০৩ আগস্ট ২০২১
`

মোদি-অমিত ম্যাজিক পরাস্ত করে মমতার হ্যাটট্রিক

মোদি-অমিত ম্যাজিক পরাস্ত করে মমতার হ্যাটট্রিক - ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের বাইরে বাংলাদেশের জনগণ যে দু’টি নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও প্রবল আগ্রহ নিয়ে নজর রেখেছে তা হলো- গত ২ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০।

এই দুই নির্বাচনের দু’টি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এক. ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত ছিল না কে আসলে জিততে যাচ্ছে। দুই. সম্ভবত এদেশের বেশির ভাগ মানুষ এ দু’ক্ষেত্রে যে দুটি দলকে সমর্থন করেছে সেই দুটি দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

বহু জল্পনা-কল্পনা ও ডামাডোলের পর সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা কেন্দ্র নবান্নের চেয়ার আবার দখল করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনী প্রচারণায় আঘাত পেয়ে পা ভাঙে তার। সে ভাঙা পায়েই ভোটের ময়দানে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ কেন্দ্রের হেভিওয়েট নেতা-মন্ত্রী এবং ১০-১২ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বিপক্ষে তিনি একাই ২৯৪টি আসনে লড়েছেন। তিনি নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় বারবার উচ্চারণ করেছেন, ‘মনে রাখবেন, ২৯৪টি আসনে আমিই প্রার্থী। আমাকে ভোট দিন।’ কার্যত গেরুয়া ঝড়কে তিনি একাই এক শ’ হয়ে সবুজ সুনামি দিয়ে রুখে দিয়েছেন। তাদের প্রভাব ভণ্ডুল করে দিয়ে জিতে নিয়েছেন ২৯২টি আসনের মধ্যে ২১৩টি। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘জয় বাংলা’, ‘খেলা হবে’ এবং ‘বাংলায় তার মেয়েকেই চাই’ স্লোগানের মতো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলার মেয়েকেই তৃতীয় দফা ক্ষমতায় বসাল। এই পরাজয় শুধু রাজ্য বিজেপির নয়, এ পরাজয় অনেকখানি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরও।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তার এই ধারাবাহিক সফলতা অল্পদিনের সাধনা নয়। তার পথচলা সম্রাট জুলিয়াস সিজারের মতো ‘Veni, vidi, Vici’ বা ‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’- এমন নয়। ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে আজ অবধি দীর্ঘ লড়াই, ঘাত-প্রতিঘাত, যাতনা, অত্যাচার, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বিজয়ের উৎকৃষ্ট স্বাদ পেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো বা সভাধিকারী।

বিজেপি, সিপিআইএম, কংগ্রেস, ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টকে একপ্রকার দুমড়ে-মুচড়ে ম্যাজিক ফিগারের চেয়ে অনেক বেশি আসন নিয়ে আরো একবার বাংলার ক্ষমতায় মমতার তৃণমূল সরকার। সাদা শাড়ি আর হাওয়াই চটির দিদির হাতেই রইল বাংলা রাজ্য পরিচালনার ভার। তার পক্ষে জনরায়ের অন্যতম কারণ হলো, নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত গুণ বা ক্যারিশমাটিক ক্ষমতা। মানুষ তাকে দূরের কেউ মনে করে না; যেন পাশের বাড়ির চিরচেনা মেয়ে। যেন অনেক আপনজন। মমতায় তারা সবসময় মায়া খুঁজে পায়। তিনি যেন কারো মমতাময়ী মা, কারো দিদি!

