২১ মে ২০২২
`

সংখ্যালঘুদের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংঘর্ষ বাধানোর চেষ্টা

-

উত্তরপ্রদেশসহ ভারতের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনের মওসুমকে অতিথি বা পরিযায়ী পাখিদের স্থান বদল বা পরিযানের মওসুমের সাথেও তুলনা করা হয়ে থাকে। সর্বদা ক্ষমতায় থাকার অভিলাষী ব্যক্তি পোশাকের মতো নিজেদের আনুগত্যও বদলে ফেলে। এখন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশে এ ধারার সবচেয়ে বড় বাজার বসেছে। শাসক দল বিজেপির কয়েকজন মন্ত্রী ও বিধায়ক দলবদল করে সমাজবাদী পার্টির আঁচল ধরেছে। ডবল ইঞ্জিন সরকারের দাবিদার বিস্ফোরিত চোখে এ দৃশ্য দেখছে। নিজেদের এই ব্যর্থতা লুকাতে বিজেপি সেই বিদ্বেষের ভাইরাস ছড়াতে শুরু করেছে, যা তাদের সবচেয়ে বেশি প্রিয় খোরাক। তবে এবার যে ধরনের বিষাক্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, তা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। অর্থাৎ বিজেপি হিন্দুত্ববাদের অ্যাজেন্ডায় অনুগত থেকে মুসলমানদের কোণঠাসা করতে কোনো চেষ্টাই বাদ দিচ্ছে না। এ জন্য হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে প্রকাশ্যে এমন এক রেখা টেনে দেওয়া হচ্ছে, যা এর আগে কখনো করা হয়নি। হিন্দু-মুসলমানদের সম্পূর্ণরূপে দুই জাতিতে বিভক্ত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা করা হচ্ছে।

এবার মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আচরণবিধি সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হবে এবং পরিস্থিতি নোংরা করতে কোনো চেষ্টাই বাদ দেওয়া হবে না। ইউপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বেশ কুৎসিত ভঙ্গিতেই এর সূচনা করেছেন। একটি নিউজ চ্যানেলের সভায় দেয়া তার বক্তব্য শুধুই স্পষ্ট নির্বাচনী আচরণবিধি বিরোধী নয়, বরং দেশের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সংবিধানেরও স্পষ্ট বিরোধী। যোগীর এ বক্তব্যে এটাই অনুমিত হয়, তার কাছে যেমন সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতির কোনো পরোয়া নেই, তেমন তার সেই শপথেরও কোনো মূল্য নেই, যা তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময় গ্রহণ করেছিলেন। ৮০ ভাগ বনাম ২০ ভাগের লড়াইয়ের অভিমত তুলে ধরে তিনি তার অবস্থানটা পুরোপুরি প্রকাশ করে দিয়েছেন। এমনটা করে তিনি তার সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিদ্বেষী মানসিকতাকেই সুদৃঢ় করেছেন।

ইউপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এমনিতেই অতীতেও এমন সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু তিনি ঠিক নির্বাচনের মুহূর্তে সমাজে বিদ্বেষ ছড়ানো ও প্রীতিময় সাম্প্রদায়িক পরিবেশকে বিষাক্ত করতে যা কিছু বলেছেন, তা পেছনের সব বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, এ নির্বাচন শতকরা ২০ ভাগ বনাম ৮০ ভাগের মাঝে হবে। তিনি নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন, ৮০ ভাগ লোক তারা, যারা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে খুশি। আর বাকি ২০ ভাগ লোক তারা, যারা ঘুষ, দুর্নীতি, মাফিয়া, বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসকে পছন্দ করে। এ ব্যাখ্যায় তিনি কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নাম নেননি। কিন্তু যেদিকে লক্ষ্য করে তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য, তা সবাই জানেন। এ জন্য এই বক্তব্য নির্বাচনকে হিন্দু বনাম মুসলমানের লড়াই ঘোষণা বলে অভিহিত করা হচ্ছে। সবাই জানেন, যোগী সরকার তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে উন্নয়ন ও সুখ-শান্তির ঢোল পিটিয়েছে, বাস্তবে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই করেনি। যোগী প্রকাশ্যে এমন কাজ করেছেন, যা সাংবিধানিক শপথ গ্রহণকারী কোনো মুখ্যমন্ত্রী করতে পারেন না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার সাথে ন্যায় আচরণ করার তার সাংবিধানিক শপথ ধোঁকা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিশৃঙ্খলাকারী ও সন্ত্রাসীদের সাথে তুলনা করেছেন। এমনকি তিনি তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যে দামী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন, তন্মধ্যে কয়েকটি ইশতেহারে মুসলমানদের বিশৃঙ্খলাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতেও কোনো লজ্জা অনুভব করেননি।

