২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

আমিই আমার হন্তারক

আমিই আমার হন্তারক - ফাইল ছবি

নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে সহজে মডিফাই করা যায় এমন রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোর (ধূমপান, মদ্যপান, পুষ্টিহীন খাবার ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা) পর আসে মেটাবলিক রিস্ক ফ্যাক্টর, যা মডিফাই করা মানুষের জন্য অসম্ভব নয়, তবে খানিকটা কষ্টকর। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে আরো চারটি রিস্ক ফ্যাক্টর যেমন- হাইপারটেনশন, ওবেসিটি, হাইপারগ্লাইসেমিয়া ও হাইপারলিপিডেমিয়া।

আমরা কী খাই
এনসিডির রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো লাইফ স্টাইলের পাশাপাশি খাবারের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।

আমরা শ্রেষ্ঠ জীব। খাবার হিসেবেও খাই অন্য কোনো প্রাণী নতুবা উদ্ভিদ। আমরা যে খাবার খাই তা মূলত সাত ধরনের : কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, পানি ও ডায়েটারি ফাইবার।

প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেটকে একত্রে ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট বলে। ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টগুলোর মধ্যে আবার সবচেয়ে সস্তা, ন্যাচারাল, পর্যাপ্ত আর সহজলভ্য হলো কার্বোহাইড্রেট।

আমরা যে কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাবার খাই তা প্রধানত ফ্রি সুগার, শর্ট চেইন কার্বোহাইড্রেট, স্টার্চ (উৎস-চাল, গম, আলু, যব, ডালজাতীয় খাবার) এবং নন-স্টার্চ পলিসেকারাইড বা ডায়েটারি ফাইবার (উৎস-সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, ফল, শাকসবজি) ও সুগার অ্যালকোহল (শক্ত ফল, ভুট্টা) ফর্মে খাই।

তবে মনে রাখতে হবে যে, কোনো একটা নির্দিষ্ট কার্বোহাইড্রেটই শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নয়। কারণ আমাদের শরীরের গ্লিসারল এবং প্রোটিন থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট তৈরি হয় কিন্তু গ্লুকোজ বা প্রোটিন একবার ফ্যাটে রূপান্তর হলে তা আবার গ্লুকোজ বা প্রোটিনে রূপান্তর হয় না। কার্বোহাইড্রেট থেকে যে শক্তির জোগান হয়, তার বেশির ভাগই হতে হবে স্টার্চ ও ডায়েটারি ফাইবার থেকে।

প্রকৃতিতে ফ্রি সুগারের দু’টি উৎস। একটি হলো ইন্ট্রিঞ্জিক যা টাটকা ফলে, শাকসবজিতে ও দুধে পাওয়া যায় এবং যার খাবার ব্যাপারে এমনকি ডায়াবেটিস রোগীদেরও তেমন কোনো বাধা নেই। আরেকটি হলো নন-মিল্ক এক্সট্রিঞ্জিক যেমন আখ ও খেজুরের রস এবং তাদের বাই প্রডাক্ট চিনি ও গুড়। এগুলো সীমিত আকারে খাওয়া যায়।

ডায়েটারি ফাইবার উপেক্ষিত কেন?

সব কার্বোহাইড্রেট খাবারই ন্যাচারাল সটার্চ ফর্মে এবং যত বেশি ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ হবে তত নিরাপদ। ডায়েটারি ফাইবার পুরোপুরি উদ্ভিদজাত এবং টাটকা ফল, শাকসবজি, ডাল, শিম ও বাদামজাতীয় খাবারে থাকে। এটি সাধারণত হজম হয় না, বরং খাদ্যনালীতে অবস্থান করে এবং এদের ব্যবহার করে কলনিক ব্যাকটেরিয়া আমাদের জন্য উপকারী শর্ট চেইন ফ্যাটিএসিড তৈরি করে। এটি কোলেস্টেরল হজমে বাধা দেয়, গ্যাস্ট্রিক এম্পটিং দেরি করায়, কলনিক ক্যান্সার প্রতিরোধী এবং শরীরের টক্সিক উপাদান খাদ্যনালী থেকে বের করে দেয়। এ জন্য ডায়েটারি ফাইবারকে খাদ্যনালীর প্রাকৃতিক ঝাড়ুদারও বলে। এসব কারণে ডায়েটারি ফাইবারকে সপ্তম খাদ্য উপাদানও বলে। এটি দুই প্রকার, দ্রবণীয় যার খুব সামান্য ক্যালরি ভ্যালু আছে আর অদ্রবণীয় যার কোনো ক্যালরি ভ্যালুই নেই। ডায়েটারি ফাইবারের পরিমাণ থাকা উচিত মোট খাবারের ২৭-৪০ শতাংশ। কিন্তু এ খাবারটিকে উপেক্ষা করছি অনবরত।

ফ্যাট নামে আমরা কী খাই
খাবারে আমরা যে প্রাণিজ ফ্যাটজাতীয় খাবার খাই তা মূলত ট্রাইগ্লিসারাইড-জাতীয় এবং কিছু কোলেস্টেরল। হজমের সময়ে এক অনু ট্রাইগ্লিসারাইড ভেঙে এক অনু গ্লিসারল এবং তিন অনু ফ্যাটিএসিড তৈরি হয়।

জৈব রসায়নে, ফ্যাটিএসিড হলো একটি কার্বক্সিলিক এসিড যা এলিফ্যাটিক চেইনযুক্ত যেখানে সাধারণত ৪-২৮ টি কার্বন পরমাণু থাকে।

এসব ফ্যাটিএসিড রক্তে লাইপোপ্রোটিন নামক বাহনে ঘুরে বেড়ায় এবং শক্তির জোগান দেয়।

ফ্যাটিএসিড চার ধরনের
প্রথমত, সেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড বা ‘খারাপ ফ্যাট’। দ্বিতীয়ত, আনসেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড বা ‘ভালো ফ্যাট’ যার থেকে অন্ততপক্ষে ৬-১০ শতাংশ ক্যালরি আসা দরকার। তৃতীয়ত, কোলেস্টেরল এস্টার যা প্রয়োজনীয় কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন হলে ‘খুব খারাপ’। চতুর্থত, ম্যান-মেইড ট্রান্সফ্যাট বা ‘আগলি বা কুৎসিত’ ফ্যাট যা সবচেয়ে খারাপ।

মনো আনসেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড সাধারণ তাপমাত্রায় তরল কিন্তু ফ্রিজে রাখলে শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু পলি আনসেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড সাধারণ এবং ফ্রিজিং তাপমাত্রায় উভয় অবস্থাতেই তরল।

সব এসেন্সিয়াল ফ্যাটিএসিডই প্রকৃতিতে আমাদের চার পাশে বিশেষ করে উদ্ভিদে অল্প পয়সায় পাওয়া যায়। আর সেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড অনেক দামি খাবার যা বড় বড় পশুর মাংসে পাওয়া যায় যা রক্তে ‘ভালো কোলেস্টেরল’ বা এইচডিএল এর মাত্রা কমিয়ে দেয়, খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল ২০-২৫ শতাংশ এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ এর ঝুঁকি বাড়ে বহুগুণ।

সেচুরেটেড ফ্যাটিএসিডের মাত্রা পা-বিহীন প্রাণী (যেমন, মাছ) থেকে চার পা-ওয়ালা প্রাণী (যেমন, মুরগি, ছাগল, গরু ও মহিষ) এবং ছোট থেকে বড় প্রাণী অনুপাতে বাড়তে থাকে। এসেন্সিয়াল ফ্যাটিএসিড প্রাণিজ মাংশে বেশি থাকলেও দামি এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বিধায় বিশেষজ্ঞরা একাধিক ফল-সবজির ভক্ষণের মাধ্যমে এসেন্সিয়াল ফ্যাটিএসিডের চাহিদা পূরণের পরামর্শ দিয়েছেন।

পলি আনসেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়, ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় আর রক্ষা করে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে।

কোলেস্টেরলের উৎস কেবল দামি প্রাণিজ মাংশ ও ডিমে। এর কোনো উদ্ভিদ উৎস নেই।

ডব্লিউএইচওর ফ্যাট উৎসের ব্যাপারে মূল টার্গেট হলো সেচুরেটেড ফ্যাটিএসিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উদ্ভিদজাত ন্যাচারাল আনসেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড নির্ভর হওয়া। কিন্তু বিশ্বের বড় বড় ব্যবসায়ী কোম্পানি এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যবসায়িক লোকসান গুনতে রাজি নন। ফলে সেচুরেটেড ও ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

ট্রান্সফ্যাট মানব সৃষ্ট মারণ বিষ
এটি ন্যাচারাল সিজ আনসেচুরেটেড ফ্যাটিএসিডের একটি ম্যান-মেইড জীবননাশক আওসোমার।

ট্রান্স ফ্যাট হলো মানুষের তৈরি প্রথম বিশেষ ধরনের আনসেচুরেটেড ফ্যাট। উইলিয়াম নরম্যান ১৯০২ সালে আবিষ্কার করলেন কিভাবে আংশিক হাইড্রোজেনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরল উদ্ভিজ চর্বিকে শক্ত, সেমিসোলিড চর্বিতে রূপান্তর করা যায়।

এটি হলো খাবারকে সুস্বাদু, টাটকা ও পুষ্টিকর করার নামে কুখাদ্য ও পুষ্টিহীন খাবারে রূপান্তর করা যা হার্ট ডিজিজ, ডায়াবেটিসসহ অন্য অনেক রোগের বড় কারণ। ধূমপান আর মদ্যপানের মতোই ট্রান্স ফ্যাটের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। নেই কোনো স্বাস্থ্য সুবিধা।

নরমাল সিজ আনসেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড চেইনের ডাবল বন্ড যেখানটায় সেখানে একই দিকে হাইড্রোজেন সংযুক্তির সময় চেইনটি বেঁকে যায় কিন্তু ট্রান্স ফ্যাটের ক্ষেত্রে ফ্যাটিএসিড চেইনটি গঠন করার সময় বাঁকিয়ে না গিয়ে সোজা চেইন হয়। লাতিন ভাষায় ‘সিজ’ মানে একই দিক আর ‘ট্রান্স’ মানে বিপরীত দিক।

সব ধরনের বেকিং, ফ্রাইং, ফ্রজেন, পারসিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড, রেফ্রিজারেটেড, প্রসেজড, ডগনাটস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টিক মারগারিন, কেক, কোকিজ, পাইস প্রভৃতি ম্যান মেইড খাবার ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ।

১৯০২ সালের আগে এ খাদ্য সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না। বর্তমানে বিশ্বে শুধু এর কারণে অতিরিক্ত পাঁচ লাখ লোক প্রতি বছর করোনারি হার্ট ডিজিজে মারা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ট্রান্স ফ্যাটিএসিডকে আইনের আওতায় এনে শিল্পে ব্যবহৃত ফ্যাটযুক্ত খাবারে সারা বিশ্বে এর মাত্রা ২০২২ সালের জানুয়ারির মধ্যে ২ শতাংশে এবং ২০২৩ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কিছু অঙ্গরাজ্য ট্রান্স ফ্যাট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

প্রোটিন : প্রোটিন খাবারে মূল কাজ রোগ প্রতিরোধ। আবার ফ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর একটি বড় উপায় হলো প্রোটিন খাবার বাড়িয়ে দেয়া। কারণ প্রোটিন গ্লুকাগন, গ্রোথ হরমোন ও মেটাবলিসম বাড়িয়ে এবং ক্ষুধা কমিয়ে ফ্যাট ভাঙতে সাহায্য করে।

হাইপারটেনশনের ভয়ঙ্কর চিত্র : ডব্লিউএইচও বলছে, বিশ্বে ১২৮ কোটি হাইপারটেনশনের রোগী আছে যারা ৩০-৭৯ বয়সী এবং যাদের দু-তৃতীয়াংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের মানুষ। পুরুষদের মধ্যে প্রতি চারজনে একজন এবং মহিলাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন হাইপারটেনশনের রোগী। এর মধ্যে শুধু ৪২ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নেয়। পৃথিবীব্যাপী অকালে মানুষ মৃত্যুর বড় কারণ এটি।
হাইপারটেনশনের কারণেই হার্ট ডিজিজ, ব্রেইন ও কিডনি রোগীর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

হাইপারটেনশনের রিস্ক ফ্যাক্টর : অতিরিক্ত লবণ, সেচুরেটেড ও ট্রান্সফ্যাট, কম পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া, শারীরিক কাজকর্ম কমিয়ে দেয়া, তামাক-মদজাতীয় খাবারে অভ্যস্ত হওয়া ও অতিরিক্ত ওজন।

স্থূলতা মানে স্বাস্থ্য নামের ফাঁকা বেলুন : বর্তমানে মানব স্বাস্থ্যের একটি মহামারী অবস্থা হলো স্থূলতা। যুক্তরাজ্যে স্থূলতা ১৯৮০, ১৯৯৫ ও ২০১৫ সালে যথাক্রমে ৭%, ১৬% ও ২৫%। ৯ জুন ২০২১ সালে ডব্লিউএইচও প্রতিবেদন মতে, ১৯৭৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী স্থূলতা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। অর্থাৎ লোকসংখ্যা বাড়ার হারের চেয়ে স্থূলতা বাড়ার হার অনেক বেশি।

স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে ফুড পিরামিডের চার্ট হবে সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্নক্রমে যথাক্রমে ফল-শাকসবজি, শরীর চর্চা, স্টার্চ, প্রোটিন, ফ্যাট ও সুগার। পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষে এবং না খেয়ে যত লোক মারা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি লোক মারা যায় অতিরিক্ত খেয়ে অতিরিক্ত ওজন বাড়িয়ে এবং স্থূলকায় হয়ে যাওয়ার কারণে।

হাইপারলিপিডেমিয়া, ঘরের শত্রু বিভীষণ
আমরা ট্রাইগ্লিসারাইড ফর্মে যে ফ্যাট খাই তা ইন্টেস্টাইনে ভেঙে গ্লিসারল ও ফ্যাটিএসিড হয়। শরীরে ঢোকার পরপরই ইন্টেস্টাইনের কোষে তা আবার ট্রাইগ্লিসারাইডে রূপান্তর হয়। কিন্তু শোষিত কোলেস্টেরল, ফ্যাটিএসিড ও ট্রাইগ্লিসারাইড পানিতে দ্রবণীয় নয়। ফলে এদের সারা শরীরে রক্তের মাধ্যমে পৌঁছানোর জন্য পানিতে দ্রবণীয় বাহন দরকার। অনেকটা নদী-সমুদ্রে বিভিন্ন জাহাজে করে যেমন করে দেশে দেশে মালামাল পৌঁছে দেয়ার মতো। আমাদের শরীরে ‘লাইপোপ্রোটিন’ নামক বাহনে চড়ে এসব ফ্যাট শরীরের বিভিন্ন অংশের কোষে পৌঁছে যায়, আবার অপ্রয়োজনীয় লিপিড লিভারে বহন করে নিয়ে আসে। পাঁচ ধরনের লাইপোপ্রোটিনের নামকরণ হয়েছে কোলেস্টেরল বহনের ক্ষমতানুযায়ী।

এই লাইপোপ্রোটিনগুলো হলো : হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল, লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল, ইন্টারমেডিয়েট ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা আইডিএল ভেরি লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা ভিএলডিএল ও আল্ট্রা লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা ইউএলডিএল বা কাইলোমাইক্রন।

মানুষের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল লিভার তৈরি করতে পারে। কাজেই আমরা যদি খাবারের সাথে কোনো কোলেস্টেরলজাতীয় খাবার নাও খাই, তবুও শরীর তার প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল তৈরি করে নেবেই।

কোন উৎস থেকে কতটুকু ক্যালরি নিবেন
সুষম ক্যালরিযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার বলতে ডব্লিউএইচও মতে সব ধরনের ম্যালনিউট্রিশন এবং যাবতীয় এনসিডি জাতীয় রোগ থেকে সুরক্ষা দেবে সে ধরনের খাবারকে বোঝায়।

ফ্যাট উৎস থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ এবং সেচুরেটেড ফ্যাট থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ক্যালরি নেয়া যাবে কিন্তু ট্রান্স ফ্যাট উৎস থেকে ১ শতাংশের নিচে কিংবা শূন্য ক্যালরি আহরণ সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন থেকে ক্যালরি আহরণ করা যাবে যথাক্রমে ৬৫ ও ১৫ শতাংশ।

ফ্রি সুগার থেকে ক্যালরি আহরণ ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার টার্গেট হলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার।লবণ প্রতিদিন ৫ গ্রামের বেশি খাওয়া যাবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে তারা ২০২৫ সালের মধ্যে খাবারে বর্তমান লবণের ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাবে। কিন্তু পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই এ নিয়ম মানছে না। ফলে ‘এনসিডি’র ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে।

সুষম খাবারে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঝুঁকিমুক্ত রাখার উপায়
খাবারে স্টার্চ ও ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ করা।
এম্পটি সুগার, কোলেস্টেরল, পাতে লবণ বন্ধ করা।
প্রাণিজ তথা সেচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে উদ্ভিদ উৎসের আন সেচুরেটেড ফ্যাট ব্যবহার করা।
ট্রান্সফ্যাট ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া।

যেহেতু প্রাণিজ উৎসের সব প্রোটিনেই প্রচুর ফ্যাট সংযুক্ত থাকে, তাই প্রোটিনের মূল উৎস হিসেবে উদ্ভিদজাত ডাল, শিম, সয়া প্রোটিন ও বীজজাতীয় খাবারকেই প্রোটিন চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা।
ফলমূল, শাকসবজি ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়া।

গভীর চিন্তার বিষয়
জগতে ধনী-গরিবের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলমান। ধনীরা আনন্দিত এই ভেবে যে তাদের টাকা আছে তাই যখন যা খুশি কিনে খেতে পারছে। আর গরিবরা হীনম্মন্যতায় ভোগেন এই চিন্তায় যে টাকা থাকলে কত কিছুই না কিনে খেত। অথচ ধনীদের মজা করে কিনে খাওয়া খাবারেই সবচেয়ে বেশি রোগ বালাই আর গরিবদের ন্যাচারাল সস্তা খাবার যা সর্বত্রই বিরাজমান তার মধ্যে নেই কোনো রোগবালাই। ভিটামিন, মিনারেল, পানি ও ডায়েটারি ফাইবার, যা শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, লাগে কম কিন্তু সর্বত্রই সহজলভ্য সহজ পাচ্য, অথচ তারই ‘অভাবে’ জগৎজোড়া মানুষ রোগে ভোগে অজ্ঞতার কারণে। যেমন জগতে পানির তেমন কোনো অভাব নেই, আর ভিটামিন, মিনারেল আর ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি ফলমূল সর্বত্রই সস্তায় পাওয়া যায়। অথচ এত বড় ভুবনে এসবেরই অভাবজনিত কারণে রোগ হচ্ছে অহরহ। অন্য দিকে তুলনামূলক দামি কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার অতি ভোজনের কারণে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। এসবের আধিক্য আর অসম বণ্টনের কারণেই তো হচ্ছে মরণঘাতী আর নীরব ঘাতক ‘এনসিডি’র রোগগুলো।

ফ্যাটজাতীয় খাবার কার্বোহাইড্রেটের চেয়ে দামি ও কম প্রয়োজন। অথচ এগুলোর ন্যাচারাল ফর্মের অপেক্ষাকৃত সস্তা সহজলভ্য খাবারকে প্রোটিনের চেয়েও দামি আর মুখরোচক বানিয়ে ব্যবসা করছি সাথে রোগ তৈরির সব উপাদান ঢুকিয়ে দিচ্ছি। ফলে ধনীরা অসুস্থ হচ্ছে বেশি খেয়ে আর গরিবরা অসুস্থ হচ্ছে না জানার কারণে উপযুক্ত খাবার না খেয়ে।

আমাদের খাবারগুলোর মধ্যে চারটি এমন খাবার আছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একবারে না খেলেই বরং জীবন রোগমুক্ত থাকবে বেশি। এই চারটি খাবার হলো চিনি, সেচুরেটেড ফ্যাট, কোলেস্টেরল ও ট্রান্স ফ্যাট।

আর পাঁচটি খাবার এমন যে তা সম্ভব বেশি খেতেই হবে এবং সহজলভ্য। তার পরও আমরা তা কম দামেও কিনে খাই না। সেগুলো হলো লো কার্ব, আন সেচুরেটেড ফ্যাটিএসিড, ভিটামিন ও ডায়েটারি ফাইবার।

আরেকটি অত্যাবশ্যক খাবার প্রোটিন যার মূল উৎস প্রাণিজ। কিন্তু এই উৎস থেকে প্রোটিন আহরণ করতে সাথে প্রচুর পরিমাণে অনাকাক্সিক্ষতভাবে ফ্যাট খেয়ে ফেলতে হয়। তাই তার উত্তম বিকল্প হিসেবে একাধিক উদ্ভিজ জাত খাবার যেমন সয়া প্রোটিন, ডাল, শিম ও বাদামজাতীয় উপাদান থেকে প্রোটিন চাহিদা পূরণ করা যায়। কিন্তু তা আমরা করছি না।

যা না হলে এক দণ্ডও চলে না, সেই অক্সিজেন প্রকৃতিতে আছে অফুরন্ত। যেসব খাবার সবার জন্য বেশি প্রয়োজন এবং অত্যাবশ্যক তার সবই আল্লাহ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যেই প্রকৃতিতে করেছেন সহজলভ্য। অথচ অকৃতজ্ঞ মানুষ এ সুযোগের সুবিধাও নিচ্ছে না এবং তার প্রভুর দরবারে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করছে না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, শের-ই-বাংলা নগর, ঢাকা।



আরো সংবাদ


ভারতের প্রতিরক্ষাপ্রধান রাওয়াতের মন্তব্য ঘিরে ক্ষুব্ধ চীন (১০৫০৬)কাতার বিশ্বকাপে থাকবে না ইতালি বা পর্তুগালের কোনো একটি দল (১০৫০১)বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিতীয় দিনের খেলার সময় পরিবর্তন (৮৫৩৬)স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন যুবক (৭২২৯)ভূমিকম্প দিয়ে গেল সতর্কবার্তা (৬৮৩০)স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সব শর্ত পূরণ করেছি : তালেবান (৬০৫০)ঘরে ঘরে জাহাঙ্গীর (৫৭৫৯)‘জরুরি অবস্থার মুখে দেশ’ কী বার্তা দিলেন ইসরাইল প্রধানমন্ত্রী (৫৬৮৪)‘হত্যাচেষ্টা ফাঁস হওয়ার ভয়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে দিচ্ছে না’ (৫০৮০)ইসরাইলের সাথে পানির বিনিময়ে জ্বালানি চুক্তির বিরুদ্ধে জর্ডানে বিক্ষোভ (৪২৯২)