এবারের নির্বাচনের আগে অদ্ভুত এক দলবদলের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল। চারিদিক নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনায় মুখরিত ছিল। অনেকে গলা উঁচু করে বলেছে, এবার মোদি-অমিত শাহের ম্যাজিকে মমতা মসনদ হারাতে বসেছেন। অপরদিকে ফিসফিসানি চলছিল, আর যা-ই হোক, শেষমেশ বাংলা তার মেয়েকেই চায়। হাওয়া ছিল বিজেপির পক্ষে; কিন্তু নীরবে বিপ্লব ঘটিয়ে দেন পশ্চিমবঙ্গের রাজপথের লড়াকু নেত্রী মমতা। তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী গেরুয়া শিবিরে নাম লেখানোতে দলের অন্দরমহলে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। কিন্তু মমতা যে দমে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘নিহত বাঘের চেয়ে আহত বাঘ অনেক ভয়ঙ্কর’। তিনি আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ভাঙা পায়ে মাঠ-ময়দান চষে বেড়ালেন এবং তৃতীয়বারের মতো বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রমাণ করে দিলেন- সুশাসনের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও তার বিকল্প এখনো পশ্চিমবঙ্গে সৃষ্টি হয়নি। এটাও নিশ্চিত হলো- ‘দলবদলুরা’ কমবেশি বিজেপিকে ডুবিয়েছেন। তৃণমূল নেতারা গেরুয়া শিবিরে যোগ দেয়াতে অনেক বড় বড় বিজেপি নেতার প্রাধান্য কমে গেছে। পোড়খাওয়া অনেক নেতা সাইড বেঞ্চে চলে গিয়েছিলেন। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের স্থানে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে চিত্রনায়ক মিঠুন চক্রবর্তী ও তৃণমূলের দলত্যাগী নেতা শুভেন্দু অধিকারী এমন কথাও শোনা গেছে। এটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে দলের ভেতর। তাছাড়া শুভেন্দু অধিকারী, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, বৈশালী ডালমিয়া, প্রবীর ঘোষাল, সব্যসাচী দত্তরা তৃণমূলে যে দুর্নীতির কালিমা লেপন করা হয়েছিল; তা তুলে বিজেপির গায়ে লাগিয়ে দিয়েছেন। ভোটের ফল বলে দিচ্ছে- মিঠুন চক্রবর্তী শুধু সিনেমাতেই ‘ফাটা কেষ্ট’, বাস্তবে নন। বাস্তবের ফাটা কেষ্ট অনুব্রত মণ্ডল যার ‘ক্যাপ্টেন’ মমতাই।

এ ছাড়া বেশকিছু কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের এই ল্যান্ড স্লাইড ভিক্টরি বা মহাবিজয় হয়। প্রথম কারণই হলো- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি হলেন সুপার ফাইটার, স্ট্রিট ফাইটার। তিনি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে সম্মোহনী নেতত্বের মাধ্যমে রাজনীতিকে দেশজকরণ করতে পেরেছেন যা গেরুয়া শিবির পারেনি। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি বা ভারতীয় জনতা পার্টি মূলত দিল্লি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের তেমন কিছু করার ছিল না যা দলে ও দলের বাইরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ দিল্লির হস্তক্ষেপকে ‘ভাড়াটে খেলোয়াড়’দের হস্তক্ষেপ বলেও অভিহিত করেছেন। বিজেপির নির্বাচন পরিচালনার ভাষা ছিল বাংলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনকে বাঙালীকরণ বা দেশজকরণ করে নবান্নের ১৪তলা আরোহণের দীপ্ত শপথে ছিলেন অবিচল ও প্রাণোচ্ছল; যা নির্বাচনে জিততে টনিকের মতো কাজ করেছে। বিভিন্ন সমীক্ষা ও ভোটের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যেকোনো বাবের তুলনায় এবার সংখ্যালঘু মুসলিমরা তৃণমূল কংগ্রেসকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছে। ‘মুসলিম মিরর’ পত্রিকায় বলা হয়েছে, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দক্ষিণ ও উত্তর চব্বিশ পরগনাসহ বিভিন্ন জেলাতে মুসলিম প্রাধান্য আছে এমন ৬১ আসনের মধ্যে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল দখল করেছে ৫৮টি, বিজেপি মাত্র দু’টি এবং ফুরফুরার পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর আইএসএফ (Indian Secular Front) পেয়েছে মাত্র একটি আসন। আর একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- এবারের জাতীয় কংগ্রেস, সিপিআইএম বা Communist Party of India (Marxist), আইএসএফ নিয়ে গঠিত ‘সংযুক্ত মোর্চা’ বলা যায়, ব্যাক ফায়ার করেছে। মুসলিম ভোটাররা ভেবেছে, এই মোর্চাকে ভোট দিলে আসলে বিজেপি ক্ষমতায় চলে যাবে। তারা ক্ষমতায় এলে সিএএ (Citizenship Amendment Act- 2019)-এর আওতায় এনআরসি (National Register of Citizens) বাস্তবায়ন করে তাদের বিপদে ফেলে দেবেন। তাই বিজেপি ঠেকাতে তৃণমূলকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছে তারা। কংগ্রেসের গড় বা ঘাঁটি বলা হতো যে মালদাহ, মুর্শিদাবাদকে; সেখানে প্রায় সব আসন দখল করেছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস।

