২৮ জুলাই ২০২১
`

শাহ্ আব্দুল হান্নানকে যেমন দেখেছি

শাহ্ আব্দুল হান্নানকে যেমন দেখেছি - ছবি : সংগৃহীত

আমাদের মাতৃভূমি শাহ্ আবদুল হান্নানের মতো একজন সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক সন্তানকে হারাল। তার সাথে আমার পরিচয় ছাত্রজীবন থেকে। আমার একটা ধারণা ছিল, তাকে কাছে থেকেই জানি। কিন্তু সম্প্রতি তার সম্পর্কে বিভিন্ন গুণীজনের লেখা পড়ে আমার ধারণা পাল্টে গেল। অর্থাৎ তার এমন অনেক গুণ ছিল যা এতদিন পর্যন্ত জানতাম না। যেমন, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সরকারি খরচে তিনি বিদেশে যাওয়া পছন্দ করতেন না। এটা আমার কাছে একটি অত্যন্ত বিরল গুণ মনে হয়েছে। তার অফিস ছিল উন্মুক্ত, তিনি ছিলেন ছোট-বড় সবার কাছে সহজলভ্য। এটাও ছিল তার বিশেষ গুণ। তার বই পড়ে জেনেছি, বাংলাদেশে ভ্যাট প্রবর্তনের জন্য তাকে কত বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। ব্যাংকিং ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি এভাবে প্রকৃত দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন।
আজ আমি তার সাথে আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরব যা হয়তো অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।


ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইসলামী আদর্শের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। শাহ্ হান্নান সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর কোনো দলীয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ। তিনি তার কর্মজীবনে এ নিয়ম সততার সাথে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এ জন্য দেখা যায়, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, রাষ্ট্রের একজন সেবক হিসেবে তিনি আন্তরিকভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। তবে ইসলামকে তিনি তার সব কর্মকাণ্ডের অনুপ্রেরণা হিসেবে মনে করতেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, ইসলাম কিছু নিছক ধর্মীয় রীতি-নীতির সমষ্টি নয়, বরং এর রয়েছে নিজস্ব পারিবারিক নীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় নীতি যা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত, অশান্ত পৃথিবীতে আবারো শান্তির বারতা আনতে সক্ষম। তাই তিনি তার এই চিন্তাধারাকে যথাসাধ্য আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। একদিন তিনি এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে আমাদের বলেছিলেন, তোমরা কুরআনের তিন-চার খানা তাফসির পড়বে। তাহলে আল্লাহ তায়ালার এ মহাগ্রন্থ সম্বন্ধে একটা স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি হবে। এ থেকে অনুমান করা যায়, কুরআনকে তিনি কত গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। অথচ তিন-চার খানা তাফসির পড়েছেন এরকম মানুষ আলেমদের মধ্যেও বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার ছিল জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা। এই জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া ছিল তার নেশার মতো। বিগত বছরগুলোতে যখনই তিনি অসুস্থ হয়ে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, ওখানেই আমার চেম্বার থাকায় আমাকে তার ভর্তি হওয়ার খবর পাঠাতেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তিনি আমাকে কোনো বই, কিছু লেখা আর কিছু উপদেশ দিয়ে বিদায় দিতেন যেন আমার রোগীদের কোনো কষ্ট না হয়। মনে মনে খুশি হতাম যে, ছাত্রজীবন থেকে তার সাথে আমার পরিচয়; এত বছর পরও এই মহান ব্যক্তির ছাত্রই রয়ে গেলাম। বছরখানেক আগে আমার লেখা একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তাকে WhatsApp-এ পাঠালাম। আমি অবাক হলাম, সেটা তিনি দ্রুত পড়ে ফেললেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উপদেশও দিলেন। কয়েক মাস পর আমাকে এ কথাও বললেন, লেখালেখি করতে গিয়ে আবার ডাক্তারি বাদ দিও না। অর্থাৎ আর্তমানবতার সেবাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদার চোখে দেখতেন। অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে তার বিদায়বেলা আমার মনে পড়ছে। শেষবার তিনি ভর্তি হন অজ্ঞান অবস্থায়। এবার আমি সেই ‘হ্যামিলনের বংশিবাদকের ডাক’ আর শুনতে পাইনি। নিজেই গেলাম তাকে দেখতে। ততক্ষণে তার জ্ঞান ফিরে এসেছে। তার অ্যাটেন্ডেন্ট জানাল, তিনি জরুরি কাজ করছেন যেন আমি অপেক্ষা করি। অপেক্ষার সুযোগ না দিয়ে সাথে সাথে তিনি আমাকে ডাকলেন। কুশল বিনিময়ের পর বললেন, তোমার সম্প্রতি প্রকাশিত লেখাটি পড়েছি এবং তা বেশ গবেষণাধর্মী হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আমাকে বিদায় দিলেন। এই অবস্থাতেও আমার সময়ের প্রতি তার ছিল এত খেয়াল। আমি বেশ খুশি হলাম আমার লেখার জন্য নয়, বরং তার শারীরিক অবস্থার জন্য, ডাক্তারি ভাষায় Glasgow coma scale 15/15 অর্থাৎ, তার জ্ঞান সম্পূর্ণ ফিরে এসেছে।

