০৯ মে ২০২১
`

দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতে হবে

-

দুর্নীতির মহাপ্লাবনে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলো মূলত প্লাবিত হলেও কথিত সভ্য শিক্ষিত এবং উন্নত দেশগুলোও এই মহামারীর ছোবল থেকে মুক্ত নয় । তবে একথা সত্যি যে, উন্নত ও ধনী দেশগুলোতে উন্নত শাসনব্যবস্থা এবং আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগের নিশ্চয়তা থাকাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা সেখানে দৃশ্যমান নয় । তাই এ সব দেশের মুনাফাখোর ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিরা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তৃতীয় বিশ্বের ঘুণে ধরা, ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা এবং অবৈধভাবে ক্ষমতাসীন, অসৎ, দুর্নীতিবাজ, নীতিভ্রষ্ট, স্বেচ্ছাচারী শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রেখে এই দরিদ্র দেশগুলোর অর্থসম্পদ গ্রাস করার কাজেই মনোনিবেশ করে থাকেন। তাই ধনী দেশগুলোতে বিলিয়নিয়ারদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোতেও হাজার কোটি টাকার মালিক ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলার সংখ্যাও বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। দুর্নীতিবাজ এসব ব্যক্তির পাহাড়সম অর্জিত অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়াতে, কালো টাকা হলেও দেশে তা বিনিয়োগ এবং রক্ষিত না হওয়ার কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তার সঞ্চালনের কিছুটা সুফল থেকেও হচ্ছে বঞ্চিত।

কথিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধুয়া তোলা হলেও সবদিক বিবেচনায় এবং বাস্তবিক অর্থে, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হচ্ছে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতম; কেননা আধুনিক অর্থনৈতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী জিডিপি অথবা Per Capita Income সব কোনো দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি নয়। বর্তমান সময়ে HDI (Human Development Index) অথবা IHDI (Inequality-Adjusted Human Development Index) হচ্ছে সার্বিক উন্নয়নের মানদণ্ড। এর মধ্যে সন্নিহিত রয়েছে মৌলিক মানবাধিকার, খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, বাকস্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা, অবাধ ভোটাধিকার, নারী পুরুষের সম-অধিকার ইত্যাদি। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের কয়টি দেশে ক্ষমতাসীন সরকার, দল এবং নেতারা মানবকল্যাণ নিশ্চিতকল্পে এসব পদক্ষেপ নিতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন?

বাংলাদেশের মতো অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে দুর্নীতির প্রকৃতি ও আকৃতি নিয়ে আমরা সবাই অবগত। তাই এ নিয়ে বিশদ আলোচনার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের মুখ্য লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির কারণগুলো চিহ্নিত করে তা নির্মূল করা। তবে আমাদের জন্মভ‚মি বাংলাদেশ হওয়াতে এ দরিদ্র দেশের অকল্পনীয় ও বিস্ময়কর দুর্নীতির কিছু বিশেষ উপাখ্যান সবাইকে স্মরণ করার জন্য তুলে ধরছি- ১. তিন তিনবার পুঁজিবাজার ধ্বংস করার মাধ্যমে লাখো কোটি টাকা আত্মসাৎ। এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা অংশ পথে বসে। ২. বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান থেকে লুটপাট। ৩. বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেগা বা বৃহৎ প্রকল্পের নামে টেন্ডারবিহীন কাজ দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ। ৪. ধারাবাহিকভাবে শিক্ষাঙ্গনের বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষার আগে পরিকল্পিতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা এবং গ্রেস মার্ক দেয়ার মাধ্যমে উন্নত ফলাফল নিশ্চিত করার বিধান। ৫. স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত বেশির ভাগ হাসপাতালে নিম্নমানের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, ওষুধ উৎপাদনকারী অজস্র কোম্পানি নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করেও সরবরাহ, ভুয়া সার্টিফিকেট দেয়ার মাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসকের প্রাণঘাতী চিকিৎসা প্রদান, নিম্নমানের ডায়াগনস্টিক ল্যাব কর্তৃক ভুল পরীক্ষা, ইত্যাদি। ৬. বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি ও সত্য ঘটনা ধামাচাপা দেয়া। ৭. দেশীয় সংস্কৃতি উন্নয়ন এবং উৎসাহিত করার পরিবর্তে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ ভিনদেশীয় সংস্কৃতি প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সুযোগ সৃষ্টি ও উৎসাহ প্রদান করা। ৮. ধান, চাল, ডাল, মাছ, শাকসবজি ও মসলাসহ সব খাদ্যদ্রব্য এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দ্রব্যাদিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্তে¡ও ভেজাল খাদ্য সরবরাহ করে এবং কালোবাজারি ও মজুদদারির মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লোভ দেখা যাচ্ছে অহরহ। কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করা। ৯.পদোন্নতি, ব্যবসায়ী প্রকল্প অনুমোদন এবং আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে বুদ্ধিজীবী ও সুশীলসমাজের মেধা, মনন, সততা ও দায়বদ্ধতা ধ্বংস করে তাদেরকে দলীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। ১০. নিম্ন থেকে সর্বোচ্চ স্তরে বিচারকাজে নিয়োজিত সব রকম বিচারক ও আইনজীবীদের ভয়, ভীতি, হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব কাজে মেধাবর্জিত ও দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়া। ১১. সীমাহীন ক্ষমতা এবং অকল্পনীয় অর্থ ও পদবি অর্জনের সুবিধা থাকায় সৎ, ত্যাগী, মেধাসম্পন্ন দেশপ্রেমী নাগরিকের পরিবর্তে অসৎ, অশিক্ষিত ও নীতিবিবর্জিত ব্যক্তিদের রাজনীতিতে যোগদানের পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এ কারণে রাজনীতি হয়েছে দুর্বৃত্তায়ন এবং একই কারণে স্বচ্ছ , নিরপেক্ষ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ রুদ্ধ হওয়ায়, নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসা ক্ষেত্র। ১২. দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, স্বাধীনতা অর্জনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষমতা, অর্থ, পদবি দেয়ার বিনিময়ে দলীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তাদেরকে করা হয়েছে বিভক্ত। একই সাথে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিতরণের মাধ্যমে সৃষ্টি করা রয়েছে অসংখ্য ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও সমর্থনজ্ঞাপনকারী বিদেশী ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দানের জন্য স্মরণিকা স্বর্ণের পরিবর্তে ভেজালদ্রব্য দিয়ে তৈরি করে বিশ্বের সম্মুখে সমগ্র জাতিকে বিব্রত ও লজ্জিত করা হয়েছে। এতক্ষণ বাংলাদেশের দুর্নীতির কিছুটা খণ্ডচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। দুর্নীতি সম্পূর্ণ নির্মূল করা আমাদের প্রত্যাশা ও কাম্য হলেও তা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। তবে দুর্নীতির কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার চেষ্টা করা হলে আমরা তার ভয়াল থাবা থেকে অনেকটাই রেহাই পাবো।

