২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮ আশ্বিন ১৪২৮, ১৫ সফর ১৪৪৩ হিজরি
`

‘মানিলন্ডারিং’ ও দুর্নীতির অর্থ পাচার- মুর্শিদকুলি খানের দৃষ্টান্ত

মুর্শিদকুলি খান - ছবি : সংগৃহীত

আজ আমরা অবৈধ টাকা পাচার, ‘মানিলন্ডারিং’ এসব নিয়ে কতই না ব্যতিব্যস্ত! এই যে একটা বাজেট হলো, এবারো কালো টাকা ধলা করার বন্দোবস্ত জিইয়ে থাকল। মুদ্রা পাচার তো আমাদের মতো ভাগ্যহত দেশের ললাট লিখনই বটে। প্রতি বছর এ দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। সিস্টেমের মধ্য থেকেই পাচারকারীরা নিজেদের জন্য ‘সিস্টেম’ করে অর্থসম্পদ লোপাট করে রাজকোষ ঝরঝরে করে ফেলছে। দেখার কেউ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই যে এতগুলো টাকা খোয়া গেল, তার কী হলো? অথচ ভাবতে অবাক লাগে, এখন থেকে কয়েক শ’ বছর আগে বাংলার শাসক মুর্শিদকুলি খান কী চমৎকার ব্যবস্থাই না করেছিলেন! বাংলাদেশ থেকে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রেও (দিল্লি) অর্থ যেত। কেননা, তখন ধাতব মুদ্রার অবারিত নির্গমন পথ ছিল। তবে তখনো চোরাপথ (হুন্ডি) ছিল। মুর্শিদকুলি খান যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন তার মধ্যেই ছিল কেন্দ্রে অর্থ পাঠানোর বৈধ বিধান-ব্যবস্থা। মুর্শিদকুলি খান হুন্ডিযোগে অর্থ না পাঠিয়ে শাহী রাজস্বের মাধ্যমে তখনকার দিনে গড়ে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি টাকা পাঠাতেন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রফতানি থেকে আয় হতো বছরে কয়েক শ’ কোটি টাকা। ইউরোপের কোম্পানিগুলোও বাংলা থেকে তাদের রফতানির বিনিময়ে সোনা-রুপা নিয়ে যেত।
১৭০৯ সালে মাদ্রাজে ইংরেজরা মুদ্রা ‘স্টার্লিং’-এর দাম চালাকি করে হঠাৎ কমিয়ে দেয়। এতে ভুক্তভোগী হয় ওলন্দাজরাও (ডাচ)। ওলন্দাজরা তখন তাদের ইন্দোনেশিয়ার ভাণ্ডার থেকে সোনা-রুপা এনে এখানে তা গলিয়ে (মিন্ট) ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে। ইংরেজরা সেটা পারেনি। ইংরেজরা ছাড়াও নবাব মুর্শিদকুলি খানের বিরোধিতা শুরু করল বাংলার পোদ্দাররা। মুর্শিদকুলি খান স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করতেন। যে কেউ সোনা বা রুপা নিয়ে এসেই তার টাঁকশাল থেকে রাজচিহ্ন দিয়ে টাকা গড়িয়ে নিতে পারত। রাষ্ট্র পেত ২.৫ শতাংশ মিন্টিং চার্জ। শুধু ১৭২২ সালের হিসাবেই মুর্শিদকুলি খানের তখনকার দিনে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ‘বাংলা সরকার’ আয় করেছিল তিন লাখ টাকার কিছু বেশি।

মুর্শিদকুলি খান বা তার পরবর্তী নবাব সিরাজউদদৌলার সাথে বেঈমানী শুরু করেছিল পোদ্দার (Shroff) এবং জগৎশেঠের মতো রাজপুত (মাড়োয়ারি) মহাজনরা। তখনকার দিনের মানিলন্ডারিং’ এ শাসকদের স্বজাতির মধ্যেও কেউ কেউ ছিলেন। ১৭২১ সাল নাগাদ মহাজন ফতেহ চাঁদ হাতিয়ে নেন টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব। রাজ অনুগ্রহে টাঁকশালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেয়ে ফতেহ চাঁদ অল্প দিনের মধ্যেই জগৎশেঠ বা টোডরমলের মতো বেনিয়াদের সাথে খাতির পাতিয়ে বাংলার সবচেয়ে বড় মহাজনে পরিণত হন। তবে ফতেহ চাঁদ ইংরেজদের কাছে ‘গতরের কাপড় খুলে দেননি’। এ নিয়ে কলকাতার ইংরেজ পরামর্শক সভায় বেশ কয়েকবার দরবারও হয়েছিল। জগৎশেঠদেরকে দলে ভেড়ানোর কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেনি বেনিয়া ইংরেজরা। মুর্শিদকুলি খান একসময় আমির ফতেহ চাঁদের জন্য যেমন বাদশাহর কাছে সুপারিশ করেন; আবার তার বেশি দ্রুত বেড়ে ওঠার উচ্চাভিলাষ কমাতে তার ওপর নজরদারি এবং শাসন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও কুণ্ঠা করেননি। কাশিমবাজারের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, এক চালানে মুর্শিদকুলি ফতেহ চাঁদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা আদায় করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুর্শিদকুলি জগৎশেঠদের সঙ্ঘশক্তির সাথে পেরে ওঠেননি। স্থানীয়দের (রায়ত) স্বার্থরক্ষা, দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে বাঁচানো এবং মহাজনী জুলুম থেকে নিরাপদ করতে গিয়ে তাকে মাড়োয়ারিদের সাথে অনিবার্য সঙ্ঘাত এড়িয়ে যেতে হয়েছিল। এর খেসারত দিয়ে গেছেন নবাব সিরাজউদদৌলা।

ইতিহাসের বিচিত্র পুনরাবৃত্তিই বটে! আমাদের জাতীয় সংসদে এবার বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যদের কাছে অর্থ পাচারকারীদের নাম ঠিকুজি চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী অর্থপাচারকারীদের ‘খুঁজে’ পাচ্ছেন না। সে জন্যই তিনি সংসদ সদস্যদের কাছে পাচারকারীদের সন্ধান চেয়েছেন। বলুন, তো হাসব না কাঁদব? অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব না অর্থ পাচারকারীদের খুঁজে বের করে মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় আনা? তার দায়িত্ব না দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ লোপাট থামানো? আমাদের সর্বোচ্চ আদালতও এর আগে ‘দুদক’-এর ওপর রুলনিশি জারি করে পুঁজি পাচারকারীদের নাম ঠিকুজি জানতে চেয়েছিলেন। দায়সারা গোছের একটা তালিকা ‘দুদক’ দিয়েও ছিল। কিন্তু মহামান্য আদালত সেই তালিকা ফেরত দিয়ে আরো তদন্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেন। মাননীয় আদালত যথার্থই বলেছিলেন, অর্থ পাচারকারী দেশের দুশমন।

প্রশ্ন হলো- বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, কানাডার টরেন্টোয় তথাকথিত বেগমপাড়ায় সম্পত্তির মালিকানা জানতে তিনি নিজ উদ্যোগে একটা জরিপ করে দেখেছেন- রাজনীতিবিদরা নন, বেগমপাড়ার বেশির ভাগ বাসিন্দা এ দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবার। এর নির্গলিত অর্থ : ঘুষের টাকা দেশে না রেখে তারা কানাডায় পাঠিয়ে ঘর জমি জিরাত খামারবাড়ি কিনেছেন। সেখানে সামান্য কয়েকটা সম্পত্তি ব্যবসায়ী (গার্মেন্ট) মালিকদের। ব্যবসায়ীরা তাদের লাভ মুনাফা থেকে কানাডায় কেন, চাঁদেও জমি কিনতে পারেন। তারা আয় করেন ডলার-পাউন্ড-মার্ক-লিরা-পেসো-ইয়েন বা আরএমবিতে। যারা দেশের ঘুষের টাকায় বিদেশে বাড়ি কেনেন, তাদের ওপরই কি আইনের একাধিক খড়গ নামার কথা নয়? একে তো তারা যে সম্পদ কিনেছেন তা কখনোই তাদের উপার্জনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্বিতীয়ত, এত টাকা নিশ্চয়ই তারা শ্বশুরবাড়ি থেকে পাননি। তাহলে? বাংলাদেশ এত চুরি, ঘুষ-দুনীতির ওপর দিয়েও আজ উন্নয়নের ‘মহাসড়কে’। সরকারি কর্মকর্তাদের অবৈধ উপার্জনের পথ বন্ধ করতে পারলে এ দেশই আজ উঠতে পারত উন্নয়নের ‘রানওয়েতে’। টেকঅফ করতে পারত উন্নয়নের আরো বিশাল দিগন্তে।

এ দেশের কৃষক মজুর যে পরিমাণে আবাদ করেন, প্রবাসীরা যে হারে দেশে টাকা পাঠান, গার্মেন্ট থেকে যে অকল্পনীয় আয় হয়, তা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ বহু আগেই বাস্তবে রূপায়িত করা যেত। গেল না কেবল এই দুর্নীতিবাজদের কারণেই। আমাদের আজ চাই নবাব মুর্শিদকুলি খানের মতো শাসক। সিরাজের মতো দেশপ্রেমিক। ঋণখেলাপির জন্য ব্যবসায়ীরা ধরা খান। সুদভার বহন করেন। জেল খাটেন। ঋণখেলাপি কাদের জন্য হয়? কারা টেবিলে টেবিলে, কেবিনে কেবিনে ফাইল ঠেকিয়ে ঘুষের পাহাড় গড়ে তোলেন? যত দোষ রাজনীতিবিদদের? বলি না, সব রাজনীতিবিদ ধোয়া তুলসীর পাতা। দুর্নীতির মূলেই তারা। তবে তারা বোকাও নন; এত অসহায়ও নন। কিন্তু আমলাদের গায়ে তো আগুনের আঁচও লাগে না। ক’জন আমলাকেই বা জেলের ঘানি টানতে হয়? আইন সবার জন্য সমান হলে কোনো অপরাধীই পার পেতে পারত না। জবাবদিহিতা এমন একটা জিনিস, যার পেছনে থাকে শাস্তির ভয়, সামনে থাকে জেলখানা, অন্তরে থাকে দুদক- ভীতি। সবচেয়ে বড় কথা, খোদাভীতি এবং গুনাহর আজাবের ভয়। এ কেমন একটা বিচিত্র দেশ যা বিস্মিত করেছিল গ্রিক বীর আলেকজান্ডারকেও? এখানে প্রতিষ্ঠানে বা দলে কিছু নগদ গছিয়ে দিতে পারলেই দুর্নীতিবাজ হয়ে যান দেশপ্রেমিক, দেশদরদি, সমাজসেবক!

যারা নগদ পেয়েই রাতকে দিন আর দিনকে রাত গণ্য করতে পারেন কোটি কোটি অভাবী-অসহায় দেশবাসীর লানৎ তাদের ওপর! সত্যজিত রায়ের ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রের কথা মনে আছে? সত্যজিত সঠিকভাবেই তার ছবিতে ‘গণশত্রু’ চিহ্নিত করে ফেলেছিলেন। গণশত্রু অর্থ পাচারকারীদের ‘খোঁজ’ কেবল পেলেন না অর্থমন্ত্রী বাহাদুর। যদি তিনি নাই পারেন, তাহলে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পথ ধরে ইস্তফা দিচ্ছেন না কেন? ব্রিটেনে করোনা বিস্তার ও সংক্রমণ রোধে ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অতি সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। অপারগতার দায়মুক্তির জন্য এর চেয়ে মহৎ দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে ?

মুদ্রা পাচার শাসক মহলের সমঝোতা ছাড়া হয় বা হতে পারে, এটা দুধের শিশুও বিশ্বাস করবে না। তাহলে দেশের মানুষ যাবে কোথায়? ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন সভাপতি স্যার অ্যাডওয়ার্ড লিটলটন বাংলার সুবেদারকে নগদ ৭০ হাজার টাকা ঘুষ সেধেছিলেন যাতে তিনি তার কোম্পানির জন্য মোগল সম্রাটের ‘ফরমান’ আদায় করতে পারেন। কিন্তু সুবেদার ৭০ হাজার টাকা লোভ সংবরণ করতে পেরেছিলেন। একেই বলে দেশপ্রেম, একেই বলে ঈমান। আজকের দিনে সেই ৭০ হাজর টাকার মূল্যমান অন্তত ৭০ কোটি টাকা, বা তার চেয়েও বেশি। মহান মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব বিদেশী কোম্পানির নিবর্তনমূলক মুনাফা এবং দুর্নীতির কারণে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার বেশ কিছু কুঠিয়ালকে পাকড়াও করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন কাশিমবাজার, রাজমহল ও পাটনার কুঠিগুলোতে। জারি করেছিলেন ইউরোপীয়দের বাণিজ্যের ওপর রাজ-নিষেধাজ্ঞা।

প্রজাপালনে মোগল বাদশাহীর সেই সুবর্ণ ধারায় ছেদ পড়ে উনবিংশ শতাব্দীতে শেষ মোগল শাসকদের নানামুখী সঙ্কট, অঞ্চলিক বিদ্রোহ এবং ইউরোপের কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত শঠতা এবং স্থানীয় মুৎসুদ্দি, পোদ্দার, মহাজন সুদখোরদের বিচিত্র ধরনের ষড়যন্ত্রের কারণে। আজকের বাংলাদেশে নব্য গজিয়ে ওঠা রাজনৈতিক আশীর্বাদধন্য ধনিক-বণিকদের কারণে সার্বভৌম রাষ্ট্রশক্তি পদে পদে প্রজাপালনে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ছে। কোনো শাসকই না চান, জনগণের কাছে তার বা তাদের আনুগত্য নিরঙ্কুশ থাকুক? তবে তারা পেরে ওঠেন না ‘সিস্টেম’-এর মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ‘সিস্টেম’ তালাশকারীদের কারণে। আমলারা জনগণের প্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে গড়ে তোলে ব্যবধানের অপ্রতিরোধ্য বাধার প্রাচীর। এই প্রাচীর ভাঙার জন্য এই জাতিকে ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর নয়!



আরো সংবাদ


ইরানের জেনারেল সোলাইমানির হত্যাকারী মার্কিন ও ইসরাইলি ২ কমান্ডার নিহত (২০৬৪৮)মুস্তাফিজদের দারুণ বোলিংয়ে রোমাঞ্চকর লড়াই জিতল রাজস্থান (৮৫৩৬)অন্য দেশে পাচার হচ্ছে আফগান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়াযান (৮০৯৩)ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে সংঘাত সমাধানের ‘উত্তম পন্থা’ : বাইডেন (৭৯৭৯)সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে জাতিসঙ্ঘকে চিঠি দিল তালেবান (৭৭২৬)অন্যদেশে পাচার হচ্ছে আফগান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়াযান (৬৯৩৫)শিশু সন্তানকে হত্যা পর মায়ের আত্মহত্যা (৬৫৩৫)ড. মাহফুজুরকে ছেড়ে আসায় ট্রল, যা বললেন ইভা (৬১২৫)নতুন ঘরে বসবাস করা হলো না স্বামী-স্ত্রীর (৫৯৭৩)জামায়াতের কাছে হারল আ’লীগ প্রার্থী (৫৬৪৫)