১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

তালেবানদের জন্য শেষ সুযোগ

-

অবশেষে কাবুল পতনের ২৩ দিন পর তালেবান আফগানিস্তানে শুধুই পুরুষসর্বস্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা দিয়েছে। অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তালেবান নাইন-ইলেভেনের ২০তম বার্ষিকীতে একটি নতুন বিন্যাস ঘোষণা করবে। কিন্তু এ ভবিষ্যদ্বাণীগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তালেবান সুপারপাওয়ারের আরো অপমান হওয়াকে এড়িয়ে যায় এবং নাইন-ইলেভেন বার্ষিকীর চার দিন আগেই তাদের সরকারের ঘোষণা দেয়। তারা শুধু পাঞ্জশির পতনের অপেক্ষা করছিল।

মন্ত্রিসভার নতুন প্রধান মোল্লা মুহাম্মদ হাসানসহ বেশির ভাগ মুখই তালেবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের পুরনো সহকর্মী। এই নতুন তালেবান সরকারকে ‘মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের উত্তরাধিকার’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তবে কিছু নতুন কৌশল ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কিছু নতুন মিত্রসহ তাদের আবির্ভাব ঘটেছে। নতুন তালেবান মন্ত্রিসভায় দু’জন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পাঁচজন উপমন্ত্রীসহ মোট ২২ জন মন্ত্রী রয়েছেন। আগামী দিনে আরো কয়েকজন মন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হবে।

তালেবান প্রধান মোল্লা হায়বাতুল্লাহ আখুনজাদা সশস্ত্র সংগঠনের রাহবারি শূরা বা শূরা নেতাদের দীর্ঘ পরামর্শের পর এই নতুন সরকার গঠন করেন। আখুনজাদা মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার ছেলে আবদুর রহমান ২০১৭ সালে হেলমান্দে এক আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। আখুনজাদা মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মতো সরকার তত্ত্বাবধান করবেন। নতুন সরকারে তার মর্যাদা একজন রাষ্ট্রপতির থেকে ভিন্ন নয়। তিনি একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, যিনি অনেক শিয়া যোদ্ধাকে তালেবানের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর সে কারণেই তাকে একজন সংস্কারক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি ক্যামেরার সামনে হাজির হন, তবে সবসময় নয়।

অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভার নতুন প্রধান মোল্লা মুহাম্মদ হাসান জাতিসঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। তিনি ১৯৯৬ থেকে নিয়ে ২০০১ সালের মধ্যে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মোল্লা মুহাম্মদ হাসান ছিলেন সেই ছোট্ট গ্র“পের সদস্য, যারা মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে তালেবান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ১৯৯৪ সালে কান্দাহারের প্রথম গভর্নর ছিলেন, যিনি পরবর্তী সময়ে মোল্লা রাব্বানির নায়েব (ডেপুটি) হন। মোল্লা হাসান আখুন্দ ১৯৯৭ ও ১৯৯৯-এর মাঝখানে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে বহুবার সাক্ষাৎ করেছেন। নওয়াজ শরিফ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন যে, তালেবান উসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর করবে; কিন্তু তালেবান নেতারা সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। জেনারেল পারভেজ মোশাররফও একই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তালেবানরা উসামা বিন লাদেনকে নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা নাইন-ইলেভেনের পর পাকিস্তানে তালেবান রাষ্ট্রদূত মোল্লা আবদুস সালাম জায়িফের মাধ্যমে মোল্লা মুহাম্মদ হাসান আখুন্দ ও মোল্লা উবায়দুল্লাহকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেন। তারা জায়িফকে বাধ্য করেছিলেন, তিনি যেন পাকিস্তানে তালেবানের প্রথম সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান। জায়িফ উল্টোটা করেন। তিনি হাসান ও উবায়দুল্লাহ উভয়কেই সতর্ক করে দেন যে, তারা পাকিস্তানে গ্রেফতার হতে পারেন। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে তালেবান সরকারের পতনের পর জায়িফকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উবায়দুল্লাহ ও তার নায়েব মোল্লা আবদুল গনি বারাদারকে পাকিস্তানে গ্রেফতার করা হয়। উবায়দুল্লাহ পাকিস্তানের হেফাজতে ইন্তেকাল করেন। তবে ২০১৮ সালে বারাদারকে মুক্তি দেয়া হয় এবং তিনিই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাতারে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।

