১৯ জানুয়ারি ২০২২
`

অধরাই রসনাতৃপ্তির ইলিশ

অধরাই রসনাতৃপ্তির ইলিশ - ছবি : সংগৃহীত

আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় মাছ ইলিশ, জাতীয় পশু বাঘ ও জাতীয় ফল কাঁঠাল। জাতীয় অভিধাপ্রাপ্ত উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য নেই। স্কুলছাত্ররা গাড়িতে বসে একে অপরকে প্রশ্ন করছিল উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে। মাত্র একজন বলতে পেরেছে জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পশু বাঘ। এদের অন্যজন বলল, “শাপলা ফুল দেখতে কেমন রে! অন্যরা উত্তর দিলো একটাই, বইয়ে দেখেছি, বাস্তবে দেখিনি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে পাই ‘ডিসকভারি’ চ্যানেলে। একমাত্র জাতীয় ফল কাঁঠাল দেখা যায় নির্দিষ্ট মৌসুমে।” দুঃখ শুধু এক জায়গায়, অনেক ছাত্রছাত্রী জাতীয় অভিধাপ্রাপ্ত জিনিসগুলোর নাম জানে না। জাতীয় মাছ ইলিশ, এ কথা না জানলেও ইলিশ মাছ প্রায় সবাই চিনে। কাঁঠাল, শাপলা ও বাঘ চিনলেও জাতীয় বিষয়ে তারা জ্ঞাত নয়। কারণ এগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকরা হয়তো কম আলোচনা করেন। বিদ্যালয়ে আলোচনা করলে না দেখলেও জাতীয় নামগুলো এদের স্মরণে থাকত।

প্রাথমিক শিক্ষায় বাবা-মা বা অভিভাবকরা কোমলমতি শিশুদের বইয়ের ছবি দেখিয়ে শেখান জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় পশু বাঘ ইত্যাদি। শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়ার পর বাড়িতে আর ছেলেমেয়েদের এ বিষয়ে পড়ানো হয় না। না পড়ানোর সুনির্দিষ্ট কারণ হতে পারে, বিদ্যালয়ে গাদা গাদা বইয়ের পড়া শেখাতে অভিভাবকরা হিমশিম খাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও হাঁপিয়ে উঠছে বিদ্যালয়ের পাঠগুলো চুকাতে। অনেক আগের কথা, তখনকার সময়ে এতগুলো বই ছিল না। ছিল নামতার বই, বাল্যশিক্ষা, বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালার বই।

শিক্ষানীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে বর্তমানে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নামতা মুখস্থ বলতে পারে না, শতকিয়া বলতে ভুল করে, বাংলা-ইংরেজিতে বর্ণমালা কয়টি, তা বলতে পারে না। আরো উল্লেখ্য, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী জাতীয় সঙ্গীত মুখস্থ বলতে পারে না। এর রচয়িতা কে তা-ও বলতে পারে না। আমরা এ জন্য কাকে দায়ী করব? সে দিকে আমি যাচ্ছি না। এ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। শিক্ষকদের মনমানসিকতার ওপর সবকিছু নির্ভরশীল।

এর পরও কথা থেকে যায়, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করতে সুপরিসর জায়গা দরকার। ভাড়াবাড়িতে জায়গা পাবে কোথায়? যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিচ্ছে তাদের দায়ী না করে অনুমোদন যারা দিচ্ছে তাদে দায়ী করা যেতে পারে। একটি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠসহ আনুষঙ্গিক আরো কতগুলো বিষয় বাধ্যতামূলক। অনুমোদন দেয়ার আগে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিশ্চয়ই ওই অনুমোদন প্রার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে যান। তারা সবকিছু দেখেশুনে তবে অনুমোদন দেয়ার নিয়ম রয়েছে।

একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনুমোদনকারী দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রধানকে ‘ম্যানেজ’ করে অনেকে অনুমোদন নিচ্ছেন। এ কথার কতটুকু ভিত্তি আছে জানি না। অন্ধ চায় চোখ, ক্ষুধার্তরা চায় খাদ্য, আমিও সে ভাষায় বলতে চাই- যাকে যেভাবে ‘ম্যানেজ’ করা যায় করুক, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন যেন ক্লাস শুরুর আগে বাধ্যতামূলক হয় সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হোক। এতে করে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সঙ্গীত বিষয়ে সবকিছু জানতে পারবে।

ইলিশ মাছ সবার প্রিয় এবং লোভনীয় খাদ্য। ইলিশ মাছের পাতুড়ির কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পয়লা বৈশাখে পান্তাভাতে ইলিশ বাঙালি জাতির ঐতিহ্য। ইলিশ মাছকে যেভাবে খেতে ইচ্ছে হয় খাওয়া যায়। স্বাদের তারতম্য থাকলেও নানা আঙ্গিকে ইলিশ মাছ খেতে পারছি না আমরা। ইলিশ মাছ বর্তমানে সোনার হরিণের মতো। তবে একশ্রেণীর মানুষের কাছে যেন কিছুই না। বাজারে বিক্রেতা বলল, প্রতি কেজি ইলিশ একদাম এক হাজার ২০০ টাকা, দরাদরি নেই। দাম শুনেই আমার ইলিশ খাওয়ার ইচ্ছে পানসে হয়ে গেল। পরক্ষণে ভাবছি, বাড়িতে গিয়ে গিন্নিকে কী জবাব দেবো। বাজার থেকে ইলিশ মাছ আনব বলে পুত্র-কন্যাকেও কথা দিয়ে এসেছি। নানা চিন্তার বেড়াজালে আটকে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

এক ক্রেতা এসে বিক্রেতাকে বলল, দেখে দেখে ১০-১২টা ইলিশ ওজন করো। বিক্রেতা দুই পাল্লায় ১৪টা ইলিশ ওজন করলেন। ক্রেতা বলল, কত টাকা হলো? বিক্রেতা মূল্য বলার সাথে সাথেই ক্রেতা পকেট থেকে কচকচে এক হাজার টাকার নোট বের করে মূল্য চুকিয়ে দিয়ে বিক্রেতাকে বলল, ‘মাছগুলো আমার গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো’। আমিও শেষমেশ ৮০০ গ্রামের একটি মাছ নিলাম বাজার অনেক কাটছাঁট করে।

খবরের কাগজে জানতে পারলাম, ভারতে কলকাতার বাজারে ইলিশের আকাল, বেজার গৃহিণীরা। কারণ হলো- জামাইয়ের পাতে ইলিশ মাছের পেটি তুলে দিতে না পারলে জামাইষষ্ঠী যে অপূর্ণ থেকে যায় কলকাতার বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলোর। এক কেজি ইলিশের দাম কলকাতার বাজারে এক হাজার ২০০ রুপি। আমাদের মতো তারাও বেকায়দায় পড়েছেন।

পত্রিকার সুবাদে আরো জানতে পারলাম, বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রপতি, পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি পদ্মার ইলিশের প্রতি তাদের বিশেষ দুর্বলতার কথা প্রকাশ করেছেন অকপটে। দুই বাংলার মধ্যে কিছু কিছু ভিন্নতা থাকলেও সংস্কৃতি এবং খানাপিনায় উভয় বাংলার যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। পদ্মার ইলিশ হলে তো কথাই নেই, উভয়ের রসনাতৃপ্তি আরো তীব্র হয়।

