০৬ ডিসেম্বর ২০২১
`

জনমতের ভিত্তিতে জনপ্রিয়তা যাচাই


‘জনপ্রিয়’ শব্দটি দিয়ে এমন একটি বিষয় বোঝানো হয়; যা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে প্রশংসিত। তাই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের ইচ্ছাতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থার প্রণভোমরা হলো জনসম্মতি। জনমতের ওপর ভিত্তি করেই সরকার গঠন, শাসন পরিচালনা, ক্ষমতায় আরোহণ, অপসারণ এমনকি নতুন সরকারও গঠিত হয়ে থাকে। গণতন্ত্র হলো প্রতিনিধিত্বমূলক। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মূলভিত্তিই জনমত। সুষ্ঠু ও সচেতন জনমতের ওপর প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভরশীল।

গণতান্ত্রিক দেশে ‘নির্বাচন’ হচ্ছে জনমত যাচাইয়ের আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়া। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে দল বেশি সংসদীয় আসনে জয়ী হয়; জনমত তাদের পক্ষে আছে বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু এখন আমাদের দেশে নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে; কারণ দেশের কোনো নির্বাচনই আর পক্ষপাতদুষ্টের বাইরে নেই। ব্যালট ছিনতাই, আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া, ক্ষমতাসীনদের পক্ষে জোর করে ভোট নেয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভোটারদের সঠিক পছন্দকে বেছে নিতে বাধা দেয়া, প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে সংখ্যা বেশি দেখানো এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অনিরপেক্ষতা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কাজেই এখনকার যেকোনো নির্বাচনে কোনোভাবেই জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে, এ কথা বলা মুশকিল।

দেশে বর্তমানের শাসকদল নিজেদের জনপ্রিয় সরকার বা জনগণ তাদেরই ক্ষমতায় রাখতে চায় এমন প্রচারণা হরহামেশা করে থাকে। কিন্তু তারা কোন ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন, সেটি বলেন না। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পথটি যে দেশে এ মুহূর্তে অনুপস্থিত, তা না বলাই ভালো। এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রোহিত করা। দেশে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কুঠারাঘাত করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নির্বাসনে দেয়া হয়েছে; অর্থাৎ এই দুই জাতীয় নির্বাচনে এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা ফের ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্থানীয় যেমন- উপজেলা, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পর্যন্ত জনগণ সুষ্ঠু ও স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারছেন, তা বলার উপায় নেই। স্থানীয় নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান। এখানে একটি কথা স্পষ্ট- যেখানে জনমতের সঠিক প্রয়োগ নেই; সেখানে জনপ্রিয়তা যাচাই করাও সম্ভব নয়। আসলে গণতন্ত্রকে অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। আমাদের দেশে যেটি অনুপস্থিত। ফলে দেশে দুর্নীতি ও নৈরাজ্য আজ সর্বগ্রাসী। দেশে নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতার মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পরিণতিতে আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনে জয়-পরাজয় একটি দলের কার্যকলাপের ওপর নির্ভর করে। জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকলাপের ওপর ভিত্তি করে দলের প্রতি ভোটাররা সমর্থন ব্যক্ত করে থাকেন। কাজেই জনগণকে যদি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ দেয়া না হয়; সে ক্ষেত্রে একটি দেশের সরকার জনগণের ‘প্রিয় সরকার’ বলার অবকাশ কোথায়। দেশে ভোটের রাজনীতিতে যে সঙ্কট সবচেয়ে বেশি বিরাজমান; তা হচ্ছে একটি সরকারের মেয়াদান্তে কোন ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জনমতের সঠিক প্রয়োগ হয়েছিল বলে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষণে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তখনকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ নিজের শরিক দলগুলো নিয়ে দীর্ঘ দিন হরতাল, অবরোধ করেছিল।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চাপে বিএনপি সরকার সেই দাবি মেনে নিয়ে সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা করেছিল। এই নির্দলীয় সরকারের অধীনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে তেমন কোনো প্রশ্ন দেখা দেয়নি। কিন্তু সংবিধানের ধারা লঙ্ঘন করে প্রায় দুই বছর ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দীনের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচন একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে হলেও তা বিতর্কমুক্ত ছিল না। এ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েই আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করে আবারো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে; যার ফল হচ্ছে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন।