মোল্লা বারাদার মোল্লা মুহাম্মদ হাসান আখুন্দের জুনিয়র। তিনি হাসানের ডেপুটি হিসেবে কাজ করবেন। বারাদারও জাতিসঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন। কিন্তু ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হয়। কিছু মানুষ মোল্লা বারাদারকে ‘ডিল মেকার’ বা চুক্তি প্রস্তুতকারী বলে থাকেন, কারণ তিনি দোহা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি মোল্লা মুহাম্মদ হাসানের নেতৃত্বাধীন শূরা নেতাদের নির্দেশে কাজ করেছিলেন। আরেক উপপ্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুস সালাম হানাফি ফারিয়াব প্রদেশের একজন উজবেক। তিনি শুরু থেকেই তালেবানের অংশ হয়ে আছেন। অর্থনীতি-বিষয়কমন্ত্রী কারি দীন মুহাম্মদ বাদাখশানের একজন তাজিক। তিনি প্রথম তালেবান সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। নতুন মন্ত্রিসভায় আরো কিছু অপশতুন আছেন যাদের মধ্যে নতুন সেনাপ্রধান কারি ফাসিহুদ্দিনও আছেন, যিনি একজন তাজিক এবং যিনি পাঞ্জশির দখল করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজ হাক্কানি এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন। দোহা চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিন আগে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে খোস্ত থেকে অপহৃত হওয়া মার্কিন নাগরিক মার্ক ফ্রেরিকসকে উদ্ধার বা মুক্তির মাধ্যমে সিরাজ হাক্কানি আমেরিকার সাথে একটি বড় চুক্তি করতে পারেন। মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনীর একজন সাবেক অভিজ্ঞ ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে হাক্কানিরা অপহরণ করেছে। দোহা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মার্কিন কর্মকর্তারা তার মুক্তির চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাকে পরিত্যাগ করেছিল। এখন বাইডেন প্রশাসন তার মুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে মার্কিন কারাগারে আটক কিছু আফগানের মুক্তির দাবি করতে পারেন হাক্কানি। হাক্কানি আরো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারেন। তিনি এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বশীল। তাকে আইএসকেপি ও অন্যান্য অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মোকাবেলা করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের সা¤প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলকায়েদা আফগানিস্তানের ১৫টি প্রদেশে বিদ্যমান। তালেবান জাতিসঙ্ঘের এই প্রতিবেদন মেনে নেয়নি। তবে তারা এই সত্য অস্বীকার করতে পারে না যে, আলকায়েদার নেতারা সা¤প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান থেকে সিএনএনকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার জন্য আফগান ভ‚খণ্ড ব্যবহার করছে। সিরাজ হাক্কানি কি আফগানিস্তানে আলকায়েদা ও টিটিপির কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবেন, নাকি তিনি আইএসকেপির বিরুদ্ধে তাদের সমর্থন চাইবেন? নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব তাকে আফগানিস্তানে শান্তি ও নিরাপত্তা আনতে পূর্ণ সহায়তা করবেন। প্রথম তালেবান সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সব সাধারণ নাগরিককে নিরস্ত্র করেছিল। সিরাজ হাক্কানি ও মোল্লা ইয়াকুব কি এবারো একই কাজ করবেন? যদি তারা আফগানিস্তানে সাধারণ নাগরিকদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেন, এতে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে পারেন; তবে তারা অবশ্যই কিছু এলাকায় প্রতিরোধের মুখোমুখি হবেন।

মৌলভি আমির খান মুত্তাকি আফগানিস্তানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি প্রথম তালেবান সরকারে তথ্যমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তিনি সহজেই বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন। তিনি ওয়ান্টেড তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নন। মোল্লা হেদায়াতুল্লাহ বদরি নতুন অর্থমন্ত্রী।

