২২ মে ২০২২
`

শরমের রকমফের এবং


বিষয়টি ব্যক্তিগত বলেই মনে হয়। মনে হয় লজ্জিত হওয়ার বিষয়টি ব্যক্তির সামাজিক ও মানবিক চরিত্রের সাথে ওতপ্রোত। সংস্কৃতি তাকে সব রকম সদগুণ ও বদগুণের সমাহারের ভেতর দিয়ে সমাজে উপস্থাপন করে। তার প্রজ্ঞার অভ্যন্তরে জাগিয়ে দেয় এমন সব বৌদ্ধিক চেতনা, যা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু তার দহন ও গহনগামিতা তাকে নিয়তই কুট কুট করে কামড়াতে থাকে। তাকে বিনম্র শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করতে পারে কিংবা করে তুলতে পারে দুর্বিনীত ও অহঙ্কারী। আমাদের সমাজে এই দুই শ্রেণীর লোকের দেখা মেলে সব থেকে বেশি। এরাই গণমানুষ।

আমরা অনেকেই এ রকম কথা বলি যে, লোকটা লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে- ইতাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ শরম না পাওয়া ব্যক্তির ভরমহীনতা আমাদের মর্মে আঘাত হানলেও তার প্রতিকারের উপায় নেই বললেই চলে। সাধারণের মধ্যে লজ্জিত হওয়ার এই যে বোধ একে আমরা সহজেই বুঝি, অনুমানও করি, সজাগ হই সমাজের র‌্যাশনালিটি বিষয়ে। আবার এমনও আছে যা যুক্তি-অযুক্তির ঊর্ধ্বে। এমন কিছু বিষয় আছে সংস্কৃতি যাকে আশ্চর্য বন্ধনে জড়িয়ে নিয়েছে। ফলে আমরা, গোটা বিশ্বেরই মানুষ, সংস্কৃতির নয়নাভিরাম বন্ধনে নিজেদের একাত্ম করে রাখি। বেশির ভাগ মানুষ তাকে মান্য করে, কেউ কেউ করে না। সেই কেউ কেউ হয়তো অসামান্য মানুষ, কিংবা কুখ্যাতি অর্জনকারী। উভয়কেই সংস্কৃতি ধারণ করে। তবে, গণমনন পরিহার করে ক্ষতিকর মানুষের, যারা সমাজের জন্য শুভ নয়। আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক যুক্তির উৎপত্তি সেখান থেকেই।
২.
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছেন তার নেতৃত্বাধীন দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেয়া লকডাউনের মধ্যে পানাহারের আয়োজন করেছিলেন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাড়িতে। ওই বাড়ি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। সে অপরাধ বরিস স্বীকার করে হাউজ অব কমন্সে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু তার দল তাকে ক্ষমা করতে নারাজ।

কনজারভেটিভ পার্টির স্কটল্যান্ডের নেতা ডগলাস রোসসহ বেশ কয়েকজন নেতা বরিসের পদত্যাগ চাইছেন।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাগানে খানাপিনার আয়োজনের খবর চাউর হয়ে পড়লে বরিস জনসন নিজের বোকামি বা অপরাধ বুঝতে পারছেন, সে কারণে ক্ষমাও চেয়েছেন কিন্তু দলীয় ফোরামের প্রাজ্ঞজনরা সেটি বুঝতে চাইছেন না। এর ভেতরে কী রাজনীতি আছে বোঝা মুশকিল। দলের ভেতরে চোরাস্রোত থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লকডাউনের সময় বরিস ডিনার পার্টির আয়োজন করবেন শতাধিক লোকের, এটি কেউ আশা করেনি। আইনত, লকডাউনের সময় এত বড় জমায়েত নিষিদ্ধই কেবল নয়, তা সরকারপ্রধানের জন্য বেমানান। কারণ তার সরকারই ওই লকডাউন দিয়েছে যাতে জনগণ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হয়। কিন্তু সরকারপ্রধানই যখন সেই আইন না মানেন তাহলে আইনপ্রণেতারা কেন মানবেন? কেন মানবে জনগণ? সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি যা করেছেন, তা নিজের করা নিষেধাজ্ঞা নিজেই ভেঙে ফেলা।

