংবা গল্প করতে করতে যখন রাস্তা পার হচ্ছেন; তখনই গাড়ি এসে চাপা দিয়ে দিচ্ছে। রেললাইনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে কিংবা হেডফোন কানে দিয়ে রেললাইনের উপর দিয়ে হাঁটছেন। ঠিক সে মুহূর্তে পেছন থেকে ট্রেনের ধাক্কায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়াও সড়ক-মহাসড়কে বিভিন্ন রকমের চাঁদাবাজি এড়াতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায় গাড়ি বেপরোয়া গতিতে ছুটে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসে। এরপর ট্রাফিক ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা দৃশ্যমান। যেখানে চারজন পুলিশ দরকার; সেখানে দু’জন এবং যেখানে ছয়জন থাকার কথা সেখানে তিনজন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকে ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যাল অমান্য করে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুতগতিতে চলে গেলেও ধাওয়া করার ব্যবস্থা নেই। দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। জাপান এর একটা সমাধান বের করছে। দেশটি রাস্তার মধ্যে শিশুদের থ্রিডি ছবি এঁকেছে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো শিশু রাস্তার মধ্যে চলে এসেছে। এটা দেখার পর চালক আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যান। ফলে সেখানে দুর্ঘটনার হার অনেকটাই কমেছে।

সড়ককে নিরাপদ সড়কে পরিণত করতে হলে, দুর্ঘটনামুক্ত করতে হলে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যারা কাজটা করবেন তারাই কিন্তু বসে আছেন সড়ক দখল করে। ফলে কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। যারা বয়সে প্রবীণ তাদের অবশ্যই স্মরণ থাকার কথা ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনে একজন ছাত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এ ঘটনায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ক্ষোভে ফুঁসে গর্জে উঠেছিল। সারা দেশে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়েছিল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে বাইয়ের গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে সব রকমের গাড়ি চলাচল করে, দুর্ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই একটি কমিটি করে দেয়া হয়। গঠিত কমিটিকে সুপারিশ করার একটা পরামর্শ দেয়া হয়। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। কমিটি গঠন এবং সুপারিশ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বিআরটিএ’র জনবল বাড়াতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে হবে। এটি এখন সময়ের দাবি। চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গাড়ির লাইসেন্স দেয়ার ব্যবস্থা এবং প্রতি বছর এ লাইসেন্স নবায়ন করার ব্যবস্থা করা দরকার। রাস্তাঘাটের উপরে এবং পাশে দোকানপাট, বাজার বন্ধ করা দরকার। চাঁদাবাজি অবশ্যই নয়! জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করা দরকার। মিডিয়ায় শুধু একটি ‘দুর্ঘটনা একটি কান্না’ এ কথা বললেই হবে না। মিডিয়াকে জনবান্ধব হতে হবে। এটার জন্য দরকার প্রশিক্ষণমূলক, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান। সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক ও চক্ষুরোগ রিশেষজ্ঞ
Email- shah.b.islam@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement