২৮ জুলাই ২০২১
`

আমার দেখা শাহ আব্দুল হান্নান

আমার দেখা শাহ আব্দুল হান্নান - ফাইল ছবি

শাহ আব্দুল হান্নান ইন্তেকালের পর আমার কেবলই মনে হচ্ছিল হয়তো তিনি শেষ যে বইটি পড়ছিলেন সেটা বালিশের পাশে উল্টে রাখা আছে। আর বইয়ের ভেতর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো তার স্বভাবসুলভ ঈষৎ এবড়োখেবড়ো আছে দাগানো। হয়তো তিনি পরিকল্পনা করছিলেন এ বইটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা কাউকে বলবেন। হয়তো যে বইগুলো-লেখাগুলো তিনি বিলি করবেন বলে ভেবেছিলেন সেগুলো এখনো খাটের পাশে স্তূপ করে রাখা আছে। কারণ এভাবেই জীবনের একেবারে শেষ পর্যায় পর্যন্ত তিনি নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে গেছেন। শাহ আব্দুল হান্নানকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় সাবেক সচিব কথাটি যুক্ত করা হয়। এটা সত্য। তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ব্যাপ্তি ছিল অনেক প্রসারিত। প্রথম আলোতে প্রকাশিত হওয়া তার এক সহকর্মীর ‘উত্তর গোড়ান নিবাসী সচিবের কথা’ শিরোনামে লেখাটি তার জীবনের একটি দিককে আলোকপাত করা হয়েছে। একজন ব্যক্তির পক্ষে অন্য কোনো এক মহৎ ব্যক্তির সবদিক জানা সব সময় সম্ভব নয়। আমি তাকে যতটুকু দেখেছি সেই সম্পর্কে সামান্য আলোচনা ও স্মৃতিচারণ করার চেষ্টা করব।

২০০৯ সাল, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিন চলছে। তখনো তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আমাদের সামনেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাকে ফোন করে বললেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী যেন সব দলকে নিয়ে বসে আলোচনা করেন। যদিও আমরা বা তিনিও জানতেন এটা কখনোই ঘটবে না। কিন্তু এভাবেই বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় বা ইসলামী শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের দেশের জন্য, ইসলামের জন্য যেটা ভালো ও সঠিক মনে করতেন সেই পরামর্শ তিনি সরলভাবে দিতেন, দিয়ে গেছেন সারা জীবন। একবার মোসাদ্দেক আলী ফালুর সাথে দেখা হলো, যিনি তখন এনটিভির মালিক। শাহ আব্দুল হান্নান তাকে বললেন, আপনি সব চ্যানেল মালিকদের সাথে বসে অশোভন-অশ্লীল বিজ্ঞাপন না দেখানোর ব্যাপারটি উত্থাপন করুন। সম্ভবত তিনি তাকে নানাভাবে কনভিন্স করার চেষ্টা করে ভালোভাবে চেপে ধরেন, ফলে তিনি এ কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

এভাবে তিনি ছোট থেকে শুরু করে বড় অনেক কাজের প্রত্যক্ষ উদ্যোক্তা বা পরোক্ষ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি সবাইকে তার যোগ্যতা পূর্ণভাবে ইসলামের জন্য ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতেন। তিনি আমাদেরকে পড়াচ্ছিলেন ড. ইসমাইল রাজি আল ফারুকির লেখা একটি উঁচুমানের বই ‘Al Tawhid : Its Implications for Thought and life’. বইটির শেষ অধ্যায়ে ছিল নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা। লেখকের প্রস্তাবনা ছিল পাশ্চাত্য, মুসলমানরা নন্দনতত্ত্বে পিছিয়ে আছে বলে দাবি করলেও, পাশ্চাত্য ধারার (Figurization) বাইরে গিয়ে তৌহিদের মূলনীতির আলোকে মুসলমানরা একটি উঁচুমানের নন্দনতাত্ত্বিক নীতিমালা (stylization) তৈরি করে, যার ফলে Arabesque এবং caligraphy। এর মতো দু’টি উচ্চমানের শিল্পধারা সৃষ্টি হয়। যাই হোক, তিনি আমাকে বললেন, এই আলোচনাটা খুবই মৌলিক এটি প্রচার হওয়া দরকার। তিনি আমাকে এ অধ্যায়টি অনুবাদ করতে উৎসাহিত করলেন। অনুবাদ করতে গিয়ে দেখি এই আলোচনার বড় অংশ দর্শনকেন্দ্রিক, যাকে সহজ ও বোধগোম্যভাবে অনুবাদ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। কিছু অংশ আসলেই সঠিক অর্থ প্রকাশ করছে কি-না এ বিষয়ে আমি খুবই সুন্দিহান হয়ে পড়লাম। তিনি সহজ সমাধান দিলেন, অস্পষ্ট অংশ পুরোপুরি কেটে লেখাটিকে ছোট করে ফেললেন। যে চাপ আমি বোধ করছিলাম তা দূর হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত একটি সারসংক্ষেপিত ভাবানুবাদ দাঁড়াল। এটাকে একটি বুকলেটের মতো করে তিনি ছাপাতে বললেন এবং ছাপার জন্য তিনিই টাকা দিলেন। পরবর্তীতে তার বিভিন্ন ইসলামিক ক্লাসে সেগুলো নিজেই বিতরণ করেছেন।

বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আধুনিক শিক্ষিত বিশেষত দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠগুলোর ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ইসলামী ক্লাস বা পাঠচক্র চালু করেন আশির দশকে। নিয়মিত ক্লাসের মাধ্যমে ইসলামের ধারণাগুলো পরিষ্কার করে, ইসলামের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করে মানুষ গঠনের ধারা তিনি চালু করেন। ইসলামের জন্য সামান্য কিছু কাজ হওয়ারও সম্ভাবনা আছে এমন লোক তিনি বিভিন্নভাবে খুঁজে খুঁজে বের করে তার সাথে যোগাযোগ করতেন। এভাবেই কোনো একভাবে তার সাথে যোগাযোগ ও দীর্ঘ সময় প্রতি সপ্তাহে তার বাসায় ক্লাস করার সুযোগ হয়।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক। বাংলা ব্লগ চালুর আগে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক আগের কথা। যখন বাংলাদেশে ইন্টারনেট সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন, তিনি এ সময়ই ইন্টারনেটে ইসলামের জন্য কাজ করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং এদিকে মনোনিবেশ করেন। তখন বড় মাধ্যম ছিল ইমেইল গ্রুপ। তিনি অসংখ্য ইমেইল গ্রুপের মেম্বার হন, তাছাড়া তার নিজের একটি গ্রুপ তৈরি করেন। দেখেছি ওই সময়টাতে আল্লাহর ওয়াস্তে যার সাথে দেখা হতো, যিনিই তার বাসায় আসতেন, তার কাছে থেকে ইমেইল অ্যাড্রেস নিতেন এবং তার গ্রুপে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতেন। এভাবে একদিকে তিনি নিজের গ্রুপ এবং অন্যান্য গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক ম্যাটেরিয়াল ছড়িয়ে দিতেন। একইভাবে ইসলামবিরোধী প্রচারণার জবাব দিতেন তিনি। মনে আছে, মুক্তমনা নামে একটি ইমেইল গ্রুপ ছিল যাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালানো। তাদের তোলা বিভিন্ন প্রসঙ্গ-প্রশ্নের তিনি জবাব দিতেন। এতে সেখানে তুমুল বিতর্ক লেগে যেত। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইসলামবিরোধিতার জবাব দেয়ার কিছু মূলনীতির কথা বলতেন যেগুলো তিনি মেনে চলতেন এবং আমাদের মেনে চলতে উৎসাহিত করতেন। যেমন- একটি হলো কোনোভাবেই পলিমিক্স-এ না জড়ানো। অর্থাৎ একটি বিষয়ে উত্তর-প্রতিউত্তরের মাধ্যমে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পেতে যখন ভাষা উগ্র আকার ধারণ করে এবং অপর পক্ষ গালিগালাজ শুরু করে তখন তিনি সেখানে কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতেন। অন্য আরেকটি মূলনীতি হলো- প্রতিপক্ষের সব কথার জবাব না দিয়ে মূল দু’-একটি পয়েন্টের দিকে ফোকাস করা। তিনি বলতেন, একটি বিল্ডিংয়ের মূল কিছু পিলার ধসিয়ে দিলে সেটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এ জন্য তার উত্তরগুলো হতো সবসময় সংক্ষিপ্ত।

