২০ জুন ২০২১
`

দুই দশকের পঙ্গু জীবন

দুই দশকের পঙ্গু জীবন - ছবি : সংগৃহীত

২০০০ সালে একটি কম্পিউটার কিনি। তখন আমি সরকারি কলেজের চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে। ২০০৩ সালে এলপিআরে চলে যাই। ওই সময়ে আমার পা দুটি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে আমার বাড়ির বাইরে যাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে যায়। কেবল ডাক্তারের কাছে প্রথমে অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি এবং বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্সে যাওয়া ছাড়া আমি আর তেমন কোথাও যেতে পারি না। একবার অনেক কষ্টে মাইক্রোবাসে চড়ে গ্রামের বাড়িতে আমার ছোট চাচার মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। ২০০০ সালে কম্পিউটার কেনার পরই আমি ‘জীবন জরিপ’ শিরোনামে সেই শিশুকালে যখন মায়ের দুধ পান করতাম তখন থেকে আমার চাকরি জীবনের এলপিআর পর্যন্ত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকথা কম্পিটারের অ৪ সাইজের প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠাব্যাপী লিপিবদ্ধ করেছি। মায়ের দুধ আমি প্রায় চার বছর খেয়েছি। সে সময়ের বেশ কিছু ঘটনা আমার মনে আছে। এ ছাড়া একটি গল্প ও নিয়মিত বেশ কিছু কবিতা লিখি। কবিতাগুলো কম্পিউটারেই আছে। গল্পটি ঢাকার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তবে পরবর্তীতে ‘জীবন জরিপ’ থেকে মাঝেমধ্যে প্রকাশযোগ্য কিছু পত্রিকায় প্রকাশ করেছি। ইরেজি পত্রিকায় লিখিত ৭৩টি আর্টিক্যাল নিয়ে ৩০০ পৃষ্ঠার বেশি বড় ‘রিফ্লেকশন অ্যাট টোয়াইলাইট’ শিরোনামে একটি বইও আছে। এই কম্পিউটার ব্যবহার করে পঙ্গু অবস্থায়ই ‘ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর ত্রৈমাসিক জার্নাল ‘থটস অন ইকোনমিক্স’-এ প্রকাশিত ২২টি আর্টিকেল নিয়ে ৪১৭ পৃষ্ঠার একটি সঙ্কলনের ম্যানাস্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি। এ সবই পঙ্গু অবস্থায় আমার অবসর জীবনে সময় কাটানোর বাইপ্রডাক্ট।

এই ‘জীবন জরিপ’ স্মৃতিকথা লেখা শেষ হলে ২০০৫ সাল থেকে ‘ইসলামিক ইকোনমিক্স রিসার্চ ব্যুরো’র (আইইআরবি) ‘থটস অন ইকোনমিক্স জার্নালে’ ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে ২২টি ইসলামিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছি। এ পথটি আমার জন্য কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কারণ ছাত্রজীবনের কোনো পর্যায়েই ইসলামী অর্থনীতি পড়িনি। এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ আমাকে ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করতে হয়েছে। আমি প্রাথমিকভাবে যে ম্যানাস্ক্রিপ্টটি পাঠাতাম তা সংশোধনের সুপারিশ করে আইইআরবি আমাকে তা ফেরত পাঠাত। সেটি সংশোধন করে পুনরায় পাঠাতাম। এরপর সেটি প্রকাশিত হতো। এভাবে ইসলামিক অর্থনীতির ওপর ২২টি ইংরেজি গবেষণাপত্র প্রকাশ করি এবং অন্য জার্নালে বাংলা দুটি প্রকাশিত হয়। এ করতে গিয়ে একটি বিষয় অনুভব করেছি তা হলো- আমি এ কাজে লিপ্ত অবস্থায় যখন একটি গবেষণাপত্র লেখার বিরতিতে শুয়ে বিশ্রাম নিতাম, তখন বুকের গভীরে এমন একটি স্বর্গীয় সুখানুভূতি লাভ করতাম যা জীবনে আর কখনো লাভ করিনি। প্রতিটি আর্টিকেলের জন্য আমি ভালো সম্মানী পেতাম কিন্তু আমার সে স্বর্গীয় হৃদয়ানুভূতির কাছে তা কিছুই নয়। এটি সম্ভবত এ কারণে যে, আমার মনে হতো- আমি একজন মুসলমান এবং আমার নিজ ধর্মে বিশ্বাস রেখে আল্লাহর ইবাদত করছি। এ লেখা বন্ধ করলাম এ কারণে যে, আমার বয়স বেড়েছে এবং পায়ের ব্যামোটাও বেড়েছে। আর এত বড় আর্টিকেলের প্ল্যানটা মগজে ধরে রাখতে পারছিলাম না।

