২২ মে ২০২২
`

ওমিক্রন কেন এত সংক্রামক


ওমিক্রন কেন এত সংক্রামক বুঝতে হলে করোনাভাইরাসের মূল গঠন বুঝে নিতে হবে।

করোনাভাইরাস একটি প্রোটিন পার্টিকেল। এর কেন্দ্রে যে রাইবোনিউক্লিক এসিড বা জিনোম রয়েছে সেটি সাধারণত ২৭ থেকে ৩৪ হাজার নিউক্লিওটাইডের অণু দিয়ে চেনের মতো করে তৈরি।

জিনোমটিকে তোয়ালের মতো পেঁচিয়ে রেখে সুরক্ষা দেয় ২৪৮-৩৬৫ অ্যামাইনো এসিডসমৃদ্ধ আরএনএ বাইন্ডিং প্রোটিন বা নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিন। আর পুরো জিনোম ও নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনকে এনভেলপের মতো ঢেকে রাখে লিপিড বাই লেয়ারের একটি আবরণ যাকে বলে এনভেলপড্ মেমব্রেন। মেমব্রেনের গাত্রে লাগানো থাকে তিন ধরনের প্রোটিন। স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন, মেমব্রেন প্রোটিন ও এনভেলপ প্রোটিনে অ্যামাইনো এসিডের সংখ্যা যথাক্রমে গড়ে ১২৭৩, ২২২ ও ৫০টি। একটি প্রোটিন তৈরি হয় অনেকগুলো অ্যামাইনো এসিডের চেন দিয়ে।

করোনায় গড়ে মোট ৭৮টি স্পাইক প্রোটিন আছে। প্রকৃতপক্ষে স্পাইক প্রোটিন হলো প্রকৃতির ২০টি অ্যামাইনো এসিড দিয়ে পুঁতির মালার মতো করে সাজানো একটি চেন। কোন অ্যামাইনো এসিড কোথায় বসবে তা জেনেটিকালি পূর্বনির্ধারিত।
জেনেটিক কোডে পরিবর্তনের ফলে ১২৭৩ পয়েন্টের যেকোনো অ্যামাইনো এসিডের একটা, অন্য একটা অ্যামাইনো এসিড দিয়ে পরিবর্তিত কিংবা সংযোজন-বিয়োজন হলেই মিউটেশন।

ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট আসলে কী?
একটা ভ্যারিয়েন্ট হলো তাই যা মূল ভাইরাসের শুধু জেনোম সিকোয়েন্সে নিউক্লিওটাইডের বিন্যাসের পরিবর্তন এবং এ কারণেই ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন বা অন্যান্য স্থানে অ্যামাইনো এসিড কিংবা অন্য কিছুর পরিবর্তন; কারণ ভাইরাসের প্রতিটি কাজই জেনেটিক কোড নিয়ন্ত্রিত। স্পাইক প্রোটিনেরও প্রতিটি অ্যামাইনো এসিডই জেনেটিক কোড নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং নিউক্লিওটাইডের বিন্যাসের এ পরিবর্তনের ফলে যে জেনেটিক কোডের পরিবর্তন হয়, সে পরিবর্তনের জন্যই অ্যামাইনো এসিডের অদল-বদল, সংযোজন, বিয়োজন বা অন্য কিছু ঘটে। ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট মূলত তাদের স্পাইক প্রোটিনের আরবিডি অংশে এবং তার বাইরে অনেক অ্যামাইনো এসিডের অদল-বদল, সংযোজন-বিয়োজন বা অন্য ধরনের কিছু ঘটনার মাধ্যমেই সৃষ্ট একটি ভ্যারিয়েন্ট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে ছয়টি বৈশিষ্ট্য থাকলে কোনো জীবাণুকে নতুন ভ্যারিয়েন্ট হিসাবে স্বীকৃতি দেয় (সংক্রমণশীলতা, রোগের উপসর্গের ভিন্নতা, রোগগ্রস্ত করার ক্ষমতা, রোগ নির্ণয়ে সমস্যা, চিকিৎসায় নতুন করে জটিলতা এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া) তার অন্তত দু’টি ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে জোরালোভাবে বিদ্যমান রয়েছে। এই দু’টি বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ সংক্রমণশীলতা এবং ভ্যাকসিনকে ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতা।

ওমিক্রনের প্রকৃত আবির্ভাব নিয়ে মতভেদ আছে।

ওমিক্রনের গতিপথ
দুনিয়ার তাবত বিজ্ঞানী ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের গতিপথ নির্ধারণে ব্যস্ত রয়েছেন মূলত দু’টি ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত ওমিক্রনের জন্মগত সংক্রমণশীলতার গতিপথ। দ্বিতীয়ত, এটি মানুষের ইমিউন সিস্টেমকে কিভাবে ফাঁকি দেয়। ভাইরাস তার সংক্রমণশীলতা বাড়ায় দু’ভাবে। সংক্রমণশীলতা বলতে আমরা বুঝি ভাইরাসটির মানুষের শরীরে র‌্যাপ্লিকেট করার ক্ষমতা এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে দ্রুত ছড়ানোর ক্ষমতা। আর ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দেয়া বলতে বুঝি ন্যাচারাল ইনফেকশন কিংবা ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডিকে এড়িয়ে চলা।

