৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

বীর উত্তম মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন

বীর উত্তম মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন (বাঁয়ে) ও লেখক কর্নেল অব: মোহাম্মদ আবদুল হক, পিএসসি (ডানে) - ছবি : সংগৃহীত

‘দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সর্বোচ্চ অবদান সেনাবাহিনীর’- এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেনাবাহিনীর ভ‚মিকা না থাকলে দেশ দ্রæত স্বাধীন হতো কি না সন্দেহ। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটা খুব সহজসাধ্য ছিল না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত সেনা অফিসাররাই স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে যেসব বাঙালি নির্বাচিত হতেন, যোগ্যতার মাপকাঠিতে তারা ছিলেন অবশ্যই অনন্য উচ্চতার। ‘নন-মার্শাল রেস’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বাঙালিদেরকে অযোগ্য হিসেবেই বিবেচনা করে সর্বক্ষেত্রে অবহেলা করত। তখন যারা সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং প্রশাসনের অন্যান্য পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা মেধা-মননে, শিক্ষা-দীক্ষা ও অন্যান্য যোগ্যতার মাপকাঠিতে চৌকস ছিলেন। সেনাবাহিনীতে এমনই একজন অত্যন্ত মেধাবী, দুঃসাহসী, দেশপ্রেমিক, ঐতিহ্যবাহী ও চৌকস তরুণ যোগদান করেছিলেন, যিনি তার কর্মজীবনের সর্বত্র দেশপ্রেমের অসাধারণ ও অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। য্দ্ধু করে দেশকে স্বাধীন করার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন। তিনি হলেন কর্নেল মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন, বীর উত্তম। তিনি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধেও দুঃসাহসিক বীরত্বের প্রমাণ রেখেছিলেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে লাহোর ফ্রন্টে যুদ্ধে অংশ নিয়ে।

সেনাবাহিনীর এ সিংহ পুরুষের সাথে দেখা করার ইচ্ছা ছিল বহুদিনের। একবার রাওয়ার সাবেক চেয়ারম্যান মেজর খন্দকার নূরুল আফসার উদ্যোগও নিয়েছিলেন চট্টগ্রামে তার বাড়িতে পাঠানোর জন্য। পরে আর হয়ে ওঠেনি। অবশেষে অধিনায়ক লে. কর্নেল শামীমের সহযোগিতায় সৌভাগ্যক্রমে ঢাকাতেই দেখা হলো সমরনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীনের সাথে। যিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে পশ্চিম পাকিস্তানে গ্যারিসন হেড কোয়ার্টারে (সেনাবাহিনী সদর দফতর) সামরিক সচিবালয়ে সর্বাধিক সম্মানের চাকরিকালীন অবস্থায় পক্ষ ত্যাগ বা বিদ্রোহ করে পলায়ন করেন দেশে ফেরার জন্য এবং মাতৃভ‚মির মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন হানাদারদের বিরুদ্ধে। মেজর আবু তাহের, মেজর মঞ্জুর (সপরিবারে) ও ক্যাপ্টেন বজলুল গনি পাটোয়ারীসহ তারা পলায়ন করেছিলেন পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে। ত্যাগ-তিতিক্ষার এ এক জ্বলন্ত ও সোনালি ইতিহাস।

স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখসমরের এ কমান্ডার নিজের ব্যাটালিয়ন সিনিয়র টাইগার নামে পরিচিত প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের নেতৃত্ব দেন এবং অনন্য কৌশল, শক্তি ও ক্ষিপ্রতা দিয়ে হানাদার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ ও পরাজিত করে একটি স্বাধীন দেশ ও পতাকা উপহার দিয়েছেন আমাদেরকে।

১৯৩৯ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম আসকর দীঘির পাড়, ১৮ জামাল খান লেন, চট্টগ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহাম্মদ কাশেম ও মা মজিদা খাতুন। ১৯৯৫ সালে জাহানারা বেগমের সাথে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ১৯৫৯ সালের এপ্রিল মাসে ২৫ পিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন। আড়াই বছরের কঠিন প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করার পর ১৯৬২ সালের ২১ এপ্রিল সামরিক একাডেমি কাকুল থেকে তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন। একজন চৌকস অফিসার হিসেবে তার বদলি হয়েছিল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে। তিনি আরো অসংখ্য সুযোগ্য অফিসার তৈরিতে অবদান রাখেন।

২১ জুলাই তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়ার্টারে রিপোর্ট করার পর আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে।

মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীনের প্রথম কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের, বিশেষ করে প্লাটুন ও সেকশন কমান্ডারদের মনোবল, সাহস ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। তাদের মনোবল ও সাহস ফিরিয়ে আনতে তিনি নতুন কৌশল প্রয়োগ করেন। শুধু প্লাটুন ও সেকশন কমান্ডারদের সমন্বয়ে ক্ষুদ্র দল করে তাদের সাথে নিয়ে কামালপুরেই হিট অ্যান্ড রান পদ্ধতিতে বেশ ক’টি অপারেশন চালান। সব অপারেশনেই তিনি তাদের সাথে থাকেন এবং নেতৃত্ব দেন। বেশির ভাগ অপারেশনই সফল। পরবর্তী সময়ে এসব যোদ্ধাই তার নেতৃত্বে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যুদ্ধ করেন। এর মধ্যে ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও এমসি কলেজের যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য।