২০১৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে তুলনামূলক খারাপ ফল তৃণমূল কংগ্রেসকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ এনে দিয়েছিল। একইভাবে এই দু’টি বিষয় নিয়ে বিজেপি মাঠ গরম করে ভোটারদের নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৮টা আসনে জয়ী হয়ে অহঙ্কারের পালক পরে তৃণমূলকে বলেছিল, ‘১৯-এ হাফ, ২১-এ সাফ’। এটা ভালোভাবে নেয়নি জনগণ। দিল্লি ও কেরালা রাজ্যের সচেতন ও শিক্ষিত নাগরিকদের মতো ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি গ্রহণ করেনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন- সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যকার এবারের নির্বাচনে প্রচ্ছন্নভাবে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জয় হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি পছন্দ করেনি। আরো প্রমাণিত হয়েছে, বিগত সরকারের বিরুদ্ধে ভুল-ত্রুটি ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প নেতা বা নেত্রী এখনো কেউ তৈরি হননি। এই সাদা শাড়ি আর তিনশ’ টাকার চপ্পলের কাছে পরাজিত হয়েছে লাখ টাকার স্যুট-কোট, জুতা। মমতা বারবার বলেন, ‘আমি স্ট্রিট ফাইটার’। তিনি করোনা, আমফানে মাঠে-ময়দানে চষে বেড়িয়েছেন; মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্য কোনো মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রে তেমন চোখে পড়েনি। তার সরকারে রেশন, আধার কার্ড, স্বাস্থ্যসাথী, খাদ্যসাথী, সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী, যুবশ্রী সব নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তাদের অভিনব কর্মসূচি ‘দুয়ারে সরকার’ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলো তৃণমূলকে মা-মাটি-মানুষের সরকারে পরিণত করেছে। অনেকেই এটা রাজ্যের টেকসই উন্নয়নের একটি দারুণ পদক্ষেপ বলে মনে করেছে। তার প্রতিফলন ভোটে স্পষ্ট। তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা কোচ, মমতা ক্যাপ্টেন এবং মমতাই স্ট্রাইকার বা স্ট্রাইক বোলার ও ব্যাটসম্যান। খেলা শেষে তিনি ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’। এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন প্রমাণ করেছে, ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, যোগ্যতা ও কঠিন মনোবল থাকলে একপায়ে খেলেও জয়লাভ করা যায়। মমতা এখন শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় সারা ভারতবর্ষের নেত্রী যাকে এখন অনেকে অনুসরণ করছে।

তবে অনেকে বিজেপির দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের তিন আসন থেকে ৭৭ আসন ও ৩৫ শতাংশের অধিক ভোট পাওয়াকে ‘ভালো কিছুর ইঙ্গিত’ বলে মনে করছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তৃণমূলের জয় থেকে বিজেপির ৭৫ আসন পাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্রেকিং নিউজ’। উচ্চাকাক্সক্ষী হয়ে গেরুয়া শিবির বাংলা জয় করে ডাবল ইঞ্জিন সরকার গঠন করে, সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়নি। বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ করেছেন। তবে বিজেপির এই ফলাফলে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। কারণ ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা মাত্র তিনটি আসন ও ১০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিলেন। অপরদিকে এটা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্যও শাপেবর হয়েছে। সরকার ভালোভাবে পরিচালনার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে, শক্তিশালী বিরোধীদল অতি প্রয়োজন। বিগত সরকারে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকার কারণে তারা বেশ কয়েকটি নেগেটিভ পয়েন্ট পেয়েছিলেন। যা এবার ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে দোলাচল তৈরি করেছিল। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি শক্তিশালী বিরোধী দল হবে বলে আশা করা যায়; যা তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর হবে। তাই মমতার দলের আগের চেয়ে ভুল অনেক কম হবে।