সমাজের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তরে, সৎ, ত্যাগী ও দেশপ্রেমী নেতৃত্বের অভাবকেই দুর্নীতি সৃষ্টি ও বিস্তারের প্রধান কারণ মনে করি। এ জন্য শিক্ষিত, চরিত্রবান, নির্লোভ ও ত্যাগী ব্যক্তিদের সব বাধা উপেক্ষা করে রাজনীতিতে যোগদানের কোনো বিকল্প নেই। আদর্শ, সময়োপযোগী শিক্ষার পরিবর্তে মাত্র অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে লোভনীয় পেশা খুঁজে পাওয়ার জন্যই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সৃষ্টি। প্রকৃতপক্ষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানবিক গুণাবলি এবং ধর্মীয় অনুশাসন সম্পৃক্ত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা যা হবে আদর্শ চরিত্র গঠনে সহায়ক। মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেস মার্কের বিনিময় পরীক্ষার ফলাফল উন্নত করা এবং জিপিএ ৫ এর সংখ্যা বৃদ্ধি করাই বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মেধাশূন্য ও অদক্ষ শিক্ষকদের নিয়োগ এবং তোষামোদি ও দলীয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে পদোন্নতির বিধান শিক্ষার বেহাল অবস্থার অন্যতম কারণ। বিশ্বজুড়ে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার সাথে জড়িত সব শিক্ষক এবং কর্মকর্তাকে দেয়া উচিত সর্বোচ্চ বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা। একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিম্নতম স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত অপরিহার্য।

মানবিক মূল্যবোধের অভাব এবং মানুষের মৌলিক চাহিদার অনুপস্থিতি দুর্নীতি বিস্তারের সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে থাকে বিধায় এ বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সৎ, দক্ষ, মেধাবী ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্তরে বিচারক ও আইন প্রশাসনে নিয়োগের মাধ্যমে আইনের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় বিভিন্ন সংস্থায়, বিশেষ করে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সততা এবং তার পাশাপাশি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যথাক্রমে পুরস্কৃত করা ও প্রকাশ্যে শাস্তির বিধান কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। বিনোদন ও খেলাধুলার নামে ক্লাব, মদ জুয়া ও নারীব্যবসা কঠোর হস্তে দমন করা আবশ্যক।

নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্য সর্ব প্রকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সৎ, দক্ষ ও অবিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন বিভাগ, কর বিভাগ, অন্যান্য জনসেবামূলক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তির উপযুক্ত বেতন-ভাতা, চিকিৎসা এবং ন্যায্যমূল্যে খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি সরবরাহ করা দরকার। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সব সদস্য ও সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সাহায্যকারী সব দেশ ও সংস্থা কর্তৃক তাদের দেয়া আর্থিক সাহায্য ও প্রকল্প বাস্তবায়ন দুর্নীতিমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে কঠোর নীতি অবলম্বন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