অনেক সময় তিনি টিমওয়ার্ক করতেন। সবসময় তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে ফোন করে জবাব লিখতে বলতেন। তিনি হয়তো শুরুতে বা শেষে অংশগ্রহণ করতেন। তার এই ইন্টারনেট-ভিত্তিক কাজ শুধু বাংলাদেশকেন্দ্রিক ছিল না। এ জন্য অনেক সময় তার গুরুত্বপূর্ণ বাংলা লেখা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে নিতেন। এরকম বেশ কিছু অনুবাদ করার সুযোগ তিনি দেন, অনেক সময় তার সাহায্যকারী হিসেবে ছিল যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী মেহরাব বখতিয়ার। এসব কাজকে তিনি এত গুরুত্ব দিতেন যে, তার কম্পিউটার এক মুহূর্তের জন্য খারাপ থাকলেও তিনি দারুণ পেরেশান হয়ে পড়তেন এবং ফোন করে বাসায় ডেকে পাঠাতেন। এমনকি মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্তও তার ব্যক্তিগত সহযোগীর সহায়তায় তিনি তার ইমেইল কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

তিনি আলেমদের সম্মান করতেন, দেখেছি বড় বড় আলেমরাও তাকে সম্মান করতেন। অথচ তেমন বড় আলেম নয় কিংবা আলেমই নয় (হয়তো কোনো ডিগ্রি আছে) এমন অনেককে তার সমালোচনা করতে শুনেছি যে, ‘তিনি কী জানেন?’ তিনি আলেমদের কাছ থেকে শিখতেন, আবার আলেমদেরও তার যুক্তি দিয়ে প্রভাবিত করতেন। বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতিব মাওলানা উবায়দুল হকের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা পরস্পরকে সম্মান করতেন। ‘বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন’-এর মতো ফিকহি বিষয়ের একটি কঠিন প্রকল্প ও অন্যান্য এরকম আরো কাজে তিনি মাওলানা উবায়দুল হকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন।

উসুল আল ফিকহ, ইসলামী জ্ঞানের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। তিনি এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং প্রায় ২০ বছর ধরে এ বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং আরো প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে সহজভাবে সবার মধ্যে এ জ্ঞান বিতরণের প্রচেষ্টা চালান। এ বিষয়ে তিনি প্রথম একটি অনলাইন কোর্স চালু করেন এবং ওই কোর্সকে উদ্দেশ্য করে ইংরেজিতে একটি বই লিখেন। পরে বইটি বাংলায় অনুবাদ হয়। সম্ভবত এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় এটিই উসুলের ওপর সহজ করে লেখা একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বই। তার উৎসাহেই এ বিষয়ে আগ্রহ বোধ করি ও পড়াশোনায় উৎসাহিত হলে তিনি খুব খুশি হন। একসময় আমি তার বইয়ে কিছু বিষয় যুক্ত করার পরামর্শ দিলে তিনি সে বিষয়গুলো আমাকে যোগ করে তাকে দেখানোর জন্য বলেন এবং তিনি বলেন, আমি কাজটি করতে পারলে, পরবর্তী সংস্করণে তিনি তা যোগ করে দেবেন। এটা তার একটি আশ্চর্য গুণ, আমার মতো অত্যন্ত নগণ্য ব্যক্তিই হোক বা অন্য যে কেউ হোক তিনি সমালোচনা, পরামর্শ খুব সহজভাবে নিতেন, যুক্তিপূর্ণ হলে গ্রহণ করতেন।

ইসলাম সম্পর্কে সারা জীবন তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। এ জন্য কোনো অহঙ্কার করতে তাকে কখনো দেখিনি। শাহ আব্দুল হান্নান একজন প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন, এ জন্য তিনি নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করতেন না। অনেক বিষয়েই প্রচুর পাণ্ডিত্য থাকার পরও তিনি অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় লিখতেন। পাণ্ডিত্য জাহিরের জন্য বাগাড়ম্বরপূর্ণ লেখা বা বক্তব্য তিনি দিতেন না। তার সব কাজের উদ্দেশ্য ছিল দাওয়াহ।

দোয়া করি, আল্লাহ তার দ্বীনের এই একনিষ্ঠ দায়ীকে কবুল করুন। তার সব গুনাহ মাফ করে দিয়ে তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন।



আরো সংবাদ