১৬ অক্টোবর ২০২১
`

কী হয়ে গেল সে দেশে?


২০১৬ সালে আমেরিকার নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হিলারি ক্লিনটনের পরাজয়ে অনেকে হতবাক হয়েছিলেন। এরপর কিছুটা কৈফিয়ত, কিছুটা অন্যকে দোষারোপের মতো করে হিলারি একটি বই লিখেছিলেন; বইটির শিরোনামWHAT HAPPENED বা তার হেরে যাওয়ার ব্যাখ্যা। যদিও হিলারি ক্লিনটনকে কিছুটা ব্যঙ্গ করে John Bridges নামে এক লেখক একটি বই লিখেছিলেন, ‘Everybody knows what happened except Hillary Clinton’ শিরোনামে।
আফগানিস্তানে কী হয়েছিল। কেন এমন হয়েছিল? যখন সারা পৃথিবীতে ইসলামপন্থী রাজনীতির ওপর নেমে আসছে খড়গ, একের পর এক ধস। সেখানে আফগান পরিস্থিতি ভিন্ন কেন?

সিআইএ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী, তথ্যসমৃদ্ধ ও চৌকস ইনটেলিজেন্স এজেন্সি। কিন্তু তারাও বুঝতে পারেনি এত তাড়াতাড়ি আফগানিস্তানের পতন ঘটবে। এটি ঠিক, আমেরিকা, ন্যাটো ও সিআইএ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল আফগানিস্তানে আর বেশি দিন টিকতে পারবে না। বুঝে ছিল বলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আর মাইক পম্পেওর মতো কট্টরবাদীরাও তালেবানের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হন।

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন লেখক হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলী খুবই খ্যাতিমান। তিনি আফগানিস্তানের কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ছিলেন; কাবুল ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার ওপর তার একটি বই ছিল যতদূর মনে পড়ে ‘পাঠান মুলুকে’ নামে। ওই লেখায় একটি খুব প্রসিদ্ধ চরিত্র ছিল ‘আবদুল’। আবদুল ছিল লেখক প্রফেসর সৈয়দ মুজতবা আলীর বাবুর্চি বা খানসামা। লেখকের বর্ণনা মতে, প্রথম দিন যখন কাবুল যান, আবদুল তার জন্য এত খাবার তৈরি করে আনে, যা তার মতো দশজনও খেয়ে শেষ করতে পারবে না। এত খাবার দেখে তিনি যখন চোখ বড় বড় করেন তখন আবদুল বলেছিল, ‘ডরিয়ে মাত, আন্দর মে আরো হায়’ অর্থাৎ স্যার, ভয় পাবেন না, ভেতরে আরো খাবার আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ‘কাবুলিওয়ালা’ নামে একটি বিখ্যাত গল্প আছে। আফগানিস্তানকে ও পশতু জাতিকে বুঝতে হলে, তালেবানকে বুঝতে হলে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পাঠান মুলুকে’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পটি কিছুটা হলেও সহায়ক হবে। আমি ন্যাটো, ইউরোপ ও সিআইএকে অনুরোধ করব, দয়া করে পাঠান মুলুকে অ্যান্ড কাবুলিওয়ালা রচনা দু’টি পড়ুন। কারণ এ আফগান পশতুরা এমন এক জাতি যাদের জানতে হলে তাদের কৃষ্টিকালচার, ইতিহাস জানতে হবে।

২. আফগান বা তালেবান বলতে মূলত পশতু জাতিকে বোঝানো হয়। এসব পশতুন শুধু আফগানিস্তান নয়, পৃথিবীর আরো অনেক স্থানে রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানে। বলা হয়ে থাকে, পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজেও একজন পশতুন। আফগান বা পশতুনরা বিশ্বের সেরা অতিথিপরায়ণ জাতি। তাদের আতিথেয়তা ও বীরত্বের অনেক কাহিনী আছে। আফগান বা পশতুনদের সম্পর্কে দু’টি বিষয় বলা যেতে পারে, পশতুনরা নিজেদের ভাষা কৃষ্টিকালচারের ব্যাপারে খুবই যত্নবান। আর দ্বিতীয় কথা হলো, পশতু ভাষা পৃথিবীর কঠিনতম ভাষাগুলোর একটি। শুধু ভাষা নয়, অনেক দিক থেকেই এসব পশতুন খুবই কঠিন জাতি। এরা জাতিগতভাবে যোদ্ধা। বীর পুরুষ।