এখন একটা ভ্যারিয়েন্ট কতটুকু সংক্রমণশীল হবে তা নির্ভর করে কতগুলো ফ্যাক্টরের ওপর :
প্রথমত, যে মিউটেশনের মাধ্যমে ভ্যারিয়েন্টটি তৈরি হয়েছে তার লোকেশন, মিউটেশন সংখ্যা এবং জেনোটাইপের ধরন।
দ্বিতীয়ত, ভ্যারিয়েন্টটির বাহ্যিক প্রকাশ বা উপসর্গ। ওমিক্রনে আক্রান্তরা মারাত্মক উপসর্গ দেখাচ্ছে না।

তৃতীয়ত, রেস্পিরেটরি ট্রাক্টের কোন লোকেশনের এপিথেলিয়াল সেলকে বেশি আক্রান্ত করে এবং কী হারে র‌্যাপ্লিকেশন হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কেরখোভের মতে, প্রধানত তিনটি কারণে ওমিক্রন এত সংক্রামক। প্রথম কারণ, এটির আরবিডি অংশের মিউটেশনের মাধ্যমে সহজেই মানুষের শরীরের কোষে প্রবেশ করতে পারে। দ্বিতীয় কারণ, শরীরে ঢোকার পর অ্যান্টিবডিকে ফাঁকি দেয়ার সক্ষমতা।

তৃতীয় কারণ, এটি আপার রেস্পিরেটরি ট্রাক্টকে সংক্রমিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওমিক্রন ফুসফুসের উপরের অংশে অর্থাৎ ব্রঙ্কিয়াল ট্রি-তে ডেল্টার চেয়ে ৭০ গুণ বেশি দ্রুত বংশবিস্তার করে। এ কারণেই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট অতি সংক্রামক কিন্তু কম ভয়ঙ্কর।

ওমিক্রনের সংক্রমণশীলতার পরিমাপ
উহানে আবিষ্কৃতি সারস-কভ-২ আক্রান্ত রোগী গড়ে ২.৫ জনকে সংক্রমিত করতে পারত। এর বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর ছিল ২.৪-২.৬। বর্তমানে আল্ফা ভ্যারিয়েন্ট অনেকটা শক্তিশালী। এর রিপ্রোডাকশন নম্বর ৪-৫। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের রিপ্রোডাকশন নম্বর ৭ আর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের রিপ্রডাকশন নম্বর ১০। তার অর্থ একজন ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী তার অসুস্থতার সময়কালে অন্য ১০ জনকে আক্রান্ত করতে পারে।

ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনে মিউটেশন
ওমিক্রনের এ পর্যন্ত ৬০টি মিউটেশনের রেকর্ড আছে। এর মধ্যে ৫০টি অ্যামাইনো এসিড পরিবর্তনকারী মিউটেশন এবং ১০টি সাইলেন্ট মিউটেশন। ওমিক্রনে ১০ টি নন-অ্যামাইনো এসিড পরিবর্তনকারী মিউটেশন আছে কোডিং এবং নন-কোডিং অংশে। ৩৬টি মিউটেশন আছে স্পাইক প্রোটিনে। আর স্পাইক প্রোটিনই হলো ভাইরাসের সেই অংশ যার বিরুদ্ধে শরীরের অ্যান্টিবডি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনের ৩৬টি পয়েন্টে অ্যামাইনো এসিড পরিবর্তনের কারণে ইনফেক্টিভিটি এবং অ্যান্টিবডিকে সহজেই ফাঁকি দিতে পারে। একই কারণে সংক্রমণ বেড়ে যায়।

ওমিক্রনে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হলো ওভারলেপিং মিউটেশন। বিজ্ঞানীরা আল্ফা, বিটা, গামা ও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের স্পাইক প্রোটিন এবং নন-স্পাইক প্রোটিন অংশের অনেক মিউটেশন ওমিক্রনেও দেখতে পেয়েছেন।

১০টি সমার্থক মিউটেশন
ওমিক্রনে এমন ১০টি সমার্থক মিউটেশন আছে, যা অ্যামাইনো এসিডের পরিবর্তন ছাড়াই নন-প্রোটিন কোডিন রিজিওনে হয়েছে। এই ১০টি মিউটেশনের মধ্যে সি২৪১ইউ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ক্ষতিকারক।