‘থটস অন ইকোনমিক্সে’ লেখা বন্ধ করার আগেই ২০১২ সালে ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিক ’দ্য নিউজ টুডে’তে কলাম লিখতে শুরু করি। পত্রিকাটির সম্পাদক আমার সহপাঠী রিয়াজ উদ্দীন আহমেদ। রিয়াজকে আমার কাছে সাম্প্রতিককালের অন্যতম সাহসী সম্পাদক বলে মনে হয়েছে, যা লিখতাম সে তাই ছাপত। কখনো যদি অমনোযোগের কারণে কোনো দিন সন তারিখ ভুল হতো সে তা সংশোধন করা প্রয়োজন মনে করত না। আমার মনে হতো, আমার আর্টিকেল ছাপার আগে সে তা পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করত না। বিষয়টি আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগত। আমি তার সাহসের প্রশংসা করি এ কারণে যে, আমি তখন দেশের প্রায় চারটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিকে নিয়মিত লিখতাম। মনে আছে, একটি আর্টিকেল দৈনিক ইনডিপেন্ডেন্টে পাঠিয়েছিলাম। তখন ইনডিপেন্ডেন্টের সম্পাদক ছিলেন মাহবুবুল আলম। সেটি তিনি ছাপতে রাজি হননি, কারণ এটিকে তিনি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করেছিলেন। আমি সে আর্টিকেলটি নিউজ টুডেতে পাঠিয়ে দিলাম। রিয়াজ সে আর্টিকেলটি ছাপে। এমন আরো বেশ কয়েকটি আর্টিকেল সে ছেপেছে যা অন্য কোনো পত্রিকায় ছাপার কথা নয়। এরপর সে পত্রিকাটি বিক্রি করে দিলে সে পত্রিকায় আমার লেখা বন্ধ হয়ে যায়। এখন আর সে পত্রিকাটি বেরোয় না।

আমার জীবনের প্রথম অর্ধেক কাল ঢাকার শিক্ষা জীবন ও কর্মজীবন এবং প্রায় তিন বছর করাচির পিআইডিতে অর্থনীতিতে গবেষণার চাকরি জীবন কাটানোর পর কলেজ শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়ে এখন মফস্বলে থাকি। মফস্বলের কলেজ শিক্ষক বলেই কি-না জানি না, আমার পরিপাটি করে সাজানো নিখুঁত কলামগুলো কোনো কোনো পত্রিকা বিকৃত করে ছাপত। কোনো কোনো সময় তারা আমার নামটা পর্যন্ত এডিট করে ফেলত! এ ব্যাপারে বারবার তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেও কোনো ফল হয়নি। এ প্রসঙ্গে একটি বাংলা গানের কলি মনে এলো, তারা হয়তো ভাবত- ‘ও কেন এত সুন্দরী হলো’। এরপরও ‘বেহায়ার’ মতো তাদের পত্রিকায় লিখতাম কারণ পায়ের পঙ্গুত্বের কারণে গৃহবন্দী আমাকে সময় কাটাতে হবে তো। এ লেখার কারণেই হয়তো আমি এখনো মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ আছি এবং অন্যান্য রোগ বালাই আমাকে আক্রমণ করতে পারেনি। কোনো কোনো পত্রিকা আমাকে সম্মানী দিতো আর কোনোটা তা দিতো না। বর্তমানে আমার পায়ের ব্যামোটা এমন পর্যায়ে এসেছে যে, আমার পক্ষে হয়তো আর নিয়মিত কলাম লেখা সম্ভব হবে না।

পত্রিকাতে যারা নিয়মিত লেখেন তাদের বেশির ভাগই সাধারণত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং আমলা শ্রেণীর লোক। তাদের বেশির ভাগেরই সম্মানীর প্রয়োজন নেই, তবে সম্ভবত তারা তা পান। আমার তা দরকার। কারণ দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে আমি বেতননির্ভর ছিলাম এবং পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকায় কুমিল্লর শহরতলিতে প্রায় ১২০০ স্কয়ার ফুটের ফাউন্ডেশনহীন একটি একতলা বাড়ি নির্মাণ করে তাতে বসবাস করি। আমার অন্য কোনো উপার্জনের সোর্স নেই। তবে সম্প্রতি পেনশন পুনঃপ্রবর্তন হওয়ায় সম্ভবত পত্রপত্রিকার লেখালেখির কাজে ইস্তফা দিতে পারি।