ব্রিটিশরা চোরের মতো, ব্যবসায়ীর বেশে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করে আস্তে আস্তে সে দেশ, সে জাতির বিরুদ্ধে তলে তলে ষড়যন্ত্র শুরু করে। সে জাতির মধ্যে কিছু বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান আর মীরজাফর তৈরি করে একদিন সে দেশ দখল করে নেয়। আমার জানা মতে, পৃথিবীর মাত্র দু’টি দেশ ব্রিটিশরা কাবু করতে পারেনি। এক হলো থাইল্যান্ড, কারণ সে সময় থাইল্যান্ড ছিল শক্ত এক রাজার অধীনে। আর দ্বিতীয় হলো আফগানিস্তান।

আজকের তালেবান, আফগান ও পশতুনদের বুঝতে হলে আফগান কৃষ্টিকালচার বোঝার সাথে সাথে বুঝতে হবে আফগানিস্তানের মানচিত্র। জানতে হবে আফগানিস্তানের উত্তর সীমান্তে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সম্পর্কে। বিশেষ করে উজবেকিস্তান। আমরা সবাই জানি, প্রতিটি মুসলমানের জন্য পবিত্র কুরআনের পর দ্বিতীয় পবিত্রতম গ্রন্থ সিহা সিত্তাহর প্রথম কিতাব বুখারি। সিহা সিত্তাহর প্রধানতম দুই কিতাব ইমাম বুখারি ও ইমাম তিরমিজির দেশ এই উজবেকিস্তান। শুধু বুখারি আর তিরমিজি নন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের গুরু ইবনে সিনাসহ হাজার হাজার ইসলামী চিন্তাবিদের দেশ, মসজিদ, মাদরাসার দেশ উজবেকিস্তান। ইমাম তিরমিজির জন্মস্থান তিরমিজ শহর আফগানিস্তানের বর্ডারেই। আমু দরিয়া পার হলেই উজবেকিস্তান ও তিরমিজ শহর। আফগানিস্তানের বর্ডারের এই তিরমিজ শহরই জন্ম দিয়েছিল ইমাম তিরমিজির মতো হাদিসবিশারদ। আফগানিস্তানের মাজার ই শরিফ থেকে মাত্র ৭০ মাইল উত্তরে এই তিরমিজ। আর আফগানিস্তানের মাজার ই শরিফ শহর থেকে মাত্র ৪০০ মাইল উত্তরে বুখারা শহরেই জন্ম দিয়েছিল ইমাম বুখারির মতো ক্ষণজন্মা পুরুষকে।

৩. ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেবিক বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। মার্কসবাদ, লেনিনবাদের মন্ত্রে একে একে গ্রাস করতে থাকে উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তানসহ ঐতিহ্যবাহী মুসলিম দেশগুলো।

সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আমদানি করা হয় মার্কসবাদ নামের মাকাল ফল। মার্কসবাদের বুলি খুবই সুন্দর। শ্রমিক অধিকার, সমান অধিকারের স্বপ্নে নিপীড়িত নিগৃহীত সহজ সরল মানুষদের বোকা বানিয়ে জার আর বুর্জুয়াদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। কায়েম করে সোভিয়েত সাম্রাজ্য, এমন করে সারা বিশ্বে সে আরেক এডিকশন তৈরি করে। বিশ্বের প্রগতিশীল চিন্তার একধরনের আবেগি তরুণদের মাতাল করে দেয় মার্কসবাদ অ্যান্ড লেনিনবাদের সমাজতন্ত্র, শ্রমিক অধিকার ও নারী অধিকারের নামে। বাংলাদেশের এক বিখ্যাত আলেম মাওলানা আবদুর রহিম একসময় এই মার্কসবাদের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বলেছিলেন এটি হলো ‘ছোট ছোট কিছু সাপ মেরে বড় বড় অজগর তৈরি করা’।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ মাদকাসক্তির মতোই আরেক এডিকশন, ‘একটিই মন্ত্র, সমাজতন্ত্র’। ষাট ও সত্তর দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও ঠিক পরে হাজার হাজার মেধাবী তরুণ-তরুণী মার্কসবাদের এ বিষমন্ত্রে বিভোর ছিল। আজকের ইনু, মেনন আর সিরাজুল আলম খান, শাজাহান সিরাজরা আজ বুর্জুয়া হয়ে গেলেও সত্তরের দশকে এই নেশা খাইয়ে হাজার হাজার তরুণের জীবন ধ্বংস করেছিলেন। সারাজীবন পুঁজিবাদী আমেরিকাকে গালি দিয়ে মুখের ফেনা তুলে এখন এই তাত্ত্বিকদের প্রায় সবাই আমেরিকার ছায়াতলে এসে অন্য তত্ত্ব ঝাড়ছেন।

যাই হোক, মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো দখলের পর মার্কসবাদী শকুনের দৃষ্টি পড়ে আফগানিস্তানের ওপর। তারা বিষাক্ত ছোবল হানে আফগানিস্তানে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী তৈরি করা হয়, তার পর দাঁড় করানো হয় সমাজতান্ত্রিক সংগঠন ও আন্দোলন। পিডিপিএ ডেমোক্র্যাসি বা গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে কিছু বুদ্ধিজীবী নামে কাল সাপ তৈরি করা হয় কাবুল বিশ্ববিদ্যলয়ে। মার্কসবাদের এ বিষবাষ্পের আগে আফগানিস্তান ছিল রাজতান্ত্রিক দেশ। বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না দেশটিতে। মুসলিম দেশগুলো আগেই দখল করে নিয়েছিল, তাই আফগানিস্তান এখন দখল করা নতুন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দখলদার শকুন সোভিয়েত ইউনিয়নের কুনজর পড়ে আফগানিস্তানে।

৪. ১৯৭৩ সালে শুরু হয় আফগানিস্তান দখলের পাঁয়তারা। তখন রাজতান্ত্রিক আফগানিস্তানের রাজা ছিলেন জহির শাহ। ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই জহির শাহ যখন ইতালিতে ছিলেন, সে সময় তারই কাজিন জেনারেল দাউদ খান অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। দাউদ খান ছিলেন মার্কসবাদীদের প্রথম টেস্ট প্রডাক্ট। যিনি রাজা জহির শাহেরই মনোনীত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দাউদ খান ফ্রান্সে লেখাপড়া করেছিলেন। সেখান থেকে ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী দীক্ষা নিয়ে আসেন। তিনি মার্কসবাদের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে এক দিকে বিশ্বাসঘাতকতা করেন তার আপন কাজিন রাজা জহির শাহের বিরুদ্ধে; অন্য দিকে বিশ্বাসঘাতকতা করে ধর্মপ্রাণ পশতুন মুসলমানদের সাথে। দাউদ খান জহির শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে ক্ষমতা দখল করেন।

১৯৭৭ সালের ১২-১৫ এপ্রিল দাউদ খান চার দিনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। সে সময় তিনি সোভিয়েত (প্রেসিডেন্ট) প্রধান লিউনিড ব্রেজনেভের সাথে সাক্ষাৎ করেন। দাউদ খান নিজে প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের সাথে একটি একান্ত গোপন মিটিং করার অনুরোধ করেন। মনে করা যেতে পারে সেই থেকেই আফগানিস্তানে সমাজতন্ত্রের শকুনের দৃষ্টি পড়ে এবং আফগানিস্তানের কপালে দুঃখ শুরু হয়।

