০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

বাংলার আকাশে বাংলা শকুন

বিলুপ্তির পথে বাংলা শুকুন - ছবি : সংগৃহীত

বাংলার আকাশে বাংলা শকুন এখন আর চোখে পড়ে না। বিমান ওঠানামাকালে রানওয়ে দিয়ে দৌড়ানোর সময় মনে পড়ে শকুনের কথা। ওপর থেকে ভূমিতে নামা-ওঠার সময় বিমানের মতো শকুনেরও লম্বা রানওয়ে দরকার হয়। একসময় বাংলার আকাশে ছিল রাজ শকুন, সরুঠুঁটি শকুন ও বাংলা শকুন। এই তিন প্রকার শকুনের মধ্যে দুই প্রকার বিলুপ্ত হয়ে গেছে কয়েক যুগ আগেই। বাংলা শকুনই বাংলার আবাসিক শকুন হিসেবে টিকে ছিল। বাংলা শকুনের বৈজ্ঞানিক নামকরণ Bengalensis এসেছিল এই বাঙলা অঞ্চল থেকেই। বছর দুয়েক আগে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন একটি বাংলা শকুন সুনামগঞ্জের ছাতক শহরের নুরাল্লাপুর এলাকা থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলার শকুনটিকে বাংলা শকুন হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, ‘পৃথিবীতে দ্রুততম গতিতে বিলুপ্ত হতে চলছে শকুন। তাই শকুন মাত্রই বিশ্বে মহাবিপন্ন।’ উদ্ধারকৃত শকুনটি দুর্বল ছিল বলে উড়তে পারত না। বনের ধারে পড়ে থাকতে দেখে কিছু শিশু-কিশোর সেটি নিয়ে খেলা করতে শুরু করেছিল। এরকম খেলা করতে করতেই শকুনের বংশ-নির্বংশ হওয়ার বিষয়টি ফুটে ওঠেছে, মরহুম হাসান আজিজুল হকের ‘শকুন’ গল্পে।

প্রকৃতিতে সর্বশেষ শকুন দেখেছিলাম সত্তরের দশকে। যখন আমন ধানে পামরি পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। তখন বিদেশ থেকে ড্রাম ড্রাম আনা হয় কীটনাশক। কৃষি অফিসের বাইরেই ফেলে রাখা হতো ড্রাম। বিনামূল্যে বিতরণের কীটনাশক যে যখন খুশি নিয়ে যেত। সরিষার তেলের মতো তরল কীটনাশকের ক্ষমতা এতই তীব্র ছিল যে, আড়াই মণ পানির মধ্যে এক ছিপি কীটনাশক ছাড়তে না ছাড়তেই পানি আলোড়িত হয়ে দুধের মতো হয়ে যায়। যে জমিতে কীটনাশক ছিটানো হয় সে জমিতে জোয়ারের পানির সাথে আসা মাছ মরত, একগোছা ধানপাতায় মুখ দিয়ে মরত গরু-ছাগল। পশুপাখি মরত মরা গরু-ছাগলের গোশত খেয়ে। একবার শত শত শকুনসহ কাক-কুকুরের মরা দেহে মাঠ ছেয়ে গিয়েছিল।

সেদিন শকুন মারতে দেখে ও মরতে দেখে কারো অনুশোচনা হয়নি, বরং খুশি হয়েছিল লোকজন; কারণ মহাভারতে দুর্যোধনের ক‚টবুদ্ধি মাতুলের নাম শকুন। সুদখোর মহাজনদের তুলনা করা হয় শকুনের সাথে। অশুভ, অমঙ্গল, লোভী, কৃপণ ইত্যাদি নেতিবাচক সব দোষে দুষ্ট শকুন। জীবনানন্দ দাশের ‘শকুন’ কবিতায়ও--

‘শকুনেরা চরিতেছে,
মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি;
নিস্তব্ধ প্রান্তর শকুনের’...

অমঙ্গল ও অশুভের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শকুনকে। উপরতলার মানুষের নজর খারাপ দেখলেই, ‘স্বর্গলোকে উড়লে কী হবে, নজর থাকে মর্ত্যলোকে’ বলে উদাহরণ হিসেবে শকুনকেই টেনে আনতাম। গবাদিপশু মারা গেলে মৃতদেহ মাঠে ফেলে রাখার পর আকাশ থেকে নেমে আসে ঝাঁক ঝাঁক শকুন। শৈশবে শকুনকে মরা গরু ঘিরে গোশত ভক্ষণ করতে দেখলে কুকুর বাধা দিত। শত শত শকুনের সাথে দু-চারটা কুকুর পেরে উঠত না। পোষা কুকুরকে শকুনের কাছে হারতে দেখে আমরা কুকুরের পক্ষ নিতাম। হালুয়া পাচন হাতে কুকুরের সাথে শকুন তাড়া করতাম। পাচন ছুড়ে শকুনের পা খোঁড়া করে মজা পেতাম। দুই দিক থেকে তাড়া খাওয়া শকুন দৌড়ে দূরে গিয়ে অসহায় হয়ে শবের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমরা চলে গেলেই আবার ফিরে এসে কিলবিল করে মুহূর্তে ফিনিশ করে শবের মাংস, পড়ে থাকে কঙ্কাল। ভক্ষণ শেষে ভরাপেট শকুনগুলো উড়তে পারত না। আমাদের তাড়া খেয়ে পাখায় ভর করে দৌড়ে দূরে চলে যেত। নানা প্রকারের শকুনের মধ্যে আমাদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল রাজা শকুন; কারণ প্রজারা আকাশ থেকে নেমে শব ঘিরে বসে থাকত। রাজার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এরা শবে ঠোকর বসাত না।