এই অন্যায় বা অপরাধ দুর্র্ধর্ষ কিছু নয়, শাদা চোখে সামান্যই মনে হয়। সামান্যই অপরাধ বা অন্যায়, কিন্তু যিনি করেছেন তিনি কে? সেটি বিবেচনায় রেখেই তার দলের লোকজনই এটি মানতে নারাজ। অন্যায় তা সে ছোট হোক বা বড়, তাতে কিছু আসে যায় না, অপরাধের দায় ও ওজন একই। ভুল করার পর বরিস জনসন সেটি বুঝেই কমন্স সভায় অন্যায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। ক্ষমতার চেয়ে জনসনের ব্যক্তিগত ইমেজে যে দাগ লাগল, সেটি ভেবেই বরিস জনসন ক্ষমা চেয়েছেন।

একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লকডাউনের সময় কোনোরকম সমাবেশ করতে পারেন না- সেটি বেমানান ও বেআইনি। সরকারকে আইন প্রণয়ন করতে হয়, আর তা মেনে চলতেও হয়। মেনে না চললে তেমন কী আর হতে পারে? হতে পারে তার দলের আইনপ্রণেতারা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে পারেন। তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বলতে পারেন। ক্ষমতা না ছাড়লে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে পারেন সংসদে। দলীয় ফোরামে তাকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দিতে পারেন। বরিসের ওপর দলীয় ফোরামের আইনপ্রণেতাদের কয়েকজন মনে করেন, তার পদত্যাগ করাই উচিত। আবার কিছু আইনপ্রণেতা তা ভাবছেন না। এ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে হাউজ অব কমন্সের ভেতরে ও বাইরে। এই সুযোগটা নিতে পারে বিরোধী দল লেবার পার্টি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে রকম কোনো খবর আসেনি গণমাধ্যমে। বিরোধী দল সব সময়ই সরকারের ত্রুটি বা সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের ভুল-ত্রুটি নিয়ে জনমত গড়ে তুলতে পারে। তারা যে সে সবের সুযোগ নেয় না, তাও নয়। কিন্তু এত সহজে, সামান্য ঘরোয়া পার্টির আয়োজনের খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বিপত্তি বেধেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের প্রধান হয়ে এ রকম একটি স্খলন গ্রহণযোগ্য কি না।

জানি না, এই ছোট ঘটনার ফল শেষতক কী হবে। এখন পর্যন্ত উপপ্রধানমন্ত্রী ডোমিনিক রাব বরিসের পক্ষেই আছেন। সাধারণত উপপ্রধানই কাল হয়ে দাঁড়ায়, ভাঙা শামুকে পা কাটার পর। সে দিক থেকে বরিস সৌভাগ্যবানই বলতে হবে। তার ডেপুটি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। কিন্তু স্কটল্যান্ডের নেতা ডগলাস রোস, আইনপ্রণেতা উইলিয়াম রেগ, ক্যারোলিন নোকস, রজার গ্যালে বরিসের পদত্যাগ চেয়েছেন। রোস হাউজ অব কমন্সের আইনপ্রণেতাই কেবল নন, তিনি স্কটল্যান্ডের আইনসভারও সদস্য। তিনি অবশ্যই শক্তিশালী অবস্থানে আছেন। তিনি বলেছেন, বরিস একজন প্রধানমন্ত্রী। এটি তার সরকার, যারা আইন বাস্তবায়নে কাজ করছে। কিন্তু যে ধরনের কাজ করছেন, সে জন্য তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি ১৯২২ কমিটির কাছে লিখবেন, যাতে বরিসের নেতৃত্ব নিয়ে আস্থা ভোটের আয়োজন করা হয়।

১৯২২ কমিটি মূলত কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনে কাজ করে থাকে। কমিটির আনুষ্ঠানিক নাম কনজারভেটিভস প্রাইভেট মেম্বার্স কমিটি। রোস সত্যই যদি এই রকম কিছু একটা করেন, তাহলে বরিসকে মারাত্মক ঝামেলায় পড়তে হবে নিজ দলের ভেতর থেকেই। মাত্র ৫৪ জন আইনপ্রণেতা যদি বরিসের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে চিঠি পাঠান তাহলে বরিসকে নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

