১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

ই-কমার্স নিয়ে একটি প্রশ্ন

-

ই-কমার্সের যাত্রা শুরু ২০১৩ সালে। সে বছরই অনলাইন বাণিজ্য করার অনুমতিপত্র দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কোনো আইন না থাকার পরও দায়িত্বশীল এক বা একাধিক কর্মকর্তা কেন এ ধরনের বাণিজ্য করার অনুমতি দিলেন? আর কেউ তা পরখ করেও দেখল না বা এমন প্রশ্ন তুলল না যে, আইনই তো নেই! আইন ছাড়াই এর যাত্রারম্ভ হয় কী করে? কোন ক্ষমতা বলে তিনি বা তারা অনুমতি দিলেন? আইন ছাড়াই যদি এমন একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যের ছাড়পত্র বা লাইসেন্স দেয়া যায়, দেয়া হয়; তা হলে আইনের কি দরকার? যেকোনো ব্যাপারে, আইনে কুলাক বা না কুলাক, আইন থাক বা না থাক, পারমিশন দিলেই যদি তা চলতে পারে, তা হলে একটি রাষ্ট্র আইন আদালত ছাড়াই চলবে? আইন কেন লাগে, তা তো এখন বোঝা যাচ্ছে। ই-ভ্যালি ও ই-অরেঞ্জের প্রতারণার পথ ধরে আরো কিছু অনলাইন বিজনেস কোম্পানি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করেনি। তাদের প্রতারিত করা হয়েছে। মেরে দেয়া হয়েছে টাকা। এর পরই মূলত সরকার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা খোঁজ করছে আইন আছে কি নেই। এখন জানা যাচ্ছে, ই-কমার্সসংক্রান্ত কোনো আইনই দেশে নেই। কেউ কেউ বলছেন, একটি কমিশন আছে। সেই কমিশনেরও নেই কোনো নীতিমালা, যা দিয়ে প্রতারকদের আটকানো যেত এবং প্রতারিত ক্রেতারা ফেরত পেতে পারত তাদের টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক মাস দুয়েক আগে ই-ভ্যালির কাণ্ড প্রকাশের পর একটি গাইডলাইন দিয়েছিল পণ্য দেয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে। সে-টুকুই মাত্র ক্রেতাদের জন্য করা হয়েছে।

উপরের প্রশ্নগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য। তবে, প্রশ্নের মূল লক্ষ্য সরকার। কারণ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সরকারের, দায়ও সরকারেরই।

‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে’ দেয়ার কথা আমরা শুনেছি। বাস্তবে দেখিনি। তবে সেই প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে চলেছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর। তারা কোনো কোনো সময় এমন সব সিদ্ধান্ত নেন, যাতে সরকারের ভাবের ঘরের মূর্তিটি (ভাবমূর্তি) উধাও হয়ে যায়। একটি উদাহরণই যথেষ্ট হতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট ১১ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। তারা দেখতে চান, ওই সব সাংবাদিকের জ্ঞাত আয়-রোজগারের চেয়ে তাদের অ্যাকাউন্টে অধিক পরিমাণ অর্থ জমেছে কি না। অধিক জ্ঞানী হলে যা হয়, ভাবছি, ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট দেশের শিল্পবাণিজ্যের বিশাল বিশাল রুই-কাতলাদের মানিলন্ডারিং বিষয়ে চোখ না রেখে ক্ষুদ্র আয়ের সাংবাদিকদের আয় নিয়ে হঠাৎ মেতেছে কেন?

ব্যাপারটি কেমন বেখাপ্পা লাগছে। সরকারের উন্নয়নের রোডম্যাপ যখন দ্রুতগতিতে চলছে, গণমাধ্যম যখন প্রায় সমস্বরে সেই উন্নয়নের দৃশ্য ও অদৃশ্য গুণ গাইছেন, তখন কেন তাদেরই বিরুদ্ধে লাগলেন তারা? একে কি আমি পেছন থেকে আঘাত করা বলব? সরকারের অবশ্য পিঠ নেই, আছে কেবল বুক। সেই স্বপ্নময় বুকে এই আঘাত কি এর মধ্যেই পৌঁছে গেছে। গণমাধ্যমেই শুনেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জেনে বলেছেন, দেশে ফিরে এসে তিনি বিষয়টি দেখবেন। তিনি দেখবেন মানে এই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। এ নিয়ে আর সাংবাদিকদের দুর্ভাবনার কিছু থাকল না।

১১ জন খেটে খাওয়া সাংবাদিক, কতটাই বা বেশি অর্থ আয় করে থাকতে পারে আমাদের জানা নেই। তবে অবৈধ পথে আয়ই যদি এর মূলে, তাহলে যখন সংবাদপত্রগুলোর পাতায় জ্বলজ্বল করতে থাকে দেশের শিল্পপতিদের কেউ কেউ হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লা-পাত্তা হয়ে গেছেন এবং লন্ডন, কুয়ালালামপুর, নিউ ইয়র্ক আর কানাডার টরন্টোতে বেগমপাড়া বানিয়ে বসবাস করছেন, তাদের ব্যাপারে ওই ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না কেন? তারা কি এ ধরনের লুটপাটের বিরুদ্ধে তৎপর নন?