ইলিশ স্বাদু পানির মাছ। কিন্তু অধিক দামের কারণে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ইলিশ মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অনেকে নানা মত দিলেও মূলত আবহাওয়া পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইলিশ মাছের প্রচুর সরবরাহ দেখেছি, দামও ছিল নাগালের মধ্যে। ক্রেতার আকর্ষণ তেমন ছিল না। বিক্রেতারা বিক্রি করতে না পেরে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যেতেন চাটগাঁর আছদগঞ্জের শুঁটকি পট্টিতে। সেখানকার দোকানরা মাছগুলো ‘খামাল’ দিত লবণসমেত যা পরবর্তী সময়ে ইলিশ মাছ ‘নুনিয়া’ ইলিশে রূপান্তরিত হতো। নুনিয়া ইলিশের স্বাদ লিখে বা বলে বুঝানো যাবে না। যারা একবার এ ইলিশ খেয়েছে, তারাই বলতে পারবে মজা কাকে বলে।

আজ সবই স্মৃতি। নুনিয়া ইলিশ বাজারে নেই কাঁচা ইলিশের দাম বেশি হওয়ায়। কলকাতায় অবস্থিত ভারতের সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ উৎপল ভৌমিক বলেছেন, অতিরিক্ত মাছ ধরাই ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে নাকি এ প্রবণতা বেশি।

ইলিশ তিন ইঞ্চি লম্বা হওয়ার পর সাগরে চলে যায় এবং সেখানেই বৃদ্ধি ঘটে। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ পদ্মা ও মেঘনার স্রোতের বিপরীত দিকে যেতে থাকে। এই সময়েই ইলিশ পূর্ণতা পায়। কিন্তু জেলেরা অতি লাভের আশায় ইলিশকে বড় হওয়ার সুযোগ দেয় না, জালে আটকিয়ে ফেলে যাকে আমরা ‘জাটকা’ বলে অভিহিত করি। ইলিশ ধরার আইন দেশে আছে। কিন্তু তা কেউ মানতে চায় না। নির্বিচারে ইলিশ ধরা হচ্ছে। এ খবর আমাদের জন্য মোটেও শুভ নয়।

জাতীয় ইলিশ মাছ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। পদ্মার ইলিশের জন্য ভারতীয় বাঙালিদের চোখের জল আর জিভের পানি এক হয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা কিন্তু বাংলাদেশীদেরও। ফারাক্কা নদীর কারণে পদ্মার পানি কমে যাচ্ছে। গভীর পানি নেই তো ইলিশও নেই। এই পরিস্থিতিতে করণীয় রয়েছে দুই বাংলার সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের। ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা না ভেবে বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবলে সমাধান হয়তো একটা বেরিয়ে আসবে।

ইলিশের আকাল রোধে এখনই ভাবতে হবে। পদ্মায় যাতে পানি কমে না যায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের। ইলিশ মাছ বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের একটি অংশ। ঐতিহ্য রক্ষায় ত্যাগ স্বীকারের কোনো বিকল্প নেই। আবার হয়তো বা ইলিশের সুদিন ফিরে আসবে- সবার সাথে আমিও এ মত পোষণ করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক


আরো সংবাদ


premium cement
জিয়া পরিবারকে ধ্বংস করতে চায় সরকার : আব্দুস সালাম ইসি আইন প্রণয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি অপপ্রচার চালাচ্ছে : ওবায়দুল চলচ্চিত্র রক্ষার শপথ নিয়েই প্রার্থী হয়েছি : ইলিয়াস কাঞ্চন নায়িকা শিমুর হত্যাকারীদের ফাঁসি চাইলেন বাবা নিশিরাতে উচ্চস্বরে গান-বাজনা : ভ্রাম্যমান আদালতে ৫ যুবকের ৫০ হাজার জরিমানা গ্যাসের দাম কেন দ্বিগুণের বেশি বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো? ডিজিটাল কমার্সে স্থিতিশীলতা আনতে ইউনিক বিজনেস আইডি চালু হচ্ছে : আইসিটি প্রতিমন্ত্রী ‘কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ পথ নিতে' রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান মাসুদ রানার কাজী আনোয়ার হোসেনের ইন্তেকাল তিন মামলায় শাহ আলীর ৭ দিন করে রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ রাজধানীতে ভুল চিকিৎসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

সকল