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ আস্থার নামে নির্বাচন লড়াইয়ের মৌখিক দাবি করা সত্ত্বেও হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে দ্বন্দ্ব আরো গভীর করার চেষ্টা করছেন। যাতে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বেশি ভোট পেতে পারেন। তবে এটা তার উচ্চাকাক্সক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতি নাখোশ। জনগণের তার শাসনামলের সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা গত বছর সেই সময়ই হয়েছে, যখন করোনা মহামারীর কারণে পুরো প্রদেশে হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছিল। ভয়ঙ্কর মহামারীতে আক্রান্ত লোকজন দ্বারে দ্বারে ছুটে বেড়াচ্ছিল। কোথাও তারা নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছিল না। সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। সেখানে বেড ছিল না, অক্সিজেন ছিল না, ওষুধ ছিল না, ছিল না ভ্যাকসিন। এমনকি এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের শেষ আনুষ্ঠানিকতারও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ প্রিয়জনের লাশ নিয়ে শ্মশান ঘাটে বারবার ঢুঁ মারছিল। অথচ এটা তো সেই সরকার, যারা বলেছিল, এর আগের সরকার কবরস্থানগুলোতে সরকারি অর্থ ব্যয় করেছিল। পক্ষান্তরে এই সরকার শ্মশান ঘাট বানিয়েছে। কিন্তু যখন প্রয়োজন দেখা দিলো, তখন দেখা গেল শ্মশান ঘাটের কোনো অস্তিত্বই নেই। চরম নির্মমতা হচ্ছে, অসংখ্য লাশ গঙ্গার তীরে খড়কুটোর মতো ভাসছিল এবং সরকারি দফতরগুলো সেগুলো লুকানোর চেষ্টা করছিল। এই সরকারি অব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষ এতটাই অসন্তুষ্ট হয়েছে যে, তারা শাসক দলকে শিক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিজেপি ‘গুড গভর্নেন্সের’ নামে ভোট চেয়ে নিকৃষ্ট শাসনব্যবস্থার প্রমাণ দিয়েছে। যোগী এই নির্বাচনে নিজের পরাজয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। আর এ কারণেই তার দলে দলত্যাগের হিড়িক পড়েছে। পিছিয়ে পড়া শ্রেণিগোষ্ঠীর নেতা স্বামী প্রসাদ মৌরিয়াসহ আরো তিন মন্ত্রী যোগীর ক্যাবিনেট থেকে ইস্তফা দিয়ে সমাজবাদী পার্টির আঁচল ধরেছেন। বিজেপির একাধিক বিধায়ক সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দিতে প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন।

নিজের পায়ের তলা থেকে সরে যাওয়া মাটি সামলাতে যোগী তার প্রিয় ‘হিন্দুকার্ড’ খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু সেটাও কাজে আসতে দেখা যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী যোগীর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তিনি নিজের কাজ ভদ্রতার সাথে সম্পাদনের রীতিও জানেন না। ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়ে তীব্রভাবে সমাজকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এ কথা সবাই জানেন, তিনি হিন্দুত্ববাদ অ্যাজেন্ডার অনুসারী। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, তিনি তার উদ্দেশ্য হাসিলে তাড়াহুড়োয় সাধারণ লাজশরমেরও তোয়াক্কা করেন না। এ কথাগুলো আমরা এ জন্য বলছি, তার দলের স্লোগান হচ্ছে ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ আরো সব কা বিশওয়াশ- সবার সাথে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সবার উন্নয়ন এবং সবার আস্থা’। যখন তার দলের নেতা এ স্লোগান দেন, তখন এতে সমাজের ওই শ্রেণীর মানুষও শামিল হয়, যারা তাদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার অংশ নয়। কাহিনীর সৌন্দর্যতার কারণে মুসলমানদেরও এতে শামিল করা হয়, কিন্তু এখন তারা প্রকাশ্যে মুসলমান ও হিন্দুদের শতকরা ৮০ ভাগ বনাম ২০ ভাগ অংশে বিভক্ত করে একে অন্যকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে নামানোর ঘৃণ্য অপচেষ্টা করছে। তবে এতেও তাকে সফলতা অর্জন করতে দেখা যাচ্ছে না। কেননা নির্বাচনের শুরুতেই তার প্রাসাদের ইটগুলো খুলে যেতে শুরু করেছে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে ইলেকশন কমিশনের। তাদের উচিত প্রকাশ্যে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িকতার এমন ধরনের আহ্বানের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা বিজেপির নেতারা তাদের অভ্যাসের কাছে বন্দী। তারা নির্বাচনী ময়দানে হিন্দুকার্ড খেলা থেকে বিরত হবেন না। কিন্তু তারা যদি তাদের কুৎসিত মানসিকতার লক্ষ্য মুসলমানদের বানায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রতিবাদ বিক্ষোভ হবে। তাদের এ কথা বুঝিয়ে দেয়া হবে যে, মুসলমানরা রাজনৈতিক দলগুলোর হাতের খেলনা নয়- যখন যে ইচ্ছা তাদের ঘাড়ে হাত দেবে, আর তারা নীরব তামাশার পাত্র হয়ে থাকবে।

লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ, ১৬ জানুয়ারি ২০২২ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement