১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

সামাজিক মাধ্যমের বিড়ম্বনা

-

বর্তমান পৃথিবীকে বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ। ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক ভ‚মিকা রয়েছে। ইদানীং বিশ্বজুড়ে সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক তোলপাড় লক্ষ করা যাচ্ছে। আরব বসন্তের কথা বলুন আর আফগানিস্তানের কথা বলুন, সবই কিন্তু আমরা সামাজিক মাধ্যমের মারফত জানতে পারছি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রচার হওয়ার আগেই সব খবর সামাজিক মাধ্যমে চলে আসছে। এর-ও একটা কারণ নিহিত রয়েছে। বিভিন্ন দেশে মিডিয়ার কিছু বিধিনিষেধ থাকার ফলে সামাজিক মাধ্যম ওই জায়গা দখল করে নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের যাত্রা অনেক আগে হলেও ২০১০ সাল থেকে এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার লক্ষ করা যায়। আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে এখন এটি প্রচণ্ড রকমের ভ‚মিকা রয়েছে। মানুষ এখন আর আগের মতো টেলিভিশনের খবর দেখে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে- টেলিভিশন ও খবরের কাগজকে সামাজিক মাধ্যম রিপ্লেস করে ফেলেছে। টেলিভিশনে যে খবরটা আসে সেটি সেন্সরশিপ হয়ে আসে। খবরের কাগজ আসতে যেখানে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে সামাজিক মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সব খবর চলে আসছে। এর ফলে মানুষ এ দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে এবং নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সামাজিক মাধ্যম হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্ল্যাটফরম। এটি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ তা নিয়ে বির্তক হতে পারে; কিন্তু সেটি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে খুব কাছে নিয়ে এসেছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে যুক্ত নন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অনেক মানুষ ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার কিংবা ইমোর মতো কোনো-না-কোনো প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকেন। ফলে এসব মাধ্যম জাতীয় জীবনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দেশে বিধিনিষেধ থাকায় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া সব খবর প্রকাশ করতে পারে না। অন্য দিকে সামাজিক মাধ্যমে তাৎক্ষণিক খবরটি পেয়ে যাচ্ছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ায় ইচ্ছেমতো সংবাদ দিতে পারে না। অথচ সামাজিক মাধ্যম দিতে পারে। কারণ সেখানে সেন্সরশিপের বালাই নেই। প্রিন্ট ও ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ার স্বাধীনতার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সামাজিক মাধ্যমের স্বাধীনতা বেশি হওয়ায় মানুষ দ্রæত অন্তর্নিহিত ঘটনাগুলো জানতে পারছে। ফলে এর প্রসার বাড়ছে। ২০২০ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৭৯ লাখ ১২ হাজার।

সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণ ও অকল্যাণ দু’টি দিকই রয়েছে। তবে টেলিভিশন, কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের অপব্যবহারে অভিভাবক সমাজের উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ এর অতিমাত্রায় ব্যবহার পরিবার এবং সমাজকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে আমরা আফগানিস্তানের খবর মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছি। আফগানিস্তানের সব খবর আমরা জানি না। কাবুলে কী হচ্ছে তা আমরা জানি না। কিন্তু খবরের কাগজে আসার আগেই আমরা সামাজিক মাধ্যম থেকে জানতে পারছি। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এটি কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে খবর আসার আগেই সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। এর প্রচণ্ড একটি প্রভাব মানুষের জীবনে আছে। সামাজিক মাধ্যমের গঠনমূলক দিক হলো; এটিকে আমাদের স্বীকৃতি দেয়া উচিত; কিন্তু আমরা এর উল্টোটাও দেখছি। কোনো কোনো সময় সামাজিক মাধ্যমে যে ভাষা ব্যবহার করা হয় তা ভদ্রজনিত ভাষা নয়! ফলে শালীনতা বোধ সমাজ থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা ইচ্ছে করলেই শালীনভাবে সমালোচনা করতে পারি। অশালীন শব্দ এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কথাবার্তায় প্রায়ই এর অনুকরণ দেখা যায়। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। আমরা তাদের কাছ থেকে শ্রদ্ধাবোধ সম্মানবোধ প্রত্যাশা করি। কিন্তু সম্মানের জায়গা দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে শালীনতাবোধ ও সম্মানবোধটুকু আমরা হারিয়ে ফেলেছি। বিকৃত ও অশালীন শব্দচয়ন স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা মনের অজান্তে রপ্ত করছে। এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যে ভাষার ব্যবহার আমরা দেখছি, এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এটি হলো নোংরা মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

