১৬ অক্টোবর ২০২১
`

করোনাকালে বাল্যবিয়ে

করোনা মহামারীর সময় বাল্যবিয়ে অনেক বেড়েছে। - ছবি : সংগৃহীত

করোনা মহামারীর সময় বাল্যবিয়ে অনেক বেড়েছে। শুধু এ বছরই পাঁচ লাখ অপরিণত বয়সের মেয়ের বিয়ে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিশু অধিকার সুরক্ষা সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’।

করোনা মহামারী বিশ্বব্যাপী বহু পরিবারকে দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছে, আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়।। ফলে আমাদের দেশের অনেক মা-বাবা মনে করছেন, মেয়েকে অপরিণত বয়েসে বিয়ে দেয়া ছাড়া এ মুহূর্তে তাদের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। এ ক্ষেত্রে নাবালিকার হবু স্বামীর বয়স নিয়ে তারা ভাবছেন না।

বর্তমান পরিস্থিতি বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগ্রামের অগ্রগতিকে রোধ করে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার হুমকি তৈরি করেছে। মহামারী লিঙ্গ বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। করোনায় স্কুল বন্ধ, মা-বাবারা চাকরি হারিয়েছেন, লকডাউনের সময় বেড়ে গিয়েছিল সহিংসতা আর ধর্ষণ। এসব কারণে মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে মা-বাবারা তাদের নাবালক মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন। বিয়ে হলে মেয়ে অন্তত ক্ষুধা আর বঞ্চনা থেকে রক্ষা পাবে বলে তাদের ধারণা।

একটি পরিসংখ্যান বলছে, করোনার কারণে ২০২০ সালে কমপক্ষে পাঁচ লাখ অপরিণত বয়েসের মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের শিকার হতে পারে আরো অতিরিক্ত ২৫ লাখ মেয়ে। গত ২৫ বছরের মধ্যে এবারই বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি।

জাতীয় সংসদের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি তথ্য চাইলে মন্ত্রণালয় করোনাকালে কিছু জেলায় বাল্যবিয়ে বেড়ে যায় জানিয়ে চার মাসের তথ্য উপস্থাপন করেছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব করোনাকালে বাল্যবিয়ের তথ্য তুলে ধরে বলেছেন, নরসিংদী, নাটোর, কুড়িগ্রাম, যশোর, কুষ্টিয়া ও ঝালকাঠি জেলায় বাল্যবিয়ের হার কিছুটা বেড়েছে। মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন এই চার মাসে ২৩১টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৫৮টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। মন্ত্রণালয় করোনার আগের মাস হিসাবে শুধু ফেব্রুয়ারির তথ্য তুলে ধরেছে। ফেব্রুয়ারিতে বাল্যবিয়ে হয়েছিল ছয়টি।

ইউনিসেফ, ইউএনএফপি ও প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সহায়তায় ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসে দেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ২১টি জেলার ৮৪টি উপজেলায় বাল্যবিয়ের মাত্রা নিয়ে পরিচালিত জরিপের ফল সংস্থাটি প্রকাশ করে। যাতে দেখা যায়- ওই সময়ে এ জেলাগুলোতে অন্তত ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। জরিপে বলা হয়, যে সব শিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে তাদের ৫০ দশমিক ৬ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছর, ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছর এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১২ বছর। করোনাকালে মানুষের আয় হ্রাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ও নিরাপত্তাহীনতাকে বাল্যবিয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ব্র্যাকের গবেষণায় বলা হয়েছে, ৮৫ শতাংশ বাল্যবিয়ে হয়েছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে। ৭১ শতাংশ হয়েছে মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য। বাইরে থেকে আসা ছেলে হাতের কাছে পাওয়া ৬২ শতাংশ বিয়ের কারণ ছিল। করোনা ঠেকাতে ব্যস্ত প্রশাসনের বিয়ে ঠেকানোর কড়াকড়িতে যে শৈথিল্য আছে, তা ব্র্যাকের গবেষণায় স্পষ্ট। জোর করে বিয়ে দেয়ার ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। আর আমাদের সহযোগী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, প্রত্যন্ত এলাকায় বাল্যবিয়ে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন, বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ২১টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। অথচ বাংলাদেশসহ বিশ্ব নেতারা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিয়ে নির্মূলের অঙ্গীকার করেছিলেন।

জাতিসঙ্ঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, বাল্যবিয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থতম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছরের আগেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ ছেলেদের সমান বা কিছু বেশি হলেও উচ্চশিক্ষা এবং চাকরিতে অনেক পিছিয়ে মেয়েরা। বর্তমানে সরকারি চাকুরেদের মধ্যে নারী মাত্র ২৭ শতাংশ।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ। মেয়েদের এই পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে। শিশু মেয়ে হয় শিশু মা। ফলে বাড়ে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার। বাল্যবিয়ে বন্ধে এখনই উদ্যোগ না নিলে চ্যালেঞ্জ হবে এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে। বিশ্বজুড়ে ১৮ বছরের বেশি বয়সে বিবাহিত মেয়েদের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিতা মেয়েরা। তাই বাল্যবিয়ে বন্ধে এখনই সরকারের পাশাপাশি আমাদের সব্ইাকে সর্তক ও সজাগ থাকতে হবে।



আরো সংবাদ