যে কয়েকটি যুদ্ধ বাংলাদেশের দ্রুত বিজয়ের পটভ‚মি তৈরি করে, তার মধ্যে ধলই ও কানাইঘাটের যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। ২৮ অক্টোবর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে ধলইয়ে আক্রমণ করে। পাঁচ দিনের টানা যুদ্ধে ধলই মুক্ত হয়। এরপর আটগ্রাম-চারগ্রাম ও কানাইঘাটে তারা পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হন। কানাইঘাটের গৌরীপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে জিয়াউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। ২৬ নভেম্বর ভোরে তার বাহিনীর একাংশের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে। এতে মুক্তিবাহিনীর একটি কোম্পানি নাজুক অবস্থায় পড়ে। কোম্পানির কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুব শহীদ হন।

এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পিছিয়ে দরবস্ত ও খাদিমনগরে অবস্থান নেয়। মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তানি অবস্থানের মধ্যবর্তী জায়গা দিয়ে অনুপ্রবেশ করে সিলেট শহরের উপকণ্ঠে যাবেন। কাঁচা রাস্তা, খাল-বিল-হাওরের মধ্য দিয়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে প্রায় এক হাজার ১০০ মুক্তিযোদ্ধা তার নেতৃত্বে ১৩ ডিসেম্বর সিলেট এমসি কলেজে পৌঁছান। তার পরিকল্পনা ছিল, পথে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে শক্তি ক্ষয় না করে সিলেট শহরের কাছাকাছি পৌঁছে তাদের চমকে দেয়া। তার এ পরিকল্পনা বেশ কাজ করে। তাদের দেখে পাকিস্তানি সেনারা একেবারে হতভম্ব হয়ে পড়ে। এমসি কলেজের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

হানাদার বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। স্বাধীনতার পর জিয়াউদ্দীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ঢাকার ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের প্রথম কমান্ডার ছিলেন। তিনি মিলিটারি একাডেমির বিকল্প হিসেবে ‘ব্যাটল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে বাংলাদেশ ওয়্যার কোর্স-২-এর প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। তিনি আগাগোড়া একজন কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ অফিসার ছিলেন। তিনি সামরিক নিয়মনীতি ও ঐতিহ্যগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন ও অধীনস্থদের তা পালনে নির্দেশ দিতেন। বিজয় অর্জনের পর দেশে খুন-খারাবি, অন্যায়-অবিচার, লুটতরাজ, গুম-খুন ও সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং এর তীব্র প্রতিবাদ করে সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় আর্টিক্যাল লিখে কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ে পদত্যাগ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি সিরাজ সিকদারের অনুরোধে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিতে যোগ দেন এবং দীর্ঘ ১৩ বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন।

অতঃপর তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন। এরপর তাকে নিয়োগ দেয়া হয় চট্টগ্রামে সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে। ওখানে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সততার উদাহরণ সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানের প্রভ‚ত উন্নতিসাধন করেন। জিয়াউদ্দীন ছিলেন মনে-প্রাণে একজন মানুষ গড়ার কারিগর। তাই বেছে নেন শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে। যোগদান করেন প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসেবে। এখনো তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে। এক দুরারোগ্য ব্যাধি এসে হজির হয়েছে তার কর্মব্যস্ত জীবনে।

আজ আমরা ভুলতে বসেছি ও অবজ্ঞা করতে শুরু করেছি সেসব দুঃসাহসী বীরের প্রতি যারা এ দেশ ও এ পতাকার জন্য অনেকে করেছেন জীবন উৎসর্গ, অনেকে দিয়েছেন জীবনের সব সুখশান্তি বিসর্জন। অবহেলিত সেসব ব্যক্তিত্বের একজন হলেন জিয়াউদ্দীন, বীর উত্তম। বর্তমানে বয়সে ভারাক্রান্ত একসময়ের দুর্দান্ত ও অকুতোভয় এ সামরিক কমান্ডার। তিনি জীবনসায়াহ্নে উপনীত। একা একা চলতে-ফিরতে পারেন না। ঠিকভাবে কথাও বলতে পারেন না। তার সৌভাগ্য যে, তিনি একজন স্বামীভক্ত জীবনসঙ্গিনী পেয়েছেন, যিনি সর্বক্ষণ প্রিয় স্বামীর সেবায় নিয়োজিত। সর্বশেষ টেস্ট রিপোর্টে জানতে পারলাম, তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে তার উন্নত চিকিৎসার খুবই প্রয়োজন। সিএমএইচ কর্তৃপক্ষ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এ-জাতীয় বীর উত্তমের সুচিকিৎসার ক্ষেত্রে। যে বীর এক দিন জীবন বিপন্ন করেছেন দেশের জন্য; সে দেশ যেন অবহেলা না করে তার প্রতি! পরিশেষে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে তার সুস্বাস্থ্য কামনা করে কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি।
Email: hoque2515@gmail.com



আরো সংবাদ