এর মাধ্যমে গুজব ও অশালীন চর্চার প্রয়োগ বাড়ছে। সর্বত্রই এর পক্ষ এবং বিপক্ষ অশালীন শব্দ ব্যবহার করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। কখনো কখনো ভিত্তিহীন ভুয়া ও বানানো খবর প্রচার হয়। মিথ্যা খবর ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়। ফলে জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলে। আস্থাহীনতায় ভুগে জাতি। এই চরম অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা কঠিন হবে। এটি একধরনের প্রান্তিক ফলাফল। এ জন্য সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সমালোচনা করা অন্যায় কিছু না। আমরা করতেই পারি! ভালো এবং শালীন ভাষায়, যা মানুষকে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধসম্পন্ন করে তোলে।

সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে, তা কিন্তু নয়! তবে আমরা মনে করি, এর একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কেউ নিজস্ব ইউটিউব, ফেসবুক পেজ খুলতে পারে। খুলতে কোনো বাধানিষেধ নেই। এটিই আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতারও একটি সীমা থাকা উচিত। কারো সম্মান কিংবা অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এমন কিছু আপলোড কিংবা শেয়ার করার নাম স্বাধীনতা নয়। এমন কিছু করা উচিত নয় যা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তরুণ প্রজন্ম আজ সোস্যাল মিডিয়ার আসক্তিতে জর্জরিত। একটি অংশ গেম খেলতে খেলতে পাগলের মতো আচরণ করছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাদের একটি অংশ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পারিবারিক বিভাজন, আত্মকেন্দ্রিক হওয়া, স্মৃতিশক্তির বিনাশ, শারীরিক অবসাদ, গঠনমূলক তৎপরতা, মানসিক অশান্তি, অস্থিরতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য টিলিভিশনে শিশুতোষ অনুষ্ঠানের সময় বাড়ানো ও গণসচেতনতা বাড়ানো দরকার। এ প্রবণতা থেকে শিশুদেরকে রক্ষা করতে হলে অভিভাবকদের উচিত শিশুদেরকে সময় দেয়া। মূল্যবোধের অবনতি কিংবা সামাজিক বিপর্যয় যেন না ঘটে সে দিকে সবারই খেয়াল রাখা উচিত। সামাজিক মাধ্যমকে গঠনমূলক জায়গাতে নিতে পারলে সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে আমরা এর সুফল পাবো বলে আমি বিশ^াস করি।

লেখক : চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ



আরো সংবাদ


সকল

মেয়ের চিকিৎসায় ১০ দিন ধরে ঢাকার হাসপাতালে থেকেও মন্দির ভাঙার আসামি (১২৯০৫)‘বাতিল হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প’ (১২২০৬)প্রধানমন্ত্রী মোদি কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন (৯৫৬৯)কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা ভারতের তালেবানভীতি থেকে? কেন সেই ভীতি? (৯৪১৪)কাশ্মিরে এক অভিযানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতীয় সেনা নিহত (৮০৩৮)৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতেই হবে : তথ্য প্রতিমন্ত্রী (৬৬০০)সঙ্কটের পথে রাজনীতি (৫৯৭৭)গ্রাহকদের উদ্দেশে কারাগার থেকে যা বললেন ইভ্যালির রাসেল (৪৮৯৫)পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি পুনর্নির্ধারণ (৪৮৬২)কিছু ‘বিভ্রান্তিকর খবরের’ পর বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ভারত (৪৮২৯)