দুর্নীতি আমাদের অস্থিমজ্জায় প্রবাহিত। এর নির্মূলের জন্য প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরে বিরামহীনভাবে কঠোর ও তীব্র আন্দোলন চালু রাখা। কোভিড-১৯ হতেও এই মহামারী বহুগুণ বেশি প্রলয়ঙ্করী। তাই একে রোধ করা না হলে পুরো জাতির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক দেশ এবং জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও সর্বনাশা দুর্নীতির কারণে ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত হয়েছে। তাই আমাদের তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজ অনেক কষ্টসাধ্য। কেননা দেশের দুর্নীতিবাজরা পুরো শাসনব্যবস্থায় জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। ক্ষমতাধর এবং ধনিক স¤প্রদায় এর চালিকাশক্তি। তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজন একতাবদ্ধ, সঙ্ঘবদ্ধ ও সমন্বিত প্রচেষ্টা। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও শাসকদের হাতে রয়েছে ক্ষমতা, অর্থ এবং সর্বপ্রকার অস্ত্র। তারা ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য প্রয়োজনে প্রশাসন, পুলিশ, গণমাধ্যম, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীকেও ব্যবহার করে নিরীহ জনগণের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, কারাবন্দী এবং প্রাণহরণ করতেও পিছপা হয় না।

দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হাতে এসব শক্তির কিছুই নেই। কিন্তু তাদের রয়েছে প্রতিবাদ করার শক্তি এবং কলমের শক্তি। এই শক্তি বয়ে আনতে পারে সাময়িক বিপর্যয়, কারাভোগ, এমনকি প্রাণহানি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে- কোনো সমাজে, কোনো দেশে, কোনো জাতিতেই ত্যাগ ও বিসর্জন ব্যতীত কোনো মহান সফলতা অর্জিত হয়নি। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুদ্ধই তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই আমরা দেশ-বিদেশে যে যেখানে যে অবস্থায়ই থাকি, কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে দুর্নীতির অগ্রযাত্রা রোধ করে মানবিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার সম্পন্ন উন্নয়নের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হতে হবে সোচ্চার। এটি আমাদের সামাজিক, নৈতিক এবং ধর্মীয় দায়িত্বও। এই মুহূর্তে আমাদের সবারই এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য কর্তব্য। বাংলাদেশের মানুষের সফলতা নিতান্তই কম নয়। এ মাটির মুক্তিপাগল মানুষের ইতিহাস জেনে আলেকজান্ডারের মতো বিশ্বসেরা যোদ্ধাও বাংলায় আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেছিলেন । এ মাটির মানুষ অজস্রবার পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার লক্ষ্যে বিদেশী শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল। এ মাটির মানুষই ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। আমাদের অর্জন একুশে ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত। এ দেশের বিজ্ঞানী, ডাক্তার, প্রকৌশলী এবং অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে অভূতপূর্ব সফলতা বয়ে এনেছেন।

এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এ দেশেই জন্মেছিলেন সোহরাওয়ার্দী। এই মাটিতেই জন্ম হয়েছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর যিনি ক্ষমতার জন্য নয়, শুধু মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। ফারাক্কা অভিমুখে লাখ লাখ মানুষ সাথে নিয়ে যাত্রা করে প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্রের বুকে সৃষ্টি করেছিলেন হৃদকম্পন। এ দেশেই জন্ম নিয়েছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। এ দেশে জন্ম নিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু, অতীশ দীপঙ্কর, দাতা মহসিন, নওয়াব সলিমুল্লাহ, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেসরকারি সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

এতকিছু অর্জনের পরও এবং এত বড় গর্বিত জাতি হয়েও আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব না, এ কথা বিশ্বাস করা কষ্টকর। এদেশে দুর্নীতি নির্মূল হতেই হবে। এ সময় প্রয়োজন আমাদের সংযম, নির্লোভতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বলে একতাবদ্ধ হয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ক্ষমতার জন্য এবং অফুরন্ত অর্থের লোভে নীতিবর্জিত পথে প্রচেষ্টা চালানো অর্থহীন। সবাইকেই পূর্বনির্ধারিত মুহূর্তে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই মানবকল্যাণে আমাদের সব কর্মই আমাদের মর্ত্যে এবং পরকালের সুফল বয়ে আনার চাবিকাঠি। আমাদের হতাশ হলে চলবে না। আমাদের মনে রাখা উচিত, অন্ধকার যত গভীর হয়, সূর্য তত দ্রুত আলোকিত হয়ে উদিত হয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উক্তি উল্লেখ করে সমাপ্তি টানছি: ‘The world will not be destroyed by those who do evils but by the ones who watch them without doing anything’.



আরো সংবাদ