করোনাভাইরাসে আছে ওআরএফওয়ানএবি নামক একটি র‌্যাপ্লিকেশন কমপ্লেক্স সাইট যেখানে ১৬টি নন-স্ট্রাকচারাল প্রোটিন আছে যার ১১টিতেই মিউটেশন হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি শুধু ওমিক্রনেই আছে। বাকিগুলো অন্য ভ্যারিয়েন্টেও হয়েছিল।

ইন্যাট ইমিউন সিস্টেমকে বাধা দানকারী মিউটেশন
ওমিক্রন এম প্রোটিনে দু’টি মিউটেশন আছে। এরা হলো, ডি৩জি ও কিউ১৯ই। এম প্রোটিনে মিউটেশনের কারণে মানুষের ইন্ন্যাট ইমিউন সিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করে।

ওমিক্রনের নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনে তাৎপর্যপূর্ণ মিউটেশন
নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আরএনএ প্যাকেজিং ও ইমিউন রেগুলেশন। এর ৩১-৩৩ পর্যন্ত অ্যামাইনো এসিডগুলো একমাত্র ওমিক্রনে বাদ পড়ার কারণে অ্যান্টিবডিকে ফাঁকি দেয়া সহজ। ওমিক্রনই একমাত্র মেজর ভ্যারিয়েন্ট যার মধ্যকার তিনটি বাদ পড়া অ্যামাইনো এসিড অংশ আছে যা অন্য কোনো ভ্যারিয়েন্টে নেই। তবে কমন দু’টি মিউটেশন যা প্রায় সব ভ্যারিয়েন্টের মধ্যেই আছে তা হলো, আর২০৩কে এবং জি২০৪আর (গ্লাইসিনের পরিবর্তে আরজিনিন) পজিশনের মিউটেশন।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনের ১৯৯-২০৫ নম্বর অ্যামাইনো এসিডের পজিশনের সিংগল পয়েন্ট মিউটেশন ওমিক্রনের ইনফেক্টিভিটিকে ১৫০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সুতরাং ওমিক্রনের অতি সংক্রমণশীলতা, অ্যান্টিবডিকে ফাঁকি দেয়ার মতো ক্ষমতা এবং ইন্ন্যাট ইমিউন রেসপন্স কমিয়ে দেয়ার পেছনে রয়েছে মূলত স্পাইক প্রোটিন ও নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনের পারস্পরিক কোলাবোরেশন দায়ী।

এক্সেসরি প্রোটিন যার কাজ হলো মূলত ইমিউন রেগুলেটর। সৌভাগ্যবশত এখানে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কোনো মিউটেশন নেই।

ওমিক্রন যেভাবে অ্যান্টিবডিকে ফাঁকি দেয়
প্রথমত, ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিন মানব কোষের এসিই-২ এর সাথে অরিজিনাল সারসকভ-২ এর চেয়ে ২.৫ গুণ বেশি আসক্তিসহকারে যুক্ত হয়ে কোষে ঢোকে। এই আসক্তি বেড়ে যাওয়া মানেই হলো সংক্রমণশীলতা বেড়ে যাওয়া।

দ্বিতীয়ত, ওমিক্রন ন্যাচারাল ইনফেকশনের কারণে তৈরি অ্যান্টিবডি কার্যকরভাবেই রুখে দিতে পারে।

ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনের ৫০১ নম্বর পজিশনে এন৫০১ওয়াই মিউটেশন থাকায় এসিএ-২ এর প্রতি আসক্তি ৬ গুণ বেড়ে যায়। এসব কারণে মডার্না, ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা দিয়ে পুরোপুরি দুই ডোজ ভ্যাকসিনেটেড করার পর ওমিক্রনের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যথাক্রমে ৩৩ গুণ, ৪৪ গুণ ও ৩৬ গুণ কমে যায়। তৃতীয় ডোজ দেয়ার দুই সপ্তাহ পরই ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা ৯০ শতাংশ এবং ৩ মাস পর শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

তৃতীয়ত, এ পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া ৮টি মনোক্লনাল অ্যান্টিবডি যেমন, সিলজেভিমেব, টিক্সাজেভিমেব, সট্রোভিমেব ইত্যাদি অনেকটা অকার্যকর।

ওমিক্রনের ইনফেকটিভিটি অনেক বেশি হওয়ায় বিশ্ববাসী এত উদ্বিগ্ন। কিন্তু এর কারণে মৃত্যুহার অনেক কম। অথচ এর আগের করোনার সারস-কভ ও মারস-কভের মর্টালিটি রেট যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ থাকলেও ওগুলো নিয়ে বিশ্ব মোটেই উদ্বিগ্ন নয়। কারণ ওই সব করোনার প্যান্ডেমিসিটি ছিল অনেক কম। সব বিবেচনায় বলা যায়, ওমিক্রনের বর্তমান তাণ্ডব করোনা প্যান্ডেমিসিটির শেষের শুরু মাত্র।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি


আরো সংবাদ


premium cement