০৯ মে ২০২১
`

লকডাউনে যেন চোর-পুলিশ খেলা

লকডাউনে যেন চোর-পুলিশ খেলা - ছবি : সংগৃহীত

দেশে ফের করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ১৪ এপ্রিল থেকে ‘সর্বাত্মক লকডাউনে’র ঘোষণা দেয় সরকার। এতে একটি বিশেষ শ্রেণীর মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে। লকডাউন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়ায় অনেক মানুষের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা মাস্ক না পরতে ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছেন। কেউ নিয়ত করছেন মরে গেলেও মাস্ক পরবেন না। কারো মাস্ক হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। কারো মতে, করোনা খুবই ধনাঢ্য এবং আভিজাত ভাইরাস। কারো মধ্যে ধর্মীয় গোড়ামিও লক্ষণীয়। অনেকে মনে করছেন, করোনা শুধু ধনীকে আক্রমণ করবে। সাধারণ মানুষের এই ধরনের প্রতিক্রিয়া মূলত অজ্ঞতা এবং সরকারের প্রতি বিরক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। ফলে লকডাউন বাস্তবায়নে সরকার এবং প্রশাসন কঠোর হলেও এটি খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, অলিগলিতে আগের তুলনায় বিপুল মানুষজনের আড্ডা আরো বেড়েছে। মোড়ে মোড়ে ভিড় জমাচ্ছেন অনেকে।

অন্য দিকে ত্রাণের আশায় জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সাথে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় বসে আছেন অনেক দিনমজুর। লকডাউনে তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আমরা দিন আনে দিন খাওয়া নিম্নবিত্তদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ধর্মীয় দিক থেকে হোক আর সামাজিক দিক থেকে হোক তাদের প্রতি আমাদের অর্পিত দায়িত্ব এড়িয়ে চলছি। তাদের জীবন ধারণে ব্যয়ের মাত্রা না কমিয়ে বেকার করে দিচ্ছি। সমাজের ভদ্রজনেরা নিজেদের পেট নিয়ে ব্যস্ত। অন্যকে কিভাবে ঠকিয়ে দু’পয়সা আয় করা যায়, তারই প্রাণন্তকর চেষ্টা। এতেই আত্মতৃপ্তি। অন্যের প্রাপ্য বঞ্চিত করতে পারলে মনে দিগি¦জয়ের আনন্দ।

অথচ এখন চলছে ত্যাগ-তিতীক্ষার পবিত্র মাহে রমজান। যা ধনী-গরিব বৈষম্য সমতাকরণের মহিমান্বিত এক পবিত্র মাস। কিন্তু বাস্তবে দেশে রমজান মাস মানেই মুনাফা অর্জনের মোক্ষম সুযোগ। আর বেশির ভাগ মানুষ ভোগ-বিলাসের মাসে পরিণত করেছেন রমজানকে। দেখা যায়, অনেকের ডজন খানেক আইটেম ছাড়া ইফতার না করলে মন ভরে না। কিন্তু পাশের বাসার কারো পান্তা ভাতও জোটে না, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এ দিকে শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরি সময়মতো দিতে কার্পণ্য মালিকপক্ষের। যাদের পরিশ্রমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত হচ্ছে দিন দিন। সেই তাদের ভাগ্যদশা বড়ই করুণ। সব কিছুর দাম বেড়েই চলেছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি পাঁচ শ’ টাকাতেই স্থির। দুই দিন কাজ করতে না পারলে চুলোয় তাদের আগুন জ্বলে না। তাই তো নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরোয় করোনা নিয়ে তাদের চিন্তা করার সময় এবং মানসিকতা না থাকারই কথা। বুভুক্ষ এসব বনি আদম করোনা খেতেও রাজি আছেন, যদি ক্ষুধা নিবারণ হয়।

বাস্তবতা হলো- খেটেখাওয়া মানুষকে বাদ দিয়ে আমাদের সভ্য হওয়ার দাবি করাটা বড়ই বেমানান। তাদের ন্যূনতম জীবন-জীবিকার সুযোগ তৈরি করে দেয়া আমাদের কর্তব্য। কিন্তু রাষ্ট্র সেই কাজ এত দিনেও করতে পারেনি। এই ব্যর্থতার গ্লানি বইতে হচ্ছে শুধু শ্রমজীবী মানুষকে। তবে এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, একটি সমাজ এবং রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি গণমানুষ। আর একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত এবং সভ্য হবে তা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকের জীবনমান এবং মাথাপিছু আয়ের ওপর। এ দু’টির মান দুর্বল হলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত মাত্রায় আসবে না, এটিই স্বাভাবিক। ফলে কখনোই একটি রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের প্রতি উদাসীন থেকে উন্নত দেশের পর্যায়ে যাওয়ার আশা করতে পারে না। যখন একটি রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্র্রে নানা অপরাধ অপকর্ম বাসা বাধে; তখন রাষ্ট্রকে অকেজো করে দেয়; সেই রাষ্ট্রের জনগণের আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য এলোমেলো হওয়াই স্বাভাবিক। যা বাংলাদেশে বর্তমানে দৃশ্যমান। অন্য দিকে সীমিত আয়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের জনগণের একটি জাতীয় ব্যাধি হলো; অপচয়ের মানসিকতা। বিভিন্ন দিবস এবং ধর্মীয় উৎসব আসলে হাট কিংবা বাজার ক্ষেত্রবিশেষে মেলায় রূপান্তর করে বসি আমরা।