বেশি অবাক হলাম যে, এই রকম শারীরিক অবস্থায়ও শাহ্ আবদুল হান্নান লেখাপড়া ত্যাগ করেননি। তাকে দেখে ইসলামের দুজন মহান জ্ঞানসাধকের কথাই মনে পড়ত। প্রথম ব্যক্তি হচ্ছেন মুসলিম স্পেনের বিজ্ঞানী, দার্শনিক আবু রুশদ যিনি ৭০ বছর বয়সে ১৭ ঘণ্টা পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। জীবনে দুই রাতে তিনি লেখাপড়া করতে পারেননি। একটা ছিল তার বাসর রাত; আরেকটা ছিল তার মায়ের মৃত্যুর রাত। দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছেন মনীষী আল বিরুনি। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তার এক বন্ধু তাকে দেখতে এলেন। তিনি বন্ধুর কাছে ইসলামের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একটি বিষয় জানতে চাইলেন। তার বন্ধু এই কঠিন মুহূর্তে জবাবটি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। আল বিরুনি বলেন, এটা কি উত্তম নয় যে, এ উত্তরটি না জানার চেয়ে বরং জেনেই আমি আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে হাজির হই।’ তার বন্ধু জবাব দিয়ে বাড়ির বাইরে দরজার কাছে যেতেই তার মৃত্যু সংবাদ শুনতে পেলেন। এটাই ছিল এক সময়ে মুসলিমদের জ্ঞান সাধনা। মরহুম শাহ্ আবদুল হান্নান আমাদের মাঝে তাদেরই উত্তরাধিকারী হিসেবে আগমন করেছিলেন। বাংলাদেশের জ্ঞানের আঁধার আকাশে এই মহান ব্যক্তি সন্ধ্যাতারা হয়ে থাকবেন- এটা আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস।

লেখক : মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ



আরো সংবাদ


ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক আটক লুটতরাজ, আত্মসাৎ ও অব্যবস্থাপনা দেশে ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে : ডা. শফিকুর করোনায় ঝালকাঠির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সানিয়া আক্তারের মৃত্যু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে ভর্তির আবেদন শুরু প্রতিদিন ছয় লাখ মানুষকে টিকা দিতে হবে : আইএমএফ খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে করোনায় আরো ১২ জনের মৃত্যু জমিতে কিটনাশক ছিটাতে গিয়ে কৃষকের মৃত্যু মোসাদ অ্যাজেন্টদের গ্রেফতার করার দাবি ইরানের অ্যাসাঞ্জের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে ইকুয়েডর ডেল্টা ছড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে আবার মাস্ক ফিরল চলতি বছর ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৯৭০ অভিবাসী

সকল