ঘুষ দেয়া ও নেয়া যদি অন্যায় ও অনৈতিক হয়, তা তো এখন প্রকাশ্যেই চলছে সরকারের দফতরে দফতরে, নিয়মিত, প্রতিদিনই। তা যে ওপেন সিক্রেট (সাংবাদিক আবেদ খান-এর একটি কলাম-রিপোর্টিংয়ের শিরোনাম ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’) তা কি তাদের জানা নেই? যেসব আমলার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ আছে নামে ও বেনামে, তাদের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত? নাকি তারা দায়মুক্ত তাদের দায়িত্বের সব ভুলত্রুটি থেকে? তারা ‘সরল বিশ্বাসে’ (ঘুষ খেয়ে বা নিয়ে দেশ ও জনগণের ক্ষতি হয়, এমন প্রকল্প চালু করে বা চালুর সিদ্ধান্ত দিয়ে) ওই সব দায়িত্ব পালন করে জনগণ বিরোধী, সরকারের অর্থের (সরকারের অর্থ আসলে জনগণের) ক্ষতি ও অপচয় করেছে, এমন প্রকল্পের আদেশ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করছেন, তার দায় কি তাদের নেই? এই ধরনের ইনডেমনিটি যে দেশের সাধারণের বিরোধী, জনগণের অর্থের অপচয়, সেটা কি তারা মানবেন? তাদের ব্যাপারে ইনটেলিজেন্স ইউনিটের মনোভাব ও পদক্ষেপ কী?

এটা ঠিক যে, সাংবাদিক ইউনিয়নের কিছু নেতা ধনবান। এই সত্য সবাই জানেন। কি করে তারা ধনের মালিক হলেন, (সেই কথিত ধনের পরিমাণ কত) তা আমরা জানি না। সাধারণ সাংবাদিকরাও জানেন না। তাদের সেই ধন কি হাজার হাজার কোটি টাকা? একটি গাড়ি কিনে বা বাড়ি বানিয়ে যদি তিনি বা তারা ধনবানের তালিকায় চিহ্নিত হন, তাহলে তো তারা ধনী, বলতেই হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের সবাই তো আর ঋণ দিয়ে ঘুষ নেয়ার সুবিধা ভোগ করে না। তাদের সংখ্যা যেমন যৎসামান্য, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যেও সে রকমটাই থাকতে পারে। আইন ছাড়াই যিনি বা যারা ই-কমার্স চালুর অনুমতি দিলেন, তারা কি বিনা খর্চায় সেই লাইসেন্স দিয়েছেন?

একটা প্রশ্ন, কেউ কি অবৈধভাবে অর্জিত টাকা তার নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখে? আমরা তো জানি বেনামে রাখে। যেসব কথিত সাংবাদিক অবৈধ অর্থ রোজগার করে থাকেন, তারা এতটা বোকা নয় যে সেই অর্থ নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা রাখবেন। যারা অন্যের ঘুষ-দুর্নীতির তথ্য উদঘাটন করে পত্রিকায় প্রকাশ করেন, তারা ‘অবৈধ পথে রোজগারের টাকা ব্যাংকে রাখবেন না, এটাই সিদ্ধ। তার পরও ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট আয়কর বিভাগ থেকে তাদের আয়ের তথ্য নিয়ে পরখ করতে পারতেন, চিঠি দেয়ার প্রয়োজন হতো না। তার মানে তাদের এ কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অন্য। সেই অন্য যে পলিটিক্যাল, তাও বোঝা যায়। সাংবাদিকের চরিত্র-হনন করা গেলে পাঠকের কাছে তাদের রিপোর্টিংয়ের, মন্তব্য প্রতিবেদনের, মূল্যায়নধর্মী উপসম্পাদকীয় ও কলাম লেখকদের ওপর ‘বিশ্বাস ও আস্থা’ থাকবে না। অর্থাৎ ‘চতুর্থ এস্টেট’ বলে খ্যাত ন্যায় প্রতিষ্ঠার কর্মীবাহিনী চরম এক মিথ্যার নদীতে ভেসে যাবে।

আমরা বলতে চাই না, তবে মনে করিয়ে দিতে চাই, ন্যায়-অন্যায়গুলো আইনের আলোকে যতটা তার চেয়েও বেশি হচ্ছে মানুষের নিজের নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নীতিহীন আচরণ করেন, তাকে আইনে কতটা ধরা যাবে? আইন তো আছে, কিন্তু দুর্নীতিবাজদের কি থামানো গেছে? না যায়নি। ই-কমার্স চালুর পর থেকে লাইসেন্স নিয়েছে ১৬০৯টি প্রতিষ্ঠান, তাদের অ্যাসোসিয়েশন আছে ই-ক্যাব নামের, তারা আজতক ১৬ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে, তারা (বেশ কয়েকটি) গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করে পাচার করেছে বিদেশে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের কর্তারাও টের পেলেন না যে ওই প্রতারকরা টাকা পাচার করছে। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? সরকার বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিভাবে প্রতারিত ক্রেতাদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করবেন? তাদের তো কোনো আইনই নেই। শোনা যাচ্ছে, এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইন করার আয়োজন করছে।

এর মধ্যে উচ্চ আদালত একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছে, জেনেছি। ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জের মালিকদের শর্তসাপেক্ষে নজরদারির ভেতরে রেখে,ব্যবসায় ফিরিয়ে এনে প্রতারিতদের টাকা অথবা পণ্য দিতে বাধ্য করতে পারে। কোম্পানিগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করলে হাজার হাজার কোটি টাকার তলানিতে পড়ে থাকবে তার পরিমাণ। ওই পথে প্রতারিতরা টাকা ফেরত পাবে না। ব্যবসার গতি না থামিয়ে, তাকে আইনের আওতায় আনাই কর্তব্য। সরকার সেই পথেই হাঁটছেন। এটি একটি শুভ লক্ষণ। আমরা সব ক্ষেত্রে শুভ দেখতে চাই। অশুভ চিন্তা দূর হোক সমাজ-সংসার, রাজনীতি, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক অ্যাভিনিউ থেকেÑ এটাই হোক মানুষের মৌলিক চিন্তা।



আরো সংবাদ