২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

মিয়ানমারের প্রতি অনুরোধ : রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিন


য়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে নিজ দেশ এবং বসতভিটা ছেড়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করছে। এদের প্রায় সবাই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং বর্তমানে এরা কক্সবাজারের বিভিন্ন উদ্বাস্তুশিবিরে রয়েছে। এরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, নারীরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং এদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এভাবে বছরের পর বছর রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থেকে যাবে এটা হতে পারে না এবং এদের ভার বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বহন করতে পারে না। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে। সুতরাং এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। তার জন্য বাংলাদেশের উদ্বাস্তুশিবিরে বসবাস করা এই সব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারে ফেরত নিতে হবে এবং মিয়ানমারে অবস্থিত তাদের নিজ ভিটাবাড়িতে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। আর ১৯৬২ সাল থেকেই সেখানে সেনাবাহিনীর শাসন চলছে। সময়ে সময়ে গণতন্ত্র এলেও তা স্থায়ী হয়নি। বাংলাদেশ সীমান্তের পাশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে তারা সেখানে বসবাস করছে। অথচ মিয়ানমার সরকার এখন রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করছে, যার কোনো প্রমাণ মিয়ানমারের হাতেও নেই। সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৮২ সালের ১৫ অক্টোবর ‘বার্মিজ সিটিজেনশিপ ল’ নামে একটি আইন পাস করে। এতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। তখন থেকেই রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ২০১৪ সালের আদম শুমারিতেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাদ দেয়া হয়েছে।

প্রত্যেক মানুষেরই কতকগুলো মৌলিক অধিকার থাকে, যা যেকোনো দেশের, যেকোনো ধর্মের এবং যেকোনো নাগরিকের বেলায় সমভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাপী মানুষের এই মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ সর্বজনীন মানবাধিকারের নীতিমালা গ্রহণ করে। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকারের এই ঘোষণাপত্রে বিভিন্ন উপধারাসহ মোট ৩০টি মূলধারা সংযুক্ত। এই ঘোষণাপত্রে- আইনের দৃষ্টিতে সবার সমান অধিকার, জাতীয়তা লাভের অধিকার, চিন্তা-বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার, সভা-সমাবেশ করার অধিকার, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ দেশে সরকারে অংশগ্রহণের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার, সবার আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং সর্বোপরি শাসনতন্ত্র বা আইন কর্তৃক প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে বিচার বা আদালতের মাধ্যমে তার কার্যকর প্রতিকার লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বসবাসরত প্রতিটি জনগোষ্ঠীর এবং প্রতিটি নাগরিকেরই স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার, মত প্রকাশের এবং রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সব অধিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরও রয়েছে। এখানে ধর্ম, বর্ণ এবং গোত্রীয়ভাবে কাউকে চিহ্নিত করে, তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই।
ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কটের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর কোনো সমাধান হয়নি। বিদেশী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থিক সাহায্য দিলেও, তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়াটাই একমাত্র সমাধান। আমরা চাই, আন্তর্জাতিক বিশ্ব উদ্বাস্তুদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনে সহযোগিতা করুক। আমরা মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার।

সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের ৭৬তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মূলত এই সঙ্কটের একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া এবং তাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজ বসতবাড়িতে বসবাসের সুযোগ দেয়া। নিজ দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাটা যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র ও সরকারের নৈতিক দায়িত্ব, সেখানে মিয়ানমারের সরকার আজ সেখানকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে এবং জাতিগতভাবে নির্মূল করা হচ্ছে।

একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং হাজারও সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও বাংলাদেশ যেভাবে রোহিঙ্গাদের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তা অতুলনীয়। বিশ্ববাসীর উচিত বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ১০ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেয়া এবং এতগুলো মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের জন্য বিরাট কঠিন একটি বিষয়। এরা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিরাট এক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন উপদলীয় সঙ্ঘাত। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব সঙ্ঘাতে শতাধিক রোহিঙ্গা খুন হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রোহিঙ্গাশিবিরে নিজ কার্যালয়ে খুন হয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নেতা মুহিবুল্লাহ, যিনি ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করেন। মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের পক্ষে কাজ করছিলেন। এভাবে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করছে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে কাজ করতে হবে। আমরা জাতিসঙ্ঘ, কমনওয়েলথ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ সব বৃহৎ রাষ্ট্রকে মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদেরকে সহযোগিতা করার এবং এই সঙ্কটের একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান করার আবেদন জানাই। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিয়োজিত এসব শক্তি এবং রাষ্ট্রকে আজ মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক গঠিত এবং জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের প্রণীত সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে।

কিছু মানুষকে হত্যা করে কখনো একটি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা যায় না। জাতিগত বিভেদ এবং সাম্প্রদায়িকতার দেয়াল সৃষ্টি করে কখনো একটি সমাজে এবং রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। একইভাবে একটি সমাজ এবং রাষ্ট্রকে শান্তি এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া যায় না। সুতরাং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া ও তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মিয়ানমারের কর্তব্য। বাংলাদেশের মাটিতে শরণার্থী হিসেবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদেরকে অবশ্যই নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে এবং তাদেরকে নিজ বসতভিটায় নিরাপদে বসবাস করতে দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের সাথে নিয়েই সে দেশের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে এবং জাতীয় উন্নয়নে কাজ করতে হবে। এতেই মিয়ানমারের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।

লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক
e-mail: omar_ctg123@yahoo.com



আরো সংবাদ