আর ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ২৯ তারিখ রাতেই সম্পন্ন করার মতো নির্বাচন দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দমন-পীড়নের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে অবদমিত করার চেষ্টা না করে কোন ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে একটি বিতর্কমুক্ত, গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়; তার জন্য জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে একটি হস্তক্ষেপমুক্ত গণভোটের আয়োজন করা জরুরি বৈকি। দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা টেকসই করতে হলে জনগণের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই। কাজেই কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে একটি জনপ্রিয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে প্রথমত গণভোট দিয়েই জনমত নেয়া দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। এ বাস্তবতা বাদ দিয়ে আর কোনো উত্তম বিকল্প আছে বলে মনে করার কারণ নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এক ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ক্রমেই এ সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বের মর্যাদাবান একটি সাময়িকী, ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে এখন লৌহমানব বা মানবীদের শাসন বাড়ছে। চীন কিংবা রাশিয়া যেখানে আগে পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একটি ছোট বলয় (পলিটব্যুরো) ছিল, যারা মিলেমিশে ক্ষমতা প্রয়োগ করত; সেখানে এখন সব ক্ষমতা এককভাবে একজন নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে এখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অভিহিত করা হচ্ছে ‘চেয়ারম্যান অব এভরিথিং’ নামে। আজকের বাস্তবতায় শুধু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যেই একনায়কতান্ত্রিকতার মাত্রা সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যুক্ত হচ্ছে আরো অনেক দেশের শাসকের নাম। এ ধরনের একনায়কতান্ত্রিকতার হাত থেকে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে অবাধ নির্বাচনের বিকল্প নেই।

জনমত যাচাইয়ে আজকের বাস্তবতায় অবাধ ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা আবশ্যকতা হলেও আমাদের দেশে উপেক্ষিত। জনমত যাচাইয়ে গণতান্ত্রিক দেশে আয়োজন করা হয় গণভোটের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে প্রতিটি বিষয়েই জনমত যাচাইয়ে বছরজুড়ে গণভোটের আয়োজন করে থাকে। গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনেও যেকোনো বিষয়ে জনমত যাচাইয়ে গণভোট হয়। গণভোটের সিদ্ধান্তকেও তারা খুব মর্যাদার সাথে মান্য করে থাকে। যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না-থাকায় ব্রেক্সিট প্রশ্নে গণভোটে ৪ শতাংশ ভোটের কারণে মাত্র আট মাসের মাথায় দেশটিতে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর কথা বলা যেতে পারে ।

আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। আর বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিতর্কের সব সীমা অতিক্রম করেছে। কাজেই আগামী নির্বাচন যেন একই ধরনের আরেকটি নির্বাচন কমিশনের অধীনে না হয়; সে ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্য হতে হবে। সার্চ কমিটি দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা কি সম্ভব? তা নুরুল হুদা কমিশনের কর্মকাণ্ডই বলে দেয়। তাই সংবিধান বর্ণিত আইন প্রণয়ন করে দেশ ও জাতির স্বার্থে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা বেশি প্রয়োজন। বিরোধী দল দমনের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে হয়তো ক্ষমতায় যাওয়া যায় কিন্তু জনপ্রিয় হওয়া সম্ভব নয়।
harun 980@yahoo.com



আরো সংবাদ


বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না (১৭৫২৮)এরদোগানকে হত্যার চেষ্টা! (১৬৩৫৫)`আগামীতে পিছা মার্কা আনমু, নৌকা মার্কা আনমু না’ - নির্বাচনে হেরে নৌকার প্রার্থী (৮৩১১)ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনার কাছে বিস্ফোরণ (৭৭৭৮)আইভী আবারো নৌকা পাওয়ার নেপথ্যে (৭৫৩৭)স্বামীর সাথে সম্পর্ক! গৃহকর্মীকে খুন করে লাশ ঝাউবনে ফেললেন গৃহকর্ত্রী (৬৭৩৮)নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের ফরম কিনলেন বিএনপির ২ শীর্ষ নেতা (৬০১৬)ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ (৪৯০৯)আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি হেফাজতের (৪০১২)রুশ অস্ত্র কিনলে নিষেধাজ্ঞা, ভারতকে বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের (৩৭৬১)