একটি কথা মনে পড়ল। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রিত্ব করে তার পোষায় না। কারণ, এ কাজ করে তিনি যে বেতন পান পত্রিকায় কলাম লিখে তার চেয়ে ঢের বেশি রোজগার করতেন। কলেজ পর্যায়ের কোনো শিক্ষক নিয়মিত কলাম লিখেন বলে আমার জানা নেই। একটি কথা পত্রিকায় যারা লিখে থাকেন তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে আমার দ্বিধা নেই যে, ও সব কলামিস্টের অনেক লেখাই আমার মনে ধরে না; অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে। তা এ কারণে যে, বাংলায় লিখলেও এবং তাদের অনেকেরই লেখার শিরোনামটি যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন বিষয়বস্তু অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমা ব্যবসায়িক সংস্কৃতির প্রচার বা কোনো না কোনো দেশীয় রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের নির্বিচার অনুসরণ। এটা এই কারণে হয় যে, তারা (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) যে দেশ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন সে দেশের প্রতি বা কোনো না কোনো দলমতের প্রতি অনুগত থেকেই তা লিখে থাকেন। এ কারণে তাদের লেখায় নির্মোহ সত্য প্রকাশিত হয় না এবং প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

প্রতিটি পত্রিকার নিজস্ব এডিটোরিয়াল পলিসি থাকে। আজকাল সরকার সে এডিটোরিয়াল পলিসি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ কারণে আমার গোটা দুই-তিনটি লেখা একটি বাংলা দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা ছাপেনি। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেছে, ‘বোলড’ হয়ে গেছে। আমার একটি লেখা একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত হলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সতীর্থ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত উপাচার্য মরহুম ড. আবদুল কাদির ভূঁইয়া আমাকে টেলিফোন করে বলেছিলেন, ‘একটু সফট হওয়াই ভালো’। তিনি একজন ভালো এবং শিক্ষিত পাঠক ছিলেন। অবশ্য তদানীন্ত সরকারের প্রতি তার একটা সফট কর্নার ছিল, যে কারণে তিনি কোনো কোনো বিষয়ে আমার সাথে একমত পোষণ করতেন না। একবার ঢাকার এক বাংলা দৈনিকে কাশ্মিরের ওপর এক পিএইচডি গবেষকের লেখা একটি নিবন্ধ তাকে পড়তে বলি। লেখাটি তিনি পড়ে পাকিস্তানকে ‘গাদ্দার’ বলে গালি দেন। কিন্তু সে লেখাটি ছিল কাশ্মিরে বিজেপি সরকার কর্তৃক অনুসৃত নীতি বিষয়ে এবং তাতে পাকিস্তানের নামটিও উচ্চারিত হয়নি। তাকে বললাম ‘তুমি ভারতে পিএইচডি করেছ বলে এ কথা বলতে পারলে।’ তিনি প্রথমে ক্ষেপে গিয়ে তৎক্ষণাৎ চুপ হয়ে যান এবং আমার যুক্তিগুলোর কোনো প্রতিবাদ না করে মনোযোগ দিয়ে শোনেন। মনে হয় তার ভুলটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তর্ক করাটা তার স্বভাবে ছিল না। এটি তার একটি গুণ ছিল যা অনেকের মধ্যেই দেখা যায় না। রিয়াজ আমার একটি লেখা ছেপে টেলিফোনে বলেছিল ‘উই হ্যাভ বিন পানিশড ফর ইট। তোমার পথে তুমি চালিয়ে যাও, তবে একটু রয়ে সয়ে লিখো’। আমার পথ মানে, নির্মোহ সত্য উদঘাটনের পথ। সে পথেই এখনো চলছি এবং যতদিন পারি চলব।

কারণ ‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’। একটি বাংলা পত্রিকায় আমি লেখা পাঠালে বলল, আপনার লেখা ছাপতে আমাদের আপত্তি নেই; তবে আমাদের এডিটোরিয়াল পলিসি হচ্ছে শেখ মুজিবের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ লেখা। আমি বললাম ‘আমি যে বয়সের (৭৯ বছর) লোক, তাদের প্রায় সবাই তাকে শেখ সাহেব বলাতেই অভ্যস্ত’। তারা আমার লেখাটি ছাপেনি। ইদানীং সত্য উদঘাটন করে পত্রপত্রিকায় লেখা প্রায় দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, মহিলা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।



আরো সংবাদ