দলে গণতন্ত্র থাকলে, সরকারের মধ্যে গণতান্ত্রিক সুশাসনের চর্চা থাকলে যেসব ন্যায়চিন্তা ও কর্ম সচল থাকে ব্রিটিশরা তারই চর্চাকারী এবং সেই গণতান্ত্রিক স্বরূপেরই বহনকারী। বরিস লকডাউনের সময় (২০২০ সালের ২০ মে) পার্টির আয়োজন করেছিলেন, যা গত সপ্তাহে একটি ইমেইলের সূত্রে প্রকাশ পায়। অপরাধ স্বীকার করার পর, ক্ষমাপ্রার্থনা করে বরিস নিজেকেই কেবল ভারমুক্ত করেননি, তার দলের আইনপ্রণেতাদেরও দুর্ভাবনামুক্ত করেছেন। কিন্তু জাঁদরেল আইনপ্রণেতাদের কয়েকজন তাকে সহজে ছাড়ছেন না। না, এটি তার বিরুদ্ধাচরণের চেয়েও আইন ও গণতান্ত্রিক রীতির প্রতি আনুগত্য। তাদের নেতৃত্বকে ধুয়ে-মুছে কলুষমুক্ত করতে, যাতে বরিসের অপরাধ অন্য কেউ না করেন এবং প্রশাসনের ভেতরে তার কুপ্রভাব না জমে থাকে। দলীয় ফোরাম কতটা শক্তিশালী, এই ঘটনা, তারই প্রমাণ। ১৯২২ কমিটিতে যদি ৫৪ জন সংসদ সদস্য বরিসের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে সেখানে ভোটাভুটি হতে পারে। তারাই মত দেবেন বরিস নেতৃত্বে থাকবেন, না অন্য কেউ নেতৃত্বে আসবেন।
৩.
আমাদের একজন সংসদ সদস্য ও তথ্যপ্রতিমন্ত্রী ছিলেন ডা: মুরাদ হাসান। তিনি যে ভাষায় মেয়েদের উদ্দেশে কটূক্তি করেছেন, তার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন। মুরাদ হাসান পদত্যাগ করে এখন একা হয়ে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, যে ব্যভিচার মুরাদের মনের কোণে লালিত হয়ে আসছে, তার বহিঃপ্রকাশ আমরা জেনেছি। তার আরো যেসব অন্যায় অপরাধ আছে, তার স্ত্রীও তার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। মুরাদের প্রতিমন্ত্রীর পদ গেছে, তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আইডেনটিটি ভূলুণ্ঠিত, তাতেই কি একজন অপরাধীর অপরাধ স্খলন হয়ে যায়? তার অপরাধের বিচার দল থেকে যেমন হওয়া জরুরি, তেমনি সরকারের তরফ আইনি পথেও হতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘রাষ্ট্র মুরাদ হাসানের ব্যাপারে সংক্ষুব্ধ নয়, তাই রাষ্ট্র কোনো মামলা করেনি। আপনি যদি সংক্ষুব্ধ হন, তাহলে মামলা করেন।’ একজন সাংবাদিকের ডা: মুরাদ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচার-আচরণ ও রাজনৈতিক আচার-আচরণ এবং তার মনস্তাত্তি¡ক বিকার প্রকাশের পরও যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে পারেন যে, রাষ্ট্র সংক্ষুব্ধ নয়, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে আমরা কোন পৃথিবীতে বাস করছি। মুরাদ হাসান কেবল নিজের ইমেজই ধ্বংস করেননি, তিনি দলের সুনামকেও টেনে নামিয়েছেন মাটিতে। মুরাদের স্ত্রীও নির্যাতনের মামলা দিয়েছেন। সেই মামলার শুনানি করার নিউজ আমরা দেখেছি। তবে বোঝাই যাচ্ছে, সরকার মুরাদের ব্যাপারে নমনীয়। সরকার ও রাষ্ট্র যখন সংক্ষুব্ধ হয় না, তখন ব্যক্তির পক্ষে সংক্ষুব্ধ হয়ে লাভ কি? বরং সরকারের রোষানলে পড়ার আশঙ্কাই থাকে তাতে। তাই আমরা বাংলাদেশ সরকারের গণতান্ত্রিক চেতনা ও তার সুব্যবহার নিয়ে টুঁ-শব্দটি করব না। কারণ তা টাইরান্ট সরকারের চেতনায় অপরাধ।


আরো সংবাদ


premium cement