অভাব অনটন থেকে রক্ষা পাইয়ে দেয়ার আশা দিয়ে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু ফল কখনোই কাক্সিক্ষত নয়। ক্ষমতায় না থাকলে রাজনীতিবিদরা আর জনগণের পাশে দাঁড়ান না। তবে ক্ষমতায় থাকলেও তাদের সেবা দেয়ার মানসিকতা খুব একটা যে দেখা যায়, তেমনও নয়। শুধু বিপদ-আপদে জনগণের পাশে নামকাওয়াস্তে দাঁড়িয়ে জনসেবকের খেতাব পেতে লালায়িত। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, সত্যিকারের একজন রাজনীতিবিদ হওয়া খুবই পরিশ্রমসাধ্য ব্যাপার।

জনগণের সাথে তাদের যত দূরত্ব বাড়বে অপরাধ অপকর্ম ততই গতিপ্রাপ্ত হবে। দেশ হয়ে পড়বে আমলানির্ভর। আর আমলাতান্ত্রিক সমাজ কোনো দিনও ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। আমলারা তখন জনগণের জানমালের হিফাজত না করে শোষণ আর কর্তৃত্ব কায়েম ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে জনগণের কথা শোনার প্রতিনিধির অভাব দেখা দেয়। যার কিছুটা হলেও বর্তমান ‘কঠোর লকডাউনে’ দৃশ্যমান।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে লকডাউন জরুরি বটে। কিন্তু তা অবশ্যই জনগণের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের লকডাউন কাগজ-কলমে ছাড়া বাস্তবে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা না রেখে চোর-পুলিশ খেলায় রূপ নেবে। জনপ্রতিনিধিরা হবেন সেই খেলার দর্শক। গত ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন দেয়ার পরও অলিগলিতে বিনাকারণে মানুষের আনাগোনা এবং রাস্তায় যানজট সে কথার প্রমাণ বহন করে। কিছু দিন তো এমন হয়েছে, যখন কোনো কিছু খোলার অনুমতি ছিল না, তখন দোকানিরা দোকানপাট খুলছেন, পুলিশ দেখামাত্রই সাটার নামিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন। এ যেন শৈশবের সেই চিরচেনা জনপ্রিয় চোর পুলিশ খেলারই প্রতিচ্ছবি।

চোর পুলিশ বা চোর সিপাহি খেলাটি আমাদের দেশে শিশুদের একটি বিনোদনমূলক বহিরাঙ্গন রোলপ্লেয়িং খেলা। খেলাটিতে সাধারণত খেলোয়াড়ের সংখ্যা অসীম রেখে দু’টি দলে বিভক্ত হয়। এক দল পুলিশের ভূমিকা পালন করে এবং অন্য দলটি একটি আখ্যানের মধ্যে চোরের ভূমিকা পালন করে। পুলিশ খেলোয়াড়রা চোরদের তাড়া করে। ঠিক একইভাবে চলমান লকডাউনে পুলিশ জনগণকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু জনসমাগম ঠিকই বলবৎ রয়েছে। এ ধরনের লকডাউনে দেশের অর্থনীতি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। তবু পর্যায়ক্রমে লকডাউন বাড়ানো হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং কর্মহীনদের সংখ্যা বাড়ছে। সবমিলিয়ে এই চোর-পুলিশ লকডাউনে শুধু জনগণই নয়, জাতীয় অর্থনীতি স্লথ হয়ে পড়েছে। আমলাতান্ত্রিক রাজনীতি দিয়ে করোনার মতো মহামারী মোকাবেলা করা কঠিন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণের প্রয়োজন বুঝে মেধা খাটিয়ে রাজনৈতিক কৌশল ও প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করে, জীবন ধারণের ব্যয় কমিয়ে এনে লকডাউন কার্যকর করে চোর-পুলিশ খেলার অবসান ঘটাতে হবে। সেই সাথে করোনা ও লকডাউনে এবং লকডাউন পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির চাকা বেগবান করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তবেই সম্ভব দেশ ও জনগণকে এই মুসিবত থেকে উদ্ধার করা।

লেখক : ছাত্রনেতা, সবুজবাগ, ঢাকা
nayemulislamnayem148@gmail.com



আরো সংবাদ