স্রষ্টার বিস্ময়কর সৃষ্টি শকুন। ‘শকুনের দোয়ায় গরু মরে’ তা সবার অন্ধবিশ্বাস। গরু মরার জন্য দোয়া দেয়া দূরের কথা প্রকৃতিতে মাংসাশী প্রাণীর মধ্যে শকুনের মতো উপকারী, অহিংস, নিরীহ ও গোবেচারা কোনো পাখি-ই হয় না। চিল, ঈগল ও বাজপাখির মতো শকুন উচ্ছৃঙ্খল নয়। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে মৃত প্রাণী ও পচা মাংস। শবদেহ ভক্ষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, ‘ব্যাকটেরিয়া’ আর ‘শকুন’ না থাকলে এত দিনে লাশে লাশে দুনিয়া ভরে উঠত। ব্যাকটেরিয়া পচায় আর শকুন পচা খেয়ে পরিচ্ছন্ন রাখে। শকুনই একমাত্র প্রাণী, যা রোগাক্রান্ত মৃত প্রাণী খেয়ে হজম করতে পারে। যে পচা পাকস্থলীতে প্রবেশ করা মাত্র অপরাপর প্রাণী অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার কথা, সে পচা শকুনের পাকস্থলীতে হজম হয়ে যায়। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত প্রাণীর মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখলেও সংক্রমণ ক্ষমতা থাকে ১০০ বছর পর্যন্ত। অ্যানথ্রাক্স, যক্ষা প্রভৃতি মারাত্মক জীবাণু হজম করে অপরাপর প্রাণীকে এসব রোগ থেকে রক্ষা করে শকুন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কে বি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শকুন মৃতজীবী পাখি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে যথেষ্ট ভ‚মিকা পালন করে। এরা সাধারণত মৃতপ্রাণী ভক্ষণ করে পরিবেশকে পরিষ্কার রাখে। কিন্তু ইদানীং বিভিন্ন দেশে গবাদিপশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক নামের ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে শকুন মারা যাচ্ছে।’

আহারের খোঁজে ওরা আকাশে টহল দেয় উঁচু গাছে বাস করে। খাবারের সন্ধান পেলে শোঁ শোঁ শব্দে দ্রুত নিচে নেমে আসে। খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। কর্কশ গলায় ঘড়ঘড়, হিসহিস কিংবা চিঁচিঁ চিৎকার করে। শকুন উপরে উড়ে আর নিচে শবদেহ খোঁজে। সারা আকাশজুড়ে একে অন্যের দিকে নজর রাখে আর চক্রাকারে উড়তে থাকে। কোনো একটি শকুনকে নামতে দেখলে অন্যরাও তাকে দ্রুত অনুসরণ করে। শকুনের দৃষ্টি অসাধারণ হলেও ঘ্রাণশক্তি নেই বললেই চলে। শকুন একই বাসায় বহু বছর কাটায়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শকুন দুই বছরে একবার একটি মাত্র ডিম পাড়ে।

শৈশবে মামার বাড়ি যাওয়ার পথে চন্দনপুর বাজার ছাড়ালেই সামনে একটা শিমুল গাছ। সব গাছ ছাড়িয়ে যাওয়া শিমুল গাছের চূড়ায় সবসময় শকুন দেখতাম। সদ্যোজাত শিশুর কান্নার শব্দের মতো শব্দ করে এরা ডাকাডাকি করত। শিমুল গাছের গোড়ায় ছিল একটি কবর। কবর কাদা দিয়ে লেপে সযত্নে পরিষ্কার করে রাখা অবস্থায়ও দেখতাম কখনো কখনো। আশপাশে কোনো বাড়িঘর ছিল না। সব মিলে এক ভুতুড়ে পরিবেশ। মামাবাড়ির পথে শিমুল গাছের কাছে পৌঁছালেই ভয়ে গা ছমছম করত। শিমুল গাছটি নেই। শিমুল, ছাতিম, দেবদারু প্রভৃতি সুউচ্চ গাছে শকুন বাসা বাঁধে। দিয়াশলাইয়ের শলাকা, চায়ের বাক্স, ইটভাটা ও রাস্তার পিচ গলানোর কাজে ব্যাপকভাবে এসব গাছ কেটে ফেলায় শকুনের বংশবৃদ্ধি ঘটছে না। এ ছাড়া রয়েছে কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার। স্থায়ী বাসা নির্মাণের জন্য উঁচু গাছসহ ভ‚মিতে ওঠানামার জন্য হারিয়ে গেছে খোলা মাঠও। বছর কয়েক আগে ঘুরতে গিয়েছিলাম শ্রীমঙ্গল। সেখানে রয়েছে ব্যক্তিমালিকানায় নির্মিত এক মিনি চিড়িয়াখানা। সেখানে দেখতে পেলাম বেশ কয়েকটি শকুন। ছবি নিচ্ছি আর ভাবছি, একসময় এসব খাঁচা খালি হবে। তখন খাঁচা পূরণ করার জন্য সারা দেশ খুঁজেও আর শকুন পাওয়া যাবে না।