আগামী মাসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের ব্যবস্থা করার জন্য তার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তার অর্থের প্রয়োজন। তিনি এখন ১৫ আগস্ট আশরাফ গনির পালানোর পর আমেরিকা কর্তৃক ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ‘হিমায়িত’ আফগান রিজার্ভ মুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এটা শুধু আমেরিকা ও তালেবানদের মধ্যে নতুন এক চুক্তির ওপর নির্ভর করে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, আমেরিকা তালেবানদের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত। সিআইএ প্রধান কাবুল পতনের পরপরই কাবুল সফর করেন এবং পেন্টাগনও বলে যে, তারা তালেবানদের সাথে কাজ করতে পারে। তবে তালেবান ঘোষিত নতুন সরকারের গঠন আমেরিকাকে সতর্ক করতে বাধ্য করতে পারে।

আমেরিকা চায় না, তালেবান চীন ও ইরানের মিত্র হোক। অন্য দিকে তালেবানদেরও কিছু সমন্বয় করতে হবে এবং নমনীয়তা দেখাতে হবে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ কাবুল সফর করে তালেবানকে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে ইতিবাচকভাবে সম্পৃক্ত করতে বলেছেন। আফগানিস্তানের নতুন গোয়েন্দা প্রধান আবদুল হক ওয়াসিফ ও নতুন মন্ত্রিপরিষদের কিছু মন্ত্রী গুয়ানতানামো বে’তে মার্কিন কারাগারে সময় কাটিয়েছেন। তালেবানদের অবশ্যই গুয়ানতানামো বে’র মতো কারাগার তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তালেবানদের প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়ন করা উচিত হবে না। আশরাফ গনি, আমরুল্লাহ সালেহ ও আহমদ মাসউদ আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু তালেবান যদি শান্তি ও নিরাপত্তা আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা অনেক এলাকায় গণ-অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হতে পারে। আহমদ মাসুদ একটি নির্বাসিত আফগান সরকার ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছেন। তালেবানরা ব্যর্থ হলে এই সরকার সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

এটাই তালেবানদের শেষ সুযোগ। তারা কিছু বড় চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বেশির ভাগ চ্যালেঞ্জ অভ্যন্তরীণ, বহিঃসম্পর্কীয় নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- আফগানিস্তানকে গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচানো। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সালের মাঝের গৃহযুদ্ধে তালেবানের সৃষ্টি হয়েছিল। এবার তাদের ব্যর্থতা আফগানিস্তানকে আরেকটি গৃহযুদ্ধের দিতে ঠেলে দিতে পারে। আর এই গৃহযুদ্ধ তালেবানদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে কিছু নতুন ‘খেলোয়াড়’ তৈরি করতে পারে। আজ আফগানিস্তানকে দুর্বল এবং তালেবানকে শক্তিশালী দেখা যাচ্ছে। তালেবানদের বেঁচে থাকার জন্য আফগানিস্তানকে শক্তিশালী করতে হবে। তারা নাইন-ইলেভেনের পর বেঁচেছিল, কারণ তারা বিদেশী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। বিদেশী দখলদার বাহিনী চলে গেছে। তালেবানদের অবশ্যই দখলদার বাহিনীর মতো আচরণ করা উচিত নয়। পুনরাবৃত্তি করছি, এটাই তাদের শেষ সুযোগ।

ইন্ডিয়া টুডের ইংরেজি থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট



আরো সংবাদ


সকল

মেয়ের চিকিৎসায় ১০ দিন ধরে ঢাকার হাসপাতালে থেকেও মন্দির ভাঙার আসামি (১২৯০৫)‘বাতিল হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প’ (১২২০৬)প্রধানমন্ত্রী মোদি কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন (৯৫৬৯)কাশ্মিরে নতুন করে উত্তেজনা ভারতের তালেবানভীতি থেকে? কেন সেই ভীতি? (৯৪১৪)কাশ্মিরে এক অভিযানে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতীয় সেনা নিহত (৮০৩৮)৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতেই হবে : তথ্য প্রতিমন্ত্রী (৬৬০০)সঙ্কটের পথে রাজনীতি (৫৯৭৭)গ্রাহকদের উদ্দেশে কারাগার থেকে যা বললেন ইভ্যালির রাসেল (৪৮৯৫)পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর সরকারি ছুটি পুনর্নির্ধারণ (৪৮৬২)কিছু ‘বিভ্রান্তিকর খবরের’ পর বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ভারত (৪৮২৯)