সর্বতোভাবে এবাবের বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির অনুকূলে ছিল না। তাদের পতনের পেছনে করোনা অতিমারীর ভয়াবহতা বিশাল ছাপ ফেলেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে মোদি সরকারের সমালোচনা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে গ্যাস ও তেলসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ করার প্রক্রিয়া জনগণ একেবারেই মেনে নেয়নি। এ ছাড়া মোদি সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যত কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারা আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি তলানিতে গিয়ে ঠেকা তৃণমূলের বিশাল জয়ে জ্বালানি জুগিয়েছে। একই সাথে, তৃণমূল কংগ্রেস বারবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে; যা অনেকেই সত্য বলে ধরে নিয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার মনে করেছিল, বেশি দফায় নির্বাচন হলে তাদের প্রচারণায় সুবিধা হবে। কিন্তু আট দফা নির্বাচন বিজেপির জন্য ‘বুমেরাং’ হয়েছে। করোনার ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ তাদের এই পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

মহাকাশে নক্ষত্রের পতন হলে তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বিশাল ব্ল্যাকহোল। পতন হওয়া নক্ষত্রের ভরকেন্দ্র অনুসরণ করে পার্শ¦বর্তী অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র। মমতা বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে অল্প ভোটে হেরেছেন এটা ঠিক। কিন্তু তার ভরকেন্দ্র অনুসরণ করেছে নন্দীগ্রামের আশপাশের অনেক তৃণমূল প্রার্থী জিতে এসেছেন। এটাই বড় নেতার উৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য- নিজে সাহস করে চ্যালেঞ্জ নিয়ে দল ও নেতাকর্মীদের এগিয়ে দেয়া। একটা কথা উঠছে- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে গিয়ে কি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারবেন? হ্যাঁ পারেন। ভারতের জন-প্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫১ অনুযায়ী, কোনো দল সরকার গঠন করলে তাদের বিধায়করা চাইলে রাজ্যপালের অনুমতি সাপেক্ষে ভোটে না জেতা কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করতে পারেন। এক্ষেত্রে তার মেয়াদ ছয় মাস। এই সময়সীমার মধ্যে উপনির্বাচন করে তাকে পুনরায় নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হতে হবে। উল্লেখ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগে ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হন।

সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা এবং উদার গণতান্ত্রিক ভাবধারার বিকাশ ও প্রকাশ ঘটবে এই আশায় পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক তথা সংখ্যালঘুরা এই বিধানসভা নির্বাচনে দুই হাত ভরে মমতা ব্যানার্জিকে দিয়েছেন সমর্থন।

অন্যদিকে, কেন্দ্রে ক্যারিশম্যাটিক নেতার অভাবে ধুঁকছে কংগ্রেস। বিদেশিনী সোনিয়া গান্ধী, গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারীদ্বয় রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সম্মোহনী নেতৃত্ব দিয়ে জাতিদের আশা পূরণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় কেন্দ্রের মোদি-অমিত ম্যাজিককে থামিয়ে দিতে পারেন একমাত্র মমতাই। তিনি যদি কংগ্রেস, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল ও সমমনা দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে শুভ্র আঁচল বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন; তবে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করতে তাকে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না।

এই প্রক্রিয়ায় যদি তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, তার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেত্রী ভারতে এখন দ্বিতীয়টি নেই। নির্বাচনী জয়ের পর তিনি বলে দিয়েছেন, ‘বাংলা ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে’। সাথে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘একপায়ে বাংলা জয়, দুপায়ে দিল্লি জয় করব’। তিনি দিল্লি জয় করতে পারেন কি না সময় বলে দেবে। অবশ্য সময়কে প্রায় সবসময় লড়াকু ও স্ট্রিট ফাইটারদের পক্ষে থাকতে দেখা যায়।

লেখক : এমফিল গবেষক



আরো সংবাদ