ধর্ম ও পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘প্রকৃতিতে কোনো কিছুই বেহুদা সৃষ্টি হয়নি’। কোনো কিছু বিলুপ্ত হয়ে গেলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়ে। যেমন - কোনো এলাকায় সব বটগাছ যদি কেটে ফেলা হয়, তা হলে ওই বটগাছনির্ভর বাদুর, চিল, শকুন, কাঠবিড়ালি, গেছো ব্যাঙ প্রভৃতি আশ্রয়হীনসহ বিপন্ন হয়ে পড়বে। অনুরূপভাবে যদি কোনো প্রজাতির পোকা বা পাখি বিলুপ্ত হয়, তা হলে যেসব উদ্ভিদের পরাগায়ন সেসব প্রজাতিনির্ভর তা বিপন্ন হবে। এভাবে প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হতে থাকলে একসময় ধরিত্রী বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। যখন ধরিত্রী বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, তখনই নড়াচড়ে বসে প্রকৃতি।

প্রকৃতিকে নির্জীব, চলৎশক্তিহীন ও সর্বংসহা মনে হলেও আসলে তা নয়; বরং তা নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণকারী। প্রকৃতি কারো অণু-পরিমাণু হস্তক্ষেপও সহ্য করে না। প্রকৃতির উপকারী কোনো জীব বা অণুজীব হারিয়ে গেলে কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে অচেনা অণুজীবের আবির্ভাবে প্লেগ, স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯ ইত্যাদি প্রাণঘাতী মহামারীসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন - ঘূর্ণিঝড়, ভ‚মিকম্প, সুনামি প্রভৃতি প্রকৃতির প্রতিশোধেরই হাতিয়ার। আধুনিক বিশ্বায়নের ফলে বস্তু ও সংস্কৃতির পরিবর্তন অনিবার্য হলেও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে জীবসমষ্টির কোনো অংশের বিলুপ্তি বা প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে ক্ষতির কারণ। ভয়াবহ বিপর্যয়সহ হারিয়ে যেতে পারে আমাদের সুন্দর পৃথিবী নামক গ্রহটাও।

২০০২ সালে দ্য ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফান্ড ফর নেচার এক পরিসংখ্যান তৈরি করে দেখিয়েছে, ব্যবহারযোগ্য স্থলভ‚মির ৯৭ শতাংশ মানুষের দখলনিয়ন্ত্রণে, অবশিষ্ট ৩ শতাংশ থেকেও বিপন্ন হওয়ার পথে বিশে^র অন্যসব প্রাণী। পৃথিবী নামক সুন্দর গ্রহ হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষার জন্যই শকুনসহ বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষা করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার ‘বিশ্ব শকুন সচেতনতা দিবস’ পালন করা হয়। একটি দৈনিক পত্রিকায় ৬ নভেম্বর ২০১৮ সালে ‘বিলুপ্তির সীমানা থেকে ফিরে আসছে শকুন’ শিরোনামে সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে দেশে শকুন দেখা গেছে ২৪০টি, সেখানে ২০১৮ অক্টোবর পর্যন্ত শকুন দেখা গেছে ২৬০টি। যেখানে ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ৯৯ শতাংশ শকুন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সেখানে (২০১৬ থেকে ২০১৮) দুই বছরে শকুনের বৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। সিলেটের সুনামগঞ্জ, মৌলবী বাজার ও হবিগঞ্জের কিছু এলাকা এবং খুলনার সুন্দরবন এলাকার কিছু অংশ নিয়ে শকুনের নিরাপদ এলাকা (Vulture Safe Zones) ঘোষিত হয়েছে। শকুন অকল্যাণ ও অশুভর প্রতীক নয় - ধরিত্রীর অবিচ্ছেদ্য অংশসহ কল্যাণের প্রতীক। আমরা চাই, বাংলার আকাশে বাংলা শকুন আবার ফিরে আসুক। নয়তো, জাদুঘরে শকুনের কঙ্কাল ছাড়া বাংলার আকাশে আর বাংলা শকুন দেখা যাবে না।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
E-mail : adv.zainulabedin@gmail.com



আরো সংবাদ