কিন্তু কিছু দিন পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বুঝতে পারে তাদের টেস্ট কেস দাউদ খানকে দিয়ে মতলব পুরোপুরি হাসিল হচ্ছে না। আফগানিস্তানকে দখলে নেয়া যাচ্ছে না। মার্কসবাদীরা খুঁজছিলেন নতুন মুখ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্টদের চিরাচরিত চরিত্র অনুসারে দাউদ খানের ছত্রছায়ায় আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট নেতা মির আকবর খাইবারকে খুন করা হয়। তার পর এসব ছুতায় ১৯৭৮ সালের ১৯ এপ্রিল কমরেড আবদুল কাদিরের মাধ্যমে সাউর বিপ্লবের মাধ্যমে দাউদ খানকে খুন করা হয় এবং মার্কসবাদী পার্টি পিডিপিএ ক্ষমতা দখল করে। কমিউনিস্ট নেতা কর্নেল আবদুল কাদির মাত্র তিন দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় ছিলেন, কর্নেল আবদুল কাদির খান ছিলেন একজন তাজিক।

১৯৭৮ সালের ৩০ এপ্রিল কর্নেল আবদুল কাদির আরেক কমিউনিস্ট নেতা নুর মোহাম্মদ তারাকির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। নুর মোহাম্মদ তারাকি ছিলেন পশতুন ও আফগানিস্তানে নাস্তিক্যবাদ ও কমিউনিজমের গোড়াপত্তনকারীদের একজন। তারাকি আফগান কমিউনিস্ট পার্টি পিডিপিএ’র প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম এবং জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় তারাকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ২০ বছরের এক বন্ধুত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

একই সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি প্রতিনিধিদল আফগানিস্তান সফর করেন এবং সোভিয়েত গোয়েন্দারা তারাকিকে দিয়ে তাদের আফগানিস্তান দখল মতলব হাসিল হওয়া অসম্ভব বলে মন্তব্য করেন। তার পর যা হওয়ার তাই হলো, সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি তারাকিকে হত্যা পথ খুঁজতে থাকে এবং এক বছরের মাথায় ১৯৭৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারাকিকে খুন করে আরেক কমিউনিস্ট নেতা হাফিজুল্লাহ আমিনকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

বলাবাহুল্য, হাফিজুল্লাহ আমিন ও আফগান কমিউনিস্ট পার্টি পিডিপিএ’র প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন এবং জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। এই হাফিজুল্লাহ আমিন ছিলেন সাউর বিপ্লবের মূল সংগঠক; যে বিপ্লবে দাউদ খানকে হত্যা করা হয়। মজার ব্যাপার হলো হাফিজুল্লাহ আমিন আমেরিকায় লেখাপড়া করেছেন এবং আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়িস্কন্সিন্স এ পড়াশোনা করার সময়ই মার্কসবাদী রেডিক্যাল সংগঠনের সাথে জড়িত হন। (তথ্য সূত্র : বিবিসি কাবুল সিটি নাম্বার ওয়ান পার্ট ৪)
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় হাফিজুল্লাহ আমিনকে কমিউনিস্টদের হাতেই প্রাণ দিতে হয়। একই বছর আফগান ইনটেলিজেন্স সার্ভিস হাফিজুল্লাহ আমিনের হাতে একটি রিপোর্ট দেন, যে রিপোর্টে দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করবে এবং হাফিজুল্লাহ আমিনকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। কিন্তু কমিউনিজমের ওপর হাফিজুল্লাহ আমিনের ঈমান এত শক্ত ছিল যে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে হত্যা করবে। তাই তিনি এটিকে সাম্রাজ্যবাদীদের মিথ্যা প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেন।

৫. ১৯৭৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত আক্রমণ চালায়। হাফিজুল্লাহ আমিন ও তার পরিবারের সব সদস্যকে হত্যা করা হয়। হাফিজুল্লাহ আমিনের মৃত্যুর পর কাবুল রেডিও কমরেড বারবাক কারমালের পূর্ব রেকর্ড করা বক্তব্য প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়েছিল, ‘আজ হাফিজুল্লাহ আমিনের কুশাসন আর নির্যাতনের জাঁতাকল গুঁড়িয়ে দেয়া হলো।’

সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক বারবাক কারমালকে আফগানিস্তানের নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো। সোভিয়েত কর্তৃক আফগানিস্তান দখল করার পর, সে সময় বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কমরেড মনি সিং হুমকি দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব ঘটানোর। সে হুমকির পর বাংলাদেশ সর্বস্তরের আলেম সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তার একাধিক মাহফিলে মণি সিংহকে তার নাম ধরে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব তারা করতে পারবেন না এবং সাঈদী আফগানিস্তানের বারবাক কারমাল ইঙ্গিত করে বলেছিলেন বারবাক কারমাল না বর্বর কারমাল সেটি আমরা দেখে নেব।

বারবাক কারমাল কমিউনিজমের জন্য জেল খেটেছিলেন ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত। তবে বারবাক কারমাল কিন্তু তার জন্মগত নাম নয়, তার নাম ছিল সুলতান হুসাইন। তিনি নিজের নাম পাল্টে বারবাক কারমাল করেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন দেখছিল কারমালকে দিয়ে তাদের মতলব হাসিল হচ্ছিল না। সে সময়কার সোভিয়েত অ্যাম্বাসেডর ইউলি ভরন্ট আরেক কমিউনিস্ট জেনারেল নাজিবুল্লাহকে বললেন আস্তে আস্তে বারবাক কারমালের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করে দিতে। ১৯৮৬ সালের ১৩ নভেম্বর সোভিয়েত পলিটব্যুরোর মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে জেনারেল কমরেড নজিবুল্লাহ বারবাক কারমালকে হটিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করবেন এবং পরিশেষে তাই হয়। বারবাক কারমাল আফগানিস্তান ছেড়ে মস্কোতে পরবাসী হন। ১৯৯১ সালে বারবাক কারমাল আবার আফগানিস্তানে ফিরে আসেন এবং জেনারেল আবদুর রশিদ দোস্তমের সহযোগী হয়ে নজিবুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

বারবাক কারমালের শাসনের শেষ দিকেই কমিউনিস্ট ধ্বজাধারীদের কিছুটা স্বপ্নভঙ্গ শুরু হয়। বুঝতে পারে, তারা আফগানিস্তানে আক্রমণ করে মারাত্মক ভুল করেছে। আফগানিস্তান মুসলমানদের ঈমানি চেতনা টের পায়। তাই বারবাক কারমালের শেষ দিকে এবং নজিবুল্লাহর শাসনের সময় আস্তে আস্তে আফগান কমিউনিস্ট পার্টি পিডিপিএ ইসলামের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। ১৯৮৭ সালে নজিবুল্লাহ তার নামের শেষে ‘উল্লাহ’ লাগায় যাতে মুসলমানরা খুশি হয়। কমিউনিস্ট চিহ্নগুলো মুছে ফেলতে শুরু করে কিংবা অন্য কিছু দিয়ে বদলে দিতে শুরু করে, কমিউনিস্টরা মাথায় টুপি পাগড়ি লাগাতে শুরু করে। আল্লাহ খোদার নাম নিতে শুরু করে। ১৯৮৭ সালে সংবিধানে ইসলামী নীতিমালা সংযোজন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ সংবিধানের আর্টিকেল ২-এ বলা হয়েছে, ইসলাম হবে দেশের রাষ্ট্রধর্ম, আর্টিকেল ৭৩-এ সংযোজন করা হয়েছে যে রাষ্ট্রের প্রধান হতে হবে একজন মুসলিম আফগান পরিবারে জন্ম নেয়া। ১৯৯০ সালের সংবিধানে আর্টিকেল ১-এ বলা হয়েছে, আফগানিস্তান হবে স্বাধীন একক ইসলামী রাষ্ট্র।



আরো সংবাদ